ইতিহাস

স্টিভ জোবস

বিশ্ববিখ্যাত প্রযুক্তি সংস্থা ‘অ্যাপ্‌ল’-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা স্টিভ জোবস (Steve Jobs)। তাঁর পরিকল্পনাতেই একের পর এক উন্নত প্রযুক্তি সম্বলিত স্মার্টফোন, ল্যাপটপ ইত্যাদি ব্যবহারযোগ্য স্তরে বাজারে এসেছে। আইফোন, আইপ্যাড কিংবা ম্যাকবুক এ সবই স্টিভ জোবসের চিন্তার ফসল। একাধারে প্রভাবশালী আমেরিকান ব্যবসায়ী, উদ্যোগপতি এবং শিল্প-বিন্যাসকারক হিসেবে পরিচিত স্টিভ জোবস ১৯৭০ থেকে ১৯৮০-এর দশকে পার্সোনাল কম্পিউটারের জগতে এক বিপ্লব ঘটিয়েছিলেন। ১৯৯৭ সালে ‘অ্যাপ্‌ল’ সংস্থার সিইও পদে উন্নীত হন স্টিভ জোবস। তাঁর উদ্যোগে ও উৎসাহেই প্রতিষ্ঠিত ‘পিক্সার’ সংস্থা থেকে ১৯৯৫ সালে ‘দ্য টয় স্টোরি’ নামে একটি পূর্ণদৈর্ঘ্যের ত্রিমাত্রিক অ্যানিমেশন ছবি নির্মিত হয় এবং এরপর থেকে ‘অ্যাপ্‌ল’-এর পাশাপাশি এই সংস্থা থেকে উন্নত প্রযুক্তির অ্যানিমেশন ছবি তৈরির কাজেও জোবস সাহায্য করেছিলেন। বিখ্যাত চলচ্চিত্র প্রযোজনা ও নির্মাণ সংস্থা ‘ডিজনি’-র সবথেকে বড়ো অংশীদার ছিল এই ‘পিক্সার’। বিশ্বের প্রযুক্তিগত সাফল্যের চেহারাটাই বদলে দিয়েছেন স্টিভ জোবস।

১৯৫৫ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি ক্যালিফোর্নিয়ার সানফ্রান্সিসকোতে স্টিভ জোবসের জন্ম হয়। তাঁর পুরো নাম ছিল স্টিভ পল জোবস। তাঁর বাবার নাম আবদুল ফাতাহ্‌ জন্দালি এবং মায়ের নাম জোয়ান স্কিব্‌ল। সিরিয়া নিবাসী আবদুল ফাতাহ কিংবা সুইস জার্মান মহিলা জোয়ান স্কিব্‌ল তাঁর জন্মদাতা বাবা-মা হলেও পরবর্তীকালে স্টিভ জোবস বড় হয়েছে পল জোবস এবং ক্লারা জোবসের কাছে। জোয়ান স্কিবলের বাবা-মা কোনোভাবেই একজন মুসলিম ছেলের সঙ্গে তাঁদের মেয়ের সম্পর্ক মেনে নিতে চাননি আর তাই বাবা-মায়ের অমতে গোপনে বিবাহ করেছিলেন আবদুল ফাতাহ্‌ এবং জোয়ান স্কিব্‌ল। তাঁদের সন্তান হওয়ার পরে পালক পিতা-মাতা হিসেবে স্টিভের দায়িত্ব তাঁরা তুলে দিয়েছিলেন পল ও ক্লারার হাতে। পালক পিতা পল জোবস একজন কোস্ট গার্ড মেকানিক ছিলেন। স্টিভ জোবসের প্রকৃত বোনের নাম মোনা সিম্পসন। স্টিভ জোবসকে পল এবং ক্লারা যখন দত্তক নেন, তখন তাঁর নামকরণই হয়নি। ক্যালিফোর্নিয়ার সানফ্রান্সিসকোতে জন্ম হলেও ক্যালিফোর্নিয়ার মাউন্টেন ভিউতে বড়ো হয়ে ওঠেন স্টিভ জোবস যে স্থানটা পরবর্তীকালে সিলিকন ভ্যালি নামে পরিচিত হয়। বাল্যকাল থেকেই বাবার সঙ্গে পারিবারিক গ্যারাজে একজন মেকানিকের কাজ শিখতেন। পল জোবসই তাঁকে শিখিয়েছিলেন কীভাবে ইলেকট্রনিক্স যন্ত্রাংশ সারাই করতে হয়, যন্ত্রাংশ খোলা-পড়ার কাজও শিখিয়েছিলেন তিনি। ক্রমে ক্রমে এই কাজই তাঁর অভ্যাস এবং গভীর আগ্রহে পরিণত হয়।

প্রথাগত পড়াশোনায় কখনোই স্টিভ জোবসের বিশেষ আগ্রহ ছিল না। প্রায়ই প্রাথমিক স্কুলে তিনি নানা সময়ে কর্তৃপক্ষ, শিক্ষক সকলের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করতেন এবং সেই কারণে তাকে বহুবার স্কুল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। স্কুলে যেতে একেবারেই তাঁর ভালো লাগতো না। স্টিভের চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষিকাই একপ্রকার জোর করে তাঁকে কিছুটা পড়াশোনা শেখাতে সমর্থ হন। পঞ্চম শ্রেণিতে না পড়েই জোবসকে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি করা হয় ক্যালিফোর্নিয়ার ক্রিটেন্ডেন মিড্‌ল স্কুলে। এই স্কুলে উচ্চ-প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা শেষ করে হোমস্টেড হাই স্কুলে তিনি ভর্তি হন ১৯৬৮ সালে। সিলিকন ভ্যালির এই স্কুলেই জোবসের সঙ্গে পরিচয় হয় বিল ফার্নান্দেজ এবং স্টিভ ওজেনিয়াকের। এই স্কুলে পড়াকালীনই ইঞ্জিনিয়ারিং এবং সাহিত্য উভয়ের প্রতিই গভীরভাবে আগ্রহ অনুভব করেন তিনি। তারপর ১৯৭২ সালে উত্তর আমেরিকার পোর্টল্যাণ্ডের রিড কলেজে ভর্তি হন জোবস। সেখানেও মানিয়ে নিতে পারেননি জোবস। ছয় মাস পরেই তাঁকে কলেজ থেকে বহিষ্কার করা হয় এবং তিনি বাকি আঠারো মাস ব্যাপী স্কুলে ক্যালিগ্রাফি, টাইপোগ্রাফি ইত্যাদি গভীর আগ্রহের সঙ্গে শিখতে থাকেন।

স্কুলে এবং কলেজে বহুবার ড্রপ-আউট হয়েও কীভাবে তিনি এত প্রযুক্তিগত উন্নতি আনতে সক্ষম হলেন তা সত্যই এক বিস্ময়। পরবর্তীকালে স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সাক্ষাৎকারে জোবস জানিয়েছিলেন যে সে সময় বাবা-মায়ের থেকে কোনো পয়সা-কড়ি নিতেন না জোবস এবং বন্ধুর মেসের মেঝেতে রাত কাটিয়ে, কোকের বোতল ফেরত দিয়ে পাওয়া পয়সায় টিফিন খেয়ে এবং সর্বোপরি নিকটবর্তী রাধা-কৃষ্ণের মন্দিরে কাঙাল-ভোজনের পাতে বসে দুপুরের খাবার খেয়ে বেঁচে থেকেছেন তিনি। আর এই সবের পাশাপাশি ক্যালিগ্রাফি শিক্ষাই তাঁকে ম্যাকবুকের অনবদ্য সব টাইপফেস নির্মাণের ভিত্তি প্রস্তুত করতে সাহায্য করেছিল।

১৯৭৪ সালে আতারি সংস্থার সঙ্গে একজন ভিডিও গেম বিন্যাসকারক হিসেবে কাজ শুরু করেন জোবস। ১৯৭৪ সালের মাঝামাঝি তিনি ভারতে চলে আসেন কাঞ্চীর নিম কারোলি বাবার কাছে আধ্যাত্মিক মুক্তির সন্ধানে, সঙ্গী ছিলেন তাঁর রিড কলেজের বন্ধু ড্যানিয়েল কোটকে। সাত মাস পরে ভারত ছেড়ে পুনরায় আমেরিকায় ফিরে আসেন জোবস। এই সময় থেকেই জোবস এবং তাঁর প্রেমিকা ব্রেনান উভয়েই জেন বৌদ্ধধর্মে দীক্ষিত হন এবং সেই ধর্মের বিধিনিয়ম মানতে শুরু করেন। ১৯৭৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে জোবস আবার আতারি সংস্থায় যোগ দেন এবং একটি আর্কেড ভিডিও গেম ‘ব্রেক আউট’-এর জন্য সার্কিট বোর্ড তৈরির কাজ পান। এই কাজে বিশেষ দক্ষতা না থাকায় তিনি এ ব্যাপারে সাহায্য করার জন্য ডেকে নেন তাঁর বন্ধু স্টিভ ওজেনিয়াককে এবং সেই জন্য বেতনও ভাগাভাগির কথা হয় উভয়ের মধ্যে। ১৯৭৬ সালের মার্চ মাস নাগাদ ওজেনিয়াক ‘অ্যাপ্‌ল ১’ কম্পিউটারের একটা প্রাথমিক নক্‌শা তৈরি করে ফেকন এবং জোবস ও প্রশাসনিক পর্যবেক্ষক রোনাল্ড ওয়েনের সহায়তায় ‘অ্যাপ্‌ল কম্পিউটার কোম্পানি’ নামে একটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান খোলেন। জোবসের বয়স তখন মাত্র ২১ বছর। এই সংস্থার প্রাথমিক পুঁজি অর্জনের জন্য জোবস তাঁর প্রিয় ভোল্কসাগান বাস এবং ওজেনিয়াক তাঁর বৈজ্ঞানিক ক্যালকুলেটর যন্ত্রটি বিক্রি করে দেন। ক্ষুদ্রতর চিপ, ক্ষুদ্রতর আয়োজনের যন্ত্রাংশ নির্মাণ করার মধ্য দিয়ে জোবস এবং তাঁর ‘অ্যাপ্‌ল’ সংস্থা প্রযুক্তির জগতে আলোড়ন সৃষ্টি করেন। ওজেনিয়াকের বানানো বেশ কিছু ব্যবহারযোগ্য পার্সোনাল কম্পিউটার জোবসের সাহায্যে প্রতিটি ৬৬৬ ডলার মূল্যে বিক্রি করতে সক্ষম হয় এই সংস্থা এবং তিন বছর পরে ‘অ্যাপ্‌ল ২’ বাজারে আসার পরে তাঁদের বিক্রি সাতশো শতাংশ বেড়ে গিয়েছিল। ১৯৮৪ সালে এই সংস্থা থেকে ‘ম্যাকিনটোশ’ নামে একটি নতুন প্রজন্মের কম্পিউটার বাজারে এলেও আইবিএম কোম্পানির সঙ্গে তাদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা শুরু হয় এবং তাতে ‘অ্যাপ্‌ল’-এর অগ্রগতি খুব একটা সহজতর হয় না। ফলে সকলেই মনে করতে থাকে সংস্থার পক্ষে জোবসের কাজকর্ম খুব একটা সুবিধের নয় এবং এই কারণেই ‘অ্যাপ্‌ল’-এ ক্রমেই তিনি একঘরে হতে থাকেন। ১৯৮৫ সালে ‘অ্যাপ্‌ল’ ছেড়ে বেরিয়ে আসেন স্টিভ জোবস।

