সববাংলায়

হাবিবুর রহমান

ব্রিটিশ শাসিত ভারতে ভারতীয় সেনাবাহিনীর একজন অন্যতম অফিসার হাবিবুর রহমান (Habib-Ur-Rahaman) ব্রিটিশ বিরোধিতা এবং ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করার জন্য আজও স্মরণীয় হয়ে আছেন। সিঙ্গাপুরে তিনি সুভাষচন্দ্র বসুর চিফ অফ দ্য স্টাফ পদে নিযুক্ত ছিলেন এবং টোকিওগামী বিমানে ওঠার আগের মুহূর্ত পর্যন্ত সুভাষচন্দ্র বসুর সঙ্গেই সময় কাটিয়েছিলেন তিনি। প্রথম কাশ্মীর যুদ্ধেও তিনি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেন এবং ১৯৪৭ সালের ইন্দো-পাক যুদ্ধে কাশ্মীরের মহারাজা হরি সিং-এর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করতে মেজর জেনারেল জামান কিয়ানির সঙ্গে যোগ দিয়েছিলেন হাবিবুর রহমান। এই সময় কাশ্মীর থেকে ডোগরা রাজত্বের বিলোপ ঘটাতে হাবিবুর এবং তাঁর বাহিনী কাশ্মীরের ভিম্বার জেলার উপর আক্রমণ করেছিলেন ডোগরা সেনাদের পরাস্ত করার জন্য, কিন্তু অনেকের মতে এই আক্রমণ সেভাবে সফলতা পায়নি। কাশ্মীরের স্বাধীনতার জন্য হাবিবুর নিজের উদ্যোগে একটি বাহিনী তৈরি করে কাশ্মীরের মানুষকে প্রশিক্ষণ দিয়েছিলেন যাতে তারা ডোগরাদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে পারে।

১৯১৩ সালের ২২ ডিসেম্বর জম্মু ও কাশ্মীরের ভিম্বার জেলার পাঞ্জেরি গ্রামে হাবিবুর রহমানের জন্ম হয়। তাঁর বাবার নাম রাজা মনসুর আহমেদ খান। তাঁর দাদু সর্দার রাজা রাহমদাদ খান জম্মু ও কাশ্মীরের মহারাজা প্রতাপ সিংয়ের দরবারে মন্ত্রী ছিলেন।

পাঞ্জেরির একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে হাবিবুর রহমানের শিক্ষাজীবন শুরু হয়েছিল। চতুর্থ শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হওয়ার পরে আরও বিভিন্ন স্কুলে পর্যায়ক্রমে পড়াশোনা করেন হাবিবুর এবং স্নাতক ডিগ্রি অর্জনের জন্য তিনি জম্মুতে চলে যান। কিছুদিন পরে দেরাদুনের প্রিন্স অফ ওয়েলস রয়্যাল ইণ্ডিয়ান মিলিটারি কলেজে নাম নথিভুক্ত করান হাবিবুর রহমান এবং তারপরে ইণ্ডিয়ান মিলিটারি অ্যাকাডেমিতে যোগ দেন তিনি।

১৯৩৬ সালের ১৫ জুলাই ইণ্ডিয়ান ল্যাণ্ড ফোর্সের স্পেশাল লিস্টে দ্বিতীয় লেফটেন্যান্ট হিসেবে নিযুক্ত হন হাবিবুর রহমান। ১৯৩৬ সালের ১০ আগস্ট থেকে ডিউক অফ ওয়েলিংটনের রেজিমেন্টে দ্বিতীয় ব্যাটেলিয়নের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন তিনি। ঠিক এর এক বছর পরে অর্থাৎ ১৯৩৭ সালের ১০ আগস্ট চোদ্দতম পাঞ্জাব রেজিমেন্টের প্রথম ব্যাটেলিয়নে যোগ দেন হাবিবুর। এই ব্যাটেলিয়নকে বলা হয় ‘শের দিল পল্টন’। সেই সময় একজন অফিসার হিসেবে তাঁর বেতন ছিল মাত্র একশো টাকা। ১৯৩৭ সালের ১ ডিসেম্বর তিনি লেফটেন্যান্ট পদে উন্নীত হন এবং ১৯৪০ সালে তাঁর ব্যাটেলিয়নটি লাহোর থেকে সেকেন্দ্রাবাদে চলে যায়। ১৯৪১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে হাবিবুর রহমান ও তাঁর ব্যাটেলিয়নকে সমুদ্রপারের বিদেশে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। ১৯৪১ সালের ৩ মার্চ সেকেন্দ্রাবাদ থেকে পেনাং দ্বীপে যাওয়ার জন্য রওনা দেন হাবিবুর এবং সেখান থেকে তিনি পৌঁছান মালয়েশিয়ার উত্তর কুয়ালালামপুরে। ইপোতে দুই মাস থাকার পরে তাঁর ব্যাটেলিয়ন স্থানান্তরিত হয় দক্ষিণ কেদাহের সুঙ্গেই পাট্টানিতে এবং সেখানে ব্রিগেডিয়ার গ্যাজেটের অধীনে পঞ্চম ভারতীয় ইনফ্যান্ট্রি ব্রিগেডে যোগ দেয়। পেনাং দ্বীপের সুরক্ষার পাশাপাশি তাঁকে ও তাঁর ব্যাটেলিয়নকে থাইল্যাণ্ডের দক্ষিণ সীমান্তে জিত্রায় পাঠানো হয়। এই সময়ই শুরু হয়ে যায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। ১৯৪১ সালের ৭ ডিসেম্বর পার্ল হারবার আক্রমণ ও সিঙ্গাপুরে বোমা বিস্ফোরণের পরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জাপানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে এবং এই সময় হাবিবুর রহমান ছিলেন সিগনাল অফিসারের দায়িত্বে। পাঞ্জাব রেজিমেন্ট ব্যাটেলিয়নকে সঙ্গে নিয়ে তিনি থাইল্যাণ্ডের যুদ্ধক্ষেত্রের কাছে ছাঙ্গলুনে যুদ্ধ করেছিলেন। ১৯৪১ সালে পেনাং-এর কাছে মিয়ামি উপকূলে পৌঁছায় তাঁরা এবং পেনাং দ্বীপকে এই সময় সম্পূর্ণরূপে উচ্ছেদ করে দেওয়া হয়। জাপানিদের আসার আগে পর্যন্ত নিবং তাবোলের কাছে একটি রেলওয়ে সেতুকে পাহারা দেওয়ার দায়িত্ব পড়ে হাবিবুরের উপর। তারপর তাঁদের নির্দেশ দেওয়া হয় ইপোতে ফিরে আসার জন্য এবং এখানে এসেই ম্যালেরিয়া জ্বরে আক্রান্ত হন হাবিবুর রহমান। ১৯৪২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে জাপানি সেনারা সিঙ্গাপুর আক্রমণ করে র‍্যাফেলস স্কোয়াডে বোমা নিক্ষেপ করে যাতে বহু মানুষের মৃত্যু হয়। হাবিবুর রহমান ও একজন ব্রিটিশ মেজরের দায়িত্ব ছিল সেই মৃতদেহগুলি সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার, তাঁরা সেগুলিকে সমুদ্রের জলে ফেলে দিয়েছিলেন। ১৯৪২ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ব্রিটিশ সেনারা জাপানিদের কাছে আত্মসমর্পণ করে। পরাজিত ও হতাশ ব্রিটিশ ভারতীয় সৈন্যরা সিঙ্গাপুরের ফারার পার্কে সমবেত হন এবং সেখানে মেজর ফুজিওয়ারা ঘোষণা করেন যে তাঁরা সকলে যদি একজোট হয়ে এই মুহূর্তে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরোধিতা করতে শুরু করেন তাহলে সবার আগে জাপানি সেনার সাহায্য পাবেন আর এর মাধ্যমে তাঁরা সকলেই তাঁদের মাতৃভূমি ভারতের স্বাধীনতা অর্জনে সক্ষম হবেন। এই লক্ষ্যেই গড়ে ওঠে ‘ইণ্ডিয়ান ন্যাশনাল আর্মি’। এরপর সমস্ত মালয়ের যুদ্ধবন্দীদের অর্পণ করা হয় ইণ্ডিয়ান ন্যাশনাল আর্মির জি.ও.সি ক্যাপ্টেন মোহন সিংয়ের কাছে। ক্যাপ্টেন মোহন সিং এই বাহিনীকে একটি শৃঙ্খলাবদ্ধ সংগঠিত সেনাবাহিনীতে পরিণত করার শপথ নেন। যুদ্ধবন্দীরাও তখন ভারতের স্বাধীনতাকামী মুক্তিবাহিনীতে যোগ দেয়। মোহন সিংয়ের সঙ্গে হাবিবুর রহমানের ভাল বন্ধুত্ব ছিল। ১৯৪২ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি হাবিবুর রহমান ইণ্ডিয়ান ন্যাশনাল আর্মিতে যোগ দেন। এরপরে ছাঙ্গি শিবিরে জাপানি সেনাদের অধীনে সমস্ত ড্রিলের প্রশিক্ষণ নিতে শুরু করেন হাবিবুর।

১৯৪২ সালের ২৪ এপ্রিল সিঙ্গাপুরের বিদাদারি শিবিরে ক্যাপ্টেন মোহন সিংয়ের দাকা একটি সম্মেলনে ত্রিশ জন ভারতীয় যুদ্ধবন্দীদের সঙ্গে হাবিবুর রহমানও যোগ দিয়েছিলেন গুরুত্বপূর্ণ সিনিয়র অফিসার হিসেবে এবং এই সম্মেলনটিই ইণ্ডিয়ান ন্যাশনাল আর্মির মেরুদণ্ড বলে বিবেচিত হয়। এভাবে এই সেনাবাহিনী গঠনের কাজ চলতে থাকে। জাপানিরা তখনও পর্যন্ত পুরোপুরি এই বাহিনীকে সাহায্য করতে প্রস্তুত ছিল না। ১৯৪২ সালের ২৯ ডিসেম্বর ক্যাপ্টেন মোহন সিংকে জাপানিরা গ্রেপ্তার করলে রাসবিহারী বসুর সাহায্যে আজাদ হিন্দ বাহিনীর পুনরুজ্জীবন ঘটে এবং রাসবিহারী বসুর নির্দেশেই হাবিবুর রহমান ইণ্ডিয়ান ন্যাশনাল আর্মিতে কাজ করতে শুরু করেন। নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর অধীনে আজাদ হিন্দ বাহিনীর ডিরেক্টরেট অফ মিলিটারি ব্যুরো-পদে নিযুক্ত হন তিনি। নেতাজীর জাপানে আসার খবর পেয়ে ইণ্ডিয়ান ন্যাশনাল আর্মির একটি শাখা হিসেবে গড়ে ওঠে পঞ্চম গেরিলা রেজিমেন্ট। এই গেরিলা রেজিমেন্ট ক্রমে বার্মায় চলে আসে এবং ১৯৪৪ সালের ১৫ অক্টোবর রেঙ্গুনে সুভাষচন্দ্র বসুর সঙ্গে হাবিবুর রহমানের দেখা হয়। পঞ্চম গেরিলা রেজিমেন্টের সেকেণ্ড-ইন-কমাণ্ডার পদে হাবিবুরকে অভিষিক্ত করেন সুভাষচন্দ্র নিজে। হাবিবুর ইণ্ডিয়ান ন্যাশনাল আর্মির নেহেরু ব্রিগেডের কমাণ্ডার পদে নিযুক্ত হন। ১৯৪৪ সালের ডিসেম্বর মাসে জাপানি সেনার কমাণ্ডার জেনারেল এস. কামাটুরা নেহেরু ব্রিগেড পরিদর্শনে আসেন। নেতাজী যে ‘আজাদ হিন্দ বাহিনী’কে নিয়ে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন, তার অংশীভূত ছিলেন হাবিবুর রহমানও। জিত্রার আলোরস্তারে ইনফ্যান্ট্রি রেজিমেন্টে তাঁকে পাঠানো হয় এবং একাদিক্রমে তাঁকে ডেপুটি কোয়ার্টারমাস্টার জেনারেল, ডেপুটি অ্যাডজুট্যান্ট জেনারেল এবং ইণ্ডিয়ান ন্যাশনাল আর্মি তথা আজাদ হিন্দ বাহিনীর অফিসার ট্রেনিং স্কুলের কমাণ্ড্যান্টের পদে নিযুক্ত করা হয়। আজাদ হিন্দ অস্থায়ী সরকারের বার্ষিকীতে এই পদে তাঁকে নিযুক্ত করা হয়েছিল। ১৯৪৫ সালে ব্রিটিশ বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হন হাবিবুর রহমান। কর্নেল গুরবক্স সিং ধিল্লন, কর্নেল প্রেম কুমার শেহগাল এবং জেনারেল শাহনওয়াজ খানের সঙ্গে তাঁকেও ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার অপরাধে দিল্লির লালকেল্লায় বিচারে বসানো হয়। ১৯৪৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত এই বিচার চলেছিলে এবং ১৯৪৬ সালের ১ জানুয়ারি বিচারের রায়ে আদালত তাঁদের হয় ফাঁসির সাজা নাহয় যাবজ্জীবন দ্বীপান্তরের সাজা দিতে বাধ্য ছিল। কিন্তু তৎকালীন ভারতবাসীদের প্রভূত আন্দোলনের চাপে পড়ে ব্রিটিশ সরকার তাঁদের চারজনকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়।

জম্মু ও কাশ্মীরকে পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত করতে চেয়েছিলেন মহম্মদ আলি জিন্না এবং সেই জন্য তিনি হাবিবুর রহমানকে দায়িত্ব দিয়েছিলেন জম্মু ও কাশ্মীরের মহারাজার সঙ্গে দেখা করে তাদের মতামত জেনে আসতে। এই বিষয়ে হাবিবুর রহমানকে জম্মু ও কাশ্মীরের ডোগরা সেনাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধও করতে হয়েছিল। প্রথম কাশ্মীর যুদ্ধে তাঁর অবদান ভারতের ইতিহাসে আজও স্মরণীয়। ১৯৪৭ সালের ইন্দো-পাক যুদ্ধে কাশ্মীরের মহারাজা হরি সিং-এর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করতে মেজর জেনারেল জামান কিয়ানির সঙ্গে যোগ দিয়েছিলেন হাবিবুর রহমান। এই সময় কাশ্মীর থেকে ডোগরা রাজত্বের বিলোপ ঘটাতে হাবিবুর এবং তাঁর বাহিনী কাশ্মীরের ভিম্বার জেলার উপর আক্রমণ করেছিলেন ডোগরা সেনাদের পরাস্ত করার জন্য, কিন্তু অনেকের মতে এই আক্রমণ সেভাবে সফলতা পায়নি। কাশ্মীরের স্বাধীনতার জন্য হাবিবুর নিজের উদ্যোগে একটি বাহিনী তৈরি করে কাশ্মীরের মানুষকে প্রশিক্ষণ দিয়েছিলেন যাতে তারা ডোগরাদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে পারে।

১৯৪৭ সালের ইন্দো-পাক যুদ্ধের সময় পাকিস্তানের সেন্ট্রাল সুপিরিয়র সার্ভিসেস-এ যোগ দেন হাবিবুর রহমান। পাকিস্তান সরকারের ডেপুটি প্রতিরক্ষা সম্পাদক, উত্তরাঞ্চলের মুখ্য আধিকারিক এবং আজাদ কাশ্মীর কাউন্সিলের একজন সদস্য হিসেবেও কাজ করেছিলেন রহমান।

আজাদ জম্মু ও কাশ্মীর সরকার তাদের স্বাধীনতার আন্দোলনের সময় হাবিবুর রহমানের অবদানের কথা মাথায় রেখে তাঁকে ফতেহ্‌-ই-ভিম্বার, ফক্‌র-ই-কাশ্মীর এবং গাজি-ই-কাশ্মীর উপাধিতে ভূষিত করে। পাকিস্তান সরকারের পক্ষ থেকে সিতারা-ই-পাকিস্তান, নিশান-ই-ইমতিয়াজ এবং তম্‌ঘা-ই-খিদ্‌মত সম্মানে ভূষিত হন হাবিবুর রহমান।

১৯৭৮ সালের ২৬ ডিসেম্বর ভিম্বারের পাঞ্জেরি গ্রামে হাবিবুর রহমানের মৃত্যু হয়।                


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading