এমন একটা ব্যাপার কল্পনা করতে পারেন যেখানে সমুদ্র আছে কিন্তু সুন্দর সমুদ্র সৈকত নেই। সমুদ্র সৈকত তো দূরের কথা সমুদ্র আছে কিন্তু তার উপকুল নেই – মানে আস্ত একটা সমুদ্র আছে অথচ তার সঙ্গে কোনরকম স্থলভাগের সংযোগ নেই। অবাক লাগলেও, পৃথিবীর মানচিত্রে এমন একটি সাগর রয়েছে যার চারপাশে কোনও স্থলভাগ নেই — সাগরটির নাম সারগাসো সাগর (Sargasso Sea) বা শৈবাল সাগর।
সাম্প্রতিক পোস্ট
উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরের মাঝে অবস্থিত এই সাগরটি চারদিকে সমুদ্রস্রোত দ্বারা পরিবেষ্টিত, যা একে পৃথিবীর একমাত্র উপকূলহীন সাগরে পরিণত করেছে। সারগোসা সাগরের পশ্চিম সীমা উপসাগরীয় স্রোত (Gulf stream), পূর্ব সীমা ক্যানারি স্রোত (Canary Current), উত্তর সীমা উত্তর আটলান্টিক স্রোত (North Atlantic Current) এবং দক্ষিণ সীমা উত্তর নিরক্ষীয় স্রোত ( North Equatorial Current) দ্বারা বেষ্টিত। এই স্রোতগুলি ঘড়ির কাঁটার দিকে ঘুরে একটি স্থিতিশীল ঘূর্ণায়মান জলরাশি তৈরি করে, যার কেন্দ্রেই রয়েছে সারগাসো সাগর। এই সাগরের আয়তন প্রায় ৩,৫০০,০০০ বর্গকিলোমিটার যা প্রায় ইউরোপ মহাদেশের সমান। তবে যেহেতু, সাগরটি বিভিন্ন মহাসাগরীয় স্রোত দ্বারা বেষ্টিত তাই এর সীমানা পরিবর্তনশীল হওয়ায় আয়তনেরও হেরফের ঘটে।
সারগাসো সাগরের নাম এসেছে “সারগাসাম” নামক এক ধরনের সোনালি শৈবাল থেকে, যা এই সাগরের জলে বিপুল পরিমাণে ভেসে থাকে। এই শৈবাল অন্য যেকোনো সামুদ্রিক উদ্ভিদের থেকে আলাদা, কারণ এটি মাটি ছাড়াই সমুদ্রে জন্মায় ও বেঁচে থাকে। সারগাসাম শৈবালের কারণে সাগরের জল অনেক সময় ঘন ও সবুজাভ হয়ে ওঠে, যা নাবিকদের চোখে দৃষ্টিবিভ্রম তৈরি করে ও জাহাজ চলাচলে বাধা সৃষ্টি করতে পারে।
সারগাসো সাগরের ইতিহাস বহু পুরনো। ক্রিস্টোফার কলম্বাস তাঁর সমুদ্রযাত্রায় এই সাগরের উল্লেখ করেন, এবং সেই সময় থেকেই এটি রহস্যময় বলে বিবেচিত। এই সাগরটি বারমুডা ট্রায়াঙ্গেলের অংশ হিসেবে পরিচিত, যেখানে বহু জাহাজ ও বিমান রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হয়েছে বলে দাবি করা হয়। যদিও এসব ঘটনার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা রয়েছে, তবুও সারগাসো সাগরকে ঘিরে নানা পৌরাণিক বিশ্বাস ও গল্প প্রচলিত রয়েছে।
সারগাসো সাগরের জীববৈচিত্র্য তুলনামূলকভাবে সীমিত হলেও এটি কিছু নির্দিষ্ট প্রজাতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইউরোপীয় ও আমেরিকান ঈল মাছ এই সাগরেই প্রজননের জন্য দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে আসে। কানাডা বা ইউরোপ থেকে হাজার হাজার কিলোমিটার দূরত্ব অতিক্রম করে তারা এই সাগরে ডিম পাড়ে, যা বিজ্ঞানীদের কাছে এক বিস্ময়কর অভিবাসন রহস্য। এই প্রক্রিয়া এখনও পুরোপুরি ব্যাখ্যা করা যায়নি, এবং এটি সামুদ্রিক জীববিজ্ঞানের অন্যতম গবেষণার বিষয়।
সারগাসো সাগর জলবায়ু ও সমুদ্রবিজ্ঞান গবেষণার ক্ষেত্রেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি সমুদ্রের কার্বন চক্র ও স্রোতচক্র বোঝার জন্য একটি প্রাকৃতিক ল্যাবরেটরি। এই কারণে দীর্ঘদিন ধরে সমুদ্রবিজ্ঞানীরা এই অঞ্চলের উপর গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন। বর্তমানে্ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সাগরের তাপমাত্রা ও শৈবাল বৃদ্ধির ধরণ পরিবর্তিত হচ্ছে, যা বিজ্ঞানীদেকে মূল্যবান তথ্য দেয়।
আমাদের পরিবেশের জন্য সারগোসা সাগরের গুরুত্ব অপরিসীম। এখানে যে বিপুল পরিমাণে শৈবাল আছে তা অন্যান্য শৈবালের মতোই অক্সিজেন দেয়। ১৯৭৫ সালের এক গবেষণা অনুযায়ী এই সমুদ্রে যে পরিমাণ শৈবাল আছে তাতে অনুমান করা যায় যে প্রতি ঘন্টায় ২.২ বিলিয়ন লিটার অক্সিজেন দেয় যা পরিবেশের অক্সিজেনের একটা বড় উৎস।
তবে দুঃখের কথা হল, সারগাসো সাগর এখন প্লাস্টিক বর্জ্য ও দূষণের শিকার।সমুদ্রস্রোতের ঘূর্ণনের ফলে আশেপাশের বর্জ্য ও প্লাস্টিক আবর্জনা এখানে জমা হয়। এর ফলে শৈবাল ও সামুদ্রিক প্রাণীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এই কারণেই বর্তমানে আন্তর্জাতিক উদ্যোগে ২০১৪ সালে সারগাসো সি কমিশন (Sargasso Sea Commission) গঠিত হয়েছে, যার লক্ষ্য এই অনন্য সাগরের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা করা।
সারগাসো সাগর শুধু একটি ভৌগোলিক বিস্ময় নয়, এটি সামুদ্রিক পরিবেশ, জীববিজ্ঞান ও জলবায়ু গবেষণার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর শৈবাল, স্রোত, এবং জীববৈচিত্র্য আমাদের পৃথিবীর সামুদ্রিক ভারসাম্য সম্পর্কে অনেক কিছু শেখায়। তবে পরিবেশগত সংকট মোকাবিলা করতে হলে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও গবেষণার প্রয়োজন। সারগাসো সাগর আমাদের মনে করিয়ে দেয়— প্রকৃতির রহস্যময়তা ও জটিলতা এখনও অনেকাংশে অনাবিষ্কৃত।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান