ইতিহাস

আন্না হাজারে

আন্না হাজারে(Anna Hazare) একজন ভারতীয় সমাজ সংস্কারক। তাঁর প্রচেষ্টায় ভারতের মহারাষ্ট্র রাজ্যের আহমেদনগর জেলার রালেগান সিদ্ধি গ্রাম আদর্শ গ্রামে পরিণত হয়। এছাড়াও তিনি ‘জনলোকপাল বিল’ আইন হিসেবে বলবৎ করার ক্ষেত্রে সক্রিয় ভূমিকা গ্রহণ করেছেন।

১৯৩৭ সালের ১৫ জুন মহারাষ্ট্রের আহমেদনগর জেলার ভিঙ্গারি গ্রামে এক মজুর পরিবারে আন্না হাজারের জন্ম হয়। আন্না হাজারের প্রকৃত নাম কিসান বাবুরাও হাজারে। তাঁর বাবার নাম বাবুরাও হাজারে ও মায়ের নাম লক্ষ্মীবাঈ। ১৯৫২ সালে প্রতিকূল পরিস্থিতিতে বাবুরাও হাজারে সপরিবারে রালেগান সিদ্ধি গ্রামে চলে আসেন এবং সেখানে কিছু পরিমাণ চাষের জমি কেনেন। গ্রামে কোন প্রাথমিক বিদ্যালয় না থাকায় আন্না হাজারে পড়াশোনার জন্য মুম্বাইতে তাঁর এক নিঃসন্তান পিসির কাছে বড় হয়েছেন। প্রবল আর্থিক দুরবস্থার কারণে তিনি সপ্তম শ্রেণীর বেশি পড়াশোনা করতে পারেননি। এরপর তিনি মুম্বাইয়ের দাদার রেলওয়ে স্টেশনে ফুল বিক্রি করতে শুরু করেন এবং মুম্বাই শহরে দুটি ফুলের দোকান খোলেন।

১৯৬০ সালে সেনাবাহিনীতে কর্মজীবনের প্রথম পর্যায়ে তিনি ছিলেন ভারতীয় সেনাবাহিনীর একজন আর্মি ট্রাক ড্রাইভার। পরবর্তীকালে তিনি সেনা প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন। তিনি বিভিন্ন যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন এমনকি মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েও প্রাণে বেঁচে গেছেন। এই সময় তিনি স্বামী বিবেকানন্দ, মহাত্মা গান্ধী, বিনোবা ভাবে প্রমুখ মনীষীদের গ্রন্থাবলী পাঠ করতেন এবং তাঁদের আদর্শ দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন। ১৫ বছর (১৯৬০-৭৫) তিনি সেনাবাহিনীতে কাজ করেছিলেন। ১৯৭০ সালের মাঝামাঝি সময়ে তিনি এক গাড়ি দুর্ঘটনায় আহত হন। এরপর ১৯৭৫ সালে সেনাবাহিনী থেকে স্বেচ্ছা অবসর গ্রহণ করে তিনি পুনরায় রালেগান সিদ্ধি গ্রামে ফিরে আসেন।

আন্না যখন তাঁর গ্রামে ফিরে আসেন তখন তাঁর গ্রামের অবস্থা ছিল সব দিক দিয়েই খুব শোচনীয়। অর্থনৈতিক অবস্থা ছিল খুবই খারাপ, চাষের জন্য উপযুক্ত ব্যবস্থা ছিল না, পড়াশোনার জন্য কোন বিদ্যালয় ছিলনা। অশিক্ষা এবং দারিদ্র্য ছিল গ্রামবাসীদের নিত্যসঙ্গী। তিনি সর্বপ্রথম গ্রামের যুবকদের নিয়ে একটি দল গঠন করলেন। এছাড়া প্রবীণরাও ওই দলে যুক্ত হয়েছিলেন। প্রথমদিকে গ্রামবাসীদের মদ্যপানের নেশা ছাড়ানোর জন্য এক আন্দোলন গড়ে তোলেন। এই আন্দোলনের ফলে গ্রামে সমস্ত রকম নেশাদ্রব্য নিষিদ্ধ হয়। এরপর তিনি গ্রামবাসীদের স্বেচ্ছাশ্রমিকের কাজে উদ্বুদ্ধ করেন। নিকটবর্তী পাহাড়ের জলবিভাজিকা উন্নয়ন প্রকল্পে ছোটখাটো জলাধার ও জল সংশোধনাগার গড়ে তোলেন। তাঁর এই উদ্যোগের ফলে গ্রামের জলের সমস্যা দূর হয় এবং সেচ ব্যবস্থার প্রভূত উন্নতি ঘটে। এছাড়া তিনি গ্রামে মাধ্যমিক বিদ্যালয় গড়ে তোলেন। তাঁর নানান উদ্যোগের ফলে রালেগান সিদ্ধি গ্রামটি ‘আদর্শ গ্রাম’ হিসেবে পরিচিত হয়।

