ইতিহাস

মহম্মদ রফি

মহম্মদ রফি (Mohammed Rafi) ভারতের সর্বকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্লে-ব্যাক গায়ক হিসেবে গন্য হয়ে থাকেন। কিশোরকুমারের আগে তিনিই হিন্দি চলচ্চিত্রের গানের দুনিয়ার সম্রাট ছিলেন। শুধুমাত্র হিন্দি সিনেমার জন্য প্লে-ব্যাকই নয়, হিন্দি ছাড়াও বহু ভাষায় গানও গেয়েছেন তিনি। তাঁর গাওয়া গানের সংখ্যা প্রায় সাত হাজারেরও বেশি। ২০০১ সালে, রফি হিরো হোন্ডা এবং স্টারডাস্ট ম্যাগাজিনের বিচারে “শতাব্দীর সেরা সংগীতশিল্পী” উপাধিতে ভূষিত হন। ২০১৩ সালে, সিএনএন-আইবিএন-এর সমীক্ষায় রফিকে হিন্দি সিনেমার সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ কণ্ঠ হিসেবে নির্বাচিত করা হয়।

১৯২৪ সালের ২৪ ডিসেম্বর ভারতের পাঞ্জাব প্রদেশের কোটলা সুলতান সিং গ্রামে মহম্মদ রফির জন্ম হয়। তাঁর বাবার নাম হাজী আলী মহম্মদ। তিনি তাঁর পাঁচ ভাইয়ের মধ্যে সবার বড় ছিলেন। মহম্মদ রফির সাথে প্রথমে বৈশিরা বিবির বিবাহ হয়। পরবর্তীকালে তাঁদের একটিই পুত্রসন্তান হয়। দাঙ্গার সময় বৈশিরার বাবা-মা নিহত হলে তিনি আর ভারতে থাকতে চাননি। তাঁদের বিচ্ছেদের পর তিনি লাহোরে চলে যান। রফি তারপর বিলকিস্‌ বানুকে বিবাহ করেন। তাঁদের ছ’টি ছেলে মেয়ে।

সঙ্গীতের প্রতি রফির আকর্ষণ তৈরি হয় ছোটোবেলায় ফকিরদের গান শুনে। ১৯৩৫ সালে তাঁরা লাহোরে চলে যান। সেখানে তাঁর বাবা একটি সেলুন চালাতেন। রফি শাস্ত্রীয় সঙ্গীত শিখতে শুরু করেন উস্তাদ আব্দুল ওয়াহিদ খানের কাছে। তারপর তিনি পন্ডিত জীবন লাল মট্টু এবং ফিরোজ নিজামীর কাছে সঙ্গীত-শিক্ষা লাভ করেন। মাত্র তেরো বছর বয়সেই সঙ্গীতানুষ্ঠান করতে শুরু করেন তিনি। প্লে-ব্যাক গায়ক হিসেবে তিনি প্রথমবার ১৯৪১ সালে ‘গুল বালুচ’ নামক একটি পাঞ্জাবি ছবিতে জিনাত্‌ বেগমের সাথে ডুয়েট গান করেন যে ছবিটি ১৯৪৪ সালে মুক্তি পায়। সেই বছরই তিনি লাহোরের ‘অল ইন্ডিয়া রেডিও’-তে গান গাওয়ার সুযোগ পান। 

