ভূগোল

বাঁকুড়া জেলা

আমাদের পশ্চিমবঙ্গ মূলত ২৩টি জেলাতে বিভক্ত। বেশীরভাগ জেলাই স্বাধীনতার আগে থেকে ছিল, কিছু জেলা স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে গঠিত, আবার কিছু জেলা একটি মূল জেলাকে দুভাগে ভাগ করে তৈরি হয়েছে মূলত প্রশাসনিক সুবিধের কারণে। প্রতিটি জেলাই একে অন্যের থেকে যেমন ভূমিরূপে আলাদা, তেমনি ঐতিহাসিক এবং সাংস্কৃতিক দিক থেকেও স্বতন্ত্র। প্রতিটি জেলার এই নিজস্বতাই আজ আমাদের বাংলাকে সমৃদ্ধ করেছে।সেরকমই একটি জেলা হল বাঁকুড়া।

১৮৮১ সালে গঠিত ভারতের তথা পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের  মেদিনীপুর বিভাগের অন্তর্গত অন্যতম একটি জেলা বাঁকুড়া। খ্রিস্টীয় অষ্টম শতাব্দীতে আদি(রঘুনাথ)মল্ল ‘মল্ল রাজবংশ’ প্রতিষ্ঠা করেন। সেই সময় থেকে বাঁকুড়া জেলা “মল্লভূম” নামে পরিচিত হয়।  ১৭৬৫ সালে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি মল্লভূম রাজ্য অধিকার করে নেয় এবং আধুনিক বাঁকুড়া জেলাটি প্রতিষ্ঠিত হয়। এই জেলার নামকরণ করা হয় এর সদর শহরের নামানুসারে। বাঁকুড়া নাম হল কিভাবে সেই প্রসঙ্গটিও বেশ চমকপ্রদ। কোল-মুণ্ডাদের ভাষায় ‘ওড়া’ বা ‘ড়া’ শব্দের অর্থ ‘বসতি’ আর বাঁকু শব্দের অর্থ ‘এবড়ো খেবড়ো’ অর্থাৎ এবড়ো খেবড়ো জমিতে যে বসতি। এই ভাবেই  নামটি অর্থবহ হয়ে উঠেছে।

ভৌগলিক দিক থেকে দেখলে এই জেলার উত্তরে  পূর্ব বর্ধমান ও পশ্চিম বর্ধমান, দক্ষিণে ঝাড়গ্রাম এবং পশ্চিম মেদিনীপুর, পূর্বে হুগলি এবং পশ্চিমে পুরুলিয়া জেলা অবস্থান করছে। এই জেলাকে ‘পূর্বের বঙ্গীয় সমভূমি ও পশ্চিমের ছোটোনাগপুর মালভূমির মধ্যকার সংযোগসূত্র’ বলে বর্ণনা করা হয়। বাঁকুড়া জেলার প্রধান নদনদীগুলি হল দামোদর, দ্বারকেশ্বর, শিলাই ও কংসাবতী, নদীগুলি বর্ষার জলে পুষ্ট, তাই শীতকালে জলতলের উচ্চতা কমে যায়৷ দামোদর এই জেলার প্রধান নদ ও এই নদ বাঁকুড়াকে বর্ধমান থেকে পৃথক করেছে। ভয়াল বন্যা এই নদে দেখা যায় সেই কারণে দামোদর ‘বাংলার দুঃখ নামে অভিহিত হয়ে থাকে। তবে বর্তমানে দামোদর ভ্যালি কর্পোরেশন এই নদে বাঁধ দিয়ে বন্যা নিয়ন্ত্রণে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। সালি ও বোদাই হল বাঁকুড়ায় দামোদরের প্রধান উপনদী।

