সববাংলায়

দিল্লি ষড়যন্ত্র মামলা ।। দিল্লি-লাহোর ষড়যন্ত্র মামলা

বিভাগঃ ,

ব্রিটিশ-শাসিত পরাধীন ভারতে উনিশ শতকের শেষদিক থেকেই শুরু হয়ে গিয়েছিল ব্রিটিশ-বিরোধী নানা আন্দোলনের জোয়ার। বিংশ শতাব্দীর শুরুতে এসে ইতিহাস থেকে জানা যায় বিভিন্ন গুপ্ত সমিতির কার্যকলাপ, সক্রিয় ও সশস্ত্র বিরোধিতায় একের পর এক ব্রিটিশ-নিধন যজ্ঞ শুরু হয়েছিল। কখনো বড়লাট, কখনো পুলিশ কমিশনার, কখনো বা জেলার সাহেব – আর প্রতিটি ব্যর্থ বা সফল প্রচেষ্টা ধরা পড়লে তাদের বিরুদ্ধে মামলা শুরু হয় কোর্টে। ভারতের ইতিহাসে এমন বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ মামলার মধ্যে দিল্লি ষড়যন্ত্র মামলা র(Delhi Conspiracy Case) তাৎপর্য অনেক। তৎকালীন বড়োলাট লর্ড হার্ডিঞ্জকে হত্যার চেষ্টা করেছিলেন যে সমস্ত বিপ্লবীরা তাঁদের বিরুদ্ধে এই মামলা দায়ের করা হয়েছিল।

দিল্লি-লাহোর ষড়যন্ত্র মামলা (Delhi Lahore Conspiracy Case) হিসেবেও পরিচিত এই মামলার চূড়ান্ত শুনানি শুরু হয়েছিল ১৯১৪ সালের ২৩ মে। তৎকালীন ভারতের ভাইসরয় লর্ড হার্ডিঞ্জকে হত্যার অপচেষ্টার বিরুদ্ধে বিপ্লবী বসন্তকুমার বিশ্বাস, লালা হনুমন্ত সহায়, ভাই বালমুকুন্দ, আমীর চাঁদ ও অবোধবিহারীকে অভিযুক্ত করে ব্রিটিশ সরকার দিল্লি ষড়যন্ত্র মামলা নামে তাঁদের বিরুদ্ধে এক রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলা শুরু করে।

বিংশ শতাব্দীর শুরুতে বাংলার বুকে অনুশীলন সমিতি এবং যুগান্তর দল দুটি বৃহৎ গুপ্ত সমিতি হিসেবে সক্রিয় হয়ে উঠেছিল। আলিপুর বোমা মামলায় এর আগে যুগান্তর দলের বহু বিপ্লবী অভিযুক্ত হয়েছিলেন। এবারে অনুশীলন সমিতির এক তরুণ বিপ্লবী বসন্তকুমার বিশ্বাস প্রাজ্ঞ বিপ্লবী রাসবিহারী বসুর কাছে সশস্ত্র বিপ্লবের দীক্ষা নিয়েছিলেন। রাসবিহারী বসুর উদ্দেশ্য ছিল ভারতের ভাইসরয় তথা তৎকালীন বড়োলাট লর্ড চার্লস হার্ডিঞ্জকে হত্যা করা। ১৯১১ সালে দিল্লির দরবারে বড়োলাট লর্ড হার্ডিঞ্জ ঘোষণা করেছিলেন যে পরের বছর অর্থাৎ ১৯১২ সালে দিল্লির বুকে তাঁর একটি শোভাযাত্রা আয়োজিত হবে। সেই কথামতো ভারতের সমস্ত বিত্তশালী-প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে নিয়ে ১৯১২ সালের ২৩ ডিসেম্বর দিল্লিতে শোভাযাত্রা আয়োজন করেন লর্ড হার্ডিঞ্জ। আসলে এই বছরই ভারতের রাজধানী কলকাতা থেকে দিল্লিতে স্থানান্তরিত হয়। শোভাযাত্রায় যে বড়োলাট স্বয়ং থাকবেন সেই সংবাদ আগেই জানতেন রাসবিহারী বসু এবং সেই স্থানেই বোমা নিক্ষেপ করে তাঁকে হত্যার পরিকল্পনা করেছিলেন তিনি। রাসবিহারী বসুর সঙ্গে এই পরিকল্পনায় সহায়তা করেছিলেন ভাই বালমুকুন্দ, আমীর চাঁদ এবং অবোধবিহারী। ১৯১০ সালে লাহোরে রাসবিহারী বসু যে বিপ্লবী সংগঠন স্থাপন করেছিলেন তার ভারপ্রাপ্ত ছিলেন ভাই বালমুকুন্দ আর আমীরচাঁদ ছিলেন কেমব্রিজ মিশন হাই স্কুলের শিক্ষক। এই পরিকল্পনায় কিশোর বিপ্লবী বসন্তকুমার বিশ্বাসের উপর ছিল বোমা নিক্ষেপ করার দায়িত্ব। এই কাজে দক্ষ করে তোলার জন্য রাসবিহারী বসু তাঁকে সঙ্গে করে দেরাদুনে নিয়ে গিয়েছিলেন বোমা তৈরি ও বোমা ছোঁড়ার কৌশল রপ্ত করাতে। দিল্লির কুইন্স গার্ডেন থেকে চাঁদনী চক হয়ে শোভাযাত্রা চলে যাবে দেওয়ান-ই-আমের দিকে এমনটাই নির্ধারিত ছিল। এই শোভাযাত্রার মধ্যমণি হয়ে লর্ড হার্ডিঞ্জ সস্ত্রীক একটি হাতির পিঠে হাওদায় চেপে মাহুত সহ এগিয়ে যাচ্ছিলেন। সেই সময় রাসবিহারী বসুর নির্দেশমাফিক বসন্তকুমার বিশ্বাস একটি ষোড়শী কিশোরীর ছদ্মবেশ ধারণ করেন, নাম নেন লীলাবতী। মহিলাদের দাঁড়ানোর জন্য আলাদা করে নির্দিষ্ট স্থানে পাঞ্জাব ন্যাশনাল ব্যাঙ্ক ভবনে কিশোরী লীলাবতীর বেশে বসন্তকুমার বিশ্বাস অপেক্ষা করছিলেন। এই ভবনের তিন তলায় অজস্র মহিলা ভিড় করে দাঁড়িয়ে শোভাযাত্রা দেখছিলেন, তাদেরই মাঝে লীলাবতী লুকিয়ে ছিলেন এবং লর্ড হার্ডিঞ্জের অপেক্ষা করছিলেন। আর তাঁকে সঠিক সময়ে নির্দেশ দেওয়ার জন্য ঠিক উল্টোদিকের একটি ভবনে উপস্থিত ছিলেন রাসবিহারী বসু। এর মাঝে আবার ভিড়ের মধ্যে থেকে কোনো এক মহিলা বসন্তকুমারকে নাম জিজ্ঞেস করায় তিনি হিন্দিতে তাঁর নাম লীলাবতী জানান। শোভাযাত্রা একেবারে পাঞ্জাব ন্যাশনাল ব্যাঙ্ক ভবনের কাছে চলে এলে রাসবিহারী বসুর নির্দেশ পাওয়া মাত্র ভিড়ের মধ্যে থেকে ১৪ বছরের কিশোর বসন্তকুমার বিশ্বাস বোমা নিক্ষেপ করেন হার্ডিঞ্জকে লক্ষ্য করে। প্রচণ্ড শব্দে সকলেই সচকিত হয়ে পড়েন, ভিড় ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। পুলিশ তৎক্ষণাৎ অনুসন্ধান চালাতে শুরু করে। এর মধ্যেই লীলাবতীর পোশাক বদলিয়ে বসন্তকুমারকে নিয়ে দেরাদুনে পালিয়ে যান ২৬ বছরের যুবক রাসবিহারী বসু। এই বোমা নিক্ষেপের ফলে লর্ড হার্ডিঞ্জ মারা যাননি, তাঁর এক পেয়াদার মৃত্যু হয়েছিল। বোমার ওজন ছিল এক পাউণ্ড এগারো আউন্স। সেই মুহূর্তে বসন্তকুমার বিশ্বাস ধরা না পড়লেও ১৯১৪ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি বাবার মৃত্যু হলে তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন করার সময় ১৯ বছর বয়সী বসন্তকুমার বিশ্বাস ধরা পড়েন নদীয়ার কৃষ্ণনগর থেকে। তবে এই মামলা শুধুই হার্ডিঞ্জ হত্যার পরিকল্পনার বিরুদ্ধে রুজু হয়নি। এই ঘটনার পরে লাহোরের লরেন্স গার্ডেনে ১৯১৩ সালের ১৭ মে তারিখে একটি সভা আয়োজিত হয়েছিল যেখানে বহু ইংরেজ অফিসার উপস্থিত ছিলেন। সেই সভাতেও বোমা নিক্ষেপ করেন ভাই বালমুকুন্দ এবং আমীর চাঁদ। পুলিশ একটি সূত্র ধরে দীননাথ নামের এক বিপ্লবীকে ধরে ফেলে এবং দীননাথ এই পরিকল্পনায় যুক্ত সকলের নামই ফাঁস করে দেয়। ফলে ১৯১৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে যোধপুর থেকে ভাই বালমুকুন্দ গ্রেপ্তার হন। কিন্তু কোনোভাবেই রাসবিহারী বসুকে ধরা সম্ভব হয়নি ব্রিটিশ পুলিশের। দিল্লি এবং লাহোর উভয় স্থানের বোমা নিক্ষেপের ঘটনার বিরুদ্ধে এই মামলা দায়ের করা হয়েছিল বলে একে দিল্লি-লাহোর ষড়যন্ত্র মামলা বলা হয়।

১৯১৪ সালের ২৩ মে এই মামলার শুনানি শুরু হয়। ঐ বছরই ৫ অক্টোবর দিল্লি ষড়যন্ত্র মামলা র রায় বেরোলে লালা হনুমন্ত সহায়কে আন্দামানে যাবজ্জীবন দ্বীপান্তর এবং বাকি চারজন অর্থাৎ ভাই বালমুকুন্দ, বসন্তকুমার বিশ্বাস, অবোধবিহারী এবং আমীরচাঁদকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়। দণ্ডাদেশপ্রাপ্ত অভিযুক্তদের আম্বালা জেলে বন্দি করে রাখা হয়েছিল। এখানেই একটি বিরাট কারচুপি করে ব্রিটিশ সরকার বসন্তকুমার বিশ্বাসের বয়স সংক্রান্ত তথ্যে। এসময় লাহোর হাইকোর্টে একটি আপিল দাখিল করে আম্বালা জেলে বসন্তকুমার বিশ্বাসের ফাইলে অদলবদল করা হয় তথ্যের। জেলের ফাইলে তাঁর বয়স দুই বছর বাড়িয়ে প্রমাণ করার চেষ্টা করেন ব্রিটিশ সরকার যে তাঁর কৃত অপরাধ সম্পূর্ণ সজ্ঞানে ঘটেছে, এই অপরাধ সম্পর্কে তিনি আগে থেকেই জানতেন। ফলে নাবালকত্বের যে ছাড়ের সু্যোগ ছিল তার পথ বন্ধ করে দেওয়া হল। মাত্র ২০ বছর বয়সে ১৯১৫ সালের ১১ মে তারিখে পাঞ্জাবের আম্বালা জেলে ফাঁসি হয় বসন্তকুমার বিশ্বাসের। ঐ একইদিনে ভাই বালমুকুন্দ ও অন্যান্যদেরও ফাঁসি হয়।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

তথ্যসূত্র


  1. Hanged for Their Patriotism’,K. Tandon, ‘ National Book Trust, India, 2ndEd., 2019, Pg – 88-91
  2. https://en.wikipedia.org/
  3. https://sobbanglay.com/
  4. https://www.bongodorshon.com/
  5. https://en.wikipedia.org/

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading