সববাংলায়

ঝুমুর গান

বঙ্গদেশের লোকসংস্কৃতির একটি বিপুল অংশ জুড়ে আছে লোকগান। হরেক কিসিমের প্রাচীন লোকগানের ধারা আজও বাংলার নানা জায়গায় বহমান। কোন কোন লোকগান আবার বাংলার বাইরেও জনপ্রিয়। ঝুমুর গান (Jhumur Song) তেমনই এক লোকগান। মূলত আসাম, ঝাড়খন্ড, ওড়িশা এইসব অঞ্চলে ঝুমুর গানের ব্যাপক প্রচলন রয়েছে। ওরাওঁ, মুন্ডা, বাগাল প্রভৃতি আদিবাসী সম্প্রদায় টুসু, করম ইত্যাদি উৎসবে এই গান করে থাকে। কোনও কোনও পন্ডিতের মতে এই গানের ধারা প্রায় হাজার বছর ধরে চলে আসছে। পদকল্পতরুর মতো প্রাচীন গ্রন্থে, বৈষ্ণব পদাবলীর প্রসিদ্ধ কবি বিদ্যাপতির লেখাতেও ঝুমুর গানের উল্লেখ পাওয়া যায়। ঝুমুর গানে একটা সময় পর থেকে বাউলতত্ত্ব, ভক্তিতত্ত্বও স্থান পেতে শুরু করেছিল। প্রাচীন এই লোকগানের ধারাটির আবার নানারকম প্রকারভেদও রয়েছে। বর্তমান সময়ে ঝুমুরের জৌলুস কিছুটা ম্লান হয়ে গেলেও তার অস্তিত্ব আজও হারিয়ে যায়নি।

ঝুমুর নামকরণের উৎপত্তি বিষয়ে পন্ডিতদের মধ্যে নানা মতভেদ রয়েছে। সুকুমার সেনের মতে, প্রাচীনকালে কোন এক নাট্যগীতের ধারা ঝুমুর নামে প্রচলিত ছিল। সেই পালায় কোন গদ্য সংলাপ থাকত না, সবটাই গানের মাধ্যমে বলা হত। তিনি বলেন সংস্কৃতে ঝুমুরকে জম্ভলিকা বলা হত। কেউ আবার বলেন যে, ঝুমুর বা নুপুরের সঙ্গে ঝুমুর গানের সম্পর্ক আছে। নাচনির ঘুঙুরের ঝুমঝুম শব্দ থেকেই ঝুমুর শব্দের উৎপত্তি বলে অনেকে মনে করেন। কারও কারও মতে, ঝুমরি রাগে গাওয়া গানগুলোই আসলে ঝুমুর নামে পরিচিত। কোন কোন লোকসংস্কৃতি গবেষক আবার মনে করেন জুম বা ঝুম চাষের সঙ্গে ঝুমুর শব্দের উৎপত্তির একটি যোগাযোগ রয়েছে। কৃষিনির্ভর অঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রাকে অনুসরণ করেই ঝুমুর গান বিকাশ লাভ করেছিল। কৃষিজমিতে কাজের সময় ক্লান্তি দূর করার জন্যই মূলত মেয়েরা সমবেত কন্ঠে এই গান গাইত। একজন ঝুমুর শিল্পী সলাবত মাহাত বলেছেন ‘ঝুমুর কথার অর্থ ঝুরে মরা। সুর ও সঙ্গীতের অন্তরের নিবেদনই ঝুমুরের মূল তাৎপর্য। এও বলা হয়ে থাকে, যে, এই গান হল ‘ঝুমুইর’, অর্থাৎ যা ঝুম বা তন্দ্রা হরণ করে।

তবে ঝুমুর শব্দটির উদ্ভব যেভাবেই হোক না কেন বহুদূর পর্যন্ত এই ঝুমুর গান বিস্তার লাভ করেছে। সাধারণভাবে মনে করা হয়, পশ্চিমবঙ্গের পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, মেদিনীপুর (মূলত পশ্চিম মেদিনীপুর ও ঝাড়গ্রাম), বীরভূম, ঝাড়খণ্ডের রাঁচি, সিংভূম, হাজারিবাগ, পালামৌ, গিরিডি, ধানবাদ, বোকারো, সাঁওতাল পরগনা, ওড়িশার ময়ূরভঞ্জ, কেওনঝাড়, সুন্দরগড়, সম্বলপুর, ছোটনাগপুরের মালভূমি ইত্যাদি এইসব অঞ্চলে ঝুমুর গান ব্যাপকভাবে প্রচলিত। লোকগবেষক আশুতোষ ভট্টাচার্যের মতে, ‘ছোটনাগপুর হইতে আরম্ভ করিয়া সমগ্র মধ্য ভারত ব্যাপিয়া গুজরাটের সীমা পর্যন্ত যে আদিবাসী সংগীত প্রচলিত আছে, তাহা ঝুমুর নামে পরিচিত।’

