ইতিহাস

গোবর গোহ

গোবর গোহ (Gobar Goho) একজন কিংবদন্তী বাঙালি কুস্তিগীর যিনি প্রথম এশীয় হিসেবে আমেরিকায় অনুষ্ঠিত বিশ্ব লাইট হেভিওয়েট চ্যাম্পিয়নশিপ জিতেছিলেন। কলকাতার গোয়াবাগান স্ট্রিটের কুস্তির আখড়ায় আজও তাঁর স্মৃতি অমলিন।

১৮৯২ সালের ১৩ মার্চ কলকাতার এক অতি পরিচিত কুস্তিগীর পরিবারে জন্ম হয় গোবর গোহ-র। গোবর গোহ নামে পরিচিত হলেও তাঁর আসল নাম যতীন্দ্রচরণ গুহ। এ প্রসঙ্গে বলা ভালো, ছোটোবেলায় নাদুসনুদুস চেহারার জন্য রামচরণ গুহ এবং অম্বিকাচরণ তাঁদের বংশের নতুন সদস্যের ডাকনাম রেখেছিলেন ‘গোবর গণেশ’। সেই থেকে ওটাই তাঁর অন্যতম পরিচয় হয়ে ওঠে। আর ইংরেজরা গুহকে ‘গোহো’ বলায় মুখে মুখে তিনি পরিচিত হন ‘গোবর গোহ’ নামে। গোবরের বাবার নাম রামচরণ গুহ ও মায়ের নাম নির্মলাকুমারী দেবী। শরীরচর্চার জন্য প্রসিদ্ধ গুহ-বংশে ব্রজরাম গুহ যশোর জেলা থেকে কলকাতায় এসে সাহেবদের মুৎসুদ্দির কাজ করে প্রভূত অর্থ সঞ্চয় করেন এবং দর্জিপাড়া অঞ্চলে সম্পত্তি কিনে স্থায়ী বাসিন্দা হন। তাঁর পুত্র শিবচরণ গুহও মুৎসুদ্দির কাজে প্রচুর অর্থ-সম্পত্তির মালিক হন। শিবচরণের নাতি অম্বিকাচরণ গুহের হাত ধরেই ডন-কুস্তির প্রচলন হয় গুহ-বংশে। শিবচরণের প্রশ্রয়ে ও বিপুল অর্থব্যয়ে আধুনিক বাংলার প্রথম কুস্তির আখড়া স্থাপন করেন অম্বিকাচরণ অধুনা শোভাবাজার অঞ্চলে ২৫ নং মসজিদবাড়ি স্ট্রিটে। অল্পদিনের মধ্যেই কুস্তির জগতে অসীম দক্ষতার কারণে তিনি ‘রাজাবাবু’ নামে পরিচিত হয়ে গেলেন। তাঁর চতুর্থ পুত্র অর্থাৎ যতীন্দ্রচরণের কাকা ক্ষেত্রচরণ গুহ ওরফে ক্ষেতুবাবুও ছিলেন কুস্তিবীর। এই ক্ষেতুবাবুই প্রশিক্ষণ দিয়েছিলেন গোবরকে।

পনেরো বছর বয়সেই তাঁর দম ছিল অবিশ্বাস্য, আখড়ায় দু-আড়াই ঘণ্টা কুস্তি লড়েও ক্লান্ত হতেন না। আর সতেরো-আঠেরো বছর বয়সে রোজ ছয় ঘন্টা ডন-কুস্তি, আড়াই হাজার বৈঠকে অভ্যস্ত হয়ে পড়েন গোবর গোহ। শোনা যায়, পায়ের জোর বাড়াতে গলায় একটা ১৬০ পাউন্ড ওজনের পাথরের হাঁসুলি পড়তেন তিনি, তাঁর দুইজোড়া মুগুরের একজোড়ার প্রতিটির ওজন ছিল ২৫ সের আর অন্যজোড়ার প্রতিটির ওজন ছিল ১ মণ ১০ সের। তাঁর কাকা কুস্তি শেখানোর জন্য অমৃতসর থেকে নিয়ে আসেন খোসলা চৌবে, রহমান ওস্তাদ, লাহোরের ওস্তাদ বগলা খলিফা এমনকি কল্লুর শাগরেদ গুর্তা সিং-কেও। কাকার দক্ষ তালিমের সুবাদে তাঁর শরীরে প্রবল শক্তি সঞ্চার হয়। দেহের ওজন দাঁড়ায় ২৪৫ পাউন্ড অর্থাৎ ১১০ কেজির একটু বেশি। তাঁর চেহারার গঠন ছিল এরকম – গলা ২০ ইঞ্চি, হাতের গোছ ১৫ ইঞ্চি, কব্জি পৌনে ৯ ইঞ্চি, ছাতি ৫০ ইঞ্চি, ঊরু ৩৩ ইঞ্চি। গামা পালোয়ান, ইমাম বক্স, আলি সাই আহমেদ বক্স কাল্লুর মতো বিখ্যাত পালোয়ানদের সঙ্গে লড়ে তিনি বহু ঘরানার কুস্তির প্যাঁচ শেখেন।

