সব

লক্ষ্মী আগরওয়াল

লক্ষ্মী আগরওয়াল (Laxmi Agarwal) একজন অ্যাসিড আক্রান্ত মহিলা যাঁর জীবন কাহিনী নিয়ে তৈরি হয়েছে চলচ্চিত্র ‘ছপাক’। তাঁর চরিত্রটিতে অভিনয়  করেছেন জনপ্রিয় অভিনেত্রী দীপিকা পাড়ুকোন।

১৯৯০ সালের ১ জুন দিল্লিতে লক্ষ্মী আগরওয়ালের জন্ম হয়। তাঁর বাবা দক্ষিণ দিল্লির একটি বাড়িতে রান্নার কাজ করতেন। দিল্লি স্কুলের ক্লাস সেভেনে পড়াকালীন মাত্র পনেরো বছর বয়সে তিনি আ্যসিড আক্রমণের শিকার হন। লক্ষ্মী’র স্বপ্ন ছিল বিভিন্ন গানের প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করা এবং গায়িকা হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত হওয়া।

লক্ষ্মীর বান্ধবীর বত্রিশ বছর বয়সী দাদা নাঈম খান তাঁকে প্রেমের প্রস্তাব দিলে লক্ষ্মী সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে। একদিন সে যখন ভিড়ে ভরা সেন্ট্রাল দিল্লিতে দিনের বেলায় বাসের জন্য অপেক্ষা করছিলেন যখন লক্ষ্মী তখনই ওই যুবক তার ছোট ভাইয়ের বান্ধবীর সাথে লক্ষ্মীকে ধাক্কা মেরে ফেলে তাঁর মুখে অ্যাসিড ঢেলে দেয়। লক্ষ্মী আগরওয়াল যন্ত্রণায় চিৎকার করতে থাকলেও কেউই সাহায্যের জন্য এগিয়ে না এসে দূরে সরে যেতে থাকে। লক্ষ্মী আ্যসিডের জ্বালায় জ্বলতে জ্বলতেই দুই হাত দিয়ে তাঁর চোখদুটো আড়াল করে ফেলেছিলেন  ফলে পরবর্তীকালে তাঁর দৃষ্টিশক্তি অক্ষত থাকে।  তাঁর কান ও মুখের অংশের চামড়া গলে যায়। এই সময় একজন ড্রাইভার তাঁকে নিয়ে রাম মনোহর লোহিয়া হাসপাতালে পৌঁছে দেয়। দশ সপ্তাহ তিনি হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। প্লাস্টিক সার্জারি হওয়ার আগে তাঁর এগারোটি সার্জারির প্রয়োজন হয়েছিল। তাঁর যখন এই রকম অবস্থা তখন পাড়া-প্রতিবেশী, বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন সবাই তাঁদের পাশ থেকে সরে গিয়েছিল। এদের আচরণ লক্ষ্মীকে ভীষণ হতাশ করে। লক্ষ্মী মানসিকভাবে আরও ভেঙে পড়ে। একমাত্র মা-বাবা এবং ডাক্তার আর‌ তাঁর উকিল তাঁকে সমানে মনোবল জুগিয়ে যায়। এছাড়াও তাঁর বাবা যে বাড়িতে কাজ করতেন সেই বাড়িও তাঁর পাশে এসে দাঁড়ায়। এমনকি তাঁর চিকিৎসার খরচও  তারা বহন করেছিল। এরপর লক্ষ্মী আট বছর গৃহবন্দী হয়েই কাটান এবং যখন বেরোবার প্রয়োজন হতো মুখ ঢেকে বের হতেন।

নাঈম খান এক মাসের মধ্যেই জামিন পেয়ে যায় এবং স্বাভাবিক জীবন-যাপন করতে থাকে। এমনকি সে বিয়েও করে। অথচ কোন অপরাধ না করেও লক্ষ্মী আগরওয়ালের জীবনে অন্ধকার নেমে আসে। এমনকি কেউ তাঁকে চাকরিও দিতে চাইত না। জীবনের এই দুঃসময়ে তার পারিবারিক জীবনেও নেমে এসেছিল বিপর্যয়। তাঁর ভাই  যক্ষ্মায় আক্রান্ত হয় এবং তার বাবা মারা যান। তবু তিনি আইনি লড়াই চালিয়ে যান। আ্যসিড নিষিদ্ধ করার জন্য সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করা হয়। এই সময় সে আরো অ্যাসিড আক্রান্ত মহিলাদের সঙ্গে পরিচিত হন, যাঁদের কারো কারো অবস্থা তাঁর চেয়েও খারাপ। লক্ষ্মী আ্যসিড বিক্রি বন্ধ করার উদ্দেশ্যে আদালতের দ্বারস্থ হয়েছিলেন। ‘স্টপ সেল অ্যাসিড’ – এর জন্য বিভিন্ন রাজ্যে ঘুরে ২৭,০০০ সই সংগ্রহ করেন এ ব্যাপারে। তাঁর আবেদন ছিল যে, দোকানদার যেন লাইসেন্স নিয়ে আ্যসিড বিক্রি করেন এবং ক্রেতাদের নাম-ঠিকানা  নথিভুক্ত করেন। এছাড়াও অ্যাসিড হামলায় আক্রান্তদের অবিলম্বে ন্যায়বিচার, পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণের দাবিতে তিনি অনশন করেছিলেন। ২০১৩ সালে সুপ্রিম কোর্টে তাঁর আবেদন গ্রাহ্য হয় এবং আ্যসিড বিক্রির ওপর নিয়ন্ত্রণ জারি হয়। নাঈম খান সুপ্রিম কোর্টের আদেশে আবার সাত বছরের জন্য জেলে যায়। সুপ্রিম কোর্ট রাজ্য সরকারকে ৩ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার আদেশ দেয়। তাঁর কাহিনী ‘হিন্দুস্তান টাইমস’ পত্রিকায়  প্রকাশিত হয়েছিল। আ্যসিড বিক্রি বন্ধের ডাক দিয়ে দেশ-বিদেশের  কুড়ি হাজার স্বেচ্ছাসেবীদের সাথে পেয়েছেন তিনি।

