বিখ্যাত বাঙালি ভাষাতাত্ত্বিক এবং একইসঙ্গে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ইতিহাস প্রণেতা হিসেবে সুবিদিত সুকুমার সেন (Sukumar Sen)। শুধু বাংলা ভাষাই নয়, পালি প্রাকৃত ও সংস্কৃত ভাষার উপরেও তাঁর পাণ্ডিত্য ছিল প্রশ্নাতীত। তুলনামূলক ভাষাতত্ত্ব এবং পুরাণের আলোচনায় তাঁর বক্তব্যই ছিল সর্বাগ্রে মান্য। শুধু তাই নয়, সরস সাহিত্য রচনাতেও তাঁর জুড়ি মেলা ভার। গাম্ভীর্যপূর্ণ প্রবন্ধ কিংবা বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসের পাশাপাশি মৌলিক সাহিত্য রচনাতেও সুকুমার সেনের জুড়ি মেলা ভার। তাঁর লেখা পাঁচ খণ্ডের ‘বাঙ্গালা সাহিত্যের ইতিহাস’ একটি অন্যতম আকরগ্রন্থ। বলা যায় এই বইটিই বাংলার একটি পূর্ণাঙ্গ ও সামগ্রিক ইতিহাসের বই। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ এই বইয়ের ভূমিকা লিখে দিয়েছিলেন। ১৯৬০ সালে সাহিত্য অকাদেমি থেকে এই বইয়ের ইংরেজি সংস্করণ প্রকাশিত হলে পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু তার প্রস্তাবনা লিখে দেন। রামায়ণ ও মহাভারতকে কেন্দ্র করে তাঁর দীর্ঘ তুলনামূলক পুরাণতাত্ত্বিক আলোচনাগ্রন্থ বাঙালি পণ্ডিতমহলে যথেষ্ট সমাদৃত। সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের ছাত্র ছিলেন তিনি, সুনীতিকুমারের পরে তিনিই কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনামূলক ভাষাতত্ত্ব বিভাগের দ্বিতীয় খয়রা অধ্যাপক হিসেবে নিযুক্ত হন। ১৯৮৪ সালে লণ্ডনের রয়্যাল এশিয়াটিক সোসাইটি তাঁকে জুবিলী স্বর্ণপদকে ভূষিত করে। তিনিই প্রথম এশীয় হিসেবে এই পুরস্কার পান। এছাড়াও ভারত সরকারের পক্ষ থেকে ১৯৮২ সালে ‘দেশিকোত্তম’ এবং ১৯৯০ সালে ‘পদ্মভূষণ’ উপাধি পান সুকুমার সেন।
১৯০০ সালে ১৬ জানুয়ারি পূর্ব বর্ধমান জেলার শ্যামসুন্দরের নিকটবর্তী গোতান গ্রামে সুকুমার সেনের জন্ম হয়। তাঁর বাবা হরেন্দ্রনাথ সেন পেশায় ছিলেন একজন উকিল। তাঁর মায়ের নাম নবনলিনী দেবী। তাঁদের বাড়িতে পূজিতা হতেন অভয়াদুর্গা। প্রথম দিকে তাঁর পরিবারে আর্থিক সচ্ছলতা থাকলেও, পরে বিস্তর অনটনের মধ্যে দিয়ে তাঁর জীবন কেটেছে। তাঁর দাদার নাম ছিল অন্নদাপ্রসাদ সেন। ছোটোবেলায় খেলতে খেলতে দাদার কোমরে থাকা চাবিকাঠিতে হাত পড়ে যায় সুকুমারের আর তাই দেখে তাঁর ঠাকুমা বলেছিলেন যে তিনি সঠিক জিনিসকেই ধরেছেন, জীবনে চাবিকাঠিটাই হল আসল। শৈশবেই একবার ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁর বাবা হরেন্দ্রনাথ তাঁকে উপহার দেন ‘হাসিখুশি’ ও ‘রাক্ষস-খোক্ষস’ নামের দুটি বই। পরবর্তীকালে সুনীলা