ইতিহাস

বাঁকুড়া জেলার নাম হল কিভাবে

পশ্চিমবঙ্গের ২৩টি জেলার মধ্যে  বাঁকুড়া একটি অন্যতম জেলা।পশ্চিমবঙ্গের  মেদিনীপুর বিভাগের অন্তর্গত পাঁচটি জেলার অন্যতম একটি জেলা হল এই বাঁকুড়া।এই জেলার উত্তরে ও পূর্বে বর্ধমান, দক্ষিণে পশ্চিম মেদিনীপুর, দক্ষিণ-পূর্ব হুগলি এবং পশ্চিমে পুরুলিয়া জেলা অবস্থিত।

এই জেলার নাম 'বাঁকুড়া' কিভাবে হল  সেই প্রসঙ্গে কোন ঐতিহাসিক সাক্ষ্য প্রমাণ না পাওয়া গেলেও বাঁকুড়া নামটির উৎপত্তি বিষয়ে বেশ কিছু জনশ্রুতি জনমানসে প্রচলিত আছে।

যেমন একটি মত অনুযায়ী  জেলা শহরের নাম থেকে এই জেলার নাম হয়েছে বাঁকুড়া।কোন এক সময় বাঁকুড়া জয়বেলিয়া পরগণার অন্তর্গত একটি গ্রাম ছিল বলে ধারণা করা হয়। ১৭৭৯ খ্রিষ্টাব্দে রেনালের মানচিত্রে বাঁকুড়াকে একটি গ্রাম হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে এবং ১৭৯৪ খ্রিষ্টাব্দের সরকারী চিঠি পত্রে 'বাঁকুড়া' নামটির স্পষ্ট উল্লেখের প্রমাণ মেলে। তবে বাঁকুড়া তখন বিষ্ণুপুর নামের সঙ্গে উল্লেখ করা হয়েছিল। উনিশ শতকের গোড়া থেকে বাঁকুড়া নামটি জেলা হিসেবে বিশেষ পরিচিতি লাভ করে। তবে বাঁকুড়া বানানটি তখনও ইংরেজিতে লেখা হত- BANCOORAH।এখন অবশ্য লেখা হয় BANKURA ।

কোল মুন্ডা উপজাতিদের ভাষা অনুযায়ী 'ওড়া' বা 'ড়া' শব্দের অর্থ 'বসতি'। সংস্কৃত শব্দ 'বক্র' থেকে 'বাকু' শব্দের উদ্ভব।যার অর্থ- আঁকা বাঁকা আবার সুন্দর অর্থেও 'বাকু' শব্দ ব্যবহার হয়। তাই বাঁকুড়া কথাটির অর্থ মনে করা হয়- 'আঁকা বাঁকা উঁচু নিচু বাসস্থান' বা 'সুন্দর বাসস্থান'।

জনশ্রুতি বলে বিষ্ণুপুরের রাজা বীর হামবীর এর এক পুত্র বীর বাঁকুড়ার নাম থেকেই এই বাঁকুড়া নামের উৎপত্তি।আবার কবি মুকুন্দ চক্রবর্তী প্রণীত চন্ডীমঙ্গল কাব্যের আত্মকাহিনীতে 'বাঁকুড়া' নামের এক ব্যক্তির উল্লেখ পাওয়া যায়।মনে করা হয় এই বাঁকুড়া হলেন ব্রাহ্মণভূমির রাজা 'বাঁকুড়া রায়'। কবি লিখছেন - সুধন্য বাঁকুড়া রায়, ভাঙিল সকল দায়...'। এই রাজার নাম থেকেও বাঁকুড়া নাম হয়ে থাকতে পারে বলে অনেকে মনে করে থাকেন।

লোক মুখে একথাও প্রচলিত আছে যে আজকের বাঁকুড়া শহর এলাকা এক সময় বঙ্কু রাই বা বাঁকু রায় নামে এক সর্দারের আওতাধীন ছিল এবং এই বঙ্কু রাই এই এলাকায় প্রথম বাজার প্রতিষ্ঠা করেন।এনার আদি বাসস্থান ছিল বাঁকুড়া জেলার বদরায়।হতে পারে এই 'বাঁকু রায়'-এর নাম থেকেই আজকের ' বাঁকুড়া' নামকরণ হয়েছে।

বাঁকুড়া নামের উৎপত্তি হিসেবে বানকুন্ড কথাটির প্রভাব আছে বলে মনে করেন অনেক গবেষক।ইংরেজ আমলে বাংলা ও ইংরেজিতে 'বানকুন্ডা' লেখার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়।পরবর্তী কালে লোকমুখে ওই নামটি পরিবর্তিত হয়ে থাকতে পারে।

'বামকুন্ড'  শব্দটি থেকেও বাঁকুড়া নামটি এসে থাকতে পারে। বাম অর্থাৎ বাঁ দিক এবং কুন্ড অর্থাৎ জলাধার। বাঁকুড়া শহরের বাঁ দিক বরাবর জলাশয় বা নদীর উপস্থিতি থেকেই 'বাঁকুড়া' নামের উৎপত্তি হয়েছে বলে মনে করা হয়।

আবার আরেকটি সূত্র অনুসারে বাঁকুড়া জেলায় চাষ যোগ্য বড় জমিকে - বাকড়ি বা বাকুড়ি বলা হয়ে থাকে।এই বাকুড়ি কথাটি আজও সমান ভাবে বাঁকুড়া জেলার মানুষের মুখে ব্যবহৃত হয়। মনে করা হয় একসময় এখানে বড় বড় চাষের জমি ছিল।এই বাকুড়ি থেকেই শব্দটির নাম বাঁকুড়া হয়েছে।

প্রাচীন কাল থেকেই দুটি নদী বাঁকের বা দুটি নদীর গতি পথের মাঝখানে গড়ে ওঠা চাষ যোগ্য জমিকে বলা হত- বাগরি, বাখারি বা বাকড়ি বলা হয়। ভাগীরথী পূর্ব ও পদ্মা নদীর পশ্চিমের ভূ- ভাগের গঠন অনেকটা এমনি। বহুকাল আগে থেকেই গন্ধেশ্বরী ও দ্বারকেশ্বর নদীর মধ্যভাগের ভূ- খণ্ড কে এই নামে ডাকা হত। বিশেষত আজকের বাঁকুড়া শহরের পূর্ব দিকে যেখানটায় গন্ধেশ্বরী ও দ্বারকেশ্বর নদী মিলিত হয়েছে পশ্চিম বাহিনী হয়ে।সাঁওতাল মুন্ডা প্রভৃতি জন জাতির মানুষের উচ্চারণে নাসা- ধবনির প্রাধান্য থাকায় বাগরি, বাখারি বা বাকড়ি যথাক্রমে বাঁগরি, বাঁখারি বা বাঁকড়ি হয়েছে। এখান থেকেই বাঁকুড়া নামের উৎপত্তি হয়ে থাকতে পারে বলে কেউ কেউ মনে করেন।আবার একথাও মনে করেন অনেকে গন্ধেশ্বরী ও দ্বারকেশ্বর নদী বাঁকুড়া শহরের কাছে গতিপথ পরিবর্তন করেছে। গন্ধেশ্বরী উত্তর- পশ্চিম দিক থেকে এসে বাঁকুড়া শহরের কাছে সোজা পূর্ব দিকে বাঁক নিয়েছে। আবার দ্বারকেশ্বর নদী বাঁকুড়ার পশ্চিমে পূর্ব মুখী কিন্তু বাঁকুড়া শহরের পূর্বে উত্তর দিকে বাঁক নিয়েছে। দুই নদীর এই গতিমুখ পরিবর্তন বা বাঁক এর জন্য স্থান নাম বাঁকুড়া হয়েছে। নদীর এই বাঁক কে ' বাঁওড়' বলা হয়। বাঁক বা  বাঁওড় থেকে বাঁকুড়া নাম এসে থাকতে পারে।

বাঁকুড়া জেলার পশ্চিম সীমান্তে অবস্থিত বানকুড়া বা বানকুণ্ডা সিভিল স্টেশন থেকে বাঁকুড়া নাম হয়ে থাকতে পারে।আবার ভিন্ন একটি মত অনুসারে বাঁকুড়া জেলার পশ্চিম সীমান্তে ছাতনা ব্লক থানার অন্তর্গত একটি মৌজার নাম- বারবাঁকুড়া। প্রাচীন ছাতনার রাজ কাহিনীর সঙ্গে বারবাঁকুড়া স্থানটির গভীর সম্পর্ক আছে। এই স্থানে  ছাতনার প্রাচীন রাজাদের রাজধানী ছিল।এই বারবাঁকুড়া থেকে বাঁকুড়া নামটি এসে থাকতে পারে।বারবাঁকুড়া বাঁকুড়া থেকে প্রায় ১০ কিমি দূরে অবস্থিত।

প্রাচীন দলিল বা সরকারী কাগজপত্রে ' বাঁকুন্ডা গ্রাম' কথাটির উল্লেখ মন্দির ফলকেও দেখা যায়।এই গ্রামই পরবর্তীকালে বিশেষ করে ইংরেজ আমলে বাঁকুড়া শহর হয়েছে।

Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

To Top

 পোস্টটি ভালো লাগলে শেয়ার করে সকলকে পড়ার সুযোগ করে দিন।  

error: Content is protected !!