কেউ কেউ মনে করেন চড়ক-গাজনই আসলে ঝুমুর গানের মূল উৎসমুখ। শিব আরাধনার সময় শিবভক্তেরা নৃত্যসহযোগে যে গান করে থাকেন, আসলে সেটাতেই ঝুমুরের সূচনার ইঙ্গিত ছিল বলে মনে করা হয়। এছাড়াও বহু পুরোনো যে করম-জাওয়া গান ও নাচ সেটিকেও ঝুমুর গানের আকর উৎস রূপে গণ্য করেন অনেকে। উল্লেখ্য যে, মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্যদেবের আবির্ভাবের পূর্বে বিদ্যাপতি, গোবিন্দদাসদের পদে ‘ঝুমরি’ বা ‘ঝুমরী’, এই শব্দের উল্লেখ পাওয়া যায়। শ্রীখন্ডের দামোদর মিশ্র রচিত ‘সঙ্গীত দামোদর’, কিংবা বৈষ্ণবদাসের ‘পদকল্পতরু’ গ্রন্থে ঝুমুরের উল্লেখ রয়েছে। আশুতোষ ভট্টাচার্য ঝুমুর গানকে সাঁওতালদের গান বলে মনে করতেন। দামোদর মিশ্রের রচনায় যেভাবে ঝুমুর গানের প্রসঙ্গ এসেছে তা থেকে বোঝা যায়, তিনি পরোক্ষে এই গানকে নিম্নশ্রেণীর মহিলাদের দ্বারা গীত বলে উল্লেখ করেছিলেন, তবে সাঁওতাল শ্রেণীর কোন স্পষ্ট ইঙ্গিত সেখানে ছিল না। লোকগবেষক বঙ্কিমচন্দ্র মাহাতর বক্তব্য অনুযায়ী, ঝুমুর হল ঝাড়খণ্ডের প্রেমের গান। করম নাচ ও নাচনী নাচের গানকেই তিনি ঝুমুর গান হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন।

আদিযুগের ঝুমুর গান মোট চারটি ধারায় বিভক্ত ছিল, যথা, কবি, টাইঁড়, উধয়া এবং ছুট। তবে বিভিন্নদিক থেকে ঝুমুরের একাধিক প্রকারভেদ রয়েছে। মার্জিত ভাষায় রাধাকৃষ্ণ লীলা ইত্যাদি বিষয়ে রচিত ঝুমুরগুলি দরবারি বা বৈঠকী ঝুমুর নামে পরিচিত। অন্যদিকে লৌকিক ঝুমুরের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল, ঠাঁড়, উধয়া, ডমকচ, ডহরিয়া, দাঁড় ইত্যাদি। ঋতু অনুসারেও ঝুমুরের প্রকারভেদ রয়েছে, যথা, চৈতারি, আষাঢ়ি, বারমেসা ইত্যাদি। সুর, তাল ও নৃত্য অনুসারে ঝুমুরের প্রকারভেদগুলি হল, বাউলছোঁয়া, ঢুয়া, কীর্তনছোঁয়া, দাঁড়শালিয়া, খেমটি, আড়হাইয়া পৃরভৃতি। অঞ্চলভেদে বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য অনু্যায়ী ঝুমুর নানাপ্রকার, যথা, বরাবাজারিয়া, ঝালদোয়া, সিলিয়াড়ি, গোলায়ারি, তামাড়িয়া প্রভৃতি। এছাড়াও জাতিভেদেও ঝুমুরের কুড়মালি, মুন্ডারি ইত্যাদি প্রকারভেদ রয়েছে। এছাড়াও কেউ কেউ সাঁওতালি ঝুমুর, টপ্পা ঝুমুরের কথাও বলেন।

