সববাংলায়

মূর্তি নদী ভ্রমণ 

পাহাড়, অরণ্য এবং পাহাড়ি নদীর সৌন্দর্য একত্রে উপভোগ করতে চাইলে উত্তরবঙ্গের কথাই প্রথমে মনে আসে। উত্তরবঙ্গে অনেক পাহাড়ি নদীরই দেখা মিলবে, কিন্তু নদীর সঙ্গে দূরবর্তী পর্বতমালা এবং আরণ্যক প্রকৃতির অপূর্ব দৃশ্যও চাক্ষুষ করতে চাইলে চলে যেতে হবে মূর্তি নদী । গরুমারা অভয়ারণ্যের খুব নিকটেই অবস্থিত বহমান এই নদীটির শোভা চোখে না দেখলে অনুভব করা যাবে না।  মূর্তি নদীর সবচেয়ে আকর্ষণীয় ব্যাপারই হল এখানকার নৈসর্গিক প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। এই মূর্তি নদীর তীরে স্বজনদের নিয়ে পিকনিকও উপভোগ করতে পারবেন পর্যটকেরা। মূর্তি নদীর আশেপাশে অবস্থিত গরুমারা, ঝালদা, বিন্দু ইত্যাদি অনেকগুলি দর্শনীয় স্থানেও ঘুরে আসা যাবে। এই পাহাড়ি আরণ্যক প্রকৃতির নির্জনতার মাঝখান দিয়ে বয়ে চলা জলতরঙ্গের ধ্বনি সত্যিই অদ্ভুত এক প্রশান্তি এনে দেয়। কিছুটা অবসর সময় কাটিয়ে আসবার জন্য এই স্থান খুবই উপযুক্ত।

মূর্তি নদী কোথায়

পশ্চিমবঙ্গের ডুয়ার্স অঞ্চলে মূর্তি নদী অবস্থিত। আরও বিশেষভাবে বললে জলপাইগুড়ি থেকে ৬০ কিলোমিটার দূরে হিমালয়ের পাদদেশে বিস্তীর্ণ বনানীর সন্নিকটে এই নদী বহমান। নদীটি নেওড়া ভ্যালি ন্যাশানাল পার্ক অঞ্চলের পাহাড় থেকে উদ্ভুত হয়ে ডুয়ার্সের প্রধান প্রধান পর্যটন অঞ্চলগুলির মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত হয়ে জলঢাকা নদীর সঙ্গে মিলিত হয়েছে। এই জলঢাকা নদীটির উৎস ভুটান। মূর্তি নদীর যাত্রা এখানে শেষ হয় এবং তা জলঢাকার একটি উপনদী হয়ে দাঁড়ায়। নদীটির পাড়ে গরুমারা জাতীয় উদ্যান (দক্ষিণ ও পশ্চিম) এবং চাপড়ামারী বণ্যপ্রাণী অভয়ারণ্য (উত্তর ও পূর্ব) অবস্থিত। নেওড়া ভ্যালি থেকে রামসাইয়ের কাছে জলঢাকা পর্যন্ত নদীটির এই যে বিস্তীর্ণ পথ, তার পরিমাপ করলে এর দৈর্ঘ্য দাঁড়ায় প্রায় ৮০ কিলোমিটার।

মূর্তি নদীর ইতিহাস

মূর্তি নদীর তীরে সেই একই নামের একটি গ্রামও রয়েছে। অধিকাংশ পর্যটকের কাছেই মূর্তি মানে উত্তর ধুপঝোরা এলাকার নদীর তীরকেই বোঝায়। বিশ শতকের শেষের দিকেও এই অঞ্চল ঘন জঙ্গলাকীর্ণ ছিল এবং সেখানে ছিল ভয়ঙ্কর ডাকাতদের বসবাস। রাতের অন্ধকারে সেই ঘন জঙ্গল পেরিয়ে যেতে কেউ সাহস করত না। মূর্তি ক্রসিং থেকে যে রাস্তাটি চাপড়ামারী জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে গিয়ে ন্যাশানাল হাইওয়েতে পৌঁছেছে সেটি এখনও ‘খুনিয়া’ ক্রসিং নামে পরিচিত।

