ইতিহাস

গুরুসদয় দত্ত

ভারতে ব্রতচারী আন্দোলনের উদ্‌গাতা এবং লোকনৃত্য ও লোকসংস্কৃতির এক অন্যতম পৃষ্ঠপোষক গুরুসদয় দত্ত (Gurusaday Dutta)। পেশায় একজন দক্ষ আইসিএস অফিসার হলেও তাঁর প্রধান লক্ষ্য ছিল বাংলার লুপ্তপ্রায় লোকসংস্কৃতিকে মূলধারার স্রোতে ফিরে আনা। বাংলার জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে তাঁর ব্রতচারী এক বিশেষ অবদান রেখেছে। তিনিই প্রথম সমবায় প্রথায় কৃষিকাজের প্রবর্তন করেন। বামনগাছিতে রেলওয়ে ওয়ার্কশপের শ্রমিক ও কৃষকদের উপর ইংরেজ পুলিশের অত্যাচার ও গুলিবর্ষণের ঘটনার প্রতিবাদে তাঁর সরব ব্রিটিশ-বিরোধী ঐতিহাসিক রায় ব্রিটিশ শাসনের ভিত্তি নড়িয়ে দিয়েছিল। বঙ্গীয় পল্লী সম্পদ রক্ষা সমিতি, হাওড়া জেলা কৃষি ও হিতকারী সমিতি সবই তাঁরই প্রতিষ্ঠিত। গুরুসদয় দত্তের সম্পাদনায় ‘বাংলার ব্রতচারী সমিতি’র মুখপত্র হিসেবে প্রকাশিত হতো ‘ব্রতচারী বার্তা’ নামে একটি পত্রিকা। লোকসংস্কৃতির অঙ্গনে বীরভূমের রায়বেঁশে নৃত্যকে পুনরুদ্ধার করার পাশাপাশি নানা জেলায় ঘুরে ঘুরে সেখানকার লোকজ শিল্প সংগ্রহ করেছেন গুরুসদয় দত্ত। ভূমিবাদ আর ছন্দবাদের তাত্ত্বিক ভিত্তির উপর বাঙালি জাতিসত্তার আন্দোলনকে উজ্জীবিত করে তুলেছিলেন তিনি। এছাড়াও ‘পল্লী সংস্কার ও সংগঠন’ (১৯২৮), ‘বাংলার সামরিক ক্রীড়া’ (১৯৩১), ‘পটুয়া’ (১৯৩২), ‘ব্রতচারী সখা’ (১৯৩৩), ‘ব্রতচারী মর্ম্মকথা’ (১৯৩৭), ‘ব্রতচারী পরিচয়’ (১৯৪১), ‘বাংলার বীরযোদ্ধা রায়বেঁশে’ (১৯৯৪) ইত্যাদি বিখ্যাত সব বাংলা বই লিখেছেন গুরুসদয় দত্ত।

১৮৮২ সালের ১০ মে অধুনা বাংলাদেশের শ্রীহট্ট জেলার করিমগঞ্জ সাবডিভিশনের অন্তর্গত বীরশ্রী গ্রামে গুরুসদয় দত্তের জন্ম হয়। তাঁর বাবা রামকৃষ্ণ দত্ত চৌধুরী শ্রীহট্টের জমিদার বংশের সন্তান ছিলেন এবং তাঁর মায়ের নাম ছিল আনন্দময়ী দেবী। তাঁদের পরিবার ছিল বৈষ্ণব ধর্মাবলম্বী। মাত্র নয় বছর বয়সেই বাবাকে হারান গুরুসদয় এবং দুর্ভাগ্যজনকভাবে ১৪ বছর বয়সে তাঁর মাও মারা যান। বাবা-মায়ের মৃত্যুর পরে তাঁর জ্যাঠামশাইয়ের কাছেই তিনি বড়ো হন। তাঁর জ্যাঠামশাইও ছিলেন ঐ বীরশ্রী গ্রামের জমিদার। বাল্যকাল থেকেই প্রকৃতিপ্রেমিক গুরুসদয় দত্ত বন্ধুদের সঙ্গে ঘোড়ায় চড়া, নৌকা চালানো, শিকার করায় অত্যন্ত দক্ষ ছিলেন। অনাথ গুরুসদয়ের প্রতি জ্যাঠামশাইয়ের কোনোরূপ স্নেহ-মায়া ছিল না, নিতান্ত অনাদরেই তিনি বড়ো হয়েছেন। কিন্তু ঐ গ্রামের আরেক বয়স্য ব্যক্তি তারকচন্দ্র রায় তাঁকে যথেষ্ট স্নেহ করতেন। তারকচন্দ্রের প্রেরণাতেই গ্রামে সেবামূলক কাজে যুক্ত হন গুরুসদয়। কখনো আগুন লাগলে উদ্ধারকার্য, কখনো আবার বন্যার সময় গ্রামবাসীদের ওষুধ পৌঁছে দেওয়া সব কাজেই গুরুসদয় দত্তের উৎসাহ ছিল প্রবল।

বীরশ্রী গ্রামের মাইনর স্কুল থেকে প্রাথমিক শিক্ষা সম্পূর্ণ হয় গুরুসদয় দত্তের। এরপরে শ্রীহট্টের একটি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে ভর্তি হন তিনি। শ্রীহট্টের গভর্নমেন্ট কলেজ থেকে ১৮৯৮ সালে প্রবেশিকা পরীক্ষায় প্রথম স্থানে উত্তীর্ণ হন গুরুসদয় দত্ত। ১৬ বছর বয়সে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবেশিকা পরীক্ষায় পুরো জেলার মধ্যে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেন। সমগ্র গ্রামের মধ্যে গুরুসদয়ের এই সাফল্য গর্বের বিষয় হয়ে ওঠে। এরপরে উচ্চশিক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ তাঁর জ্যাঠামশাই দিতে অস্বীকার করলে ‘শ্রীহট্ট সম্মিলিনী’ নামে একটি স্থানীয় সংস্থা গুরুসদয়ের পড়াশোনার ভার নেয়। তবে তাদের শর্ত ছিল যে এফ.এ পরীক্ষায় গুরুসদয়কে প্রথম হতে হবে। ১৯০১ সালে এফ.এ পরীক্ষায় প্রথম স্থান অর্জন করে কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হন তিনি। এই সময়েই ভারতের জাতীয়তাবাদী আন্দোলন চরমে ওঠে এবং কলকাতায় সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জীর মতো মহান জাতীয়তাবাদী নেতাদের বক্তৃতা শুনে স্বদেশি আন্দোলনের প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠেন গুরুসদয় দত্ত। ফলে একজন তরুণ কংগ্রেস স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে যোগদান করেন তিনি। এফ এ পরীক্ষায় প্রথম হয়ে তিনি পেয়েছিলেন সিণ্ডিয়া স্বর্ণপদক এবং পূর্বের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী শ্রীহট্ট সম্মিলনীর আর্থিক সহায়তায় ইউরোপের কেমব্রিজে ইমানুয়েল কলেজে পড়ার জন্য বিদেশে পাড়ি দেন গুরুসদয় দত্ত। ১৯০৫ সালে ভারতীয় সিভিল সার্ভিস তথা আইসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন তিনি। পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে সপ্তম স্থানে এবং দ্বিতীয় বিভাগে প্রথম স্থানে উত্তীর্ণ হয়েছিলেন তিনি। জানা যায় মুক্ত প্রতিযোগিতামূলক চাকরি পরীক্ষায় তিনিই ছিলেন প্রথম ভারতীয় যিনি প্রথম স্থান অর্জন করেন। এরপরে বার পরীক্ষাতেও প্রথম হলে ‘অনারেব্‌ল সোসাইটি অফ গ্রে’স ইন’ তাঁকে বারে ডেকে পাঠায়। কেমব্রিজে থাকাকালীনই তিনি নিজের পদবি থেকে ‘চৌধুরী’ শব্দটি বাতিল করেন। দেশে যখ ফিরে আসেন তিনি, সে সময় লর্ড কার্জন কর্তৃক দেশভাগে স্বদেশি আন্দোলন তুঙ্গে উঠেছে।


প্রাকৃতিক খাঁটি মধু ঘরে বসেই পেতে চান?