এছাড়াও বিভিন্ন পরবকে কেন্দ্র করেও ঝুমুর গানের ধারা তৈরি হয়। ভাদু পরবের সময়ে গীত ভাদুগানকে কেন্দ্র করে ঝুমুর গানের যে ধারাটি তৈরি হয়েছিল তা ভাদরিয়া-ঝুমুর নামে পরিচিত। এছাড়াও করম-পরবের সময় পুরুষেরা করম ডাল নিয়ে আসার সময় যে গান গায় তাকে ‘ডাল-ধরা ঝুমুর’ বলা হয়ে থাকে।

এমনকি কয়লা খনিতে কাজ করার জন্য মানভূমে থেকে যাওয়া শ্রমিকদের গান ‘খাদানিয়া ঝুমুর’ নামে পরিচিত। অঞ্চলভেদে, জাতিভেদে, কর্মভেদে, বিষয়ভেদে এভাবেই ঝুমুরকে নানাভাগে বিভক্ত করা হয়ে থাকে।

বাইজিদের অনুকরণে মানভূম অঞ্চলে গড়ে ওঠা নাচনী সম্প্রদায়ের মহিলারাই এক সময় ঝুমুর গানের অন্যতম ধারক ও বাহক ছিলেন৷ আজও এই নাচনীরা বিশ্বকর্মা পুজো কিংবা সরস্বতী পুজোর মতো উৎসবে ঝুমুরের বায়না পেয়ে থাকে। এছাড়াও করম পরব, ভাদু পরবের মতো উৎসবে আজও ঝুমুর গান শুনতে পাওয়া যায়।

ঝুমুর গান যত সময় পেরিয়ে এগিয়ে এসেছে আধুনিক কালের দিকে ততই এরমধ্যে নানারকম বিবর্তন লক্ষ করা গেছে। চৈতন্য মহাপ্রভুর আবির্ভাবের আগে থেকেই যে ঝুমুর গানের প্রচলন ছিল তা পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে। মহাপ্রভু যখন ঝাড়খন্ডে গেলেন এবং সেখানে প্রেমভক্তির রসধারা দিকে দিকে সঞ্চারিত করে দিলেন ও জাতিভেদহীন শ্রেণীর ধারণার বিস্তার ঘটালেন তা সেখানকার সাধারণ মানুষকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করে, ফলে সেই অঞ্চলের ঝুমুর গানের মধ্যেও সেই বৈষ্ণব ধারণার প্রভাব স্পষ্টত লক্ষ করা যায়। মানুষের চিন্তায় যে রদবদল ঘটে ঝুমুরেও তার প্রভাব পড়ে। মহাপ্রভুর প্রভাবে ঝাড়খণ্ডের ঝুমুর গান একপ্রকার ভক্তিমূলক গানে পরিণত হয়। ঝুমুরে রাধাকৃষ্ণ লীলার কথা এসে পড়ে। মহাপ্রভুর পরিক্রমার ফলে ধ্রুপদী কীর্তনের সঙ্গে মিশে দরবারি ঝুমুরের প্রবর্তন হয়। এই যুগকে ঝুমুরের মধ্যযুগ বলা যেতে পারে। এরপর আধুনিক যুগে ঝুমুর অনেক বেশি সামজিক জীবনের গান হয়ে উঠেছিল। এই সময় থেকেই ভাদু, টুসু ইত্যাদি পরবের সঙ্গে ঝুমুর গানের ঘনিষ্ঠতা বাড়ে, ফলে ভাদরিয়া ঝুমুরের মতো সব ধারা তৈরি হতে থাকে। অন্যদিকে আসামের চা-শ্রমিকেরা যে সমবেত নৃত্যগীতসহযোগে ঝুমুর গান গায় তার মধ্যে ভক্তির তুলনায় ঝুমুরের আদি সুরের আধিক্যই লক্ষ করা  যায়। অন্যদিকে মানভূমে জমিদারদের পৃষ্ঠপোষকতায় বাইজি ঘরানার অনুকরণে যখন নাচনী সম্প্রদায়ের সৃষ্টি হল, তখন, ঝুমুর গানের সঙ্গে নাচের মেলবন্ধনে তৈরি হল নাচনিশালিয়া ধারা। স্বাধীনতার পরে এই নাচনীরাই ঝুমুর গানের প্রধান ধারক-বাহক ছিলেন। জনগণের দাবিতে ক্রমে ক্রমে সেই নাচনীদের শিল্পে যৌনতার এমনকি চটকদার হিন্দি গানেরও মিশ্রণ ঘটে যায়। তবুও বিভিন্ন ঝুমুর শিল্পী ও সম্প্রদায় আজও ঝুমুর গানকে টিকিয়ে রেখেছে। আদি ও মধ্যযুগের ঝুমুরের ভক্তিমূলক বিষয়বস্তু থেকে আধুনিক কালের ঝুমুর অনেকটাই সরে এসেছে। আধুনিক ঝুমুরে সমাজজীবনের বাস্তবতার কথা, সাম্প্রদায়িকতার বিরোধিতা, বিভিন্ন রাজনৈতিক প্রসঙ্গ ইত্যাদি ঢুকে পড়েছে।