লক্ষ্মী আগরওয়াল সমাজসেবী অলোক দীক্ষিতকে বিয়ে করেন। যদিও তাঁদের বিয়েতে কোন সামাজিক অনুষ্ঠান  হয়নি।  পরবর্তীকালে তাঁদের দুজনের একটি কন্যা সন্তান হয়। কিন্তু ২০১৫ সাল থেকে তাঁরা আলাদা ভাবে থাকতে শুরু করেন।

২০১৪ সালে আমেরিকার ফার্স্ট লেডি মিশেল ওবামার (Michelle Obama) থেকে লক্ষ্মী আগরওয়াল ‘আন্তর্জাতিক সাহসী নারী পুরস্কার’ (International women of courage award) লাভ করেন। ২০১৯ সালে তিনি ‘কেন্দ্রীয় মহিলা ও শিশু উন্নয়ন মন্ত্রকের তরফ থেকে ইন্টারন্যাশনাল উইমেন এমপাওয়ারমেন্ট অ্যাওয়ার্ড’ (International women 

empowerment award) পান। লক্ষ্মী আগরওয়াল ‘চানভ ফাউন্ডেশন’ নামে একটি এনজিও(NGO) চালান যেখানে অ্যাসিড আক্রান্ত মহিলাদের পুনর্বাসনের জন্য কাজ করা হয়। তিনি ‘Viva n Diva’ কোম্পানির ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর নিযুক্ত হন। এছাড়াও তিনি ২০১৪ সালে ‘এনডিটিভি ইন্ডিয়ান অফ দ্য ইয়ার’ নির্বাচিত হন। তিনি একটি টিভি চ্যানেলের অনুষ্ঠানের সঞ্চালক। তার জীবন নিয়ে তৈরি হয় একটি সিনেমা ‘ছপাক’ (Chhapaak)। ছবিটি ২০২০ সালের ১০ ই জানুয়ারি মুক্তি পায়। লক্ষ্মী আগরওয়ালের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন বলিউডের বিখ্যাত অভিনেত্রী দীপিকা পাড়ুকোন। ছবিটি পরিচালনা করেছেন মেঘনা গুলজার।

বেশ কিছুদিন তিনি কর্মহীন ছিলেন। ২০১৮ সালে তাঁর এই দুর্দিনে তাঁর পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন অভিনেতা অক্ষয় কুমার। ৫ লাখ টাকার আর্থিক সাহায্য করেন তিনি। এছাড়াও ব্যক্তিগতভাবেও অনেকে লক্ষ্মীকে আর্থিক সাহায্য করেছেন। সোশ্যাল মিডিয়াও তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছিল। এমনকি তিনি বিভিন্ন চাকরির প্রস্তাবও পেয়েছেন। বিউটিশিয়ান কোর্স পাস করেছেন লক্ষ্মী। একটি মেকআপ একাডেমী থেকে তিনি চাকরির প্রস্তাব পেয়েছেন এবং সংস্থাটি তাঁর মেয়ের পড়াশোনার খরচ চালানোর দায়িত্বও নিতে চায়। তা ছাড়া একটি গয়না প্রস্তুতকারক সংস্থাও তাঁকে সাহায্য করতে চায়। লক্ষ্মী আগরওয়াল এভাবেই তাঁর জীবনের প্রতিটি লড়াইয়ে সফল হয়েছেন এবং একইসঙ্গে অসহায় মহিলাদের মনোবল তৈরি করতেও সাহায্য করে চলেছেন।

স্বরচিত রচনা পাঠ প্রতিযোগিতা, আপনার রচনা পড়ুন আপনার মতো করে।

ভিডিও

বিশদে জানতে ছবিতে ক্লিক করুন। আমাদের সাইটে বিজ্ঞাপন দেওয়ার জন্য যোগাযোগ করুন। ইমেল – contact@sobbanglay.com

 


Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।