ইতিহাস

বিল গেটস

মাইক্রোসফ্‌ট’-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা এবং আমেরিকার একজন অন্যতম শ্রেষ্ঠ উদ্যোগপতি বিল গেটস (Bill Gates)। কম্পিউটারের সফট্‌ওয়্যারের জগতে তিনি এক বিপ্লব সৃষ্টি করেছেন। ১৯৭০ থেকে ১৯৮০ সাল পর্যন্ত মাইক্রোকম্পিউটার বিপ্লবের পিছনে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। অসমবয়সী বন্ধু পল অ্যালেনের সঙ্গে মাইক্রোসফট কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেন তিনি এবং পরবর্তীকালে সেই সংস্থার সিইও পদে আসীন হন বিল গেটস। এই মাইক্রোসফট কোম্পানির ‘উইণ্ডোজ’ আমরা আজও ব্যবহার করি। উইন্ডোজের বিবর্তন হয়েছে সময়ে সময়ে এবং এই প্রযুক্তি ক্রমে উন্নততর হয়েছে। ১৯৮৭ সালে ‘ফোর্বস পত্রিকা’ বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ধনী ব্যক্তিদের তালিকায় বিল গেটসের নাম অন্তর্ভুক্ত করে। ২০১৪ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘বিল অ্যাণ্ড মেলিন্দা গেটস ফাউণ্ডেশন’ যে সংস্থা বিভিন্ন জনসেবামূলক কাজ এবং প্রযুক্তিগত গবেষণার কাজে অর্থ সাহায্য করে থাকে। কানাডিয়ান জাতীয় রেলওয়ে, অটোনেশন ইত্যাদি বড়ো বড়ো সংস্থায় বহু অর্থ বিনিয়োগ করেছেন বিল গেটস। ২০২১ সালে তাঁর সঞ্চিত সম্পদের পরিমাণ ১২৯.৭ বিলিয়ন ডলার অর্থাৎ ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় দশ লক্ষ কোটি টাকা।

১৯৫৫ সালের ২৮ অক্টোবর ওয়াশিংটনের সিয়াটেলে একটি উচ্চ-মধ্যবিত্ত পরিবারে বিল গেটসের জন্ম হয়। তাঁর আসল নাম উইলিয়াম হেনরি গেটস তৃতীয়। তাঁর বাবা উইলিয়াম এইচ গেটস সিনিয়ার একজন দক্ষ আইনের ছাত্র ছিলেন এবং তাঁর মা ম্যারি ম্যাক্সওয়েল গেটস ছিলেন ‘ফার্স্ট ইন্টারস্টেট ব্যাঙ্কসিস্টেম’ এবং ‘ইউনাইটেড ওয়ে অফ আমেরিকা’র ডিরেক্টরদের মধ্যে অন্যতম। বিল গেটসের দাদু জে. ডব্লিউ. ম্যাক্সওয়েল ছিলেন জাতীয় ব্যাঙ্কের সভাপতি। তাঁর দিদির নাম ক্রিস্টিয়েন এবং বোনের নাম লিবি। সিয়াটেলের যে বাড়িটিতে তাঁরা থাকতেন, বিল গেটসের মাত্র সাত বছর বয়সে সেই বাড়িটি একটি টর্নেডোয় ভেঙে পড়ে। তাঁর বাবা-মা দুজনেই চাইতেন বিল গেটস আইনজীবি হবেন। ছোটোবেলায় বয়স অনুপাতে আকারে ছোটো হওয়ায় বহু বিদ্রুপের শিকার হয়েছেন তিনি। অন্যদিকে বাল্যকাল থেকেই পরিবারের মধ্যে একটি প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশে বড়ো হয়েছেন বিল গেটস। তাঁর বাবা-মা তাঁকে শিখিয়েছিলেন প্রতিযোগিতায় জিতলে পরে তবেই পুরস্কার মেলে আর হারলে পরে শাস্তি হয়। এই প্রতিযোগিতাপূর্ণ মানসিকতাই তাঁকে ভবিষ্যতে অনেকদূর এগিয়ে নিয়ে যাবে ব্যবসায়িক উন্নতির শিখরে। গ্রীষ্মকালে পরিবারের সঙ্গে নানাবিধ অ্যাথলেটিক্স জাতীয় খেলাধূলায় অংশ নিতেন গেটস এবং বোর্ড গেমস খেলতেও ভালোবাসতেন তিনি।

১৩ বছর বয়সে সিয়াটেলে লেকসাইড প্রেপ স্কুলে ভর্তি হন বিল গেটস। ছোটোবেলা থেকেই গেটস খুবই বইপত্র পড়তে ভালোবাসতেন। বহু অবসর সময় তিনি বই পড়েই কাটিয়ে দিতেন, এমনকি তাঁর পড়ার বইয়ের মধ্যে আশ্চর্যজনকভাবে ছিল এনসাইক্লোপিডিয়াও। এগারো-বারো বছর বয়সেই তাঁর বাবা-মা লক্ষ্য করেন যে পড়াশোনায় উৎসাহ থাকলেও গেটসের মধ্যে মাঝেমধ্যেই একাকিত্বের লক্ষণ দেখা যায়। সেহেতু স্কুলে ভর্তি করার পরে বিজ্ঞান এবং অঙ্কে তুখোড় হয়ে ওঠেন গেটস। তার পাশাপাশি ইংরাজি এবং নাটকের ক্ষেত্রেও তাঁর সমান দক্ষতা ছিল। লেকসাইড স্কুলে পড়ার সময়েই সিয়াটেল কম্পিউটার কোম্পানি এই স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীদের কম্পিউটার প্রশিক্ষণের প্রস্তাব দিলে, স্কুলের পক্ষ থেকে একটা টেলিটাইপ টার্মিনাল কেনা হয় ছাত্র-ছাত্রীদের ব্যবহারের জন্য। এরপর থেকেই গেটস বুঝতে পারেন কম্পিউটার ঠিক কী কী করতে পারে এবং স্কুলের বেশিরভাগ সময়টাই তিনি সেই টার্মিনালে কাজ করতে থাকেন। ঐ বয়সেই ‘টিক-ট্যাক-টো’ নামে বেসিক কম্পিউটারের উপযোগী একটি প্রোগ্রাম তৈরি করেন যা কম্পিউটারের সঙ্গে খেলতে সাহায্য করতো। লেকসাইড স্কুল থেকেই ১৯৭৩ সালে স্নাতক উত্তীর্ণ হন বিল গেটস। কলেজের স্যাট টেস্টে ১৬০০ নম্বরের মধ্যে তিনি ১৫৯০ নম্বর পেয়েছিলেন। এরপর হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলে আইন নিয়েই পরবর্তী কেরিয়ার তৈরি করবেন বলে ঠিক করেন তিনি। কিন্তু সেই বিষয়ে তাঁর দক্ষতা না থাকায় শুধুমাত্র পরিবারের কথায় পড়াশোনা করতে চাননি তিনি। এর মধ্যেই পল অ্যালেনের সঙ্গে গেটস মাইক্রোসফট কোম্পানি খুলে ফেলেন। ফলে ব্যবসায়িক দায়িত্বের কারণে নিয়মানুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠগ্রহণে অক্ষম হওয়ায় ১৯৭৫ সালে গেটস বিশ্ববিদ্যালয় ত্যাগ করেন।


প্রাকৃতিক খাঁটি মধু ঘরে বসেই পেতে চান?

ফুড হাউস মধু

তাহলে যোগাযোগ করুন – +91-99030 06475


 


লেকসাইড স্কুলে দুই বছরের অগ্রজ পল অ্যালেনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব হওয়ার পরে তারা দুজনেই দিনের বেশিরভাগ সময় কম্পিউটারে প্রোগ্রামিং-এর কাজে ব্যস্ত থাকতেন। কম্পিউটার ল্যাবে কাজ করতে করতেই গেটস এই সময়েই একটি পে-রোল প্রোগ্রাম এবং একটি স্কুলের উপযোগী সময় নির্ঘন্টের প্রোগ্রাম তৈরি করতে সক্ষম হন। ১৯৭০ সালে মাত্র ১৫ বছর বয়সে সিয়াটেলের ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের উপযোগী একটি প্রোগ্রাম তৈরি করেন গেটস ‘ট্র্যাফ-ও-ডেটা’ নামে। এরপরে ‘পপুলার ইলেক্ট্রনিক্স’ ম্যাগাজিনে আলটেয়ার ৮৮০০ মিনি কম্পিউটারের ব্যাপারে জানতে পেরে তাঁরা উভয়েই কোম্পানির সঙ্গে যোগাযোগ করে জানান যে তাঁরা এই মিনি কম্পিউটারের জন্য সফটওয়্যার বানাতে সক্ষম। পরে কোম্পানির ডাকে মেক্সিকোয় গিয়ে এই সফটওয়্যারের সফল প্রদর্শন করলে পল অ্যালেনকে কোম্পানিতে কাজ করার জন্য আহ্বান জানানো হয়। এরপরেই ১৯৭৫ সালে পল অ্যালেন এবং বিল গেটস উভয়ে একত্রে তৈরি করেন মাইক্রোসফট কোম্পানি। এই কোম্পানিরই প্রথম উদ্ভাবন হল আলটেয়ার কোম্পানির জন্য নির্মিত বেসিক সফটওয়্যার। কিন্তু পরে এই সফটওয়্যারের যথেচ্ছভাবে নকল হওয়ায় বাজারে চাহিদা কমে যায় এবং ‘এমআইটিএস’ (MITS) কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা এড রবার্টস পরে এই কোম্পানি অন্য একজনকে বিক্রি করে দেন। ১৯৭৯ সালে মাইক্রোসফট কোম্পানির সিইও হন গেটস। সেই সময় এই কোম্পানির মূল্য ছিল মাত্র আড়াই মিলিয়ন ডলার। মাইক্রোসফট ধীরে ধীরে বড়ো হতে লাগলো। গেটস ১৯৮০ সালে আইবিএম (IBM) সংস্থার সিইও-র সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ পান। এই সময় আইবিএম তাদের পার্সোনাল কম্পিউটারের জন্য উপযুক্ত সফটওয়্যার খুঁজছিল আর মাইক্রোসফটের পক্ষ থেকে গেটস উপযুক্ত দক্ষতা ও ব্যবসায়িক বুদ্ধিতে তাদের এই চাহিদা পূরণ করেছিলেন। আইবিএম-এর কম্পিউটারের জন্য নতুন ধরনের সফটওয়্যার তৈরি করেন তিনি। আইবিএম-এর হাত ধরে বিল গেটসের মাইক্রোসফট কোম্পানির প্রসার হতে শুরু করে এবং খুব সামান্য সময়ের মধ্যেই তাদের কোম্পানির মূল্য আড়াই মিলিয়ন ডলার থেকে ১৬ মিলিয়ন ডলারে পরিণত হয়। ১৯৮১ সালের মাঝামাঝি বিল গেটস মাইক্রোসফট কোম্পানির প্রেসিডেন্ট এবং চেয়ারম্যান পদে আসীন হন। ১৯৮৩ সালে গ্রেট ব্রিটেন এবং জাপানে মাইক্রোসফট কোম্পানির শাখা প্রতিষ্ঠিত হয়।