গোবর গোহর কুস্তিতে বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপ জেতার পথটি মোটেই সহজ ছিল না। বড়ো বংশের ছেলে হয়েও কুস্তিকে পেশা করতে সঙ্কোচ করেননি গোবর গুহ। জামাইবাবু শরৎচন্দ্র মিত্রের পরামর্শে ১৯১০ সালে মাত্র ১৮ বছর বয়সে তিনি বিদেশে পাড়ি দেন শুধুমাত্র কুস্তি লড়ার জন্য, সঙ্গে ছিলেন বয়সে বড় গামা পালোয়ান, ইমাম বক্স। ১৯১২-তে লণ্ডনের জন বুল সোসাইটি আয়োজিত কুস্তির বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে ভারতের প্রতিনিধিত্ব করেন গামা পালোয়ান ও গোবর গুহ। আমেরিকার বেঞ্জামিন রোলার, পোল্যাণ্ডের স্তানিস্‌লস সিবিস্কো কিংবা সুইজারল্যাণ্ডের জন লেমকে পরাজিত করেন তাঁরা। ১৯১৩ সালের আগস্ট মাসে এডিনবরায় স্কটিশ চ্যাম্পিয়ন জিমি ক্যাম্পবেলকে পরাস্ত করেন গোবর। এভাবে পরপর গ্রিসের বিল দেমেত্রালস, জার্মানির কার্ল শাফ্‌ট, বোহেমিয়ার জো শুলজ্‌, বেলজিয়ামের জ্যানসন, বুলগেরিয়ার গ্রানোভিচ্‌ এমনকি তুরস্কের মেহমুদ্‌ প্রমুখ বিখ্যাত মল্লবীরদের অবলীলায় ধরাশায়ী করে ইউরোপ জুড়ে সাড়া ফেলে দেন গোবর। এই বছরেই প্যারিসে আন্তর্জাতিক মল্লযুদ্ধের প্রদর্শনীতে গোবর গোহ বেলজিয়ামের হ্যানসন আর জার্মানির কার্ল জাফ্‌টকে পরাজিত করেন। ইতিমধ্যে মায়ের অসুস্থতার সংবাদ পেয়ে দেশে ফিরে আসেন তিনি। দেশে ফিরে শুরু হয় আরো কঠোর শরীরচর্চা ও নানারকম কুস্তির কৌশল অনুশীলন। এই সময়েই গোবর ভারতীয় কুস্তির রীতিতে ধোঁকা, টিব্বি, গাধানেট, টাং, ঢাক, ধোবাপাট-এর মত নানা নতুন প্যাঁচ উদ্ভাবন করেন। তাঁর সবথেকে বেশি ব্যবহৃত পদ্ধতিটি হল রদ্দা। তাঁর খাওয়া-দাওয়া সম্পর্কে জনশ্রুতি ছিল যে তিনি নাকি সোনার গুঁড়ো মিশিয়ে খাবার খেতেন। এভাবে নিজেকে প্রস্তুত করে আরো বড়ো জয়ের দিকে পা বাড়ালেন গোবর গুহ।

১৯২১ সালের ২৪ আগস্ট সানফ্রান্সিসকো-তে অনুষ্ঠিত বিশ্ব-মল্লযুদ্ধ চ্যাম্পিয়নশিপে তৎকালীন লাইট হেভিওয়েট চ্যাম্পিয়ন অল্‌ স্যন্টাল্‌কে পরাজিত করে গোবর গুহ লাইট-হেভিওয়েট বিভাগে বিশ্ব-চ্যাম্পিয়নের শিরোপা পান। তাছাড়া ঐ বছরই সদ্য খেতাব-খোয়ানো মার্কিন বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন এডওয়ার্ড স্ট্র্যাংগলার লুইসকে এক ঘন্টার মধ্যে পরাজিত করেন গোবর গুহ। অথচ সমস্ত খেলাতেই প্রবল বিরুদ্ধ-চেষ্টা, পক্ষপাতিত্ব করা হয়েছে গোবরকে হারানোর জন্য। ফ্রি-স্টাইল কুস্তিতে অভ্যস্ত গোবরের পক্ষে বিদেশের ‘গ্রেকো-রোমান’ পদ্ধতিতে কুস্তি লড়ায় প্রতিকূলতা ছিল পদে পদে। এই ‘গ্রেকো-রোমান’ পদ্ধতিতে প্রতিপক্ষ’র কোমরের নিচে হাত দেওয়াতেই ফাউল হয়, এমনকি ভারতে যে মাটিতে কুস্তি লড়া হত তার বদলে ইউরোপে খেলা হত ম্যাটের উপর। তবু তিন বছর বিদেশে কাটিয়ে বহু বাঘা-বাঘা মল্লযোদ্ধাদের কুপোকাত করে ভারতীয় ‘নিগার’ হয়েও ইউরোপের ত্রাস তখন গোবর গুহ। ছয় ফুট দুই ইঞ্চি লম্বা এই কুস্তিবীরকে নিয়ে তখন সংবাদপত্রে লেখালিখি হচ্ছে, কোথাও তাঁকে বলা হচ্ছে ‘দ্য জেন্টল জায়ান্ট’। আমেরিকার কার্টুনিস্ট তাঁকে নিয়ে কার্টুন আঁকছেন। একজন ভারতীয় কৃষ্ণাঙ্গ মল্লযোদ্ধা হয়ে বিদেশের মাটিতে এতটা জনপ্রিয় বোধকরি আর কেউ হননি!

