বৌদিকে লেখা বিপ্লবী দীনেশ গুপ্তের শেষ চিঠি

বৌদিকে লেখা বিপ্লবী দীনেশ গুপ্তের শেষ চিঠি

ইতিহাসে অলিন্দ যুদ্ধ বা রাইটার্স বিল্ডিং হামলার সঙ্গে জড়িত বাংলার এক দামাল বিপ্লবী দীনেশ গুপ্ত (Dinesh Gupta)। ইতিহাসে তিনি বিখ্যাত হয়ে আছেন বিপ্লবী বিনয় বসু এবং বাদল গুপ্তের সঙ্গে একযোগে রাইটার্স বিল্ডিং- আক্রমণ করার জন্য। ফাঁসি হওয়ার আগে মাকে এবং বৌদিকে চিঠি লিখেছিলেন দীনেশ। বৌদিকে লেখা বিপ্লবী দীনেশ গুপ্তের শেষ চিঠি সেগুলোই।

অলিন্দ যুদ্ধ চলাকালীন একসময় বিনয়, বাদল এবং দীনেশের রিভলবারের গুলি শেষ হয়ে যাওয়ায় তিনজনে একসাথে একটি ফাঁকা ঘরে ঢুকে তাঁদের সঙ্গে থাকা সায়ানাইড মুখে দিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। মৃত্যু নিশ্চিত করতে তাঁরা প্রত্যেকেই নিজের কপালে বন্দুক তাক করে গুলি চালিয়ে দেন। গুলিতে সেই মুহূর্তেই বাদল গুপ্তের মৃত্যু হয়। বিনয় বসু এবং দীনেশ গুপ্তকে ব্রিটিশ পুলিশ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যায় চিকিৎসার জন্য। ডাক্তারদের আপ্রাণ চেষ্টায়, সেবায় দীনেশ ক্রমশ সুস্থ হয়ে উঠলে তাঁকে হাসপাতাল থেকে ‘কনডেমড’ সেলে নেওয়া হয়। দীনেশ গুপ্তের বিচার করার জন্য আলিপুরের সেশন বিচারপতি মি. গ্রালিকের সভাপতিত্বে ব্রিটিশ সরকার এক ট্রাইবুনাল গঠন করে তাঁর ফাঁসির আদেশ দেয়।

বৌদিকে লেখা বিপ্লবী দীনেশ গুপ্তের শেষ চিঠি টি নিচে সরাসরি তুলে ধরা হল –

আলিপুর সেন্‌ট্রাল জেল

কলিকাতা,

১৮ই জুন, ১৯৩১

বৌদি,

তোমার দীর্ঘ পত্র পাইলাম। অ-সময়ে কাহারো জীবনের পরিসমাপ্তি হইতে পারে না। যাহার যে কাজ করিবার আছে, তাহা শেষ হইলেই ভগবান তাহাকে নিজের কাছে টানিয়া লন। কাজ শেষ হইবার পূর্বে তিনি কাহাকেও ডাক দেন না।

তোমার মনে থাকিতে পারে, তোমার চুল দিয়া আমি পুতুল নাচাইতাম। পুতুল আসিয়া গান গাহিত, “কেন ডাকাইছ আমার মোহন ঢুলী?” যে পুতুলের পার্ট শেষ হইয়া গেল, তাহাকে আর স্টেজে আসিতে হইত না। ভগবানও আমাদের নিয়া পুতুল নাচ নাচাইতেছেন। আমরা এক-একজন পৃথিবীর রঙ্গমঞ্চে পার্ট করিতে আসিয়াছি। পার্ট করা শেষ হইলে প্রয়োজন ফুরাইয়া যাইবে। তিনি রঙ্গমঞ্চ হইতে আমাদের সরাইয়া লইয়া যাইবেন। ইহাতে আপশোষ করিবার আছে কি?

পৃথিবীর যে কোন ধর্মমতকে মানিতে হইলেই আম্মার অবিনশ্বরতা বিশ্বাস করিতে হয়। অর্থাৎ দেহের মৃত্যু হইলেই আমাদের সব শেষ হইয়া যায় না, এ-কথা স্বীকার করিতে হইবে। আমরা হিন্দু, হিন্দুধর্মে এ সম্বন্ধে কি বলিয়াছে, কিছু কিছু জানি। মুসলমান ধর্মও বলে, মানুষ যখন মরে, তখন খোদার ফেরেস্তা তার রু কবজ করিতে আসেন। মানুষের আত্মাকে ডাকিয়া বলেন, “অ্যায় রুহ্ নিকাল ইস কালিসে, চল্ খুদাকা জান্নৎমে।” অর্থাৎ তুই দেহ ছাড়িয়া ভগবানের কাছে চল্। তাহা হইলে বোঝা গেল, মানুষ মরিলেই তার সব শেষ হইয়া যায় না, মুসলমান ধর্মের এ বিশ্বাস আছে। খৃষ্টান ধর্ম বলে, “Very quickly there will be an end of thee here; consider what will become of thee in the next world’—অর্থাৎ দিন তো তোমার ফুরিয়ে এল, পরকালের কথা চিন্তা কর। বোঝা গেল খৃষ্টানধর্মও বিশ্বাস করে মানুষের দেহের মৃত্যু হইলেও আত্মা মরে না। এই তিন ধর্মের কোন একটা স্বীকার করিতে হইলেই আমাকে মানিয়া লইতে হইবে যে, আমার মৃত্যু নাই। আমি অমর। আমাকে মারিবার সাধ্য কাহারো নাই।

ভারতবাসী আমরা নাকি বড় ধর্মপ্রবণ। ধর্মের নামে ভক্তিতে আমাদের পণ্ডিতদের টিকি খাড়া হইয়া উঠে। কিন্তু তবে আমাদের মরণকে এত ভয় কেন? বলি ধর্ম কি আছে আমাদের দেশে? যে দেশে দশ বছরের মেয়েকে পঞ্চাশ বৎসরের বৃদ্ধ ধর্মের নামে বিবাহ করিতে পারে, সে দেশে ধর্ম কোথায়? সে দেশের ধর্মের মুখে আগুন। যে দেশে মানুষকে স্পর্শ করিলে মানুষের ধর্ম নষ্ট হয়, সে দেশের ধর্ম আজই গঙ্গার জলে বিসর্জন দিয়া নিশ্চিন্ত হওয়া উচিত। সবার চেয়ে বড় ধর্ম মানুষের বিবেক। সেই বিবেককে উপেক্ষা করিয়া আমরা ধর্মের নামে অধর্মের স্রোতে গা ভাসাইয়া দিয়াছি। একটা তুচ্ছ গরুর জন্য, না হয় একটু ঢাকের বাদ্য শুনিয়া আমরা ভাই-ভাই খুনোখুনি করিয়া মরিতেছি। এতে কি ‘ভগবান’ আমাদের জন্য বৈকুণ্ঠের দ্বার খুলিয়া রাখিবেন, না ‘খোদা’ বেহেস্তে স্থান দিবেন?

যে দেশ জন্মের মত ছাড়িয়া যাইতেছি, যার ধূলিকণাটুকু পর্যন্ত আমার কাছে পরম পবিত্র, আজ বড় কষ্টে তার সম্বন্ধে এসব কথা বলিতে হইল।

আমরা ভাল আছি। ভালবাসা ও প্রণাম লইবে।

— স্নেহের ছোট ঠাকুরপো।

তথ্যসূত্র


  1. অগ্নিযুগের চিঠি, শুভেন্দু মজুমদার, র‍্যাডিক্যাল ইম্প্রেশন,  দীনেশ গুপ্ত - পৃষ্ঠা -৪৯
  2. স্বাধীনতা যুদ্ধে অচেনা লালবাজার, অগ্নিযুগের বিপ্লবীদের রোমহর্ষক বীরগাথা, সুপ্রতিম সরকার, আনন্দ পাবলিশার্স, অষ্টম অধ্যায় - ৮ ডিসেম্বর ১৯৩০
  3. https://ekhonkhobor.com/

আপনার মতামত জানান