সেনের সঙ্গে সুকুমার সেনের বিবাহ হয়। ছোটোবেলায় তাঁর ইচ্ছে ছিল বড় হয়ে রেলের ইঞ্জিনচালক হবেন, পরে বড় হয়ে চেয়েছিলেন গণিতজ্ঞ হতে। যদিও গণিতজ্ঞ না হয়ে শেষ পর্যন্ত ভাষাতাত্ত্বিক হলেন কিন্তু তারপরেও ইণ্ডিয়ান ম্যাথমেটিক্যাল সোসাইটির এস. কে. বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে পত্রালাপ চালিয়ে গেছেন।
বর্ধমান মিউনিসিপ্যাল হাইস্কুলে ১৯১৭ সালে ভর্তি হন সুকুমার সেন। এরপরে ১৯১৯ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে বর্ধমান রাজ কলেজ থেকে বাংলা, সংস্কৃত, গণিত ও লজিক বিষয়ে এফ. এ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন তিনি। ১৯২১ সালে সংস্কৃত কলেজ থেকে সংস্কৃত সাম্মানিক কোর্সে প্রথম বিভাগে প্রথম হন সুকুমার সেন এবং একইসঙ্গে একটি বিভাগীয় বৃত্তিও অর্জন করেন। ১৯২৩ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে তুলনামূলক ভাষাতত্ত্ব পড়তে শুরু করেন তিনি এবং স্নাতকোত্তর স্তরে এই বিষয়ে সর্বোচ্চ নম্বর পেয়ে উত্তীর্ণ হন তিনি। ভাষাতাত্ত্বিক সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় এবং ইরাচ জাহাঙ্গীর শোরাবজি তারাপুরওয়ালা ছিলেন তাঁর শিক্ষক। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন একবার সুনীতিকুমারের তৈরি করা পরীক্ষার প্রশ্নপত্রে একটি ভুল খুঁজে বের করে শিক্ষককে দেখান সুকুমার সেন। সুনীতিকুমার এতে বিন্দুমাত্র ক্ষুণ্ন না হয়ে তাঁর আরেক প্রিয় ছাত্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহের সঙ্গে সুকুমারের আলাপ করিয়ে দেন। এই সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ই সুকুমার সেনের দক্ষতা ও মেধার প্রাখর্য উপলব্ধি করে তাঁকে বিদেশে পড়তে পাঠাবেন মনস্থির করে নিজের দায়িত্বে তাঁর জীবনপঞ্জী ছাপিয়ে উপাচার্য আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের ঘরে গিয়ে সুকুমারকে বিদেশ পাঠানোর প্রস্তাব দেন। কিন্তু আশুতোষ জানান যে তিনি পাটনা থেকে ফিরে এসে এ বিষয়ে কথা বলবেন। দুর্ভাগ্যবশত পাটনাতেই আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের মৃত্যু হয়। ফলে আর বিদেশ যাওয়া হয়নি সুকুমার সেনের। এরপরে গবেষণার জগতে এসে মধ্য ও আধুনিক আর্যভাষার ঐতিহাসিক পদবিচারের উপর গবেষণা করে পিএইচডি ডিগ্রিও অর্জন করেন তিনি। এছাড়াও তাঁর একটি অন্যতম গবেষণা প্রবন্ধের শিরোনাম ছিল ‘সিনট্যাক্স অফ বৈদিক প্রোজ’ অর্থাৎ বৈদিক গদ্যের ভাষাশৈলী। এই গবেষণা প্রবন্ধ লিখে ১৯২৫ সালে প্রেমচাঁদ-রায়চাঁদ বৃত্তি পান সুকুমার। ১৯২৬ সালে তাঁর