১৯৯১ সাল থেকেই তিনি মহারাষ্ট্র সরকারের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে থাকেন এবং দুর্নীতি বিরোধী আন্দোলন গড়ে তোলেন। ১৯৯৭ সালে মহারাষ্ট্রে ‘রাইট টু ইনফরমেশন ল'(Right to information law) এর জন্য প্রচার চালান। ১৯৯৮ সালে মহারাষ্ট্রের শিবসেনা ও বিজেপি সরকারের সমাজকল্যাণমন্ত্রী বাবান রাও গোলাপ তাঁর বিরুদ্ধে মানহানির অভিযোগ দায়ের করেন। এর ফলে তিনি গ্রেফতার হন। কিন্তু জনরোষের ফলে তিনি ছাড়া পান। ২০০০ সালের প্রথমদিকে আন্না হাজারে মহারাষ্ট্র রাজ্যে একটি আন্দোলন গড়ে তোলেন। এর ফলে মহারাষ্ট্র সরকার আইন পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়। এই আইনটি রাষ্ট্রপতি দ্বারা অনুমোদিত না হওয়া অবধি তিনি আন্দোলন চালিয়ে গিয়েছিলেন। ২০০৫ সালে আইনটি সংসদে পাশ হয়।

২০১১ সালে আন্না হাজারে ভারতীয় সংসদে একটি শক্তিশালী দুর্নীতিবিরোধী লোকপাল বিল পাস করানোর জন্য আন্দোলন শুরু করেন। এই আন্দোলনের অংশ হিসেবে সুপ্রিম কোর্টের প্রাক্তন বিচারপতি তথা কর্নাটকের লোকায়ুক্ত এন সন্তোষ হেগড়ে, সুপ্রিম কোর্টের প্রবীণ আইনজীবী প্রশান্ত ভুষন এবং ইন্ডিয়া এগেইনস্ট করাপশন আন্দোলনের অন্যান্য সদস্যরা মিলে একটি বিকল্প বিলের খসড়া প্রস্তুত করেন। এই বিলটির নাম দেওয়া হয়েছে ‘জনলোকপাল বিল’। আগের তুলনায় এই বিলটি বেশী ক্ষমতাযুক্ত। ২০১১ সালে ৫  এপ্রিল থেকে দিল্লির যন্তর মন্তরে বেশী ক্ষমতাশালী ও আগের তুলনায় স্বাধীন লোকপাল ও  লোকায়ুক্ত নিয়োগের জন্য একটি যৌথ কমিটি গঠন  করার জন্য তিনি আমরণ অনশন শুরু করেন। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী  তাঁর এই দাবি মেনে নেন। ৯ই এপ্রিল তিনি অনশন ভঙ্গ করেন। গণমাধ্যমগুলোর মাধ্যমে আন্না হাজারের এই আন্দোলনের কথা ছড়িয়ে পড়ে। এর ফলে বিভিন্ন স্তরের মানুষ তাঁকে সমর্থন জানায় এবং ১৫০ জন ব্যক্তি তাঁর সঙ্গে অনুষ্ঠানে যোগ দেন। মেধা পাটেকর, অরবিন্দ কেজরিওয়াল, প্রাক্তন আইপিএস অফিসার কিরণ বেদী আন্না হাজারের অনশন ও দুর্নীতি বিরোধী আন্দোলনকে সমর্থন জানাতে এগিয়ে আসেন। এছাড়া সোশ্যাল নেটওয়ার্ক এর মাধ্যমে অনেক মানুষ তাদের সমর্থন জানায়। বিভিন্ন খ্যাতনামা ব্যক্তিত্বগণ আন্না হাজারেকে সমর্থন করেন। ২০১৮ সালের ডিসেম্বর মাসে আন্না হাজারে পুনরায় অনশনে বসার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন। কেন্দ্রীয় সরকার লোকপাল ও লোকায়ুক্ত নিয়োগ না করায় ২০১৯ সালের ৩০ শে জানুয়ারি থেকে পুনরায় বিক্ষোভ শুরু করার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। এ ব্যাপারে তাঁর বক্তব্য ছিল যে, রাজ্য সরকার ও বিজেপি মন্ত্রীরা তাঁকে আশ্বাস দিয়েছিলেন যে, লোকপাল ও লোকায়ুক্ত নিয়োগের চূড়ান্ত প্রক্রিয়া চলছে। তাই তিনি বিক্ষোভ তুলে নিয়েছিলেন। কিন্তু এতদিনেও সেই প্রক্রিয়া বাস্তবায়িত না হওয়ায় তিনি পুনরায় অনশন আন্দোলন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তবে আলাপ-আলোচনার পর অনশন ভাঙলেও আন্দোলন জারি রেখেছিলেন তিনি।

২০২০ সালের জানুয়ারি মাসে তিনি আবার নিজের গ্রামে কৃষক সমস্যা সমাধানে অনশনে বসেন। অনশনের ফলে তাঁর শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটতে থাকলে, পরিস্থিতি বুঝে তাঁর সঙ্গে কথা বলেন বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকারের কৃষি মন্ত্রী নরেন্দ্র সিংহ তোমার এবং মহারাষ্ট্র সরকার। এই বৈঠকের পর তিনি অনশন ভঙ্গ করেন। যদিও তিনি আন্দোলন থেকে এখনো সরে আসেননি। কারণ তাঁর বক্তব্য হলো, কেন্দ্রীয় মন্ত্রী তাঁর সঙ্গে কথা বললেও এখনো পর্যন্ত লিখিত আশ্বাস দেননি।

আন্না হাজারে অবিবাহিত। তিনি রালেগান সিদ্ধি গ্রামে তাঁরই  তৈরি করা মন্দিরের সংলগ্ন একটি ছোট ঘরে বাস করেন। বৈভবহীন, সহজ, সরল, অনাড়ম্বর জীবনযাপন তাঁর বৈশিষ্ট্য।

১৯৮৬ সালে তিনি ভারত সরকারের থেকে ‘ইন্দিরা প্রিয়দর্শিনী বৃক্ষ মিত্র’ পুরস্কার লাভ করেন। ১৯৮৯ সালে মহারাষ্ট্র সরকার তাঁকে ‘কৃষি ভূষণ’ পুরস্কারে সম্মানিত করেছে। ১৯৯০ সালে তিনি ভারত সরকারের কাছ থেকে ‘পদ্মশ্রী’ এবং ১৯৯২ সালে ‘পদ্মভূষণ’ খেতাব পান। ২০০৮ সালে তাঁর অসামান্য অবদানের জন্য তিনি ‘বিশ্ব ব্যাংক জিত গিল স্মৃতি পুরস্কার’ পান। এছাড়া আহমেদনগর  ও পুনের পৌরসংস্থা তাঁকে সংবর্ধিত করেছে।

স্বরচিত রচনা পাঠ প্রতিযোগিতা, আপনার রচনা পড়ুন আপনার মতো করে।

vdo contest

বিশদে জানতে ছবিতে ক্লিক করুন। আমাদের সাইটে বিজ্ঞাপন দেওয়ার জন্য যোগাযোগ করুন। ইমেল – contact@sobbanglay.com

 


Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।