ইতিহাস

ভি. এস. শ্রীনিবাস শাস্ত্রী

ভি এস শ্রীনিবাস শাস্ত্রী

ভি. এস. শ্রীনিবাস শাস্ত্রী (V. S. Srinivasa Sastri) একাধারে একজন প্রখ্যাত ভারতীয় রাজনীতিবিদ, সুবক্তা, শিক্ষাবিদ এবং সক্রিয় স্বাধীনতা সংগ্রামী ছিলেন। এছাড়াও দক্ষ প্রশাসক হিসেবেও তাঁর খুব খ্যাতি ছিল। সেকালের ভারতীয়দের মধ্যে ইংরেজি ভাষায় সুমধুর ও পাণ্ডিত্যপূর্ণ বক্তৃতা দেওয়ার জন্য শ্রীনিবাস শাস্ত্রী বিখ্যাত ছিলেন। প্রথম জীবনে মাদ্রাজের তিরুবল্লীকেনির একটি স্কুলে প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন তিনি। পরবর্তীকালে ১৯০৫ সালে তিনি ‘সার্ভেন্টস অফ ইন্ডিয়া সোসাইটি’-তে যোগ দেওয়ার মধ্য দিয়ে সক্রিয় রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। ১৯০৮ থেকে ১৯২২ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ১৪ বছর ভি. এস. শ্রীনিবাস শাস্ত্রী ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের সদস্য ছিলেন। গোপালকৃষ্ণ গোখলে এবং মহাত্মা গান্ধীর সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সখ্যতা ছিল। মাদ্রাজ বিধান পরিষদ, ঔপনিবেশিক বিধান পরিষদের সদস্য ছিলেন তিনি। সর্বোপরি ‘লিগ অফ নেশনস’-এ ভারতের প্রতিনিধি হিসেবে কাজও করেছেন তিনি। যুক্তরাজ্যের প্রিভি কাউন্সিলের সদস্য এবং দক্ষিণ আফ্রিকার ইউনিয়নের প্রতিনিধি হিসেবেও বিশ্বের কাছে পরিচিত ছিলেন ভি. এস. শ্রীনিবাস শাস্ত্রী।

১৮৬৭ সালে ২২ সেপ্টেম্বর তৎকালীন মাদ্রাজের ভালাঙ্গেইমান গ্রামে একটি গরিব ব্রাহ্মণ পরিবার ভি. এস. শ্রীনিবাস শাস্ত্রীর জন্ম হয়। তার সম্পূর্ণ নাম ভালাঙ্গাঈমান শংকরনারায়ণ শ্রীনিবাস শাস্ত্রী। তাঁর বাবা বৈদিক শঙ্করনারায়ণ শাস্ত্রী ছিলেন একজন দরিদ্র পুরোহিত। ১৮৮৫ সালে শ্রীনিবাসের সাথে পার্বতীর বিবাহ হয়।

শ্রীনিবাসের প্রাথমিক পড়াশোনা শুরু হয় কুম্বাকোনামের নেটিভ হাই স্কুলে (Native High School)। এরপর ১৮৮৭ সালে তিনি চেন্নাইয়ের পাচাইআপ্পাস কলেজ (Pachaiyappa’s College) থেকে ইংরেজি এবং সংস্কৃতে ফার্স্ট ক্লাস ডিগ্রি নিয়ে পাশ করেন।

স্নাতক স্তরের পড়াশোনা সম্পন্ন করার পরেই তিনি সালেমের মিউনিসিপাল কলেজে (Municipal College) অধ্যাপনায় নিযুক্ত হন। ১৮৯৪ সালে তিনি তিরুবল্লীকেনির হিন্দু হাই স্কুলের (Hindu High school)  প্রধান শিক্ষক হিসেবে নিযুক্ত হন। এখানে তিনি আট বছর কাজ করেন। এই সময় থেকেই ইংরেজি ভাষায় দক্ষতার জন্য তাঁর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। এছাড়াও তিনি একজন দক্ষ প্রশাসক হিসেবেও সুনাম অর্জন করেছিলেন। এই সময় তিনি মাদ্রাজ টিচার্স গিল্ড (Madras Teachers Guild) তৈরি করেন। বেশ কিছুদিন তিনি আন্নামালাই বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য পদেও নিযুক্ত ছিলেন। উপাচার্য থাকাকালীন তিনি নানা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রভাষক (Lecturer) হিসেবে আমন্ত্রিত হন। এই সময়পর্বে সংস্কৃত এবং প্রাচ্য সাহিত্যের উপর তাঁর পাণ্ডিত্য প্রদর্শন করেছিলেন ভি. এস. শ্রীনিবাস শাস্ত্রী। কালিদাসের লেখা ‘অভিজ্ঞান শকুন্তলম্‌’ নাটকটি তামিল ভাষায় অনুবাদ করার জন্য ভি. এস. শ্রীনিবাস শাস্ত্রী আন্নামালাই বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন তামিল গবেষণা বিভাগের প্রধান মহাবিদ্বান আর রাঘব আয়েঙ্গারকে সহায়তা করেন। ‘সন্দম্‌’ ছন্দে এই নাটকটি অনুদিত হয় এবং ১৯৩৮ সালে তা প্রকাশিত হয়। ভি. এস. শ্রীনিবাস শাস্ত্রী কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে ‘কমলা বক্তৃতামালা’তেও অংশ নিয়েছেন।