ফুড হাউস মধু

তাহলে যোগাযোগ করুন – +91-99030 06475


 


এই সময়ই মহকুমা শাসকের পদে আসীন হন গুরুসদয় দত্ত আর এই চাকরি দিয়েই তাঁর কর্মজীবনের সূত্রপাত। চাকরির বেতন থেকে তিনি শুধু শ্রীহট্ট সম্মিলনীর বৃত্তির টাকা ফেরত দিয়েছিলেন তাই নয়, নিজের উদ্যোগে শ্রীহট্টে উৎসাহী ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য আলাদা একটি তহবিল গড়ে তোলেন। আইসিএস অফিসার হিসেবে পল্লী উন্নয়নের কাজে যথেষ্ট গুরুত্ব দিতেন। ১৯১৮ সালে এই কারণেই বীরভূমে তিনি গ্রামীণ পুনর্নির্মাণ প্রকল্প শুরু করেন যার মূল লক্ষ্য ছিল গ্রামে গ্রামে উন্নয়নমূলক কর্মসূচী গ্রহণ। পরে এই প্রকল্প বাঁকুড়া, হাওড়া ও ময়মনসিংহ জেলাতেও ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু একসময় ব্রিটিশ সরকার এবং জাতীয়তাবাদী নেতাদের প্রত্যেকে গুরুসদয়কে পরস্পরের গুপ্তচর বলে মনে করেন। ১৯২৮ সালে বামনগাছিতে রেলওয়ে ওয়ার্কশপের শ্রমিক ও কৃষকদের উপর ইংরেজ পুলিশের অত্যাচার ও গুলিবর্ষণের ঘটনার প্রতিবাদে তাঁর সরব ব্রিটিশ-বিরোধী ঐতিহাসিক রায় ব্রিটিশ শাসনের ভিত্তি নড়িয়ে দিয়েছিল। এমনকি এই সংবাদ লণ্ডনের লর্ডস হাউসেও পৌঁছে গিয়েছিল। ১৯২৯ সালে গান্ধীবাদী প্রতিবাদীদের উপর পরোয়ানা জারি করার প্রশাসনিক হুকুম মানতে না পারায় বীরভূমে তাঁকে বদলি করে দেওয়া হয়। আড়রা, হুগলী, পাবনা, বগুড়া, যশোর, ফরিদপুর, কুমিল্লা, বরিশাল, কলকাতা, বীরভূম, বাঁকুড়া, ময়মনসিংহ প্রভৃতি বিভিন্ন জেলায় তাঁর কর্মক্ষেত্র ছড়িয়ে ছিল।

১৯২২ সালে বাঁকুড়ায় সমবায় সেচ প্রকল্প চালু করেন গুরুসদয় দত্ত যা পরে ময়মনসিংহ এবং বীরভূমে ছড়িয়ে পড়ে। ১৯২৪ সালে রোমে আন্তর্জাতিক কৃষি প্রতিষ্ঠানে ব্রিটিশ ভারতের প্রতিনিধিত্ব করেন। তাঁর স্ত্রী সরোজনলিনী দত্তের মৃত্যুর পরে স্ত্রীয়ের স্মৃতিরক্ষার্থে গুরুসদয় দত্ত স্থাপন করেন সরোজনলিনী দত্ত মেমোরিয়াল অ্যাসোসিয়েশন যার উদ্দেশ্য ছিল গ্রামীণ মহিলাদের প্রথাগত পড়াশোনা এবং কর্ম-প্রায়োগিক শিক্ষায় শিক্ষিত করে তোলা। সময়টা ১৯২৫ সাল। এই বছরেই ‘বঙ্গলক্ষ্মী’ নামে একটি পত্রিকা প্রকাশ করেন তিনি। ১৯২৯ সালে একইভাবে ‘গ্রামের ডাক’ নামে আরেকটি পল্লী উন্নয়ন সংক্রান্ত পত্রিকা প্রকাশ করেন গুরুসদয় দত্ত। ময়মনসিংহে তিনি জারি গান ও জারি নৃত্যকে পুনরুদ্ধার করে ‘লোকনৃত্য পুনরুদ্ধার সমিতি’ গড়ে তোলেন। লোকসংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষকতায় ১৯৩০ সালে বীরভূমের রায়বেঁশে নাচকে নতুন করে জনসমক্ষে নিয়ে আসেন তিনি। লুপ্তপ্রায় লোকসংস্কৃতি পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে ১৯৩১ সালে গুরুসদয় দত্তের উদ্যোগে স্থাপিত হয় ‘বঙ্গীয় পল্লী সম্পদ রক্ষা সমিতি’। ১৯৩২ সালে গুরুসদয় দত্তের নেতৃত্বে সমগ্র অখণ্ড বাংলা জুড়ে শুরু হয় ‘ব্রতচারী আন্দোলন’। ১৯৩৩ সালে তিনি কেন্দ্রীয় আইনসভার সদস্য হলে দিল্লিতে ব্রতচারী নাম পালটে তিনি সংগঠনের নাম দেন ‘সর্বভারতীয় লোকনৃত্য ও লোকগীতি সমিতি’। পরে আবার ১৯৩৪ সালে এই নাম বদলে রাখা হয় ‘বাংলার ব্রতচারী সমিতি’। পঞ্চব্রত ও ছন্দাত্মক সাধনার মধ্য দিয়ে বাংলার ব্রতচারীকে তিনি বিশ্বে দরবারে পরিচিত করে তোলেন। এই পঞ্চব্রত হল ব্রতচারী শিক্ষার্থীদের জ্ঞান, শ্রম, সত্য, ঐক্য ও আনন্দ এই পাঁচটি ব্রত মেনে দেশের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের শরিক হতে হবে। এছাড়াও ব্রতচারীদের মধ্যে জ্ঞানের সীমা প্রসারণ, নারীর মুক্তি আন্দোলন, শ্রমের মর্যাদা বর্ধন ইত্যাদি মোট ১৬টি পণ যুক্ত করেন গুরুসদয় দত্ত। বাঙালি সংস্কৃতির নিবিড় পরিচয় হিসেবে তিনি তুলে ধরতে চাইলেন এই ব্রতচারীকে। অনেকে এই কর্মকাণ্ডকে প্রাদেশিক জাতীয়তাবাদ বলে সমালোচনা করেছেন।

এসবের বাইরেও দীর্ঘ বারো বছর ধরে বাংলার বিভিন্ন জেলা থেকে নক্‌শী কাঁথা, পট, মাটির পুতুল, কাঠের পুতুল, সরা, হাতপাখা, বিনুনি বাঁধার দড়ি ইত্যাদি নানাবিধ লোকজ শিল্প উপকরণ সংগ্রহ করেছেন গুরুসদয় দত্ত। এগুলি সবই বর্তমানে ‘গুরুসদয় দত্ত সংগ্রহশালা’য় সংরক্ষিত আছে। ভূমিবাদ আর ছন্দবাদের তাত্ত্বিক ভিত্তির উপর বাঙালি জাতিসত্তার আন্দোলনকে উজ্জীবিত করে তুলেছিলেন তিনি। এছাড়াও ‘পল্লী সংস্কার ও সংগঠন’ (১৯২৮), ‘বাংলার সামরিক ক্রীড়া’ (১৯৩১), ‘পটুয়া’ (১৯৩২), ‘ব্রতচারী সখা’ (১৯৩৩), ‘ব্রতচারী মর্ম্মকথা’ (১৯৩৭), ‘ব্রতচারী পরিচয়’ (১৯৪১), ‘বাংলার বীরযোদ্ধা রায়বেঁশে’ (১৯৯৪) ইত্যাদি বিখ্যাত সব বাংলা বই লিখেছেন গুরুসদয় দত্ত। তাঁর সম্পাদনায় ‘বাংলার ব্রতচারী সমিতি’র মুখপত্র হিসেবে প্রকাশিত হতো ‘ব্রতচারী বার্তা’ নামে একটি পত্রিকা।

১৯৪১ সালের ২৫ মে গুরুসদয় দত্তের মৃত্যু হয়।

  • সববাংলায় সাইটে বিজ্ঞাপন দেওয়ার জন্য আজই যোগাযোগ করুন
    contact@sobbanglay.com

  • এই ধরণের তথ্য লিখে আয় করতে চাইলে…

    আপনার নিজের একটি তথ্যমূলক লেখা আপনার নাম ও যোগাযোগ নম্বরসহ আমাদের ইমেল করুন contact@sobbanglay.com

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

-
এই পোস্টটি ভাল লেগে থাকলে আমাদের
ফেসবুক পেজ লাইক করে সঙ্গে থাকুন

আধুনিক ভ্রূণ বিদ্যার জনক পঞ্চানন মাহেশ্বরীকে নিয়ে জানুন



ছবিতে ক্লিক করে দেখুন ভিডিও