মূর্তি নদীতে কীভাবে যাবেন

ট্রেনে যেতে হলে নিউ জলপাইগুড়িগামী ট্রেন ধরে নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশনে নেমে সেখান থেকে গাড়ি ভাড়া করে চলে যাওয়া যায়। আবার জলপাইগুড়ি থেকে ট্রেন ধরে চালসা স্টেশনে গিয়ে সেখান থেকে সরাসরি মূর্তি যাওয়ার জন্য গাড়ি পাওয়া যায়। চালসা থেকে মূর্তির দূরত্ব বেশি নয়। আবার ট্রেনে নিউ মাল জংশনে নেমে সেখান থেকেও মূর্তি নদী সহজেই পৌঁছে যাওয়া যাবে। আকাশপথে মূর্তি নদীতে যেতে হলে নিকটবর্তী বাগডোগরা বিমানবন্দরে নেমে সেখান থেকে গাড়ি নিয়ে যেতে হবে। সড়কপথে বাসে করে যেতে হলে শিলিগুড়ি পর্যন্ত গিয়ে সেখান থেকে গাড়ি ভাড়া করে মূর্তি যাওয়া যায়। প্রাইভেট গাড়িতে যেতে হলে প্রথমে ন্যাশানাল হাইওয়ে ৩৪ ধরে ডালখোলা এবং সেখান থেকে ন্যাশানাল হাইওয়ে ৩১ ধরে শিলিগুড়ি চলে যাওয়া যায় এবং সেখান থেকে চালসা হয়ে মূর্তি নদীর উদ্দেশ্যে রওনা দেওয়া চলে।

মূর্তি নদীতে কোথায় থাকবেন

মূর্তি যেহেতু পর্যটন স্থান হিসেবে বেশ জনপ্রিয় তাই এখানে থাকবার জন্য বেশ কয়েকটি হোটেল পাওয়া যাবে। সরকারী এবং বেসরকারী দুরকম রিসর্টই রয়েছে এখানে। ওয়েস্ট বেঙ্গল ফরেস্ট ডেভলপমেন্ট কর্পোরেশন দ্বারা পরিচালিত মূর্তি বনানী রিসর্ট এখানে থাকবার একটি অত্যন্ত চমৎকার ঠিকানা। এছাড়াও বিভিন্ন দামের বহু বেসরকারী রিসর্টও এখানে খুঁজে পাওয়া যাবে। যদি কোনো ট্যুর প্যাকেজের পরিষেবায় ঘুরতে আসেন তবে সেইসব প্যাকেজেই এখানকার বিভিন্ন আবাসন অন্তর্ভুক্ত থাকে, আলাদা করে আর রিসর্ট বুকিং-এর ঝামেলা থাকে না।

মূর্তি নদীতে কী দেখবেন

শান্ত ও নির্জন আরণ্যক প্রকৃতির শোভা, দূরবর্তী সারি সারি পাহাড়ের বিশালতার মাঝখানে বয়ে চলা এই স্বচ্ছ জলের মূর্তি নদীর সৌন্দর্য সত্যিই অভূতপূর্ব। মূর্তির বিস্তীর্ণ চরে ছড়িয়ে থাকা নুড়ি-পাথরের ওপর দিয়ে হাঁটার অনুভূতি অতুলনীয়। নদীর জলের ভিতরে ইতস্তত বিক্ষিপ্ত পাথর এবং সেগুলির গায়ে ধাক্কা খেয়ে বয়ে চলা জলতরঙ্গ ও তার ধ্বনি যেন এক মায়াজগত রচনা করে দেয়। যেহেতু গরুমারা অভয়ারণ্যের একেবারে সন্নিকটেই এই নদী প্রবহমান, তাই এখানে বিচিত্র পাখির সমাহার, তাদের কলতান স্থানটিকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলে। বিশেষত শীতের সময়ে এখানে অজস্র পরিযায়ী পাখি এসে ভীড় জমায় এখানে। পাখি পর্যবেক্ষকদের জন্য তখন এই স্থানটি এক অমূল্য খনি। মূর্তি নদীর তীরে দাঁড়িয়ে সূর্যোদয় এবং সূর্যাস্ত দেখাও এক অনন্য অভিজ্ঞতা। আকাশের লাল রঙ যখন প্রতিবিম্বিত হয়ে মূর্তির স্বচ্ছ জলে এসে পড়ে তখন মুগ্ধ হয়ে দেখতে হয় কেবল সেই দৃশ্য।
আত্মীয়-স্বজন, বন্ধুবান্ধবদের নিয়ে মূর্তির তীরে পিকনিকও জমিয়ে তোলা যায়, করা যায় ক্যাম্পিংও। শহুরে কোলাহল থেকে দূরে নির্জন প্রাকৃতির সৌন্দর্যের মাঝে দুদন্ড অবসর যাপনের জন্য এমন উপযুক্ত স্থান খুবই পাওয়া যায়।
মূর্তিতে ঘুরতে গেলে যে যে দ্রষ্টব্য জিনিসগুলি হাতের কাছেই পাওয়া যায় ঘুরে দেখার জন্য সেগুলি নিম্নে উল্লিখিত হল।

গরুমারা ন্যাশানাল পার্ক – নদীর খুব কাছেই রয়েছে বিখ্যাত গরুমারা ন্যাশানাল পার্ক। মূর্তি নদীর সেতু পার করে এই ন্যাশানাল পার্কে চলে যাওয়া যায়। ১৯৯২ সালে সরকারী মর্যাদা পাওয়া এই জাতীয় উদ্যানে বিবিধ প্রজাতির উদ্ভিদের যেমন দেখা মিলবে, তেমনি বিচিত্র পশু ও পাখির সমাহারও লক্ষ করা যাবে৷ প্রাথমিকভাবে গরুমারা ভারতীয় গন্ডারের জন্যই বেশি পরিচিত। এছাড়াও প্রায় ৫০ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী, ২২ প্রজাতির সরীসৃপ  রয়েছে এখানে। এর ভিতরে যেমন রাইনো অবজারভেশন পয়েন্ট রয়েছে তেমনি পশু-পাখি দেখার জন্য অনেকগুলি ওয়াচ টাওয়ারও রয়েছে। চুকচুকি বার্ড ওয়াচিং পয়েন্টটি পাখি দেখার জন্য খুবই উপযুক্ত। উল্লেখ্য যে, গরুমারা অরণ্যের মধ্যে গাড়ি করে জঙ্গল সাফারির ব্যবস্থা যেমন রয়েছে, তেমনি হাতির পিঠে চড়েও জঙ্গল ঘোরার অনবদ্য অভিজ্ঞতা লাভের সুযোগ রয়েছে।

রকি আইল্যান্ড – মূর্তি নদীর তীরে অবস্থিত রকি আইল্যান্ড আরেকটি মনোমুগ্ধকর গন্তব্য হতে পারে। সামসিং থেকে প্রায় সাড়ে তিন কিলোমিটার দূরে এই আইল্যান্ডটি রয়েছে। ঘন জঙ্গলের পাশে অবস্থিত এই রকি আইল্যান্ড এবং এর পাশ দিয়ে বয়ে চলা মূর্তি নদীর সৌন্দর্য ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। এই আইল্যান্ডটি আবার পিকনিকের জন্যেও খুবই আদর্শ। নদীতে মাছ ধরাও যাবে এখানে। সেই রকি আইল্যান্ড থেকে আবার সুন্তালেখোলা এবং সেখান থেকে আরও ৬ কিলোমিটার দূরে মৌচুকি গ্রাম থেকেও ঘুরে আসা যায়।

সামসিং – মূর্তি নদীর পাড়ে অবস্থিত সামসিং একটি প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর সুদৃশ্য পাহাড়ি গ্রাম। মূর্তি নদীর একদম গা ঘেঁষেই বিশাল জায়গা জুড়ে রয়েছে সামসিং চা বাগানও। এই জায়গা থেকে ভুটানের তুষারাবৃত পাহাড়ের দৃশ্যও চোখে পড়ে। এমন অসাধারণ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য প্রত্যক্ষ করতেই অসংখ্য পর্যটক এখানে এসে ভীড় জমান।

মূর্তি নদীর তীরবর্তী উল্লিখিত আকর্ষণীয় জায়গাগুলি ছাড়াও এখান থেকে, বিন্দু, ঝালং, নেওড়া ভ্যালি ন্যাশানাল পার্ক ইত্যাদি সব দারুণ সুন্দর স্থানে ঘুরে আসা যায়।

মূর্তি নদীতে কখন যাবেন

মূলত অক্টোবরের মাঝামাঝি সময় থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত সময়কাল মূর্তি ভ্রমণের পক্ষে উপযুক্ত। শীতকালীন মনোরম আবহাওয়ায় এই পাহাড়ি নদীর পাড়ে সময় কাটানোর অভিজ্ঞতা তো দারুণ হবেই, তা ছাড়া শীতে এখানে প্রচুর পরিযায়ী পাখি এসে ভিড় করে, তা হবে একপ্রকার উপরিপাওনা। পাখি পর্যবেক্ষণ করতে যাঁরা ভালোবাসেন তাঁদের জন্য তো সেই সময়টি সত্যিই উপযুক্ত। তবে বর্ষাকালটি এড়িয়ে চলাই ভালো, তার একটি অন্যতম কারণ হল, যেহেতু এই সময়টি পশুদের প্রজননের কাল, তাই ডুয়ার্সের বন এসময় বন্ধ থাকে। আর তাছাড়াও বর্ষাকালে মূর্তি নদীর তীব্র স্রোতে স্নান করাও বিপজ্জনক হতে পারে। বর্ষাকালটি বাদ দিয়ে অবশ্য বছরের যে-কোনো সময়তেই মূর্তি নদীতে ভ্রমণের উদ্দেশ্যে যাওয়া যায়।

সতর্কতা ও পরামর্শ

• বর্ষাকালে এখানে না আসাই ভালো, পশুদের প্রজননের সময় বলে ডুয়ার্সের জঙ্গলগুলি বন্ধ থাকে।

• মূর্তির কাছে সরকারি আবাসনে থাকতে হলে আগে থেকেই বুকিং করে আসা ভালো।

• মূর্তি নদীর তীরে পিকনিক করবার পর আবর্জনা একটি নির্দিষ্ট স্থানে ফেলুন, যত্রতত্র ফেলে এখানকার প্রাকৃতিক  পরিচ্ছন্ন সৌন্দর্যের হানি ঘটাবেন না।


সর্বশেষ সম্পাদনার সময়কাল – ২০২৪


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

তথ্যসূত্র


  1. নিজস্ব প্রতিনিধি

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading