ইতিহাস

গোপালকৃষ্ণ গোখলে

ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের এক স্বনামধন্য রাজনৈতিক নেতা এবং এক বিশিষ্ট সমাজ সংস্কারক ছিলেন গোপালকৃষ্ণ গোখলে(Gopal Krishna Gokhale)। 

১৮৬৬ সালের ৯ মে বোম্বাই প্রেসিডেন্সির(বর্তমান মহারাষ্ট্র রাজ্য)  রত্নগিরি জেলার কোটালুকে গোপালকৃষ্ণ গোখলের জন্ম হয়৷ তাঁর বাবার নাম কৃষ্ণারাও গোখলে, মা ছিলেন সত্যাভামা বাঈ।

গোপালকৃষ্ণ গোখলে কোলহাপুরে অবস্থিত রাজারাম কলেজে পড়াশুনা করেন৷  তারপর ১৮৮৪ সালে এলফিনস্টোন কলেজ থেকে তিনি গ্র্যাজুয়েট  হন। গ্র্যাজুয়েশন শেষ করে তিনি ডেকান এডুকেশন সোসাইটির (Deccan Education Society – Pune) আজীবন সদস্যপদ গ্রহণ করেন।  এরপর তিনি আইন নিয়ে পড়াশুনা করার জন্য বোম্বের ল’ কলেজে ভর্তি হন যদিও তিনি পড়াশুনা শেষ করতে পারেননি৷ তাঁদের আর্থিক অবস্থা ভালো না থাকলেও তাঁর বাবা তাঁকে ইংরেজি মাধ্যম শিক্ষায় শিক্ষিত করতে চেয়েছিলেন যাতে ভবিষ্যতে তিনি ব্রিটিশ সরকারের অধীনে কেরানীর বা ছোটোখাটো পদাধিকারীর যে কোনো পদ লাভ করতে পারেন। গোপালকৃষ্ণ গোখলে ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষিত প্রথম দিকের ভারতীয়দের মধ্যে একজন। 

গোপালকৃষ্ণ গোখলের কর্মজীবন শুরু হয় ১৮৮৫ সালে ফার্গুসন কলেজের (Fergusson College) অধ্যাপক হিসেবে। পরবর্তীকালে তিনি প্রিন্সিপাল হিসেবে তাঁর কর্ম জীবন অতিবাহিত করেন৷ যদিও ১৯০৪ সালে তিনি জনসেবায় নিজেকে নিয়োগ করার জন্য স্বেচ্ছা  অবসর নেন। 

গোপালকৃষ্ণ গোখলের উল্লেখযোগ্য কৃতিত্ব বলতে তাঁর রাজনৈতিক জীবনকেই বোঝায়৷ গোপালকৃষ্ণ গোখলে ১৮৮৯ সালে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সদস্যপদ লাভ করেন। তাঁর রাজনৈতিক গুরু ছিলেন বিশিষ্ট সমাজ সংস্কারক মহাদেব গোবিন্দ রানাডে। দাদাভাই নওরোজি এবং ফিরোজশাহ্ মেহতাকেও তিনি অনুসরণ করতেন৷ ১৮৯০ সালে পুনার সার্বজনিক সভার ( Sarbajanik Sava) সচিব (Secretory)  হিসেবে তিনি নির্বাচিত হন, এই সভায় মহাদেব গোবিন্দ রানাডে একজন প্রভাবশালী নেতা হিসেবে যুক্ত ছিলেন৷ এরপর ১৮৯৩ সালে বোম্বাইয়ের প্রাদেশিক সম্মেলনে ( Bombay Provincial Conference) সচিব হিসেবে যুক্ত হয়েছিলেন৷ গোপালকৃষ্ণ গোখলে রাজনৈতিক আদর্শের বিচারে বরাবর মধ্যপন্থী নেতা হিসেবে থাকতেই পছন্দ করতেন।তিনি মনে করতেন আবেদন-নিবেদন নীতির মধ্য দিয়ে নিজেদের অধিকারগুলি আদায়ের করে ব্রিটিশদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে হবে। 

১৮৯৪ সালে গোখলে বালগঙ্গাধর তিলকের সঙ্গে যৌথ ভাবে কংগ্রেসের সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত হন৷  তিনি বিশ্বাস করতেন প্রতি মানুষের মনে রাজনৈতিক চেতনা জাগিয়ে তুলতে গেলে সবার প্রথমে প্রয়োজন শিক্ষার আলো ঘরে ঘরে পৌঁছে দেওয়া৷  মানুষকে রাজনৈতিক শিক্ষাতে শিক্ষিত করার কথাও তিনি বলেন৷  গোপালকৃষ্ণ গোখলে ভারতবর্ষে  সর্বপ্রথম অবৈতনিক প্রাথমিক শিক্ষা চালু করার কথা বলেছিলেন ৷ ১৯১১ সালে ইম্পেরিয়াল লেজিসলেটিভ কাউন্সিলে কংগ্রেস নেতা গোপালকৃষ্ণ গোখলে  “বাধ্যতামূলক অবৈতনিক প্রাথমিক শিক্ষা বিল” উত্থাপন করে। বিলটি তখন অনুমোদিত না হওয়ায় তা কার্যকর হয়নি। শিক্ষার অধিকার নিয়ে গোপালকৃষ্ণ গোখলে সুপারিশ করে বলেছিলেন যে সারা দেশে প্রাথমিক শিক্ষাকে বিনামূল্যে ও বাধ্যতামূলক করতে হবে এবং জনগণকে শিক্ষিত করার দায়িত্ব সরকারের পালন করা উচিত। সেই সময় থেকে ১০০ বছর পর তাঁর চিন্তাধারায় ভারতবর্ষে ২০১১ সালে “শিক্ষার অধিকার” আইন প্রণয়ন করা হয়। এই আইনে বলা হয় প্রত্যেক ভারতীয় শিশু, মেয়ে এবং ছেলের শিক্ষার আধিকার জন্মায় । 

গোপালকৃষ্ণ গোখলে ছিলেন ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের ১৮৯৫ সালের পুনা অধিবেশনের রিসেপশন কমিটি- ( “Reception Committee”) এর সেক্রেটারি। এই অধিবেশনের পর থেকেই,  ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের একটি বিশিষ্ট মুখ হয়ে ওঠেন গোখলে৷  কিছু সময়ের  জন্য তিনি বোম্বাই লেজিসলেটিভ কাউন্সিলের(  Legislative Council)  সদস্য ছিলেন যেখানে তিনি তৎকালীন সরকারের বিরুদ্ধে তীব্র বক্তব্য রাখেন।

গোখলে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রথম যুগের একজন বিশিষ্ট নেতা ছিলেন৷  প্রাথমিকভাবে তিনি স্বাধীনতা আন্দোলনের থেকে সমাজ সংস্কারে বেশী গুরুত্ব দিতেন৷ জাতীয়তাবাদ এবং জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের পরিচালনা সম্পর্কে গোখলে চেয়েছিলেন ভারতীয়রা সরকারের সহযোগী হয়ে উঠবে সংবিধান সংশোধন ও সংস্কারে সাহায্য করবে। ব্রিটিশ শাসকের প্রশংসার পাশাপাশি তিনি বলেছিলেন ভারতের অর্থনৈতিক কাঠামো বিকাশের জন্য শিল্পশিক্ষার প্রয়োজন কারণ তৎকালীন সময়ে ভারতীয়রা অর্থসংকটময় পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। কেবল শিল্প নয় উন্নত কৃষিব্যবস্থার জন্যও তিনি বক্তব্য রেখেছিলেন। পুরনো যন্ত্রপাতি এবং উৎপাদন ব্যবস্থার পরিবর্তন করে আধুনিক কৃষিজ যন্ত্রপাতি আনার কথা তিনি বলেছিলেন৷ 

১৮৯৬ সালে গোখলের সঙ্গে গান্ধীজির প্রথম সাক্ষাৎ ঘটে৷ তারপর ১৯০১ সালে কলকাতায় তাঁরা প্রায় একমাস একে অপরের সান্নিধ্য লাভ করেন৷ গোখলে তৎকালীন ভারতের সাধারণ জনগণের দুর্দশাগ্রস্ত বিষয়গুলি তাঁকে ব্যাখ্যা করেছিলেন এবং সাউথ আফ্রিকা থেকে দেশে ফিরে এসে কংগ্রেসের প্রচেষ্টায় যোগ দেওয়ার জন্য অনুরোধ করেন৷

১৮৯৭ সালে তিনি প্রথম বার ইংল্যান্ড সফরে যান ওয়েলবি কমিশনের সঙ্গে বিশেষ কাজের জন্য৷ তারপর তাঁকে প্রায়ই ইংল্যান্ড যেতে হত৷ ১৯০৫ সালে কংগ্রেস বিশেষ উদ্দেশ্যে তাঁকে ইংল্যান্ড পাঠায়৷ এই সফরের উদ্দেশ্য ছিল, ব্রিটিশ নেতাদের সামনে ভারতীয় সাংবিধানিক যে দাবি আছে সেগুলো উত্থাপন করার পাশাপাশি ভারতীয়দের প্রতি হওয়া অন্যায় অসাম্য আচরণগুলোর কথা জানানো৷ 

ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের প্রথম দিকের ব্যক্তিবর্গের মধ্যে গোপালকৃষ্ণ গোখলে ছিলেন বিশেষ পরিচিত এক ব্যক্তিত্ব৷ ফলতঃ ব্রিটিশ সরকার তাঁকে ভয় পেত এবং জনগন তাঁকে সম্মান করত৷ তাঁর জনপ্রিয়তার মূল কারণ তিনি রাজনৈতিক অগ্রগতির পাশাপাশি সমাজ সংস্কারকেও তিনি সমান জোর দিতেন৷ একজন জনদরদী নেতার মতন প্রায় তিন দশক ধরে গোপালকৃষ্ণ গোখলে তাঁর বিরল গুণাবলি দিয়ে  দেশ ও দেশবাসীকে একচ্ছত্র সেবায় নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন। তাঁকে ভারতের গভর্নর জেনারেলের ইম্পেরিয়াল কাউন্সিলে যুক্ত করা হয়েছিল । তিনি অধিবেশনগুলিতে তুলো ও  নুনের ওপর কর হ্রাস করার জন্য সমাবেশ করেছিলেন।  এছাড়া তিনি ভারতীয়দের জন্য বিনা খরচায় প্রাথমিক শিক্ষার পাশাপাশি সিভিল সার্ভিসে আরও বেশি সংখ্যক ভারতীয়কে অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা করেছিলেন। 

১৯০৫ সালে গোখলে প্রতিষ্ঠা করেন ‘ Servants of India Society’। ভারতে শিক্ষার প্রসার করা ছিল এই সোসাইটির উদ্দেশ্য। এই সংস্থা প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে তিনি লিখেছিলেন “The Servants of India Society will train men prepared to devote their lives to the cause of country in a religious spirit, and will seek to promote, by all constitutional means, the national interests of the Indian people.” তিনি বিশ্বাস করতেন জাতি শিক্ষিত হলে তবেই সমাজ এগোবে ।  এই সংস্থা ভ্রাম্যমান গ্রন্থাগার, বিদ্যালয় ও কারখানার শ্রমিকদের জন্য নৈশ বিদ্যালয়ের ব্যবস্থা করেছিল ।  ১৯০৮ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন  ‘Ranade Institute of Economics’

গোখলে ১৯১০ সালে গান্ধীজিকে Natal Indentured Labour Bill সংস্থান করতে সাহায্য করেছিলেন এবং গান্ধীর প্রচেষ্ঠা সফল করতে দক্ষিণ আফ্রিকায় তাঁকে অর্থ সংস্থানেরও সাহায্য করেছিলেন। ১৯১২ সালে গোখলে দক্ষিণ আফ্রিকা যান এবং গান্ধীজির সঙ্গে দেখা করে আফ্রিকান নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন৷ গোখলের রাজনৈতিক মতাদর্শ, তাঁর চিন্তাভাবনা সামগ্রিক ভাবে গান্ধীজিকে প্রভাবিত করেছিল। যদিও শেষপর্যন্ত গোখলের দৃষ্টিভঙ্গীর সঙ্গে গান্ধীজির মতপার্থক্য হয়েছিল। গান্ধীজি গোখলের চরিত্র বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছেন,  ” pure as crystal, gentle as a lamb, brave as a lion and chivalrous to a fault and the most perfect man in the political field… ‘ । স্বাধীন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী মহম্মদ আলি জিন্নাহও গোখলের আদর্শে প্রভাবিত হয়েছিলেন এমনকি তিনি  “Muslim Gokhale” হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশও করেন৷ 

গোপালকৃষ্ণ গোখলের বিখ্যাত উক্তি যেটি আজও স্মরনীয় হয়ে আছে -বাংলা আজ যেটা ভাবছে ভারতবর্ষ কাল সেটা ভাববে।  (“What Bengal thinks today, India thinks”) 

১৯১৫ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি  গোপালকৃষ্ণ গোখলে’র মৃত্যু হয়।

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।