ইতিহাস

খান আবদুল গফ্‌ফর খান

খান আবদুল গফ্‌ফর খান

ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে ‘সীমান্ত গান্ধী’ নামেই সমধিক পরিচিত খান আবদুল গফ্‌ফর খান (Khan Abdul Ghaffar Khan)। গান্ধীজি পরিচালিত আইন অমান্য আন্দোলনের সময় ভারতের উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের পাখতুনদের সংগঠিত করে ব্রিটিশ বিরোধী অহিংস আন্দোলন পরিচালনা করেছিলেন তিনি। এই লক্ষ্যেই তিনি গড়ে তুলেছিলেন ‘খুদা-ই-খিদমতগার’ নামে একটি বিপ্লবী সংগঠন। একজন মুসলিম হয়েও ভারতীয় উপমহাদেশে হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের জন্য লড়াই করেছিলেন তিনি। ব্রিটিশ শাসনের একেবারে শেষ পর্যায়ে যখন সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুদের নিয়ে ভারত এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিমদের নিয়ে পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠনের পরিকল্পনা করা হয়, খান আবদুল গফ্‌ফর খান সর্বাগ্রে এর বিরোধিতা করেন। কিন্তু জাতীয় কংগ্রেসের অগ্রজ নেতৃবৃন্দ এই পরিকল্পনায় সম্মত হলে, তিনি অত্যন্ত ক্ষুণ্ন হন। ফলে পাখতুনদের সংগঠিত করে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তোলেন তিনি এবং পাখতুনদের জন্য পৃথক রাষ্ট্রের দাবি জানান। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পরে উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের সমস্ত অঞ্চলকে পশ্চিম পাকিস্তানের সঙ্গে সংযুক্ত করার পরিকল্পনার বিরোধিতা করেন খান আবদুল গফ্‌ফর খান এবং সেই কারণে তাঁকে কারাবন্দি করা হয়। অনুরাগী পাখতুনদের কাছে তিনি ‘ফাখরে আফগান’, ‘বাচা খান’ ইত্যাদি নামেও পরিচিত ছিলেন।

১৮৯০ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি ব্রিটিশ ভারতের পেশোয়ার উপত্যকার হাশৎনগরের উৎমাঞ্জিয়া অঞ্চলে এক সম্ভ্রান্ত সুন্নি মুসলিম পরিবারে খান আবদুল গফ্‌ফর খানের জন্ম হয়। তাঁর বাবা আবদুল বেহরাম খান হাশৎনগরের একজন জমিদার ছিলেন। খান আবদুল গফ্‌ফর খান তাঁর বাবার দ্বিতীয় সন্তান ছিলেন।


এই ধরণের তথ্য লিখে আয় করতে চাইলে…

আপনার নিজের একটি তথ্যমূলক লেখা আপনার নাম ও যোগাযোগ নম্বরসহ আমাদের ইমেল করুন contact@sobbanglay.com


 

স্থানীয় এডওয়ার্ডস স্কুলে পড়াশোনা সম্পূর্ণ করেছেন তিনি। সেই স্কুলের উপদেষ্টা রেভারেণ্ড উইগ্রাম সামাজিক কাজের জন্য শিক্ষার উপযোগিতা ও গুরুত্বের বিষয়ে তাঁকে বলেছিলেন এবং পরে দশম শ্রেণিতে পড়াকালীন ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীর ‘কর্পস অফ গাইডস’ রেজিমেন্টের এক সম্মানীয় পদে যোগ দেওয়ার প্রস্তাব দেন। কিন্তু ভারতীয় গাইডস সেনা অফিসারদের অবমাননা ও অসম্মান দেখে তিনি এই প্রস্তাবে রাজি হননি। উইগ্রাম তাঁকে লণ্ডনে পড়াশোনা করতেও অনুপ্রাণিত করেছিলেন, কিন্তু তাঁর মায়ের অমতে লণ্ডনে যাওয়া হয়নি খান আবদুল গফ্‌ফর খানের।

