ইতিহাস

সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর

জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারে মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের বারোটি সন্তানের প্রায় প্রত্যেকেই বাংলার সামাজিক, সাংস্কৃতিক ইতিহাসে একেকজন দিকপাল। এই বারো সন্তানের মধ্যে দ্বিতীয় সন্তান ছিলেন সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর। উনিশ শতকে বাংলার নবজাগরনের সময়ে স্বাধীন সমাজ গড়ে তুলতে সত্যেন্দ্রনাথের ভূমিকা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। তিনি একাধারে ছিলেন ভাষাবিদ, সাহিত্যিক, সংগীত রচয়িতা ও ভারতের প্রথম সিভিলিয়ান যিনি বিদেশ থেকে প্রথম সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। শুধু তাই নয় সমাজে নারীদের স্বাধীনতা ও মুক্তি আন্দোলনেও তাঁর অবদান ছিল চোখে পড়ার মত।

১৮৪২ সালের ১ জুন জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারে সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবার নাম মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ও মাতার নাম সারদা দেবী। তিনি তাঁর প্রাথমিক পড়াশুনা বাড়িতে গৃহশিক্ষকের কাছে সম্পন্ন করার পরে হিন্দু স্কুলে ভর্তি হন। বিদ্যালয়ের পাট চুকিয়ে এরপর উচ্চশিক্ষার জন্য প্রেসিডেন্সি কলেজ ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। প্রেসিডেন্সিতে পড়ার সময় সত্যেন্দ্রনাথ কেশবচন্দ্র সেনের সংস্পর্শে আসেন। কেশবচন্দ্রের সান্নিধ্যে সত্যেন্দ্রনাথ এক নতুন ব্রাহ্মসমাজ গড়ে তুলতে সচেষ্ট হয়েছিলেন। ব্রাহ্মসমাজের ডাকে সাড়া দিয়ে তিনি সেইসময় তত্ত্ববোধিনি পত্রিকায় সম্পাদকের পদ গ্রহণ করেন। ১৮৫৯ সালে সত্যেন্দ্রনাথের আট বছর বয়সী জ্ঞানদানন্দিনীর সাথে বিয়ে হয়। তিনি তাঁর লাজুক স্ত্রীর মধ্যে আধুনিক নারীসত্তা জাগাতে সবদিক দিয়ে সাহায্য করেছিলেন। বাড়িতেই তিনি  স্ত্রী’র পড়াশোনার ব্যবস্থা করেছিলেন এবং নিয়মিত সেই ব্যাপারে খোঁজও রাখতেন। ১৮৬২ সালে তাঁর প্রিয় বন্ধু মনোমোহন ঘোষের উৎসাহে ও বাবার অনুমতিতে সত্যেন্দ্রনাথ ইংল্যান্ডে গিয়ে সিভিল সার্ভিস পরীক্ষার প্রস্তত্তি শুরু করেন। সেই সময় ইংল্যান্ডে গিয়ে ইংরেজদের সাথে প্রতিযোগিতা করে উচ্চপদস্থ সরকারি চাকুরী পাওয়া খুব কঠিন কাজ ছিল। দুই বন্ধু মিলে কঠোর পরিশ্রম করে পরীক্ষায় বসেন। পঞ্চাশ জন ছাত্রের মধ্যে সত্যেন্দ্রনাথ পাশ করলেও তাঁর বন্ধু পাশ করতে পারেননি। দেশে ফিরলে বাঙালি জাতির গৌরব হিসাবে বিদ্যাসাগর  সহ বিভিন্ন বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বরা তাঁকে সাদরে বরণ করেছিলেন। প্রথমে বোম্বাই প্রেসিডেন্সিতে তাঁকে কালেক্টরেট পদে নিযুক্ত করা হয়। সেই সময় বোম্বাই প্রেসিডেন্সি  গঠিত ছিল মহারাষ্ট্র, গুজরাত ও সিন্ধু প্রদেশের অংশ নিয়ে। প্রথম চার মাস তিনি বোম্বাই শহরে কাটালেও পরে তাঁকে আমেদাবাদে নিযুক্ত করা হয়। বদলি চাকরির সূত্রে বেশ কয়েক বছর তিনি বাড়ি থেকে দূরে ছিলেন। বিভিন্ন জায়গা ভ্ৰমণ করায় বহু ভাষাও আয়ত্ত করেছিলেন তিনি। আমেদাবাদ ও হায়দ্রাবাদ শহরে থাকাকালীন তিনি ব্রাহ্মসমাজের কাজেও যুক্ত ছিলেন।
তৎকালীন হিন্দু সমাজে মেয়েদের অবমাননা এবং পর্দানশীন থাকার বিষয়টি ছোটবেলা থেকেই তাঁকে ভাবিয়ে তুলেছিল। ইংল্যান্ডে থাকাকালীন সেখানে নারী স্বাধীনতা প্রত্যক্ষ করে তিনি তাঁর স্ত্রীকেও সেই স্বাধীনতা প্রদান ও বিদেশি আদবকায়দায় শিক্ষিত করে তুলতে চেয়েছিলেন। তিনি তাঁর স্ত্রীকে বিদেশে নিয়ে যাবার ইচ্ছা প্রকাশ করলে তাঁর বাবার আপত্তি থাকায় সেটা হয়ে ওঠেনি। পরে ছুটিতে বাড়ি ফিরে তিনি তাঁর স্ত্রীকে প্রথমে বোম্বাই নিয়ে আসেন ও বোম্বাইয়ে তাঁর অনান্য বন্ধুর স্ত্রীদের সাথে সত্যেন্দ্রনাথ  জ্ঞানদানন্দিনী দেবীর পরিচয় করিয়ে দেন। সেখানে জ্ঞানদানন্দিনী দেবী “বোম্বাই শাড়ি” পরা রপ্ত করেছিলেন। তিনি শাড়ির সাথে জ্যাকেট পড়তেন, এই জ্যাকেট থেকেই ব্লাউজ পড়ার প্রথা চালু হয় পরবর্তীকালে। ১৮৭৭ সালে সত্যেন্দ্রনাথ তাঁর স্ত্রীকে সন্তানসহ একা এক ইংরেজ দম্পতির সাথে ইংল্যান্ড পাঠিয়েছিলেন। স্বামী ছাড়া তিন সন্তানকে নিয়ে বিদেশে পাড়ি ছিল সেই সময়ের নিরিখে এক দুঃসাহসিক কাজ। তাঁর এই সাহসী পদক্ষেপ  জ্ঞানদানন্দিনী দেবীর দৃঢ় মানসিক শক্তিকে আরও দৃঢ় করেছিল। বিদেশে থাকার সময় সত্যেন্দ্রনাথের ছোট ভাইবোনরাও তাঁর কাছে ঘুরতে আসতেন। ছোট রবীন্দ্রনাথের এটাই ছিল প্রথম বিদেশ যাত্রা। এইভাবে জোড়াসাঁকোর ঠাকুর বাড়িতে ক্রমে ক্রমে বিলেতের ছোঁয়া লাগে। সমাজে নারীদের অগ্রাধিকারে সত্যেন্দ্রনাথ বিশেষ ভূমিকা পালন করেছিলেন। নারী জাগরণ তিনি তাঁর পরিবারের মধ্যে দিয়ে চালু করেন। প্লেট দিয়ে শাড়ি পড়ার পদ্ধতি জ্ঞানদানন্দিনী দেবী প্রথম শুরু করেন। নারী সমাজ পরিবর্তনে সত্যেন্দ্রনাথের বোন সৌদামিনী দেবীও সমানভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। ১৮৮৫ সালে জ্ঞানদানন্দিনী দেবী ‘বালক’ নামে একটি শিশুপাঠ্য পত্রিকা চালু করেন যেটা ছোট রবীন্দ্রনাথকে লেখালিখির ব্যাপারে অনেকটাই উৎসাহিত করেছিল।

সত্যেন্দ্রনাথ গভীর দেশপ্রেমিক ছিলেন। উচ্চশিক্ষিত সমাজে তিনি পাশ্চাত্য পোষাক কে অগ্রাধিকার দিলেও ভারতীয় পোষাক ও ভাষাকে তিনি মনে প্রাণে গ্রহণ করেছিলেন। ১৮৬৮ সালে হিন্দুমেলা অধিবেশনে অংশগ্রহণ করে ‘মিলে সবে ভারত সন্তান” গানটি রচনা করেন তিনি। এই গানটি জাতীয় সংগীত হিসাবে প্রথম মর্যাদা পায়। এছাড়াও তিনি অনেক দেশাত্মবোধক গান রচনা করেন। তাঁর বহুমুখী প্রতিভা সত্যিই অবাক করার মতো।
অবসরের পরে তিনি নানা সাহিত্য রচনা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিচালনা করে সময় কাটাতেন। রবীন্দ্রনাথের “বাল্মীকি প্রতিভার ” ডাকাতদের সাজ ও কাবুলি ঢঙে দস্যুদের নাচ তাঁর নির্দেশনায় তৈরি। তাঁর উল্লেখযোগ্য রচনার মধ্যে পড়ে – ‘সুশীলা ও বীরসিংহ’, ‘বোম্বাই চিত্র’, ‘স্ত্রী স্বাধীনতা’, ‘আমার বাল্য কথা’, ‘বোম্বাই প্রবাস’ ইত্যাদি। সর্বোপরি ব্রিটিশ সরকারের কর্মে নিযুক্ত থেকেও সেই সরকারের তীব্র সমালোচনা করার সাহস তিনি দেখিয়েছিলেন।

এই মহাজীবন  ১৯২৩ সালে ৯ই জানুয়ারি ৮১ বছর বয়সে পরলোক গমন করেন। বাংলার সাংস্কৃতিক ও সামাজিক পরিমণ্ডলে সত্যেন্দ্রনাথের অবদান বাঙালি কখনও ভুলবে না।

Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

To Top
error: Content is protected !!