এরপরে তিনি ঐ বছরই ‘নেক্সট’ নামের একটি নতুন হার্ডওয়্যার ও সফটওয়্যার কোম্পানি তৈরি করেন। ক্রমেই ‘অ্যাপ্‌ল’ ৪২.৯ কোটি ডলারের মূল্যে এই সংস্থাটিকে কিনে নেয় ১৯৯৬ সালে। ১৯৯৭ সালে ‘অ্যাপ্‌ল’ সংস্থার সিইও পদে যুক্ত হন স্টিভ জোবস। তাঁর এই ফিরে আসার জয় বিশ্বের সকল লড়াকু মানুষের কাছে সাফল্যের প্রতীক। ১৯৯০-এর দশকে তিনিই এই সংস্থাকে ঢেলে সাজান এবং অ্যাপ্‌লের পুনর্বিন্যাস করতে সাহায্য করেন। জোবসের স্বতন্ত্র বিন্যাস এবং উপযুক্ত বিপণনী ব্যবস্থা ও সুদৃশ্য ডিজাইনের কারণে ধীরে ধীরে এই সংস্থার প্রতি আবার মানুষ আগ্রহী হয়ে পড়েন। ম্যাকবুক, আইফোন, আইপ্যাডের মতো একের পর এক উন্নত প্রযুক্তির উদ্ভাবনের সঙ্গে সঙ্গেই ক্রমশ ‘অ্যাপ্‌ল’ জনপ্রিয় হতে শুরু করে এবং বাজারে এক ও অদ্বিতীয় সংস্থায় পরিণত হয়। ১৯৮৬ সালে জোবস জর্জ লুকাসের থেকে একটি অ্যানিমেশন কোম্পানি কিনে নেন যা পরে ‘পিক্সার’ নামে বিখ্যাত হয়। দূরদর্শী স্টিভ জোবস এই কোম্পানির ভবিষ্যৎ সাফল্য বুঝে নিজের ৫ কোটি ডলার এই কোম্পানিতে লগ্নি করেন। ‘টয় স্টোরি’, ‘ফাইণ্ডিং নিমো’, ‘দ্য ইনক্রেডিবলস্‌’-এর মতো বিখ্যাত সব অ্যানিমেশন ছবি এই ‘পিক্সার’ সংস্থা থেকেই মুক্তি পেতে থাকে। ২০০৬ সালে এই পিক্সার ওয়াল্ট ডিজনির সঙ্গে যুক্ত হয় এবং ডিজনির সব থেকে বড়ো অংশীদার হয়ে ওঠে আর এভাবেই এক কলেজ ড্রপ আউট থেকে স্টিভ জোবস মার্কিন দুনিয়ার অন্যতম ধনী ও প্রভাবশালী ব্যক্তিতে পরিণত হন।

১৯৮৫ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রেগান তাঁকে ‘ন্যাশনাল মেডেল অফ টেকনোলজি’ পুরস্কারে ভূষিত করে। ১৯৯১ সালে তিনি রিড কলেজ থেকে হাওয়ার্ড ভল্লাম পুরস্কার লাভ করেন। ২০০৭ সালে ‘ফরচুন’ পত্রিকা তাঁকে সেকালের অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তির শিরোপা দেয়। ঐ বছরই ক্যালিফোর্নিয়া মিউজিয়াম ফর হিস্ট্রি, ওমেন অ্যাণ্ড আর্টস তাঁকে ‘ক্যালিফোর্নিয়া হল অফ ফেম’ সম্মানে ভূষিত করে। সর্বোপরি তাঁর সারাজীবনের কাজের স্বীকৃতি স্বরূপ ‘এডিসন অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড’ অর্জন করেন স্টিভ জোবস।

ওয়াল্টেয়ার ইসাক্‌সন স্টিভ জোবসের একটি জীবনী লেখেন ‘স্টিভ জোবস’ নামে যা ২০১১ সালে প্রকাশিত হয় এবং এর অনুপ্রেরণায় পরবর্তীকালে ড্যানি বোয়েল একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। লিসা ব্রেনানের লেখা ‘স্মল ফ্রাই’ কিংবা স্টিভ ওজনিয়াকের লেখা ‘আই ওয়াজ’ বইগুলিতেও আত্মজৈবনিক বর্ণনার মধ্য দিয়ে স্টিভ জোবসের কথা উঠে এসেছে বারবার।

২০১১ সালের ৫ অক্টোবর তারিখে ক্যালিফোর্নিয়ার পাওলো অল্টোর বাড়িতে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে স্টিভ জোবসের মৃত্যু হয়।

  • এই ধরণের তথ্য লিখে আয় করতে চাইলে…

    আপনার নিজের একটি তথ্যমূলক লেখা আপনার নাম ও যোগাযোগ নম্বরসহ আমাদের ইমেল করুন contact@sobbanglay.com

  • সববাংলায় সাইটে বিজ্ঞাপন দেওয়ার জন্য আজই যোগাযোগ করুন
    contact@sobbanglay.com

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

শুধুমাত্র খাঁটি মধুই উপকারী, তাই বাংলার খাঁটি মধু খান


ফুড হাউস মধু

হোয়াটস্যাপের অর্ডার করতে এখানে ক্লিক করুন