মুর্শিদাবাদের নবাব স্যার ওয়াশিক আলি মির্জার অনুরোধে ১৯২৯ সালে পার্ক সার্কাসে কংগ্রেসের অধিবেশনে কুস্তি প্রদর্শনীতে ছোট গামা আর গোবর গোহর মধ্যে একটি মল্লযুদ্ধ প্রদর্শনী হয়। যদিও এই খেলায় প্রহসনের মতো ছল করে পরাজিত করা হয় গোবর গুহকে। বাহারি পাগড়ি, সূক্ষ্ম কাজের কাশ্মীরি শাল আর ফতুয়া পড়ে আজীবন নিজেকে বাঙালি বলেই গর্ব করেছেন গোবর। অহিংসায় বিশ্বাসী এই মানুষটির মাথায় সর্বক্ষণ থাকতো গাঁধী টুপি। কুস্তির পাশাপাশি দারুণ এস্রাজ বাজাতেন তিনি। সেইসঙ্গে ছিল গভীর পড়াশোনা আর নিঁখুত উচ্চারণে বিশুদ্ধ ইংরেজিতে আকর্ষণীয় বক্তৃতা দেবার ক্ষমতা। নিউ ইয়র্কের ‘মডার্ন আর্ট অ্যান্ড লেটার্স’-এ রবীন্দ্রনাথের জীবন ও বাণী নিয়ে দীর্ঘ বক্তৃতা করেছেন গোবর গুহ। বক্তৃতার বিষয়-মাহাত্ম্যের পাশাপাশি তাঁর ভাষাবোধ নিয়েও প্রশংসা করেছিল সেকালের ইউরোপের পত্র-পত্রিকাগুলি। তাঁর পছন্দের লেখকদের তালিকায় রয়েছে রবীন্দ্রনাথ, বার্নার্ড শ এবং অস্কার ওয়াইল্ড।

৫২ বছর বয়সে কুস্তি থেকে বিরতি নেন গোবর গোহ। মসজিদবাড়ি স্ট্রিটের আখড়াকে স্থান বদল করে হেদুয়া পার্কের কাছে গোয়াবাগান স্ট্রিটের বাড়িতে নিয়ে আসেন তিনি। তাঁর আখড়ায় কুস্তি শিখতে বা নিছক আড্ডা দিতে আসতো বহু গুণীজন। সত্যেন্দ্রনাথ বসু, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, মান্না দে এমনকি গান্ধীজির প্রথম সচিব নির্মলকুমার বসুও আসতেন আখড়ায়। সত্যেন্দ্রনাথ বসু ছিলেন তাঁর অন্তরঙ্গ আড্ডাসঙ্গী। নীলমণি দাস, বিষ্ণুচরণ ঘোষ, মনোহর আইচ, মনোতোষ রায় প্রমুখ খ্যাতিমান ব্যায়ামবীররা আসতেন তাঁর আখড়ায়। ১৯৫২-তে অলিম্পিকে ব্রোঞ্জজয়ী কুস্তিগীর খাশাবা দাদাসাহেব যাদব (কে.ডি.যাদব) গোবর গুহর আখড়াতেই কুস্তির পাঠ নিয়েছিলেন। তাঁর অন্যতম বিখ্যাত ছাত্রদের মধ্যে স্মর্তব্য বনমালী ঘোষ, জ্যোতিষচরণ ঘোষ ও বিশ্বনাথ দত্তের নাম। তাঁর অন্তরঙ্গ সুহৃদ সমর বসু ছিলেন তাঁর জীবনীকার।

১৯৭২ সালের ২ জানুয়ারি নিজের বাড়িতেই হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়ে যতীন্দ্রচরণ গুহ ওরফে গোবর গোহ’র মৃত্যু হয়।

তথ্যসূত্র


  1. ‘সংসদ বাঙালী চরিতাভিধান’, সুবোধচন্দ্র সেনগুপ্ত ও অঞ্জলি বসু (সম্পা:), সাহিত্য সংসদ, ১৯৬০, কলকাতা, পৃ ১৩৪, ১৩৫
  2. https://www.anandabazar.com/
  3. https://www.anandabazar.com/
  4. https://www.bongodorshon.com/
  5. https://www.kolkata24x7.com/j

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

স্বরচিত রচনাপাঠ প্রতিযোগিতা - নববর্ষ ১৪২৮



সমস্ত রচনাপাঠ শুনতে এখানে ক্লিক করুন

বাংলাভাষায় তথ্যের চর্চা ও তার প্রসারের জন্য আমাদের ফেসবুক পেজটি লাইক করুন