ভারতের সমবায় আন্দোলনের অন্যতম প্রধান নেতৃত্বে ছিলেন ভি. এস. শ্রীনিবাস শাস্ত্রী। ১৯০৪ সালে শ্রীনিবাস ভারতে প্রথম সমবায় সমিতি স্থাপন করেন। এই সমিতির নাম ছিল ‘ত্রিপলিকান আরবান কো-অপারেটিভ সোসাইটি’ (Triplicane Urban Co-operative Society,TUCS)। তিনি একজন স্বাধীনতা সংগ্রামীও ছিলেন। ১৯০৬ সালে স্বনামধন্য স্বাধীনতা সংগ্রামী গোপালকৃষ্ণ গোখলের সঙ্গে সাক্ষাতের ফলে তাঁর দ্বারা তিনি গভীরভাবে আকৃষ্ট হন। গোখলের তৈরি করা ‘সার্ভেন্টস অফ ইন্ডিয়া সোসাইটি’তে (Servants of India Society) তিনি যোগদান করেন এবং ১৯১৫ সালে তার সভাপতি (President) নির্বাচিত হন। ১৯০৮ সালে তিনি ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস দলে যোগ দেন। ১৯১১ সালে তিনি মাদ্রাজ জেলার কংগ্রেস কমিটির সম্পাদক (Secretary) নির্বাচিত হন। কংগ্রেসে থাকাকালীন তাঁর সবথেকে বড় অবদান হল কংগ্রেস এবং মুসলিম লীগের মধ্যে সুসম্পর্ক স্থাপন করা। ১৯১৩ সালে তিনি মাদ্রাজ লেজিসলেটিভ কাউন্সিল (Madras Legislative Council) অর্থাৎ মাদ্রাজ বিধান পরিষদের সদস্য হন এবং ১৯১৬ সালে তিনি ইম্পেরিয়াল লেজিসলেটিভ কাউন্সিল অফ ইন্ডিয়ার (Imperial Legislative Council of India) সদস্য হন। ব্রিটিশ সরকার যখন রাওলাট আইন (Rowlatt Act) প্রণয়ন করে, তখন তিনি এর তীব্র বিরোধিতা করেন। এই আইনের দ্বারা সরকার যখন খুশি এবং যাকে খুশি কোনও বিচার ছাড়াই গ্রেপ্তার করতে পারত। তিনি ইম্পেরিয়াল লেজিসলেটিভ কাউন্সিলে এর বিরুদ্ধে ভাষণ দেন। ১৯১৯ সালে তাঁকে ‘প্রিভি কাউন্সিল অফ দ্য ইউনাইটেড কিংডম’ (Privy Council of the United Kingdom)-এর সদস্য করা হয়। মতানৈক্যের কারণে ১৯২২ সালে ভি. এস. শ্রীনিবাস শাস্ত্রী জাতীয় কংগ্রেস ত্যাগ করেন। তেজ বাহাদুর সাপরুর সঙ্গে যুগ্মভাবে তিনি ‘ইন্ডিয়ান লিবারেল পার্টি’ (Indian Liberal Party) নির্মাণ করেন। ১৯২৪ সালে তিনি অ্যানি বেসান্তের সঙ্গে ইংল্যান্ড যান ভারতের জন্য হোমরুল-এর (Home Rule) দাবি জানাতে। তিনি প্রথম এবং দ্বিতীয় গোল টেবিল বৈঠকেও (Round table conference) যোগদান করেছিলেন।

১৯১৯ সালে শ্রীনিবাস বেঞ্জামিন রবার্টসনের সঙ্গে দক্ষিণ আফ্রিকায় ভারতীয় প্রতিনিধি হিসেবে যান, সেখানে কেপটাউন চুক্তি সই করা হয় দক্ষিণ আফ্রিকার সরকারের সাথে।  ১৯২৭ সালে তৎকালীন ভারতের ভাইসরয় (viceroy) লর্ড আরউইন তাঁকে প্রথম ভারতীয় প্রতিনিধি হিসেবে নিযুক্ত করে দক্ষিণ আফ্রিকায় পাঠান। সেখানে তিনি প্রতিনিধি হিসেবে ১৯২৯ সাল অবধি ছিলেন। এখানে তিনি ট্রান্সভাল ইন্ডিয়ান কংগ্রেস (Transvaal Indian Congress, TIC) স্থাপন করেন যা পরে দক্ষিণ আফ্রিকার জাতীয় কংগ্রেসের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়। শ্রীনিবাস শাস্ত্রী লক্ষ্য করেছিলেন যে সেই সময় দক্ষিণ আফ্রিকায় ভারতীয় এবং ভারতীয় অভিবাসীদের জন্য বেশ কিছু পৃথকীকরণ আইন পাস করা হয়েছিল। ভারতীয়দের এই জাতিগত বিচ্ছিন্নতার বিরোধিতা করেছিলেন তিনি। তাঁর এই আন্দোলনের ফলে দক্ষিণ আফ্রিকার সরকার ‘ক্লাস এরিয়া বিল’ প্রত্যাহার করে নেয়। দক্ষিণ আফ্রিকায় ভারতীয়দের সাথে হওয়া অত্যাচারের প্রতিবাদ করেন। দক্ষিণ আফ্রিকার ইউনিয়নের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জান স্মুটস শ্রীনিবাসকে ইউরোপীয় অভ্যাগতদের সমান মর্যাদা দিতে চাননি, কিন্তু ভারতীয় প্রতিনিধি হিসেবে ভি. এস. শ্রীনিবাস শাস্ত্রী দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে ফিরে আসার পরেই তিনি বুঝতে পারেন সেখানকার জনগণের মধ্যে শ্রীনিবাসের জনপ্রিয়তা ঠিক কতখানি। ১৯২১ সালে ভি. এস. শ্রীনিবাস শাস্ত্রী ইম্পেরিয়াল কনফারেন্সে (Imperial Conference) যোগ দিয়েছিলেন। এই সময়ে তিনি ‘লীগ অফ নেশনস’ (League of Nations)-এর দ্বিতীয় সমাবেশে যোগ দেন। ব্রিটিশ প্রতিনিধি (British delegation) হিসেবে তিনি ওয়াশিংটন নাভাল কনফারেন্সেও (Washington Naval Conference) যোগ দিয়েছিলেন। ১৯২২ সালে ভারতীয় সরকার তাঁকে অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড এবং কানাডায় ভারতীয় প্রতিনিধি হিসেবে পাঠায়। ১৯৩৭ সালে তাঁকে মালয় দেশে পাঠানো হয় সেখানে কর্মরত ভারতীয় শ্রমিকদের অবস্থা সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করার জন্য। মালয় থেকে ঘুরে এসে ভি. এস. শ্রীনিবাস শাস্ত্রী একটি দীর্ঘ প্রতিবেদন পেশ করেন ‘কন্ডিশনস অফ ইন্ডিয়ান লেবার ইন মালয়’ নামে যা একইসঙ্গে মাদ্রাজে ও কুয়ালালামপুরে প্রকাশিত হয়। এর ফলে ভারতীয় জাতীয়তাবাদীদের দ্বারা সমালোচিত হন শ্রীনিবাস শাস্ত্রী। এই সব কর্মকাণ্ডের জন্য অনেক সময়ই তাঁকে অনেক সমালোচনার সম্মুখীন হতে হয়েছিল। একবার এক বক্তৃতা সভায় ভারতের রাজনৈতিক অবস্থা সম্পর্কে ভাষণ দেওয়ার সময় শ্রোতাদের মধ্যে অনেকেই তাঁকে ব্রিটিশদের দালাল বলে মনে করেন এবং উত্তেজিত জনতা তাঁর দিকে লক্ষ্য করে ইঁট ছুঁড়তে শুরু করে। তৎক্ষণাৎ তাঁকে অশ্বারোহী পুলিশদের সাহায্যে সেই স্থান থেকে অন্যত্র নিয়ে যাওয়া হয় সুরক্ষার জন্য। অস্ট্রেলিয়ায় তাঁর প্রচেষ্টাতেই ব্রিটিশ ভারতের উপনিবেশিত হিসেবে ভারতীয়দের ভোটাধিকার বৃদ্ধির জন্য অস্ট্রেলিয়ার সরকার কমনওয়েলথ ভোটাধিকার আইন (Commonwealth Electoral Act) পাস করেন। জওহরলাল নেহেরু মনে করতেন শ্রীনিবাস অত্যধিক মাত্রায় ব্রিটিশ দরদী ছিলেন এবং তাদের সাহায্য করতেন।

১৯৩০ সালে তাঁকে ‘দ্য রয়াল কমিশন অন লেবার ইন ইন্ডিয়া’র (The Royal Commission on Labour in India) সদস্য  হিসেবে নির্বাচিত করা হয়। এই সময়ই তিনি লন্ডনে ভারতের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করতে গোল টেবিল বৈঠকে যোগদান করেন। শ্রীনিবাস দেশভাগের সম্পূর্ণ বিরোধিতা করেছিলেন সেই সময় থেকেই।

১৯৪৬ সালের ১৭ এপ্রিল ভি.এস. শ্রীনিবাস শাস্ত্রীর মৃত্যু হয়।


এই ধরণের তথ্য লিখে আয় করতে চাইলে…

আপনার নিজের একটি তথ্যমূলক লেখা আপনার নাম ও যোগাযোগ নম্বরসহ আমাদের ইমেল করুন contact@sobbanglay.com


 

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

সববাংলায় তথ্যভিত্তিক ইউটিউব চ্যানেল - যা জানব সব বাংলায়