ইতিহাস

ভৈরব দত্ত পাণ্ডে

রাষ্ট্রপতি শাসন চলাকালীন পাঞ্জাবের রাজ্যপাল হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন ভৈরব দত্ত পাণ্ডে (Bhairab Dutt Pande)। পশ্চিমবঙ্গের দশম রাজ্যপাল ছিলেন তিনিই। ১৯৮১ সালের ১২ সেপ্টেম্বর থেকে ১৯৮৩ সালের ১০ অক্টোবর পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপালের দায়িত্ব পালন করেছেন ভৈরব দত্ত পাণ্ডে । ভারতীয় রাজনীতির ইতিহাস যে সকল মানবহিতৈষী ব্যক্তির অবদানে সমৃদ্ধ হয়ে রয়েছে তিনি তাঁদের মধ্যে অন্যতম। মূলত বি. ডি পাণ্ডে নামেই বেশি পরিচিত ছিলেন তিনি। ভারতীয় সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় নিজস্ব যোগ্যতায় উত্তীর্ণ হয়েছিলেন ভৈরব দত্ত পাণ্ডে এবং সেই সুবাদেই তিনি ভারতবর্ষের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদের দায়িত্ব সামলেছিলেন দক্ষ হাতে। ইন্দিরা গান্ধী প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন ১৯৭২ সালের ২ নভেম্বর থেকে ১৯৭৭ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত ভারত সরকারের কেন্দ্রীয় মন্ত্রীপরিষদের সচিবের পদ অলঙ্কৃত করেছিলেন ভৈরব দত্ত পাণ্ডে। চন্ডীগড়ের প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের দায়িত্বও ছিল তাঁরই হাতে। ইন্দিরা গান্ধী, জ্যোতি বসু, মোরারজি দেশাইয়ের মতো বিখ্যাত মানুষদের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। ভারতবর্ষের সামাজিক ক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের জন্য ভারত সরকার তাঁকে সম্মান জানাতেও কার্পণ্য করেনি। ভৈরব দত্ত পাণ্ডেকে ‘পদ্মশ্রী’ এবং ‘পদ্মবিভূষণ—এই দুই অত্যন্ত সম্মানীয় খেতাবে ভূষিত করা হয়েছিল। ভৈরব দত্ত পাণ্ডে একটি স্মৃতিকথাধর্মী গ্রন্থও রচনা করেছিলেন ‘ইন দ্য সার্ভিস অব ফ্রি ইণ্ডিয়া, মেমোয়ার অফ এ সিভিল সার্ভেন্ট’ নামে যাঁর ঐতিহাসিক মূল্য প্রণিধানযোগ্য। 

১৯১৭ সালের ১৭ মার্চ ব্রিটিশ শাসিত ভারতে উত্তরাখণ্ডের মিউনিসিপ্যালিটি শহর আলমোড়ায় রাজনীতিবিদ ভৈরব দত্ত পাণ্ডের জন্ম হয়। তাঁর বাবার নাম চন্দ্র দত্ত পাণ্ডে (Chandra Dutt Pande)। পরবর্তীকালে ভৈরব দত্তের বিবাহ হয় বিমলা পাণ্ডের সঙ্গে যিনি মূলত ‘মামী’ নামেই পরিচিত ছিলেন। ভৈরবের স্ত্রী বিমলা সামাজিক বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ছিলেন ওতপ্রোতভাবে এবং সমাজকর্মী হিসেবে খ্যাতিও অর্জন করেছিলেন। ২০০৬ সালের নভেম্বর মাসে স্বামীর মৃত্যুর তিনবছর পূর্বেই তাঁর মৃত্যু হয়। বিমলা এবং ভৈরব দত্ত পাণ্ডের তিন সন্তানের মধ্যে জ্যেষ্ঠ অরবিন্দ পাণ্ডে ছিলেন একজন আইএএস অফিসার এবং অরবিন্দের স্ত্রী মৃণাল পাণ্ডে ছিলেন একজন প্রখ্যাত সাংবাদিক এবং লেখিকা। মৃণাল ‘প্রসার ভারতী’র চেয়ারপার্সন নিযুক্ত হয়েছিলেন। মহিলাদের বিখ্যাত পত্রিকা ‘বামা’র সম্পাদক হিসেবেও তিনি কাজ করেছিলেন তিন বছর। ২০০৬ সালে ‘পদ্মশ্রী’ সম্মানে ভূষিত হয়েছিলেন তিনি। ভৈরব পাণ্ডের কনিষ্ঠ পুত্র ললিত পাণ্ডে  ছিলেন একজন সুবিখ্যাত পরিবেশবিদ যিনি ‘উত্তরাখণ্ড সেবানিধি এনভায়রনমেন্টাল এডুকেশন সেন্টার’ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ২০০৭ সালে ললিত পাণ্ডেকে চতুর্থ সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান ‘পদ্মশ্রী’ প্রদান করে ভারত সরকার। ভৈরব এবং বিমলার একমাত্র কন্যা হলেন রত্না পাণ্ডে। ভৈরব দত্ত পাণ্ডের শ্যালক অর্থাৎ বিমলার দাদা বিনোদ চন্দ্র পাণ্ডে নিজেও কেন্দ্রীয় মন্ত্রীপরিষদের সচিব এবং একজন রাজ্যপাল হিসেবে কাজ করেছিলেন।  

বিদ্যায়তনিক শিক্ষা সমাপ্ত করবার পর সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় যোগ্যতার সঙ্গে উত্তীর্ণ হন বি. ডি. পাণ্ডে।


প্রাকৃতিক খাঁটি মধু ঘরে বসেই পেতে চান?

ফুড হাউস মধু

তাহলে যোগাযোগ করুন – +91-99030 06475


 


১৯৩৯ সালে তিনি সিভিল সার্ভিসে যোগদান করেছিলেন। চল্লিশ বছরেরও বেশি সময় তিনি একজন সিভিল সার্ভেন্ট হিসেবে নিজের দায়িত্ব পালন করেছেন দক্ষ হাতে। বি. ডি. পাণ্ডে ছিলেন ইম্পেরিয়াল সিভিল সার্ভিসের শেষ জীবিত সদস্যদের মধ্যে অন্যতম একজন। 

স্বাধীনতা সংগ্রামের উত্তপ্ত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বেড়ে উঠেছিলেন ভৈরব দত্ত পাণ্ডে । দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের ফলে স্বাধীনতা অর্জন করবার পরও ভারতবর্ষকে নানারকম অর্থনৈতিক ও সামাজিক সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। ১৯৫০ সালের গোড়ার দিকে ভৈরব দত্ত পাণ্ডে বিহারের ফুড কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সেই পদে থাকাকালীন তিনি বরাদ্দ খাদ্যশস্য সরবরাহ বাড়াতে সাহায্য করেছিলেন। দুর্ভিক্ষের সমাধানের জন্য ভূমিসংস্কার কমিশনার হিসেবে একটি দূর্ভিক্ষ কোড গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন বি. ডি. পাণ্ডে। জন-উন্নয়ন বা কমিউনিটি ডেভলপমেন্ট কর্মসূচীতে তাঁর অবদান এতই মূল্যবান ছিল যে তা পঞ্চায়েতি রাজ প্রতিষ্ঠানের জন্য আজও ভীষণ শিক্ষণীয় একটি বিষয় হয়ে রয়েছে। ইন্দিরা গান্ধীর সরকারের অধীনে ভৈরব দত্ত পাণ্ডে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী পরিষদের দ্বাদশ সচিব হিসেবে নিযুক্ত হয়েছিলেন। তখন ভারতীয় রাজনীতির ইতিহাস নানা ঘাত-প্রতিঘাতে উত্তাল এবং জরুরী অবস্থার নিকটবর্তী সময় আসন্ন। ১৯৭২ সালের ২ নভেম্বর তিনি ক্যাবিনেটের সচিব হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং আগামী প্রায় পাঁচ বছর অর্থাৎ ১৯৭৭ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত তিনি এই পদ অলঙ্কৃত করেছিলেন। খুব অল্প সময়ের জন্য চণ্ডীগড়ের প্রশাসক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছিলেন ভৈরব দত্ত পাণ্ডে। 

সিভিল সার্ভেন্টের পদ থেকে অবসর গ্রহণের পরে দুই রাজ্যের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদ রাজ্যপালের দায়িত্ব সামলেছেন তিনি। ১৯৮১ সালের ১২ সেপ্টেম্বর পশ্চিমবঙ্গের দশম রাজ্যপাল হিসেবে তিনি দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তখন বাম-শাসিত পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন জ্যোতি বসু। ত্রিভুবন নারায়ণ সিং রাজ্যপাল পদ থেকে সরে যাওয়ার পর বি. ডি. পাণ্ডেকে সেই শূণ্যস্থান পূরণ করবার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। যদিও মি. পাণ্ডের এই নিয়োগ সত্যিই আশ্চর্যজনক। রাজস্থানের প্রাক্তন রাজ্যপাল মোহনলাল সুখাদিয়াই এই পদের জন্য প্রথম পছন্দ ছিলেন, কিন্তু মোহনলাল এই প্রস্তাবে সম্মত হননি। কলকাতার মারোয়াড়ি ব্যবসায়ীরা মোহনলালকে এই প্রস্তাব গ্রহণ করতে নিষেধ করেছিল। রাজভবনে পৌঁছে ভৈরব দত্ত পাণ্ডে দরজা খুলে দেওয়া পরিচারকের সঙ্গে করমর্দন করে অবাক করে দিয়েছিলেন সকলকে। ১৯৮৩ সালের ১০ অক্টোবর পর্যন্ত বি. ডি. পাণ্ডে পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পাঞ্জাবে এক উত্তাল রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে যখন রাষ্ট্রপতি শাসন জারি হয় তখন পাঞ্জাবের রাজ্যপাল হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন ভৈরব দত্ত পাণ্ডে । ১৯৮৩ সালের ১০ অক্টোবর থেকে আগামী প্রায় এক বছর ১৯৮৪ সালের ৩ জুলাই পর্যন্ত পাঞ্জাবের রাজ্যপাল পদেই আসীন ছিলেন তিনি। 

সক্রিয় রাজনীতির পাশাপাশি অবসরে লেখালেখির চর্চাও করতেন ভৈরব দত্ত পাণ্ডে। নিজের দীর্ঘ উত্থান-পতনময় ঘটনাবহুল জীবনযাত্রাকে সাবলীল ভাষায় লিপিবদ্ধ করে গেছেন তিনি। এই স্মৃতিকথাধর্মী গ্রন্থটির নাম ‘ইন দ্য সার্ভিস অব ফ্রি ইণ্ডিয়া, মেমোয়ার অফ এ সিভিল সার্ভেন্ট’। তাঁর মৃত্যুর পরে তাঁর কন্যা রত্না পাণ্ডের সম্পাদনাতেই এই লেখা গ্রন্থাকারে প্রকাশ পেয়েছে। ব্রিটিশ অধ্যুষিত ভারতবর্ষে যৌবনের অধিকাংশ সময় কাটিয়েছেন তিনি, তারপর ইংরেজ রাজত্বের একেবারে শেষদিকে সিভিল সার্ভিসে যোগদান করেছেন। ফলত সেই সময়কার ভারতবর্ষকে যে তাঁর বয়ানে খুবই বিশ্বাসযোগ্যরূপে পাওয়া যাবে তা বলাই বাহুল্য। একজন সিভিল সার্ভেন্টের জীবনযাপনই তাঁর লেখায় জীবন্ত হয়ে ধরা দিয়েছে, সঙ্গে রাজনীতির নেপথ্যের বহু ঘটনার অনুপুঙ্খ বিবরণের হদিশ পাওয়া যেতে পারে এই গ্রন্থে। অতএব এই স্মৃতিকথাটির ঐতিহাসিক মূল্য এবং গুরুত্ব অনস্বীকার্য তো বটেই। এই বইতেই ১৯৮৪ সালে পাঞ্জাবের ‘অপারেশন ব্লু-স্টার‘ যে বিপর্যয় ডেকে এনেছিল তার তীক্ষ্ণ সমালোচনা করেছেন তিনি। খলিস্তানি আন্দোলনকে দমন করার জন্য প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর যে নির্মম পদক্ষেপ তারও সমালোচনা করেছেন বি. ডি. পাণ্ডে। সর্বোপরি তিনি এও জানিয়েছেন যে শিখ ধর্মাবলম্বীরা কখনোই কোন হিন্দুকে হত্যা বা আক্রমণ করেননি।  

ভারত সরকার সামাজিক ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অবদানের জন্য ভৈরব দত্ত পাণ্ডেকে দুটি অত্যন্ত সম্মানীয় পুরস্কার প্রদান করে। ১৯৭২ সালে তাঁকে ভারতের চতুর্থ সর্বোচ্চ বেসমারিক সম্মান ‘পদ্মশ্রী’ খেতাবে ভূষিত করে ভারত সরকার এবং পরবর্তীকালে ২০০০ সালে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসমারিক খেতাব ‘পদ্মবিভূষণ’-এ সম্মানিত করা হয় বি. ডি. পাণ্ডেকে। 

বি. ডি. পাণ্ডে একসময় ভারতবর্ষের সবচেয়ে প্রবীণ সিভিল সার্ভেন্ট ছিলেন। সিভিল সার্ভিসে দীর্ঘদিন সক্রিয় ভূমিকা পালনের পর দিল্লি থেকে তিনি নিজের শহর আলমোড়াতে ফিরে আসেন এবং সেখানেই জীবনের বাকি দিনগুলি কাটিয়েছিলেন ভৈরব দত্ত পাণ্ডে । 

২০০৯ সালের ৪ এপ্রিল ৯২ বছর বয়সে আলমোড়াতেই ভৈরব দত্ত পাণ্ডের মৃত্যু হয়। 

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

-
এই পোস্টটি ভাল লেগে থাকলে আমাদের
ফেসবুক পেজ লাইক করে সঙ্গে থাকুন

নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুকে নিয়ে জানা-অজানা তথ্য


নেতাজী

ছবিতে ক্লিক করে দেখুন এই তথ্য