তুলসীদাস

তুলসীদাস

ষোড়শ শতকে উত্তর ভারতে রামের মাহাত্ম্য প্রচারকারী ধর্মসংস্কারকদের মধ্যে অন্যতম হলেন তুলসীদাস (Tulsidas)।তাঁর রামভক্তির জন্য তাঁকে ‘বাল্মীকির অবতার’ বলা হয়। তিনি বাল্মীকি রামায়ণ অবলম্বনে রচনা করেছেন ‘রামচরিতমানস’ যার কারণে হিন্দি ভাষার সাহিত্যের ইতিহাসে তুলসীদাস স্মরণীয় হয়ে আছেন। এটি স্থানীয় অবধী ভাষায় রচিত। শ্রীহনুমানের স্তুতি হিসেবে তিনি ‘হনুমান চালিশা’ও রচনা করেছেন। তুলসীদাসের অন্যান্য গ্রন্থগুলি হল  ‘হনুমান বাহুক’, ‘জানকী মঙ্গল’, ‘বিনয় পত্রিকা’, ‘কৃষ্ণ গীতাবলী’, ‘তুলসী সাতসাই’, ‘রামলীলা নাহছু’, ‘দোহাবলী’, ‘বারভাই রামায়ণ’, ‘বৈরাগ‍্য সন্দিপনি’ ইত্যাদি। তাঁকে নিয়ে বহু জনশ্রুতি ছড়িয়ে আছে। অনেকেই মনে করেন তুলসীদাস নাকি শ্রীরামচন্দ্র, শ্রীহনুমানের সাক্ষাৎ পেয়েছিলেন। আজ বারাণসীর সঙ্কটমোচন মন্দির যেখানে অবস্থিত, সেখানেই নাকি হনুমানের দর্শন পেয়েছিলেন তিনি। গোস্বামী, ভক্তশিরোমণি, অভিনববাল্মীকি ইত্যাদি নানা উপাধিতে তাঁকে আখ্যা দেওয়া হয়। তাঁর স্মৃতিতে বারাণসীর গঙ্গাতীরের একটি ঘাটের নামই রাখা হয়েছে ‘তুলসী ঘাট’।

১৫৩২ সালে হিন্দুদের চান্দ্র বর্ষপঞ্জীর শ্রাবণ মাসের শুক্লপক্ষের সপ্তমী তিথিতে উত্তরপ্রদেশের কাশগঞ্জ জেলায় শুকরক্ষেত্র সোরন গ্রামে তুলসীদাসের জন্ম হয়। তবে মতান্তরে তাঁর জন্ম হয়েছিল ১৪৯৭ সালে। তাঁর বাবার নাম আত্মারাম দুবে এবং মায়ের নাম হুলসি। তাঁরা ছিলেন কান্যকুব্জ ব্রাহ্মণ। অনেকে যদিও তাঁদের পরাশর গোত্রের সরযূপারীন ব্রাহ্মণ হিসেবেও বর্ণনা দিয়েছেন। তুলসীদাসের জন্ম নিয়ে কিংবদন্তী ‘বিনয়পত্রিকা’য় আছে যে তিনি বারো মাস গর্ভে থেকে বত্রিশটি দাঁত নিয়ে জন্ম করেছিলেন। তিনি জন্মের সময় কাঁদেননি, মুখ থেকে রাম নাম উচ্চারণ করেছিলেন, তাই তাঁর নাম রাখা হয় রামবোলা। তুলসীদাসের জন্মের পর তাঁর বাবা মারা গেলে তুলসীদাসের মা হুলসি তাঁকে চুনিয়া নামে এক শূদ্র মহিলা দাসীর কাছে রেখে চলে যান। চুনিয়া সাড়ে পাঁচ বছরের শিশুটিকে তাঁর নিজের গ্রাম হরিপুর নিয়ে গিয়ে দেখাশোনা করতেন। পরে চুনিয়া মারা গেলে বালক তুলসীদাস অতি কষ্টে  নিজেই  নিজের ভরণপোষণ করছিলেন। বিশ্বাস করা হয় যে, দেবী পার্বতী একজন ব্রাহ্মণ নারীর রূপ ধারণ করে তাঁকে প্রতিদিন খাওয়াতেন। তুলসীদাসকে কীভাবে তাঁর মা চুনিয়ার কাছে রেখে দিয়ে গিয়েছিলেন, তা নিয়ে একটি কাহিনি  ‘বিনয়পত্রিকা’ গ্রন্থে রয়েছে। পরবর্তীকালে তুলসীদাস বিয়ে করেন কৌশাম্বী জেলার অন্তর্গত মহেওয়া গ্রামের ভরদ্বাজ গোত্রীয় ব্রাহ্মণ দীনবন্ধু পাঠকের কন্যা রত্নাবলীকে। তাঁদের তারক নামে এক পুত্রসন্তান ছিল। যদিও পুত্রসন্তানটি জন্মের পরেই মারা যায়। তুলসীদাসের সঙ্গে তাঁর স্ত্রীকে নিয়ে বহু কিংবদন্তী আছে। জানা যায় যে তুলসীদাস যখন হনুমান মন্দিরে গিয়েছিলেন তখন রত্নাবলী তাঁর বাবার কাছে চলে গিয়েছিলেন। তিনি বাড়ি এসে স্ত্রীকে না দেখে এবং তাঁর স্ত্রী নিজের বাবার কাছে চলে গেছে জানতে পেরে সেই রাতেই যমুনা নদী পেরিয়ে স্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন তুলসীদাস। রত্নাবলী তুলসীদাসকে দেখে অপমান করলে তিনি তৎক্ষণাৎ সেখান থেকে বেরিয়ে বারাণসীতে চলে গিয়েছিলেন। এই ঘটনার পরই তুলসীদাস হিন্দুধর্মের এক সন্ততে পরিণত হয়েছিলেন।

