ইতিহাস

সুতোমু ইয়ামাগুচি

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন প্রায় দুই লক্ষ ষাট হাজারেরও বেশি মানুষ হিরোশিমা এবং নাগাসাকির এই বিস্ফোরণে মারা যান। কিন্তু, যে অল্প সংখ্যক মানুষ এই দুটি ভয়ঙ্কর বিস্ফোরণ একসঙ্গে চাক্ষুষ করার পরেও বেঁচে ছিলেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন জাপানের সুতোমু ইয়ামাগুচি (Tsutomu Yamaguchi) । এই বিস্ফোরণের ভয়াবহতা ইয়ামাগুচির সাথে শহরদুটির প্রত্যেক জনগণকে যে সঙ্কটের মধ্যে ফেলেছিল এবং যার ফলাফল আজও তাঁদের বহন করতে হচ্ছে তা পৃথিবীর ইতিহাসের এক কলঙ্কময় অধ্যায়। সেই কালো অধ্যায়ের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ পৃথিবী পেয়েছে সুতোমু ইয়ামাগুচির কাছে।

১৯১৬ সালের ১৬ মার্চ জাপানের নাগাসাকি শহরে সুতোমু ইয়ামাগুচি র জন্ম হয়। পেশাগতভাবে তিনি ছিলেন একজন নৌ ইঞ্জিনিয়ার(Naval Engineer)। ১৯৩০ এর দশকে জাপানের মিতসুবিশি হেভি ইন্ডাস্ট্রিজে (Mitsubishi Heavy Industries) নকশাকার (Draftsman ) হিসেবে তিনি নিযুক্ত হন। তাঁর কাজ ছিল তেলের ট্যাঙ্কারের নকশা প্রস্তুত করা। মিতসুবিশি কোম্পানির সঙ্গে সুতোমু ইয়ামাগুচি দীর্ঘদিন কাজ করেন। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানের শিল্প এবং অর্থনীতি ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপান হেরে গেলে দেশের এই অবস্থায় হতাশ হয়ে সুতোমু ইয়ামাগুচি তাঁর গোটা পরিবারকে ঘুমের ওষুধ খায়িয়ে মেরে ফেলার সিদ্ধান্ত নেন যদিও কিন্তু শেষ পর্যন্ত এমনটা করতে সফল হননি তিনি।

নাগাসাকিতে জন্ম এবং কর্মজীবন কাটলেও ১৯৪৫ সালে সুতোমুকে তাঁর কোম্পানির তরফ থেকে তিনমাসের জন্য একটি বাণিজ্যিক সফরে হিরোশিমাতে পাঠানো হয়। ১৯৪৫ সালের ৬ অগস্ট ছিল হিরোশিমাতে তাঁর শেষ দিন। সেদিন সকালেই তাঁর দুই সহকর্মী আকিরা ইয়ানাগা (Akira Iwanaga) এবং কুনিয়োশি সাতো-এর (Kuniyoshi Sato) সঙ্গে তাঁর শহর ছাড়ার কথা ছিল। কিন্তু রেল স্টেশনে গিয়ে তাঁর মনে পড়ে যে তিনি তাঁর সফরের স্ট্যাম্প হ্যাঙ্কো (Hanko) সাথে নিয়ে আসতে ভুলে গিয়েছেন। সঙ্গে সঙ্গে তিনি তাঁর কর্মস্থলের উদ্দেশ্যে রওনা দেন। ঘড়িতে যখন ঠিক সকাল ৮ টা বেজে ১৫ মিনিট, তিনি জাহাজের ডকের দিকে এগোচ্ছেন, তখনই তাঁর থেকে মাত্র ৩ কিমি দূরত্বে হিরোশিমা শহরের কেন্দ্রে আছড়ে পড়ে সেই পারমাণবিক বোমা ‘লিটল বয়’ (Little Boy)।

‘লিটল বয়’ হিরোশিমার মাটি স্পর্শ করার সঙ্গে সঙ্গে গোটা আকাশ কালো ধোঁয়ায় ছেয়ে যায়। সুতোমু ইয়ামাগুচি সাময়িকভাবে অন্ধ হয়ে যান। বিস্ফোরণের শব্দে তাঁর বাম কানের শ্রবণশক্তি চলে যায়, এবং পারমাণবিক তেজস্ক্রিয়তার ফলে তাঁর শরীরের ঊর্ধ্বাংশের বামদিকে গভীর ক্ষত সৃষ্টি হয়। অবস্থা স্বাভাবিক হতে গোটা রাতটা তিনি একটি এয়ার-রেইড আশ্রয়স্থলে (Air raid Shelter) কাটান। ৮ আগস্ট নিজের শহর নাগাসাকিতে এসে তিনি প্রথমেই চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে যান। সেখানকার এক ডাক্তার ছিলেন সুতোমুর ছোটোবেলার বন্ধু। কিন্তু, তাঁর কালো হয়ে যাওয়া হাত এবং মুখ দেখে তিনি প্রথমে সুতোমু ইয়ামাগুচিকে চিনতে পর্যন্ত পারেননি। এমনকি, বাড়িতে গেলে তাঁর স্ত্রীও তাঁকে চিনতে পারেননি। এতটাই ভয়াবহ অবস্থা হয়েছিল তাঁর সেই বিস্ফোরণে। তাঁর মেয়ে জানিয়েছিলেন তিনি নিজের ১২ বছর বয়স পর্যন্ত তাঁর বাবাকে ব্যান্ডেজে মোড়া অবস্থায় দেখেছেন।

৯ আগস্ট সুতোমু ইয়ামাগুচি স্বাভাবিক নিয়মে মিতসুবিশির নাগাসাকি্র অফিসে যান, কাজে যোগ দেওয়ার জন্য। সেখানে তাঁর ঊর্ধ্বতন সহকর্মীরা তাঁর কাছে হিরোশিমার অভিজ্ঞতার কথা জানতে চাইলে তিনি তাঁদেরকে সেকথা বলতে শুরু করেন। সকাল ১১ টা নাগাদ তিনি যখন হিরোশিমার অভিজ্ঞতার কথা তাঁর সহকর্মীদের সঙ্গে ভাগ করছেন তখনই নাগাসাকির মাটিতে আমেরিকা দ্বিতীয় পারমাণবিক বোমাটি নিক্ষেপ করে, যার নাম ‘ফ্যাট ম্যান’ (Fat Man)। নাগাসাকিতে যে বোমা বিস্ফোরণ হয় তার জন্য সুতোমু ইয়ামাগুচির কোনো দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি হয়নি তবে বেশ কিছুদিন তাঁর তীব্র জ্বর ছিল এবং এক সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে তাঁর বমি হয়েছিল। শারীরিক কোনো ক্ষতি এক্ষেত্রে না হলেও দুই দিনের ব্যবধানে নিজের দেশের এবং দেশের মানুষের এতবড় ক্ষতি হতে দেখে তাঁর মানসিক স্থৈর্য যে কি পরিমাণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল তা সহজেই অনুমেয়। নাগাসাকি বিস্ফোরণের সময় তাঁর পরিবারও সেখানেই ছিল। কিন্ত সৌভাগ্যবশতঃ তাঁদের কারোরই বিশেষ কোনো ক্ষতি সেই সময় হয়নি।

সময় যত এগিয়েছে পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্রের ক্ষতিকর দিক নিয়ে তিনি তত বেশি কথা বলেছেন। তাঁর অভিজ্ঞতা নিয়ে তিনি একটি বইও লিখেছেন যার নাম ‘ইকাসারেতেইরু ইনোচি’ (Ikasareteiru Inochi)। এছাড়া তাঁর একটি কবিতার বইও আছে,নাম- ‘অ্যান্ড দ্য রিভার ফ্লোজ অ্যাজ আ র‌্যাফ্ট অব কর্পসেস’। ১৯৫০ এর দশকে তিনি অনুবাদক হিসেবে কাজ করা শুরু করেন।  

১৯৫৭ সালে জাপান সরকার যখন পারমাণবিক বোমা বিস্ফোরণের পরে জীবিতদের ‘হিবাকুশা’ (Hibakusha) হিসেবে স্বীকৃতি দিচ্ছিলেন তখন সুতোমু ইয়ামাগুচি কেবলমাত্র নাগাসাকিতেই উপস্থিত ছিলেন বলে তদন্তে প্রকাশ হয়। প্রথমদিকে তিনি তাঁর এই দু দুটি বোমা বিস্ফোরণ থেকে বেঁচে ফিরে আসার বিষয়টিকে সরকার কর্তৃক স্বীকৃতি দেওয়ার কথা ভাবেননি। কিন্তু ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যাতে এই কালো অধ্যায়ের সম্পূর্ণ হদিশ পায় তা সুনিশ্চিত করতে তিনি ২০০৯ সালের মার্চে জাপান সরকারের কাছে দুটি বোমা বিস্ফোরণের পরে জীবিত ব্যক্তি হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার জন্য আবেদন করেন।

নাগাসাকি বিস্ফোরণের সময় তেমন কোনো ক্ষতি না হলেও হিরোশিমা বিস্ফোরণের ফলে তাঁর প্রভূত ক্ষতি হয়। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর শরীরে তেজস্ক্রিয়তা সংক্রান্ত অসুখ দেখা দিতে থাকে যার মধ্যে ছানি এবং অ্যাকিউট লিউকেমিয়াও (Acute Leukemia) ছিল। ২০০৯ সালে তাঁর যকৃৎ ক্যান্সার (Stomach Cancer) ধরা পড়ে। ২০১০ সালের ৪ জানুয়ারি ৯৫ বছর বয়সে নাগাসাকিতে সুতোমু ইয়ামাগুচির মৃত্যু হয়। সুতোমু ইয়ামাগুচি একটা কথা বলতেন- ‘‘পরমাণু অস্ত্রওয়ালা দেশগুলো শাসন করার ক্ষমতা থাকা দরকার শুধুু মায়েদের হাতে। সেই সব মায়েরা, যাঁরা এখনও সন্তানকে বুকের দুধ খাওয়ান।’’ 

সববাংলায় পড়ে ভালো লাগছে? এখানে ক্লিক করে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ভিডিও চ্যানেলটিওবাঙালি পাঠকের কাছে আপনার বিজ্ঞাপন পৌঁছে দিতে যোগাযোগ করুন – contact@sobbanglay.com এ।


Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।