গবেষণা প্রবন্ধ ‘নোটস অফ দ্য ইউজ অফ কেসেস ইন দ্য কথক সংহিতা’ প্রথম এশিয়াটিক সোসাইটির জার্নালে প্রকাশ পায়। পড়াশোনা ছাড়া খেলাধূলাতেও তাঁর আগ্রহ ছিল বিস্তর। মোহনবাগান আর ইস্টবেঙ্গলের ডার্বি ম্যাচ একবার দেখতে গিয়েছিলেন তিনি। সুনীল গাভাস্কার তাঁর প্রিয় ক্রিকেটার ছিলেন । মাঝেমধ্যেই ভারতের খেলা থাকলে অন্যদের থেকে খোঁজখবর নিতেন তিনি।
১৯৩০ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন লেকচারার হিসেবে যোগ দেন সুকুমার সেন। দীর্ঘ চৌত্রিশ বছর এই বিশ্ববিদ্যালয়েই অধ্যাপনা করেছেন তিনি। ১৯৫৪ সালে সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের পরে তিনিই তুলনামূলক ভাষাতত্ত্ব বিভাগের দ্বিতীয় খয়রা অধ্যাপক নির্বাচিত হন। অধ্যাপনা করার সময়েও সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের স্নেহবৎসল সান্নিধ্য পেয়েছেন তিনি। অধ্যাপনার জগতেও তাঁর শিক্ষাতেই নিজের ছাত্রদেরকেও আপনি বলে সম্বোধন করতেন সুকুমার সেন।
১৯২৮ সালে তিনিই প্রথম গবেষক ছিলেন যিনি প্রাচীন ইন্দো-আর্য ভাষাশৈলী বিষয়ে গবেষণা করেছেন আর এই গবেষণার ফলশ্রুতি লক্ষ করা যায় তাঁর ‘ইউজ অফ কেসেস ইন ভেদিক প্রোজ’ এবং ‘বুদ্ধিস্ট হাইব্রিড সংস্কৃত’ বই দুটিতে। এরপরে মধ্য ইন্দো-আর্য ভাষার বিন্যাস নিয়েও গবেষণা করেছেন তিনি যা ফুটে ওঠে তাঁর লেখা ‘অ্যান আউটলাইন অফ সিনট্যাক্স অফ মিডল ইন্দো-আরিয়ান’ বইটিতে যা ১৯৫০ সালে প্রকাশ পায়। ভাষাতত্ত্ব বা পুরাণ চর্চার ক্ষেত্রে মিথের প্রাধান্যের বদলে আধুনিক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অবলম্বন করেন তিনি। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, এশিয়াটিক সোসাইটি এবং বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদে প্রায় ১২ হাজার পুঁথি নিজে হাতে পরীক্ষা করেন তিনি। তিনিই প্রথম জয়দেবের ‘গীতগোবিন্দম্’ কাব্যের প্রাচীনতম পুথিটি খুঁজে বের করেন। এছাড়া ‘সেকশুভোদয়া’ নামে আরেকটি প্রাচীন বাংলা ভাষার নিদর্শনমূলক পুঁথি সম্পাদনা করেন তিনি। ১৯৩৯ সালে তাঁর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ ‘বাঙ্গালা সাহিত্যের ইতিহাস’-এর প্রথম খণ্ডটি প্রকাশ পায় এবং পরে ১৯৯১ সালের মধ্যে আরও চারটি খণ্ড প্রকাশিত হয়। পাঁচ খণ্ডের এই সাহিত্যের ইতিহাস গ্রন্থ আজও বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস বিষয়ে অন্যতম প্রামাণ্য আকর গ্রন্থের মর্যাদায় আসীন। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ এই বইয়ের ভূমিকা লিখে দিয়েছিলেন। ১৯৬০ সালে সাহিত্য অকাদেমি থেকে এই বইয়ের ইংরেজি সংস্করণ প্রকাশিত হলে পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু তার প্রস্তাবনা লিখে দেন। বাংলা ভাষার উৎপত্তি ও প্রকার বিষয়ে দীর্ঘ গবেষণালব্ধ ফল তিনি প্রকাশ করেন ‘ভাষার ইতিবৃত্ত’ নামে। এই বইতেই প্রথম ইন্দো-আর্য ও ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষার ঐতিহাসিক পদ্ধতিতে ভাষাতত্ত্বের বিচার করা হয় এবং বাংলা ভাষার পঞ্চম উপভাষা হিসেবে ঝাড়খণ্ডী ভাষার উল্লেখ করা হয়। এর আগে যদিও ১৯৩৪ সালে প্রকাশ পেয়েছে তাঁর লেখা ‘বাংলা সাহিত্যে গদ্য’ বইটি। এই বইটিতেই প্রথম ভাষার নিয়মতান্ত্রিক, শৈলীগত বর্ণনা ও বিশ্লেষণ করা হয়। ১৯৩৫ সালে সুকুমার সেনের লেখা ‘হিস্ট্রি অফ ব্রজবুলি লিটারেচার’ বইটি প্রকাশিত হয়। এই বইটি তাঁর বাবাকে উপহার দিয়েছিলেন সুকুমার সেন। বইটি উল্টে পাল্টে হরেন্দ্রনাথ তাঁকে বলেছিলেন যে তিনি যেন চৈতন্যকে নিয়ে ব্যবসা না করেন। কিন্তু তাঁর গবেষণা যে ব্যবসা নয়, সে কথা বুঝতে পারেননি তিনি।
তাঁর অন্যান্য বিখ্যাত বইয়ের মধ্যে রয়েছে – ‘মধ্য ভারতীয় আর্য ভাষার তুলনামূলক ব্যাকরণ’ (১৯৬০), ‘রামকথার প্রাক ইতিহাস’ (১৯৭৭), ‘বাংলা স্থাননাম’ (১৯৮২), ‘ভারত কথার গ্রন্থিমোচন’ (১৯৮১), ‘ভারতীয় আর্য সাহিত্যের ইতিহাস’ (১৯৬৩) এবং ‘বাংলায় নারীর ভাষা’ (১৯২৩)। ১৯৭১ সালে দুই খণ্ডে প্রকাশিত হয় সুকুমার সেনের ‘বাংলা নামের উৎপত্তি’ বইটি। ভারতের কোন ভাষাতেই এমন বিস্তারিত কাজ পাওয়া দুষ্কর। বাংলা শব্দের ঐতিহাসিক উৎপত্তি এবং ব্যুৎপত্তিগত বিচার বিশ্লেষণ করেছেন সুকুমার সেন এই বইতে। গাম্ভীর্যপূর্ণ প্রবন্ধের পাশাপাশি বাংলা ক্রাইম কাহিনীর পূর্বাপর নিয়েও তিনি লিখেছেন ‘ক্রাইম কাহিনীর কালক্রান্তি’ নামে একটি বই। তাছাড়া স্ত্রীর মৃত্যুর পরে নিজের বাড়িতেই তিনি ‘হোমসিয়ানা’ নামে একটি আসর বসাতেন যেখানে তাঁর নিজের সৃষ্টি গোয়েন্দা কালিদাসকে নিয়ে লেখা নানা গল্প পড়ে শোনাতেন সুকুমার সেন। তাঁর একমাত্র আত্মজীবনীর নাম ‘দিনের পরে দিন যে গেল’।
১৯৭৩ সালে সাহিত্য অকাদেমির সম্মানীয় সদস্যপদ পান সুকুমার সেন । ১৯৮৪ সালে লণ্ডনের রয়্যাল এশিয়াটিক সোসাইটি তাঁকে জুবিলী স্বর্ণপদকে ভূষিত করে। তিনিই প্রথম এশীয় হিসেবে এই পুরস্কার পান। এছাড়াও ভারত সরকারের পক্ষ থেকে ১৯৮২ সালে ‘দেশিকোত্তম’ এবং ১৯৯০ সালে ‘পদ্মভূষণ’ উপাধি পান সুকুমার সেন। এশিয়াটিক সোসাইটির পক্ষ থেকে তাঁকে যদুনাথ সরকার পদকে ভূষিত করা হয়।
১৯৯২ সালের ৩ মার্চ ৯২ বছর বয়সে সুকুমার সেনের মৃত্যু হয়।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান