ধর্ম

বাজ পড়লে শাঁখ বাজানোর রীতি এল কিভাবে

আজকের সময়ে দাঁড়িয়ে আমরা যদি কোন এক বৃষ্টির দিনে জানলা থেকে বৃষ্টির ছাঁট মুখে মাখতে মাখতে ভাবি কেন মেঘ ডাকে আকাশে, কেন বিদ্যুৎ চমকায় তাহলে এক মুহূর্তে আমাদের মনে পড়বে ছোটবেলায় শেখা সেই উত্তরটা-মেঘে মেঘে ধাক্কা লেগে বিদ্যুৎ চমকায়, বাজ পড়ে, মেঘ ডাকে। কিন্তু আমরা যদি আজ থেকে দেড় লক্ষ বছর আগের পৃথিবীতে ফিরে যাই, যখন মানুষকে আজকের মত না এত সুন্দর দেখতে ছিল। না ছিল তার আজকের মানুষের মত বুদ্ধি। তখন কিন্তু তার মেঘ ডাকলেই মনে পড়ত না ওই আকাশের অনেক ওপরে এখন মেঘে মেঘে ভীষণ যুদ্ধ হচ্ছে আর তাই আমরা ওই ভীষণ যুদ্ধের শব্দ হিসেবে যা শুনতে পাচ্ছি সেটাই মেঘ ডাকা। আদিম মানুষের প্রতিটা দিন, প্রতিটা মুহূর্ত কাটত দুটো কাজে-১.খাবার সংগ্রহ করে ২. হিংস্র পশুর হাত থেকে নিজেকে রক্ষা করার চেষ্টা করে। তার দিন শুরু হত ভয় দিয়ে, দিন শেষ যখন হত, তাও ভয় দিয়ে। তার কিসে না ভয় ছিল? হিংস্র প্রাণী, বিষাক্ত পোকামাকড়, বিষাক্ত উদ্ভিদ, ঝড় বৃষ্টি, ভূমিকম্প, অগ্নুৎপাত, দাবানল। তবে এসবের মধ্যে আদিম মানুষ সবচেয়ে ভয় পেত বাজ পড়া আর মেঘ ডাকাকে। তারা মনেও করত এই বাজ পড়া হল ভগবানের বা ওই আকাশে যে মহা শক্তিশালী মানুষটির বাস, তার সবচেয়ে সাংঘাতিক, সবচেয়ে ভয়ঙ্কর অস্ত্র। ওই মহাশক্তিধর কোন কারণে মানুষের ওপর প্রচন্ড রেগে গেলে ওই অস্ত্র দিয়ে পৃথিবীকে আঘাত করে। দক্ষিণ পশ্চিম আমেরিকায় ‘নাভাজো’ হল এই ধরনের আদিবাসী মানুষ, যারা বিশ্বাস করে ‘ বজ্রপাখি’ নামে এক বিশেষ ধরনের বিশালাকার পাখি আছে. সে যখন আকাশে ওড়ে তার ডানার শব্দই হল- মেঘের ডাক, আর সূর্যের আলো তার চোখে ঠিকরে পড়লে বিদ্যুৎ চমকায়।

আদিম মানুষ ধীরে ধীরে সভ্য হল। সভ্য আদিম মানুষ বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ল। তৈরী হল সভ্যতা। তৈরী হল ধর্ম। আদিম থেকে সভ্য হওয়া মানুষ আগুনের ব্যবহার শিখে গেছে ততদিনে। শিখে গেছে লোহার ব্যবহার। কিন্তু মেঘ, বৃষ্টি, বজ্রপাতের মত প্রাকৃতিক শক্তিগুলো কিন্তু মানুষকে তখনও সমানে ভয় পাইয়েই চলেছে। সে আগে থাকতেই ভেবে রেখেছিল বজ্রপাত হল কোন ভীষণ শক্তিশালী দেবতার অস্ত্র। সভ্য মানুষ সেই দেবতার নামকরণ করল। এই নামকরণ বিভিন্ন ধর্মে বিভিন্ন রকম।

নর্স হল উত্তর জার্মানিক গোত্রের একটা জাতি। এই জাতিদের যে পুরাণ সেই পুরাণ অনুসারে ঝড়, বৃষ্টি, বজ্র বিদ্যুৎ এর দেবতা হল; -‘থর’। এই থর নামের দেবতাটির হাতে ‘জলনর’ নামের একটি বিশাল হাতুড়ি থাকে যা দিয়ে পাহাড় পর্যন্ত এক আঘাতে গুঁড়িয়ে ফেলা যায়।প্রাচীন নর্স জাতিদের কাছে এই দেবতা মানুষের রক্ষাকারী হিসেবে পূজিত হত। নর্সদের কাছে এই ‘থর’ দেবতাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ন ছিল। তারা এই দেবতাটির নাম দিয়ে রোমান ক্যালেন্ডারের একটি দিনে কে উৎসর্গ করল।এই দিনটিকে তারা বলত Thor’s Day। কালক্রমে এই দিনটির উচ্চারণ লোকমুখে পাল্টাতে পাল্টাতে যেখানে এসে দাঁড়ালো, আমরা সেই দিনটিকে এখন Thursday বা বৃহস্পতিবার নামে চিনি।

গ্রিক পুরাণে আবার ঝড় বৃষ্টির দেবতার নাম কিন্তু পাল্টে যায়. সেই দেবতার নাম- ‘জিউস’। গ্রিকরা মনে করত জিউস হল সমগ্র দেবতা ও মানবজাতির পিতা সেই হিসেবে দেবতাদের রাজা।

আবার রোমান পুরাণ অনুযায়ী এই দেবতার নামই পাল্টে হয়ে যায়- জুপিটার।

হিন্দু পুরাণে এই জুপিটার বা জিউসের নাম বদলে হয়ে যায়- ইন্দ্র। গ্রিক বা রোমান ধর্মের মত ইন্দ্রকেও দেবতাদের রাজা মনে করা হয়, যার প্রধান অস্ত্র হল- ‘বজ্র’ যা কিনা বিদ্যুৎ চমক হিসেবে আমাদের কাছে পরিচিত। ইন্দ্রকে হিন্দু পুরাণে ঝড়, বৃষ্টি, বজ্রপাতের দেবতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

ঠিক এই প্রসঙ্গেই আসে হিন্দু ঘরে প্রবল বাজ পড়ার সময় শাঁখ বাজানোর রীতি। যেহেতু ইন্দ্রকে হিন্দু পুরাণে ঝড় বৃষ্টির দেবতা বলা হয়েছে, সেই ইন্দ্র যখন প্রচন্ড ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন , তখন পৃথিবীতে বজ্রপাত হয় বলে হিন্দুরা বিশ্বাস করে।  সেই বিশ্বাস থেকেই ইন্দ্র কে শাঁখ বাজিয়ে সন্তুষ্ট করার প্রয়াস।

Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

To Top

 পোস্টটি ভালো লাগলে শেয়ার করে সকলকে পড়ার সুযোগ করে দিন।  

error: Content is protected !!