১৯৪৪ সালে রফি বোম্বে চলে আসেন এবং সেখানেই তাঁর সঙ্গে চলচ্চিত্র প্রযোজক আব্দুল রশিদ কারদার, মেহবুব খান এবং চলচ্চিত্র পরিচালক নাজিরের পরিচয় হয়। ১৯৪৫ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘গাঁও কি গোরি’ হিন্দি ছবিটিতে তিনি প্রথম গান গাওয়ার সুযোগ পান। এরপর  ‘পেহলে আপ’ ছবির জন্য তিনি প্রখ্যাত সঙ্গীত পরিচালক নওশাদের সুরে ‘হিন্দুস্তান কে হাম হে’ গানটি করেন। ১৯৪৫ সালে ‘লায়লা মজনু’ ছবিতে ‘তেরা জল্‌বা জিস্‌নে দেখা’ গানটির দৃশ্যে তিনি অভিনয়ও করেন। ১৯৪৭ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘জুগনু’ ছবিটিতে ‘আপনি ইয়াদ দিলানে কো’ গানটির দৃশ্যেও অভিনয় করেন মহম্মদ রফি। এই ছবিটিতে তিনি প্রখ্যাত সঙ্গীত শিল্পী নুরজাহানের সাথে গান গেয়েছেন। পরবর্তীকালে তিনি নওশাদের সঙ্গে অনেক কাজ করেন। সেই সময় অনেক গানের কোরাসেও গলা মিলিয়েছেন রফি। ১৯৪৬ সালে  মুক্তিপ্রাপ্ত মেহেবুব খানের ‘আনমোল ঘড়ি’ ছবিটিতে তিনি গান করেন।

১৯৪৭ সালের  দেশভাগের পর রফি ভারতে থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন এবং তাঁর পরিবারকে বোম্বেতে নিয়ে চলে আসেন। ১৯৪৮ সালে গান্ধীজির মৃত্যুর পর মহম্মদ রফি তাঁকে স্মরণ করে হাসানলাল ভগৎরাম রাজেন্দ্রকৃষ্ণের সুরে একটি গান করেন। ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু সেই গানটি গাওয়ার জন্য তাঁর বাড়িতে আমন্ত্রণ জানান তাঁকে। মহম্মদ রফিকে  সেই গানটির  জন্য ১৯৪৮ সালে প্রথম স্বাধীনতা দিবসের দিন রৌপ্য পদক প্রদান করেন নেহরু। ১৯৪৯ সালে তিনি  অনেকগুলো ছবিতে একক গান করার সুযোগ পান। রফি কিশোরকুমারের অভিনীত ছবিতে, তাঁর লিপে গানও করেছেন। শংকর জয়কিষণের সুরে তিনি প্রায় ৩৪১টি  গান গেয়েছেন যার মধ্যে ২১৬টি ছিল একক গান। শংকর জয়কিষণ তাঁকে মূলত শাম্মী কাপুর এবং রাজেন্দ্র কুমারের লিপে গান গাওয়াতে পছন্দ করতেন। তাঁর সুরে মোহাম্মদ রফির কিছু জনপ্রিয় গানের মধ্যে অন্যতম হল  “দিল কে ঝরোখে মে”, “বাহারো ফুল বরসাও”, “তেরে পেয়ারে পেয়ারে সুরত কো”, “চাহে কই মুঝে জঙ্গলি কহে” ইত্যাদি। তিনি শংকর জয়কিষণের সুরে গান গাওয়ার জন্য তিনবার ফিল্মফেয়ার পুরস্কার (Filmfare Award) পান। নওশাদের সুরে গান গেয়ে তাঁর খ্যাতি বম্বে চলচ্চিত্র জগতে ছড়িয়ে পড়ে। নওশাদের সুরে ১৪৯টি গান করেন রফি যার মধ্যে ৮১টি ছিল একক গান। নওশাদের সঙ্গে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ একটি কাজ হল ১৯৫২ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘বৈজু বাওরা’ ছবির গান। রফি সম্পর্কে নৌশাদ এতটাই মুগ্ধ ছিলেন যে রফিকে নিজের আত্মা বলতেও দ্বিধা করেননি তিনি।

রফি শচীন দেব বর্মনের সুরেও অনেকগুলি  গান গেয়েছেন। শচীন দেব বর্মন সাধারণত দেব আনন্দ ও গুরু দত্তের লিপে (leap)  রফিকে দিয়ে  গান গাওয়াতে পছন্দ করতেন। প্রায় ৩৭টি ছবিতে তিনি শচীন দেব বর্মনের সঙ্গে কাজ করেন। সেই সব ছবির মধ্যে অন্যতম হল ‘প্যায়াসা’ (১৯৫৭), ‘কাগজ কে ফুল’ (১৯৫৯),  ‘তেরে ঘরকে সামনে’ (১৯৬৩), ‘গাইড’ (১৯৬৫), ‘আরাধনা’ (১৯৬৯), ‘অভিমান’ (১৯৭৩), ‘কালা বাজার’ ইত্যাদি। ১৯৬০ সালে ‘চৌধ্‌ভি কা চাঁদ’ ছবিতে সুরকার রবির সুরে গান গাওয়ার জন্য তিনি তাঁর জীবনের প্রথম ‘ফিল্মফেয়ার পুরস্কার’ পান। ১৯৬৮ সালে ‘নীলকমল’ ছবিতে তাঁর সুরে ‘বাবুল কে দুয়া লেতে যা’ গানটির জন্য মহম্মদ রফি জাতীয় পুরস্কারে পুরস্কৃত হন। প্রখ্যাত সুরকার মদন মোহনের প্রিয় সঙ্গীতশিল্পী ছিলেন মহম্মদ রফি। তিনি মদন মোহনের সুরে প্রথম ১৯৫০ সালে ‘আঁখে’ ছবিতে গান করেন। মদন মোহনের সুরে তাঁর গাওয়া বেশ কিছু জনপ্রিয় গানের মধ্যে অন্যতম হল ‘ইয়ে দুনিয়া ইয়ে মেহেফিল’, ‘তেরে আঁখো কে সিবা’, ‘তুম জো মিল গায়ে হো’, ‘মেরি আওয়াজ সুনো’, ‘আপ কে পহেলে ম্যায়’ ইত্যাদি।

পঞ্চাশের দশকে এবং ষাটের দশকে রফি সুরকার ও. পি. নাইয়ারের সুরে অনেকগুলি ছবিতে গান গেয়েছেন। ও. পি. নাইয়ারের সুরে রফির গাওয়া বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ গানের মধ্যে অন্যতম হল ‘ইয়ে হ্যায় বোম্বে মেরি জান’, ‘মন মোরা বাবরা’, ‘জওয়ানিয়া ইয়ে মস্ত মস্ত’, ‘ইয়ে চাঁদ সা রৌশন চেহ্‌রা’ ইত্যাদি। ‘কাশ্মীর কি কলি’ সিনেমাটিতে ও. পি. নাইয়ারের  সুরে রফির গাওয়া গানগুলি খুবই জনপ্রিয় হয়।  মহম্মদ রফির সঙ্গে ও. পি. নাইয়ারের কিছু সমস্যা হওয়ায় তাঁর সাথে অনেকদিন কাজ করেননি রফি। প্রখ্যাত সঙ্গীত পরিচালকদ্বয় লক্ষ্মীকান্ত ও প্যায়ারেলালের সুরে তিনি প্রথম ১৯৬৩ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘পরশমনি’ ছবিতে গান করেন। ১৯৬৪ সালে তাঁদের সুরে ‘দোস্তি’ ছবিতে ‘চাহুঙ্গা ম্যায় তুঝে সাঁঝ সবেরে’ গানটি গাওয়ার জন্য তিনি  ‘ফিল্মফেয়ার পুরস্কার’ পান। লক্ষ্মীকান্ত-প্যায়ারেলালের সুরে প্রায় ৩৮৮টি  গান গেয়েছেন রফি। তিনি অপর বিখ্যাত সঙ্গীত পরিচালকদ্বয় কল্যাণজি ও আনন্দজির সুরে ১৭০টি গান গেয়েছেন। এছাড়াও তিনি অন্য বহু সুরকারদের সাথে কাজ করেছেন যাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন জয়দেব, খৈয়াম, রাজেশ রোশন, রবীন্দ্র জৈন, বাপ্পি লাহিড়ী, রাহুল দেব বর্মণ ও আরো অনেকে। তিনি শুধু প্রতিষ্ঠিত সুরকারদের সঙ্গেই কাজ করেননি, অনেক কম খ্যাতনামা এবং নবাগত সুরকারদের সুরেও গান গেয়েছেন। তিনি তাঁর সময়কার প্রায় সমস্ত প্রথম সারির সঙ্গীত-শিল্পীর সঙ্গে যুগলে (duet) গান গেয়েছেন। তাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন লতা মঙ্গেশকর, আশা ভোঁসলে, মান্না দে, সুমন কল্যাণপুর ও গীতা দত্ত। চলচ্চিত্রের গান গাওয়ার পাশাপাশি তিনি অনেক অ্যালবামের গানও (basic songs) গেয়েছেন। তিনি ক্রিস পেরির অ্যালবাম (album) ‘কোঙ্কাণী’তে লরনা করডেইরোর সঙ্গেও বেশ কিছু গান গেয়েছেন। এছাড়াও তিনি বাংলায় বিভিন্ন সুরকারের সুরে অনেকগুলি গান গেয়েছেন। তার পাশাপাশি তিনি একটি নজরুলগীতির অ্যালবামও প্রকাশ করেন।

রফির সাথে কাজ করেছেন এমন অনেক বিখ্যাত অভিনেতাই মনে করেন গানের দৃশ্যে কোন নায়ক কখন কী করবেন, এই বাপারে তাঁর অবিশ্বাস্য স্তরের আন্দাজ ক্ষমতা ছিল। লন্ডনের স্কালা থিয়েটারে রফির গান শেষে এক অন্ধ শ্রোতা তাঁকে বলেছিলেন, ‘যত দিন আমার কান শুনতে পাবে আপনার গান, তত দিন এ জগতে আমার চোখের প্রয়োজন হবে না’।

সত্তরের দশকের প্রথম দিকে তিনি গলার কিছু সমস্যার জন্য গান গাওয়া অনেকটাই কমিয়ে দেন। এছাড়াও হিন্দি চলচ্চিত্রের জগতে প্লে-ব্যাক গায়ক হিসেবে কিশোরকুমারের আবির্ভাবের ফলে তাঁর কাজ কিছুটা কমে যায়। সেই সময়কার তাঁর কিছু উল্লেখযোগ্য গানের মধ্যে অন্যতম হল ‘তুম মুঝে ইউ ভুলা না পাওগে’,  ‘ঝিলমিল সিতারো কা’, ‘গুলাবি আঁখে’, ‘কান মে ঝুমকা’, ‘কিতনা পেয়ারা ওয়াদা’, ‘তেরে বিন্দিয়া রে’, ‘আজ মৌসম বড়া বেইমান হ্যায়’ ইত্যাদি। সেই সময় তিনি ঋষি কাপুরের লিপে অনেকগুলি গান গেয়েছেন। ‘আস পাস’ নামক একটি ছবিতে তাঁর জীবনের শেষ গান গেয়েছেন রফি।

১৯৮০ সালের ৩১ জুলাই মহম্মদ রফির মৃত্যু হয়। তাঁর শেষ যাত্রায় প্রায় দশ হাজার মানুষের সমাগম ঘটে ছিল। ভারত সরকার তাঁকে সম্মান জানাতে দু’দিন ব্যাপী শোক পালনের কথা ঘোষণা করে। তাঁকে জুহুতে অবস্থিত একটি কবরস্থানে সমাধিস্থ করা হয়।

ভারতীয় সঙ্গীত জগতে তিনি একজন নক্ষত্র হয়ে থেকে গেছেন। তাঁর গানের মূর্ছনায়  প্রজন্মের পর প্রজন্ম মোহিত হয়ে  রয়েছে।

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর - জন্ম সার্ধ শতবর্ষ



তাঁর সম্বন্ধে জানতে এখানে ক্লিক করুন

সাহিত্য অনুরাগী?
বাংলায় লিখতে বা পড়তে এই ছবিতে ক্লিক করুন।

বাংলাভাষায় তথ্যের চর্চা ও তার প্রসারের জন্য আমাদের ফেসবুক পেজটি লাইক করুন