ফলে বাবার জমিদারি পর্যবেক্ষণের কাজ করতে শুরু করেন তিনি। ১৯১০ সালে মাত্র কুড়ি বছর বয়সে উৎমাঞ্জিয়া গ্রামে মুসলিম শিশুদের পড়ানোর জন্য একটি বিদ্যালয় খোলেন তিনি এবং তার পরের বছরই পাখতুন স্বাধীনতা সংগ্রামে যোগ দেন। তুরাঞ্জাইয়ের হাজি সাহেব এই আন্দোলন পরিচালনা করছিলেন। ১৯১৫ সালে ব্রিটিশ সরকার খানের তৈরি মুসলিম বিদ্যালয় বন্ধ করে দেন। ব্রিটিশদের পদানত না থেকে নিজেদের উন্নতি নিজে করার প্রেরণা যোগাতে খানের উদ্যোগেই ১৯২১ সালে স্থাপিত হয় আঞ্জুমান-এ-ইসলাহ-এ-আফগানিয়া অর্থাৎ আফগান রিফর্ম সোসাইটি এবং ১৯২৭-এ গড়ে ওঠে ‘পাখসতুন জিরগা’ অর্থাৎ পাখতুন অ্যাসেম্বলি। ১৯২৮ সালে ‘পাখসতুন’ নামে তিনি একটি মাসিক পত্রিকাও প্রকাশ করা শুরু করেছিলেন। ঠিক এর পরের বছর তাঁর নেতৃত্বে শুরু হয় ‘খুদা-ই-খিদমতগার’ দল যারা ব্রিটিশ শাসিত উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন গড়ে তোলে। ইতিমধ্যে হজ সম্পন্ন করে ফেলেন খান আবদুল গফ্‌ফর খান। ‘খুদা-ই-খিদমতগার’ আন্দোলন দমনের জন্য কঠোরতম শাস্তি দেওয়া হয় তাঁকে। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন পাখতুনদের স্বাধীন করতে হলে আগে তাদের শিক্ষিত করে তুলতে হবে। ব্রিটিশদের দমনমূলক আচরণ, মোল্লাদের নির্যাতন, পাখতুনদের পারস্পরিক হিংসা আগে দূর করার কথা ভাবলেন তিনি। ১৯১৫ থেকে ১৯১৮ সালের মধ্যে উত্তর-পশ্চিম সীমান্তে খাইবার পাখতুনখোয়ার সমগ্র অঞ্চল ঘুরে অধিবাসীদের মধ্যে বৈপ্লবিক চেতনা প্রচার করেন তিনি। এই সময়ই তাঁর অনুরাগীরা তাঁকে ‘বাচা খান’ বলে ডাকতে শুরু করে যার অর্থ হল উপজাতি নেতাদের রাজা। নিজে একজন মুসলিম হলেও তাঁর মধ্যে উদারতা ও ধর্মনিরপেক্ষতা ছিল। ধর্ম নিয়ে মানুষে মানুষে বিভেদ তিনি একেবারেই পছন্দ করতেন না। ফলে তাঁর স্বপ্ন ছিল স্বাধীন ও ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র তৈরি করা। আর সেই লক্ষ্যেই ‘খুদা-ই-খিদমতগার’ গড়ে তুলেছিলেন তিনি। এই দলকে অনেকে ‘রেড শার্ট’ও বলত। গান্ধিজীর সত্যাগ্রহ আন্দোলনের অনুসরণে প্রায় এক লক্ষ মানুষকে সংগঠিত করেছিলেন তিনি। খান আবদুল গফ্‌ফর খানের ভাই ড. খান আবদুল জব্বার খান এই দলের রাজনৈতিক বিভাগটি পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন। ১৯৩৭ সাল থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত মোট দশ বছর উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে অভিষিক্ত হয়েছিলেন খান আবদুল গফ্‌ফর খান। গান্ধীজির আইন অমান্য আন্দোলনের অন্যতম নেতৃত্বে ছিলেন তিনি। লবণ সত্যাগ্রহ চলার সময়েই ব্রিটিশ পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করে। সময়টা ১৯৩০ সালের ২৩ এপ্রিল। বাচা খানের গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে ‘খুদা-ই-খিদমতগার’-এর বহু সদস্য কিস্‌সা খাওয়ানী বাজারে এক প্রতিবাদ সভায় জড়ো হয়। ব্রিটিশ সেনা নির্বিচারে এই জমায়েতে গুলি চালায় যার ফলে ২০০ থেকে ৩০০ জন পাখতুন মারা যান।

অহিংসপন্থী গান্ধীজির সঙ্গে খান আবদুল গফ্‌ফর খানের মানসিক নৈকট্য ছিল প্রবল। ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত একসঙ্গে কাজ করেছিলেন তাঁরা, ফলে ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের সঙ্গে খান পরিচালিত ‘খুদা-ই-খিদমতগার’ দলের ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়। ১৯৩১ সালে জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতি হওয়ার প্রস্তাব দিলে গফ্‌ফর খান তাতে অসম্মত হন। কিন্তু বহুদিন পর্যন্ত তিনি কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির সদস্য ছিলেন। কংগ্রেসের যুদ্ধনীতির সঙ্গে সহমত না হওয়ায় দল ত্যাগ করেন তিনি। কংগ্রেস পুনরায় সেই নীতি সংস্কার করলে দলে যোগ দেন গফ্‌ফর খান। গান্ধীজির অহিংস মতাদর্শের সমর্থন করার জন্য খান ‘সীমান্ত গান্ধী’ নামেই পরিচিত হন। তিনি বারবার অহিংসার ধারণাটিতে জোর দিয়ে বলেছেন যে একই ধারণার কথা কোরানেও লেখা আছে যাকে নবীর প্রধান অস্ত্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। পবিত্র যুদ্ধ তথা জেহাদে ধৈর্য ও ন্যায়পরায়ণতাই যেমন প্রধান হাতিয়ার, তেমনি অহিংসাই হল ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে লড়ে এক স্বাধীন, অখণ্ড এবং ধর্মনিরপেক্ষ ভারত গড়ার হাতিয়ার। ফলে গোঁড়া মুসলিমদের কাছে তিনি কঠোরভাবে সমালোচিত হন। বম্বেতে একটি রাষ্ট্রদ্রোহী বক্তৃতা দেওয়ার জন্য তাঁকে ব্রিটিশ পুলিশ গ্রেপ্তার করে এবং তিন বছর কারারুদ্ধ থাকেন তিনি। সেই সময় তাঁর সন্তানদেরও তাঁর সঙ্গে দেখা করতে দেওয়া হয়নি। ১৯৩৭ সালের পর উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশে প্রাদেশিক নির্বাচনের জন্য মুসলিম লীগ প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করলেও, খুদা-ই-খিদমতগারের প্রভাব খণ্ডন করতে পারেনি। নির্বাচনে কংগ্রেসের অধীনে মোট তিরিশটি আসন জিতে এই দলটি নিজের ক্ষমতা অক্ষুন্ন রাখে। কিন্তু দেশ বিভাজন যখন ঠেকানো গেল না, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময় মহাত্মা গান্ধীর সঙ্গে বিহারে চলে যান খান আবদুল গফ্‌ফর খান। সেখানে একটি সভায় তিনি বলেছিলেন যে ভারতকে ধ্বংস করে দিলে হিন্দু, মুসলিম, খ্রিস্টান এবং অন্য সকল ধর্মাবলম্বীরা ধ্বংস হয়ে যাবে। বলপূর্বক পাকিস্তান গঠন সম্ভব নয়। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ সীমান্ত প্রদেশে ইসলামের দোহাই দিয়ে তিনি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখার চেষ্টা করেন। কিন্তু জাতীয় কংগ্রেস তাঁর সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে। সীমান্ত প্রদেশের পাখতুনদের শুধুমাত্র একটি গণভোটের মাধ্যমে পাকিস্তান অথবা ভারতের সঙ্গে সংযুক্ত হওয়ার বিকল্প দেওয়া হয়। তাদের পৃথক রাষ্ট্রের স্বাধীনতা দেওয়া হয়নি। এতে অত্যন্ত মনক্ষুন্ন হওয়ার ফলে পাকিস্তানে যোগদানের পক্ষে মত দেয় সংখ্যাগরিষ্ঠ পাখতুন সম্প্রদায়। ১৯৪৮ থেকে ১৯৫৪ সাল পর্যন্ত গৃহবন্দী ছিলেন খান আবদুল গফ্‌ফর খান। ১৯৬০-এর দশকে আফগানিস্তানের কাবুলে নির্বাসিত হন। ১৯৬৯ সালে মহাত্মা গান্ধীর জন্মশতবর্ষ উদ্‌যাপনের জন্য স্বাধীন ভারতে যান আবদুল গফ্‌ফর খান।

১৯৬৭ সালে আন্তর্জাতিক সমঝোতার জন্য নেহেরু পুরস্কারে ভূষিত করা হয় তাঁকে। ১৯৮৭ সালে ভারত সরকার তাঁকে সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান ‘ভারতরত্ন’ পুরস্কারে সম্মানিত করে। তিনিই প্রথম অ-ভারতীয় ব্যক্তি যিনি এই পুরস্কার পেয়েছিলেন।

১৯৮৮ সালে ২০ জানুয়ারি গৃহবন্দী থাকাকালীনই খান আবদুল গফ্‌ফর খানের মৃত্যু হয়।

1 Comment

1 Comment

  1. Pingback: আজকের দিনে ।। ৬ ফেব্রুয়ারি | সববাংলায়

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

-
এই পোস্টটি ভাল লেগে থাকলে আমাদের
ফেসবুক পেজ লাইক করে সঙ্গে থাকুন

বিধান রায় ছিলেন আদ্যোপান্ত এক রসিক মানুষ। তাঁর রসিকতার অদ্ভুত কাহিনী



বিস্তারিত জানতে ছবিতে ক্লিক করুন