ছয় বছর বয়সে রামানন্দের শিষ্য নরহরি দাস রামবোলাকে দত্তক নিয়েছিলেন। তাঁকে নরহরি দাস তুলসীদাস নামে দীক্ষা দিয়েছিলেন। তুলসীদাসের লেখা ‘বিনয়পত্রিকা’তে গুরুর সঙ্গে তাঁর প্রথম সাক্ষাতের কাহিনি বর্ণিত আছে। নরহরি দাস সাত বছর বয়সে তাঁকে অযোধ‍্যায় নিয়ে এসে উপনয়ন দিয়েছিলেন। তিনি এখানেই শিক্ষাগ্রহণ শুরু করেন। নরহরি দাস তাঁকে সোরন জেলায় নিয়ে গিয়ে রামায়ণ বর্ণনা করে শুনিয়েছিলেন। এই কাহিনি তাঁর ‘রামচরিতমানস’-এ জানতে পারা যায়। পরবর্তীকালে তুলসীদাস বারাণসীতে এসে নরহরি দাসের বন্ধু গুরু শেশা সনাতনের কাছ থেকে পনেরো বছর বয়সে চারটি বেদ শিক্ষা শুরু করেন। ছয়টি বেদাঙ্গ ও সংস্কৃত ব‍্যাকরণেরও অধ‍্যয়ন করেছিলেন তিনি। তারপর তুলসীদাস নিজ ভূমিতে এসে রামের মাহাত্ম্য প্রচার করেন।

তুলসীদাস ছিলেন হিন্দু কবি এবং সাধক। তিনি উত্তর ভারতের ভক্তি আন্দোলনের বৈষ্ণব সম্প্রদায়ভুক্ত রামানন্দের  পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। তাঁর ‘রামচরিতমানস’-এ হিন্দু দেবতা রামের অধিক প্রাধান্য থাকলেও বৈষ্ণব ধর্মের জনপ্রিয়তা সমানভাবে লক্ষ্য করা যায়। তিনি যেমন বর্ণাশ্রম ধর্ম, অবতারবাদ, সাকার উপাসনা, গৌ ব্রাহ্মণ সুরক্ষা, প্রাচীন বেদ মার্গের প্রতি সম্মান জানিয়েছিলেন, তেমনি তৎকালীন ধর্মদ্রোহী অত্যাচার ও সামাজিক ত্রুটির সমালোচনাও করেছিলেন। তুলসীদাস তাঁর জীবনের বেশিরভাগ সময় বারাণসী ও অযোধ্যায় কাটিয়েছিলেন। বারাণসীর গঙ্গা নদীর ঘাট ‘তুলসীঘাট’ নামে নামাঙ্কিত করা হয়েছিল। তিনি বারাণসীতে সঙ্কটমোচন হনুমান মন্দিরটি প্রতিষ্ঠা করেন।

তুলসীদাস হিন্দুদের কাছে অত্যন্ত পবিত্র স্থান বদ্রিকা, দ্বারকা, পুরী, রামেশ্বরম এবং হিমালয় ভ্রমণ করেছিলেন। তাঁর হিমালয় ভ্রমণের একটি কাহিনি বর্ণিত আছে ‘রামচরিতমানস’-এ। জানা যায় বর্তমান তিব্বতের মানস সরোবর হ্রদ পরিদর্শন করে তিনি সেখানে কাকভূশন্ডির দেখা পেয়েছিলেন। সেই কাকটির বর্ণনাও রামচরিতমানসে আছে এবং তাঁর লেখা রামচরিতমানসের কাহিনির চার কথাকারের মধ্যে এই কাকভূশণ্ডি ছিল অন্যতম। তুলসীদাস রাম ও হনুমানের দেখাও পেয়েছিলেন যা তাঁর জীবনী গ্রন্থ প্রিয়দাসের লেখা ‘ভক্তিরসবোধিনী’ থেকে জানা যায়। ‘রামচরিতমানস’-এর শুরুতে বর্ণিত আছে যে তুলসীদাস প্রেতের মাধ্যমে হনুমানের দর্শন লাভ করেছিলেন। হনুমানের সাহায‍্যে তিনি চিত্রকূট পর্বতে রামকেও নিজের চোখে দেখতে পেয়েছিলেন। কথিত আছে চিত্রকূট পর্বতে একটি শিশুর বেশে রামচন্দ্র তুলসীদাসের কাছ থেকে চন্দনের তিলক পড়তে চেয়েছিলেন। শিশুটিকে দেখে তুলসীদাস এতটাই মুগ্ধ হয়েছিলেন যে তাঁর কপালে চন্দনের তিলক পড়িয়ে দিয়েছিলেন। এভাবেই তিনি রামের দর্শন লাভ করেছিলেন। তুলসীদাস চিত্রকূট ত্যাগ করে বারাণসীর উদ্দেশ‍্যে যাত্রা করার সময় মাঘ মেলায় কলা গাছের নীচে মুনি যাজ্ঞবল্ক্য ও ভরদ্বাজের দর্শন পেয়েছিলেন। ‘হনুমান বাহুক’ গ্রন্থে তিনি ভয়াবহ রোগ যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাওয়ার ঘটনাটি বর্ণনা করেছেন। প্রিয়দাস ‘ভক্তিরসবোধিনী’তে তুলসীদাসকে কেন্দ্র করে একটি অলৌকিক ঘটনা বর্ণনা করেছেন। এক মৃত ব্রাহ্মণকে জীবিত করার কথা শুনে মোগল সম্রাট আকবর তুলসীদাসকে ডেকে পাঠান। তুলসীদাস রাজসভায় গিয়ে  ‘রাম নাম’ উচ্চারণ করায় ফতেপুর সিক্রিতে নাকি তাঁকে বন্দি করে রাখা হয়েছিল। এই বন্দি অবস্থায় তুলসীদাস টানা চল্লিশ দিন হনুমান-স্তোত্র পাঠ করেছিলেন। শেষে শ্রীহনুমান এসে গোটা শহরটিকে নাকি ধ্বংস করেছিলেন। পরে যদিও তুলসীদাসকে মুক্তি দেওয়া হয়েছিল এবং ক্রমে তিনি আকবরের বন্ধু হয়ে উঠেছিলেন। আকবর তারপর থেকে ফরমান জারি করেছিলেন যে, তাঁর রাজ‍্যে হিন্দু অনুগামীদের কোনওদিন অসম্মানিত হতে হবে না।

তুলসীদাস বারাণসীর ঘাটে বসেই ‘রামচরিতমানস’ কাব‍্যটি রচনা শুরু করেছিলেন। আটদিন ধরে প্রথমে সংস্কৃত ভাষায় কাব‍্যের যে শ্লোকগুলি তিনি রচনা করেছিলেন, একদিন রাতে হঠাৎই সেগুলি হারিয়ে যায়। বারাণসীর বিশ্বনাথ মন্দিরে শিব তুলসীদাসকে স্বপ্নে সংস্কৃতের পরিবর্তে স্থানীয় ভাষায় শ্লোকটি রচনার নির্দেশ দিয়েছিলেন। তাঁকে আশীর্বাদ দিয়ে শিব বলেছিলেন যে অযোধ্যায় গিয়ে তিনি যেন তাঁর এই কাব্য রচনা করেন। সেই নির্দেশমত অযোধ‍্যাতে রামনবমীর দিনে ‘রামচরিতমানস’ কাব্য লেখা শুরু করেছিলেন তিনি। সমগ্র কাব্যটি তিনি রচনা শেষ করেছিলেন দু বছর সাত মাস ছাব্বিশ দিনে। এরপর তুলসীদাস বারাণসীতে এসে বিশ্বনাথ মন্দিরে শিব এবং পার্বতীর সামনে সেই কাব্য পাঠ করেছিলেন। এই কাব‍্যটি নয়টি খণ্ডে বিভক্ত যার মধ্যে বালকাণ্ডটি আয়তনে সবচেয়ে বড়।

তুলসীদাস তাঁর অন্যান্য গ্রন্থগুলির মাধ‍্যমে কিছু বিশেষ কাহিনি উল্লেখ করেছেন যেগুলি ব্রজ ও অবধী ভাষায় রচিত। ‘দোহাবলী’ গ্রন্থের প্রায় পঁচাশিটি দোঁহা তিনি রামচরিতমানসে অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন। ‘কৃষ্ণ গীতাবলী’ বইতে তুলসীদাস শৈশবে কৃষ্ণের রামলীলা বর্ণনা করেছেন। পার্বতী ও শিবের বিবাহ বর্ণনা করেছেন তুলসীদাস ‘পার্বতী মঙ্গল’ বইতে, একইভাবে তাঁর লেখা ‘জানকী মঙ্গল’-এ সীতা ও রামের বিবাহের কাহিনি সংকলিত আছে। ‘রামলালা নাহছু’ বইটি শিশু রামের বাল্যলীলার বর্ণনায় সমৃদ্ধ।

শোনা যায় বারাণসী মন্দিরের ব্রাহ্মণেরা তুলসীদাসের ‘রামচরিতমানস’ কাব্যটি বিভিন্ন উপায়ে চুরি করতে চেয়েছিলেন। কথিত আছে যে, তাঁরা দুজন চোরকে তুলসীদাসের কুঁড়েঘরে পাঠান। কিন্তু সেখানে দুজন শ‍্যামবর্ণ ও গৌরবর্ণের পুরুষ পাহারা দিচ্ছিলেন সেই সময়। তাঁদের দেখে দুই চোরের মনে শুভবুদ্ধির জাগরণ ঘটে, তাঁরা রামের ভক্ত হয়ে ওঠেন। ব্রাহ্মণেরা কোনও উপায় প্রয়োগ করতে না পেরে মধুসূদন সরস্বতীজীকে কাব‍্যটি দেখতে বলেন। তিনি তুলসীদাসের কাব‍্যটি পড়ে যারপরনাই আনন্দ প্রকাশ করেছিলেন।

আনুমানিক ১৬২৩ সালে ৯১ বছর বয়সে বারাণসীর গঙ্গানদীর তীরে অসি ঘাটে তুলসীদাসের মৃত‍্যু হয়।

আপনার মতামত জানান