আয়তনের দিক থেকে বাঁকুড়া জেলা পশ্চিমবঙ্গে তৃতীয় স্থান অধিকার করে। বাঁকুড়ার পশ্চিমে উচ্চভূমি, ছোট ছোট টিলা, কাঁকুড়ে লাল মাটি, খরস্রোতা নদীনালা ও চরমভাবাপন্ন জলবায়ু বাঁকুড়া জেলার অন্যতম ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য। এখানে বন্ধুর ভূমিভাগ, ঘন অরণ্য, স্থানে স্থানে বিচ্ছিন্ন ল্যাটেরাইট পাহাড়, টিলা, শিলাস্তুপ ও উপত্যকা দেখা যায়। এই জেলার উত্তরভাগে শালতোড়া ব্লকে অবস্থিত বাঁকুড়া জেলার সর্বোচ্চ পাহাড় বিহারীনাথ, যার উচ্চতা ১৪৮০ ফুট। ছাতনা ব্লকে অবস্থিত  দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পাহাড় শুশুনিয়া

এই জেলার উচ্চভূমির মাটি অনুর্বর হলেও ধান, ভূট্টা ও গম চাষের উপযুক্ত। ২০১১ সালের জনগননা অনুসারে প্রায় ৩৫৯৬২৯২জন মানুষ বসবাস করেন। জনসংখ্যা অনুসারে পশ্চিমবঙ্গে বাঁকুড়া তেরোতম স্থান অধিকার করেছে।

লাল মাটির পথ, ছোটো ছোটো পাহাড় আর গাছ গাছালি ভরা অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যময় এই জেলা। এই জেলার বিষ্ণুপুর, জয়রামবাটী আর মুকুটমণিপুরে ইতিহাসের গন্ধ লেগে আছে৷ বিষ্ণুপুরের টেরাকোটার মন্দিরগুলোয় অদ্ভুত সুন্দর ভাস্কর্য আজও বিস্ময় জাগায়। এই অঞ্চলের মদনগোপাল, রাধামাধব, কালাচাঁদ, লালজি, রাধাশ্যাম মন্দিরগুলি ল্যাটেরাইট পাথর দিয়ে তৈরি। মল্ল রাজাদের এসব অসামান্য কীর্তি আজও নজর কাড়ে। বিষ্ণুপুরের জোড় বাংলা, দুই চালা, চার চালা, আট চালা, এক রত্ন, পঞ্চরত্ননবরত্ন মন্দিরগুলোয় বিভিন্ন পৌরাণিক উপাখ্যান লিখিত আছে। পোড়ামাটির শিল্পে পশ্চিমবঙ্গের বিষ্ণুপুরের মন্দিরগুলোয় এক আলাদা মর্যাদা রয়েছে। এই সকল মন্দিরের বেশিরভাগ দেওয়ালই পোড়ামাটির শিল্পকলায় সুসজ্জিত হয়ে আছে এটিই এখানকার বিশেষত্ব।

মন্দির স্থাপত্যে বিভিন্ন চালির ব্যবহারের মাধ্যমে চালিসহ মন্দিরগুলো তৈরি করা হয়। এই স্থানের মন্দিরে পোড়ামাটির কারুকার্য বাংলার পোড়ামাটির মন্দির স্থাপত্যে এক বড় দৃষ্টান্ত।

পোড়ামাটির শিল্পের কথা উঠলে আরেকটি প্রসঙ্গ বলা যায়, বাঁকুড়ার পোড়ামাটির ঘোড়া বিশেষভাবে উল্লেখ্য ।পশ্চিমবঙ্গের বাঁকুড়া জেলার পাঁচমুড়া গ্রামে এই বিশেষ শিল্পদ্রব্যটি তৈরি হয়।

কংসাবতী আর কুমারী নদীর সংযোগস্থলে অবস্থিত মুকুটমণিপুর, এখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য মূল আকর্ষণ।

জয়রামবাটী হল পশ্চিমবঙ্গের বাঁকুড়া জেলার অন্তর্গত একটি গ্রাম। জয়রামবাটি স্থানটি মা সারদা দেবীর জন্মস্থান হওয়ায় ঐতিহ্যমণ্ডিত হয়ে আছে।

স্বরচিত রচনা পাঠ প্রতিযোগিতা, আপনার রচনা পড়ুন আপনার মতো করে।

vdo contest

বিশদে জানতে ছবিতে ক্লিক করুন। আমাদের সাইটে বিজ্ঞাপন দেওয়ার জন্য যোগাযোগ করুন। ইমেল – contact@sobbanglay.com

 


১ Comment

1 Comment

  1. Pingback: টুসু পরব ।। তুসু পার্বণ | সববাংলায়

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।