ঝুমুর গানের প্রসঙ্গ উঠলেই যে সমস্ত ঝুমুর শিল্পীর নাম আপনা থেকেই উঠে আসে তাঁরা হলেন, বিজয় মাহাত, ইন্দ্রাণী মাহাত, মহাবীর নায়ক, দুলাল মানকি, সুনীল পাল, সুনীলবরণ মাহাত, সাধুচরণ দাস, সলাবত মাহাত, অমূল্য কুমার, মিহিরলাল সিংদেও, বঙ্কিম কর্মকার, কিশোর গুপ্ত প্রমুখ। রামকৃষ্ণ গাঙ্গুলি আরেকজন খুব বিখ্যাত ঝুমুর শিল্পী ছিলেন। তাঁর একটি গান ছিল এরকম— ‘অকালে মানুষ মরে হাহাক্কার ঘরে ঘরে/ দেখি দুখী যত মহাজন/কবিরাজ ডাক্তার কত, চিন্তা করি নানামত/করিলেন উপায় সৃজন হে’। এই গানে ছিয়াত্তরের মন্বন্তরের ভয়াবহ দিনগুলির চিত্র উঠে এসেছে। আবার বরাক উপত্যকার অত্যন্ত প্রচলিত ও জনপ্রিয় একটি গান হল, ‘চল মিনি আসাম যাব’। ঝুমুরিয়া বরজুরাম দাসের ‘সরোবরে জল নাই পদ্ম ফুটে নিতি/আকাশে পবন নাই গন্ধ ছুটে অতি’ নামক ঝুমুর গানে বাউলের দেহতত্ত্বও স্থান পেয়েছিল। অনেক ঝুমুর শিল্পী দুরদর্শন বা আকাশবাণীতেও গান গেয়েছিলেন।

নাচনীদের ছাড়াও ঝুমুরকে বাঁচিয়ে রাখার আরও নানান প্রচেষ্টা চলছে। বিজয় মাহাত, সুনীল পালদের ঝুমুর আজও জনপ্রিয়। প্রথিতযশা ঝুমুর শিল্পী ও সম্প্রদায়ের অনুষ্ঠানের ভিডিও ক্যাসেটের আজও দারুণ বিক্রি রয়েছে। ঝাড়খণ্ডের রাঁচী বিশ্ববিদ্যালয়ে কুড়মালি ঝুমুর গানকে পাঠ্যক্রমের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এমনকি ভারত সরকারের পূর্বাঞ্চল সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ছৌ ও ঝুমুর শিল্পীদের নিয়ে স্বনির্ভর দল গঠন করেছেন। তাঁদের উদ্যোগেই বিলুপ্ত হতে বসা দরবারি ঝুমুরের ওপর একটি তথ্যচিত্র তৈরি হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের তথ্য ও সংস্কৃতি বিভাগের ‘আদিবাসী ও লোক সংস্কৃতি চর্চা কেন্দ্র ঝুমুর শিল্পী সলাবত মাহাতকে নিয়ে একটি তথ্যচিত্র প্রকাশ করেছে। এমনকি সেই সরকারি বিভাগ ঝুমুরকে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য ঝুমুর সংক্রান্ত আকর গ্রন্থ ও সিডিও প্রকাশ করেছে। প্রাচীন এই লোকগানের ধারাকে রক্ষা করতে এইসমস্ত উদ্যোগ সত্যিই প্রশংসনীয়।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading