খেলা

সুনীল গাভাস্কার

ভারতীয় জাতীয় ক্রিকেট দলের একজন কিংবদন্তী ব্যাটসম্যান হলেন সুনীল গাভাস্কার (Sunil Gavaskar)৷ তিনি ‘সানি’ নামে পরিচিত ছিলেন। স্বল্প উচ্চতার কারণে তাঁকে ‘লিটল মাস্টার’ ও বলা হত। ১৯৭০ থেকে ১৯৮০ দশকে তিনি বোম্বে ক্রিকেট দল ও ভারতীয় ক্রিকেট দলের হয়ে খেলেছিলেন। টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসে সর্বকালের অন্যতম সেরা ব্যাটসম্যান হিসেবে গণ্য করা হয় তাঁকে।

১৯৪৯ সালের ১০ জুলাই বোম্বেতে সুনীল গাভাস্কারের জন্ম হয়। তাঁর বাবার নাম মনোহর গাভাস্কার এবং মায়ের নাম মিনাল গাভাস্কার। সুনীল গাভাস্কার ছোট থেকেই ক্রিকেটের প্রতি চরম আকর্ষন অনুভব করতেন। তাঁর বাবা ছিলেন একজন খেলোয়াড় এবং তাঁর মামা মাধব মন্ত্রী ছিলেন প্রাক্তন টেস্ট উইকেট কিপার। পারিবারিক ভাবে ক্রিকেট আবহে বেড়ে ওঠা তাঁর ক্রিকেটের প্রতি ভালোবাসার অন্যতম কারণ বলে মনে করা হয়।

সুনীল গাভাস্কারের প্রাথমিক পড়াশোনা সেন্ট জেভিয়ার্স স্কুলে। পড়াশুনার পাশাপাশি তিনি ক্রিকেট খেলতেন। ১৯৬৬ সালে তিনি স্কুলের সেরা ক্রিকেটার হিসেবে খ্যাতি পান৷ একাদশ শ্রেণীতে পড়াকালীন বিদ্যালয়ে প্রথমবার ভাজি সুলতান এর বিপক্ষে খেলেন তিনি৷

সুনীল গাভাস্কারের ১৯৭০-১৯৭১ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরের জন্য ভারতীয় দলে জায়গা পান। যদিও পাঁচ ম্যাচের সিরিজে চোটের কারণে প্রথমটিতে তাঁকে ব্যর্থতার মুখ দেখতে হয়৷ পরবর্তী চারটি ম্যাচে তিনি ৭৭৪ রানের বিশাল স্কোর করে ভারতকে সাফল্যের মুখ দেখান ৷ এরপর ১৯৭৫-৭৬ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে তাঁর একের পর এক সেঞ্চুরি ভারতকে অভূতপূর্ব সাফল্য এনে দিয়েছিল। ১৯৭৭-৭৮ সালে অস্ট্রেলিয়া সফরে তিনি তাঁর জীবনের অন্যতম সেরা খেলাটি খেলেন। প্রথম তিনটি টেস্টে তিনি সেঞ্চুরি করেছিলেন তবে সেই সিরিজে ভারত হেরে যায়। ব্যক্তিগত সাফল্য থাকলেও ভারতের জন্য তাঁর এই খেলা বৃথা হয়ে যায়।

১৯৭৮-৭৯ সালে ভারত পাকিস্তানের সিরিজ শুরু হয়। ভারত পাকিস্তানের খেলা মানেই বরাবর একটি উত্তেজনা থেকেই যায়৷ সুনীল গাভাস্কার এখানেও ভালো খেলে ছিলেন যদিও প্রথম দু’টি টেস্টে তিনি সেঞ্চুরি করতে পারেননি তবে তৃতীয় টেস্টের প্রতিটি ইনিংসে সেঞ্চুরি করেছিলেন৷ ১৯৭০ থেকে ১৯৮০ সালের মধ্যে সুনীল গাভাস্কারকে বেশ কিছু ম্যাচে অধিনায়কত্ব করতে দেওয়া হয়৷ কিন্তু অধিনায়ক হিসেবে তিনি সফল হন নি। তাঁর বদলে কপিল দেবকে অধিনায়ক করা হয় যদিও পরবর্তীকালে কিছু বছর পর আবার তিনি কপিল দেবের জায়গায় অধিনায়কত্বের দায়িত্ব পেয়েছিলেন। ১৯৮০ -র দশকে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজটি তাঁর জীবনের অন্যতম কঠিন সিরিজ যদিও সেখানেও ভারত ১-০ ব্যবধানে জিতেছিল। এই সিরিজে তিনি ৬২.৫ গড় সহ ৫০০ রান করেছিলেন। ১৯৮২-৮৩ সালে মাদ্রাসে হওয়া শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে ম্যাচটিতে তিনি ১৫৫ রান করেছিলেন৷ শ্রীলংকা এবং ভারতের মধ্যে এটিই ছিল প্রথম টেস্ট ম্যাচ। ১৯৮৩ সালে ভারত ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে বিশ্বকাপ জেতে এবং তিনি জয়ী দলের একজন কৃতিমান সদস্য ছিলেন৷ ১৯৮৩-৮৪ সালে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ঘরোয়া সিরিজের প্রথম টেস্টে তিনি অপরাজিত থেকে সেঞ্চুরি করেন এবং অন্যান্য ম্যাচে হাফ সেঞ্চুরি করেছিলেন। এই সিরিজে তিনটি ম্যাচ খেলা হয়েছিল এবং তিনটি ম্যাচ খেলার পর সিরিজ ড্র হয়৷ ১৯৮৫ সালের অস্ট্রেলিয়া সফরে তিনি সেরা পারফরম্যান্স করেছিলেন। প্রথম খেলায় ১৬৬ রানে তিনি অপরাজিত ছিলেন। তারপর তৃতীয় টেস্টে ১৭২ রান এবং ৩৫৩ রান করে সফর শেষ করেন। এই সিরিজে তাঁর গড় ছিল ১১৭।

টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসে সর্বকালের অন্যতম সেরা ব্যাটসম্যান বলা হয় সুনীল গাভাস্কারকে । তিনি খেলোয়াড় জীবনে সর্বাধিক টেস্ট রানের রেকর্ড গড়েছিলেন এবং সব থেকে বেশি সেঞ্চুরি করে বিশ্ব রেকর্ড গড়েন। যদিও পরবর্তীকালে শচীন তেন্ডুলকার তাঁর এই রেকর্ড ভেঙে নতুন রেকর্ড গড়েন। টেস্ট ম্যাচের ইতিহাসে দুটি ইনিংসে তিনবার সেঞ্চুরি করা প্রথম খেলোয়াড় ছিলেন তিনি৷ গাভাস্কার ছিলেন ১০০০০ রান করা প্রথম ভারতীয় ব্যাটসম্যান। কেবল ব্যাটসম্যান হিসেবেই নয় তাঁর দ্রুততম বোলিং প্রতিভাও ভারতীয় ক্রিকেটকে সমৃদ্ধ করেছিল। কেবল ব্যাটসম্যান বা বোলার হিসেবেই নয় তিনি ফিল্ডার হিসেবেও সফল ছিলেন। তিনিই প্রথম ভারতীয় ক্রিকেটার যিনি উইকেট রক্ষক না হয়েও টেস্ট ম্যাচে একশটি ‘ক্যাচ ‘ ধরেছিলেন। সুনীল গাভাস্কার তাঁর খেলোয়াড় জীবনে ওয়ান ডে ম্যাচে একটি মাত্র সেঞ্চুরি করেছিলেন। ১৯৮৭ সালের বিশ্বকাপে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে তিনি তাঁর ‘ওয়ান ডে’ জীবনের প্রথম এবং একমাত্র সেঞ্চুরি করেছিলেন৷ মাত্র ৮৮ বলে ১০৩ রান করেন তিনি। খেলোয়াড় সুনীল গাভাস্কার আজও তরুন প্রতিভাদের কাছে নিদর্শন হয়ে রয়েছেন। খেলোয়াড় জীবন থেকে অবসর গ্রহণ করার পর তিনি ক্রিকেট ধারাভাষ্যকার হিসেবে যোগ দেন।

২০১৪ সালের ২৮ মার্চ সুপ্রিম কোর্ট তাঁকে বিসিসিআইয়ের অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট পদে নিয়োগ করে এবং আই পি এল এর সপ্তম মরসুম তদারকির দায়িত্বও তাঁকে দেওয়া হয়। একই সঙ্গে কোর্ট তাঁকে ধারাভাষ্যকার পদ থেকে পদত্যাগ করার নির্দেশ দেয়। সুনীল গাভাস্কার ক্রিকেট নিয়ে চারটি বই লিখেছিলেন যার মধ্যে একটি তাঁর আত্মজীবনী ” Sunny Days” যেটি ১৯৭৬ সালে প্রকাশিত হয়েছিল। এছাড়া তিনি লিখেছিলেন ” Idol” যেটি প্রকাশিত হয় ১৯৮৩ সালে তারপর “Runs n Ruin” যেটি ১৯৮৪ সালে এবং ” One day Wonders” ১৯৮৬ সালে প্রকাশিত তাঁর লেখা অন্যতম বই।

গাভাস্কারের জন্মস্থান বেঙ্গুয়েলাতে তাঁর নামে একটি স্টেডিয়াম তৈরি হয়েছে৷ খেলা ছাড়াও সুনীল গাভাস্কার রুপোলি পর্দায় অভিনয়ের চেষ্টা করেছিলেন। তিনি মারাঠি সিনেমা “সাভেলি চাচি”তে মুখ্য চরিত্রে অভিনয় করেন৷ যদিও সিনেমাটি প্রশংসা পায়নি। বহু বছর পরে তিনি আবার হিন্দি চলচ্চিত্র “মালামালে” একটি অতিথি চরিত্রে হাজির হন। মারাঠি গীতিকার শান্তারাম নন্দগাঁওকারের লেখা একটি মারাঠি গানও তিনি গেয়েছেন৷ গানটি একটি ক্রিকেট ম্যাচ এবং বাস্তব জীবনের মধ্যে সমন্বয়ের গল্প নিয়ে রচিত। এই গানটি কিন্তু জনপ্রিয়তা পেয়েছিল৷

ভারতীয় ক্রিকেটে তাঁর অসামান্য কৃতিত্বের জন্য তাঁকে ভারত সরকার পদ্মভূষণে সম্মানিত করে। তিনি ২০১২ সালে সম্মানীয় কর্নেল সি.কে নাইডু লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন৷

স্বরচিত রচনা পাঠ প্রতিযোগিতা, আপনার রচনা পড়ুন আপনার মতো করে।

vdo contest

বিশদে জানতে ছবিতে ক্লিক করুন। আমাদের সাইটে বিজ্ঞাপন দেওয়ার জন্য যোগাযোগ করুন। ইমেল – contact@sobbanglay.com

 


Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।