১৯৮১ সালে ‘অ্যাপ্‌ল’ সংস্থার পক্ষ থেকে স্টিভ জোবস মাইক্রোসফটকে অনুরোধ জানায় তাদের ম্যাকিনটোশ কম্পিউটারের জন্য সফটওয়্যার তৈরি করতে। সেই অনুরোধে মাইক্রোসফটের অনেক কর্মী ম্যাকিনটোশের উন্নয়নের জন্য উন্নতমানের সফটওয়্যার নির্মাণ করেন। প্রথমে এম-এস ডস সফটওয়্যারই নির্মাণ করেছিলেন তিনি, পরে তার উন্নতিসাধন করে গ্রাফিক ইন্টারফেস যুক্ত ‘উইণ্ডোজ’ নামে নতুন একটি সফটওয়্যার নির্মাণ করে মাইক্রোসফট। সে সময় অ্যাপ্‌ল সংস্থার সঙ্গে সফটওয়্যার নকল করা নিয়ে মামলাও হয়েছিল মাইক্রোসফটের কারণ অ্যাপ্‌লের ম্যাকিনটোশ কম্পিউটারের সফটওয়্যারের সঙ্গে উইণ্ডোজের অনেক মিল ছিল। অপারেটিং সিস্টেম হিসেবে উইণ্ডোজ খুবই জনপ্রিয় হয়েছিল কারণ বাজারচলতি সফটওয়্যারগুলির তুলনায় এটি ব্যবহারকারীদের কাছে অত্যন্ত সুবিধেজনক ছিল, কোড বা কমাণ্ডের উপর নির্ভরশীলতা কমে এসেছিল। এই উইণ্ডোজের বহু উন্নততর রূপ বাজারে নিয়ে আসতে থাকেন বিল গেটস। উইন্ডোজ এনটি, উইণ্ডোজ এক্সপি, উইণ্ডোজ ভিস্তা, এরপর উইণ্ডোজ ৯৫ থেকে শুরু করে এখন উইণ্ডোজ ২০১০ অবধি আবিষ্কৃত হয়েছে।

২০০০ সালে বিল গেটস এবং তাঁর স্ত্রী মেলিন্দা গেটস দুজনে মিলে একটি সেবামূলক সংস্থা গড়ে তোকেন যার নাম ‘বিল অ্যাণ্ড মেলিন্দা গেটস ফাউণ্ডেশন’ যা আমেরিকার মানুষদের স্বাস্থ্য-পরিষেবা উন্নয়ন, দারিদ্র্য দূরীকরণের কাজ করতো এবং মানুষকে উন্নত প্রযুক্তি শেখাতে সাহায্য করতো। ১৯৭০ থেকে ১৯৮০ সাল পর্যন্ত মাইক্রোকম্পিউটার বিপ্লবের পিছনে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। ১৯৮৭ সালে ‘ফোর্বস পত্রিকা’ বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ধনী ব্যক্তিদের তালিকায় বিল গেটসের নাম অন্তর্ভুক্ত করে। ২০১৪ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘বিল অ্যাণ্ড মেলিন্দা গেটস ফাউণ্ডেশন’ যে সংস্থা বিভিন্ন জনসেবামূলক কাজ এবং প্রযুক্তিগত গবেষণার কাজে অর্থ সাহায্য করে থাকে। কানাডিয়ান জাতীয় রেলওয়ে, অটোনেশন ইত্যাদি বড়ো বড়ো সংস্থায় বহু অর্থ বিনিয়োগ করেছেন বিল গেটস। ২০২১ সালে তাঁর সঞ্চিত সম্পদের পরিমাণ ১২৯.৭ বিলিয়ন ডলার অর্থাৎ ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় দশ লক্ষ কোটি টাকা।

২০০৮ সালে মাইক্রোসফট থেকে অবসর নেন বিল গেটস এবং বর্তমানে স্ত্রী মেলিন্দা ও তিন সন্তানকে নিয়ে সেবামূলক কাজের মধ্য দিয়ে জীবন অতিবাহিত করছেন তিনি।

  • এই ধরণের তথ্য লিখে আয় করতে চাইলে…

    আপনার নিজের একটি তথ্যমূলক লেখা আপনার নাম ও যোগাযোগ নম্বরসহ আমাদের ইমেল করুন contact@sobbanglay.com

  • সববাংলায় সাইটে বিজ্ঞাপন দেওয়ার জন্য আজই যোগাযোগ করুন
    contact@sobbanglay.com

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

-
এই পোস্টটি ভাল লেগে থাকলে আমাদের
ফেসবুক পেজ লাইক করে সঙ্গে থাকুন

আধুনিক ভ্রূণ বিদ্যার জনক পঞ্চানন মাহেশ্বরীকে নিয়ে জানুন



ছবিতে ক্লিক করে দেখুন ভিডিও