ইতিহাস

সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়

রাষ্ট্রগুরু স্যার সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় (Surendranath Bandopadhyay) একজন ভারতীয় বাঙালি রাজনীতিবিদ এবং নেতা যিনি ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন (Indian National Association) বা ভারত সভার প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে ইতিহাসে বিখ্যাত হয়ে আছেন। তিনি এবং আনন্দমোহন বসু একসাথে দুবার ভারত সভার আয়োজন করেছিলেন। তিনি ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন এবং পরে সেই দলের নেতা হিসেবে মনোনীত হন। পরে তিনি কংগ্রেস ত্যাগ করে ইন্ডিয়ান লিবারেশন ফেডারেশন নামক আরেকটি দল তৈরি করেন।

১৮৪৮ সালে ১০ নভেম্বর কলকাতায় সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্ম হয়। তাঁর বাবার নাম ছিল দুর্গাচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় যিনি পেশায় একজন ডাক্তার ছিলেন। ছোট থেকেই সুরেন্দ্রনাথ তাঁর বাবার মুক্ত চিন্তা ধারায় প্রভাবিত ছিলেন।

সুরেন্দ্রনাথ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক হওয়ার পর ১৮৬৮ সালে রমেশচন্দ্র দত্ত এবং বিহারীলাল গুপ্তের সাথে ইংল্যান্ড যান ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিসের (Indian Civil Service, ICS) পরীক্ষা দেওয়ার জন্য। পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েও বয়স নিয়ে কিছু সমস্যার জন্য তাঁকে প্রত্যাখ্যান করা হয়। এরপর তিনি আবার ১৮৭১ সালে পরীক্ষা দেন এবং সাফল্যের সঙ্গে উত্তীর্ণ হন। তারপর তাঁকে সিলেটের অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে নিয়োগ করা হয়। ইংল্যান্ডে থাকাকালীন তিনি বেশ কিছুদিন লন্ডনের ইউনিভার্সিটি কলেজে পড়াশোনা করেন। 

১৮৭৪ সালে তিনি আবার লন্ডন যান এবং সেখানে মিডল টেম্পেল (Middle Temple) এ পড়াশোনা শুরু করেন। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই তাঁকে একটি ছোট্ট ভুলের জন্য বরখাস্ত করা হয়। তিনি মনে করতেন এর পেছনে অনেকটাই জাতিগত বৈষম্য দায়ী ছিল। এরপর তিনি বাধ্য হয়ে আবার ভারতে ফিরে আসেন। তাঁকে ইতালির জাতীয়তাবাদী রাজনীতিবিদ গুয়েসেপ মাজিনির লেখা খুব প্রভাবিত করে। এছাড়াও তিনি ইংল্যান্ডে থাকাকালীন অনেক চিন্তাবিদদের লেখার দ্বারা প্রভাবিত হন।

তিনি এরপরে ভারতে ফিরে এসে মেট্রোপলিটন ইনস্টিটিউশনে ইংরেজির শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। এরপর তিনি ফ্রী চার্চ ইনস্টিটিউশনে বেশ কিছুদিন শিক্ষকতা করেন। ১৮৮২ সালে তিনি শিয়ালদহ অঞ্চলে রিপন কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন। এই কলেজটির নাম পরে সুরেন্দ্রনাথ কলেজ রাখা হয়। তিনি সেই সময় থেকেই মুক্ত রাজনীতি, দেশপ্রেম এবং ভারতীয় ইতিহাসের বিষয়ে বিভিন্ন জনসভায় বক্তৃতা দিতেন। ১৮৭৬ সালে ২৬ জুলাই আনন্দমোহন বসুর সাথে তিনি ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন বা ভারতসভা প্রতিষ্ঠা করেন। যেসব  সংস্থা এবং দল সেই সময় ভারতীয় জাতীয়তাবাদ গড়ে তুলেছিল ভারতসভা তাদের মধ্যে অন্যতম ছিল। তিনি এই দলটির সাহায্যে আই সি এস পরীক্ষার্থী ভারতীয় ছাত্রদের সাহায্য করতেন এবং সেই সব ছাত্রদের সাথে হওয়া অন্যায়ের বিরুদ্ধে তিনি সবসময় প্রতিবাদ করতেন। এর জন্য তিনি সারা দেশে বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন।

১৮৭৯ সাল থেকে তিনি ‘The Bengalee’ নামে একটি পত্রিকা প্রকাশ করতে শুরু করেন। ১৮৮৩ সালে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সেই পত্রিকায় লেখা প্রকাশ করার জন্য তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁকে গ্রেফতার করার প্রতিবাদে সারা দেশের মানুষ প্রতিবাদের আগুন জ্বলে ওঠে। তিনিই প্রথম ভারতীয় সাংবাদিক যাঁকে কারাবন্দি করা হয়। ১৮৮৫ সালে বোম্বেতে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠা করা হলে তিনি কংগ্রেসের সাথে তাঁর দল ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশনকে যুক্ত করেন। এই সংযুক্তির কারণ হিসেবে তিনি মনে করেছিলেন যে এই দু’টি দলেরই লক্ষ্য এক ছিল। তিনি দুবার ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হন। প্রথমবার ১৮৯৫ সালে পুণাতে এবং দ্বিতীয়বার ১৯০২ সালে আমেদাবাদে।

ধীরে ধীরে সুরেন্দ্রনাথ সেই সময়কার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নেতা হয়ে ওঠেন। ১৯০৫ সালে ব্রিটিশ সরকার যখন বাংলাকে দ্বিখণ্ডিত করে তখন তিনি তার তীব্র প্রতিবাদ করেন। অন্যান্য শীর্ষস্থানীয় নেতাদের সাথে একযোগে তিনি সাধারণ মানুষকে সংগঠিত করে বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে নানান কর্মসূচী গ্রহণ করেন। তাঁদের বিভিন্ন প্রতিবাদমূলক কর্মসূচীর ফলে ১৯১২ সালে ব্রিটিশ সরকার সেই বঙ্গভঙ্গ রোধ করতে বাধ্য হয়। তাঁর হাত ধরেই গোপালকৃষ্ণ গোখলে এবং সরোজিনী নাইডুর মত নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরা রাজনীতির অঙ্গনে আসেন। তিনি কংগ্রেসের নরমপন্থী নেতাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন। কিন্তু মতানৈক্যর কারণে তিনি ১৯০৬ সালে কংগ্রেস ত্যাগ করেন। পরে তিনি স্বদেশী আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে যোগদান করেন। সেই সময় তাঁর জনপ্রিয়তা এতটাই ছিল যে সবাই তাঁকে বাংলার মুকুটহীন রাজার আখ্যা দেয়। এসময় থেকেই তাঁকে রাষ্ট্রগুরু সম্মানে ভূষিত করা শুরু হয়।

তাঁর নরমপন্থী মনোভাবের ফলে চরমপন্থী নেতাদের সাথে তাঁর মতানৈক্য ঘটে এবং এরপর তিনি সক্রিয় রাজনীতি থেকে কিছুটা দূরে সরে যান। ১৯০৯ সালে ব্রিটিশ সরকার দ্বারা আনত মর্লো মিন্টো সংশোধনী আইনকে তিনি সমর্থন করলেও অধিকাংশ ভারতীয় নাগরিক এবং নেতারা সেই আইনের প্রতিবাদ করে। মহাত্মা গান্ধীর অসহযোগ আন্দোলনকেও তিনি সমর্থন করেননি। কংগ্রেস ছাড়ার পরে তিনি এবং আরো কিছু নেতা একত্রিত হয়ে ইন্ডিয়ান লিবারেশন ফেডারেশন তৈরি করেন। কিন্তু বেশিদিন তাঁরা সেই দলটি চালাতে পারেননি। ১৯২৩ সালের বিধান সভা নির্বাচনে বিধানচন্দ্র রায়ের কাছে তিনি পরাজিত হলে সুরেন্দ্রনাথ এরপর রাজনীতি থেকে একেবারে অবসর গ্রহন করেন। বিভিন্ন বিষয়ে ব্রিটিশ সরকারকে রাজনৈতিকভাবে সমর্থন করার জন্য ব্রিটিশ সরকারের পক্ষ থেকে তাঁকে নাইটহুড উপাধি দেওয়া হয়। রাজনৈতিক জীবন থেকে অবসর নিয়ে তিনি ‘আওয়ার নেশন ইন মেকিং’ (Our Nation In Making) নামক একটি বই রচনা করেন যেটি ১৯২৫ সালে প্রকাশিত হয়।

সুরেন্দ্রনাথ বন্দোপাধ্যায়ের ১৯২৫ সালে ৬ আগস্ট ব্যারাকপুরে মৃত্যু হয়।

ভারতীয় রাজনীতিতে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। তাঁকে আগামী প্রজন্ম একজন প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ ও নেতা হিসেবে মনে রাখবে।

সববাংলায় পড়ে ভালো লাগছে? এখানে ক্লিক করে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ভিডিও চ্যানেলটিওবাঙালি পাঠকের কাছে আপনার বিজ্ঞাপন পৌঁছে দিতে যোগাযোগ করুন – contact@sobbanglay.com এ।


Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

বাংলাভাষায় তথ্যের চর্চা ও তার প্রসারের জন্য আমাদের ফেসবুক পেজটি লাইক করুন