ইতিহাস

সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত

বাংলা সাহিত্যের আকাশে সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত এক উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক৷ রবীন্দ্রানুরাগী হয়েও বাংলা কাব্যধারায় তিনি স্বতন্ত্র সুর আরোপ করেছিলেন৷ সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত বাংলা সাহিত্যে ‘ছন্দের জাদুকর’ নামে পরিচিত ।

সত্যেন্দ্রনাথের জন্ম হয়  ১১ই ফেব্রুয়ারি ১৮৮২ সালে৷ পিতা রজনীনাথ দত্ত ছিলেন পেশায় একজন নামী ব্যবসায়ী এবং পিতামহ অক্ষয় কুমার দত্ত ছিলেন তত্ত্ববোধিনী পত্রিকার সম্পাদক। উত্তরাধিকারসূত্রে পিতামহ অক্ষয়কুমার দত্তের কাছ থেকে তিনি স্বজাত্যবোধের প্রেরণা পেয়েছিলেন। সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত প্রত্যক্ষভাবে রাজনৈতিক কর্মকান্ডে যোগ না দিলেও বাল্যকাল থেকে তাঁর চিন্তা ও আচরণে তাঁর রাজনৈতিক ভাবনার প্রকাশ ছিল৷ কেবল কাব্য রচনা নয় বিভিন্ন ভাষা থেকে বাংলায় অনুবাদ কর্মও করেছেন। সত্যেন্দ্রনাথ কলকাতার সেন্ট্রাল কলেজিয়েট স্কুল থেকে এন্ট্রান্স (১৮৯৯) এবং জেনারেল অ্যাসেমব্লিজ ইনস্টিটিউশন (বর্তমান স্কটিশ চার্চ কলেজ) থেকে এফ.এ (১৯০১) পাস করেন। তিনি ছিলেন যুগসচেতন কবি। সত্যেন্দ্রনাথ প্রকৃত অর্থেই দেশপ্রেমিক ছিলেন। দেশের নামে কোন অন্যায়কে তিনি কখনও মেনে নিতে পারতেন না। তাঁর কবিতায় কেবল ছন্দ নিয়ে যে তিনি সজাগ ছিলেন তা নয় তাঁর লেখা ‘শূদ্র’, ‘মেথর’, ‘আমরা’, ‘হাহাকার’,  ‘ফরিয়াদ’ প্রভৃতি কবিতায় সমকালীন রাষ্ট্র ও সমাজের ছায়াও স্পষ্ট হয়ে আছে৷

তাঁর কবি প্রতিভার মূলে ছিল বস্তু প্রাধান্য, বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ, যুক্তি, নীতি পরায়ণতা, বাস্তবানুরাগ ও স্বজাত্যপ্রীতি। মোহিতলাল মজুমদার বলেছেন, “সত্যেন্দ্রনাথ সংস্কারমুক্ত ছিলেন, তিনি মানুষের ভাগ্য, শক্তি ও প্রতিভাকে  সর্বদেশে ও সর্বকালে সমান গৌরবের অধিকারে বলিয়া মনে করিতেন। এজন্য তাঁহার জাতীয়তাবোধ যেমন উদারতার ভিত্তির উপরে প্রতিষ্ঠিত ছিল তেমনই বর্তমানের প্রতি শ্রদ্ধা ও বৃহত্তর ভবিষ্যতের প্রতি আস্থা ছিল ”

 তাঁর লেখা কাব্যগ্রন্থ গুলি হল, ‘সবিতা'( ১৯০০),  ‘সন্ধিক্ষণ’ (১৯০৫), ‘কুহু ও কেকা (১৯১২),  ‘তুলির লিখন’ ( ১৯১৪), ‘বেলা শেষের গান'(১৯২৩), ‘বিদায় আরতি'(১৯২৪) প্রভৃতি । 
‘সবিতা’ কাব্যগ্রন্থের সূচনাংশেই দেখা যায় দেশের, জাতির ও অধিবাসীদের কল্যাণের কথা লেখা৷ তাঁর এই কাব্যে দ্বিধাগ্রস্ত বতমান ও স্বর্ণময় অতীত ঐতিহ্যের মধ্যে সেতু নির্মাণের চেষ্টা করেছেন তিনি। এই কাব্যগ্রন্থের কবিতায় ধ্বনিত হয় সেই আহ্বানের ছন্দ ”জ্বলিতেছ চিরদিন তুমি হে যেমন / জ্বলে সদা ধরনী তেমন’‘। তাঁর কাব্যে আধুনিকতা ছিল যথেষ্ট বাঙ্ময়৷ তাঁর কবিমানসের অধিষ্ঠাত্রী দেবী ছিলেন মা সরস্বতী। কাব্যের রূপকর্ম নির্মাণে, ছন্দ ও শব্দের ব্যবহারে, ধ্বনি স্পন্দন সৃষ্টিতে কবির জাদুস্পর্শে বাংলা কবিতা পেল এক বিচিত্র আনন্দের স্বাদ৷ ১৯০৫ খ্রীস্টাব্দে বইয়ের আকারে প্রকাশিত হল ‘সন্ধিক্ষণ’ সেখানে তিনি লিখলেন, “যাঁহারা আদর্শ আজি বঙ্গে একতার/ তাঁহাদেরই তরে এই ক্ষুদ্র উপহার।” ‘ফুলের ফসল’ কাব্যের ‘চম্পা’ কবিতা নাটকীয় শক্তির ভঙ্গিতে লেখা কবির সৌন্দর্যসত্তার নিদর্শন তুলে ধরে৷ সংস্কৃত বৃত্ত ছন্দের মধ্যে মালিনীব,মন্দাক্রান্তা, রুচিরা, তোটক ইত্যাদির বাংলারূপ সৃষ্টি করেছেন তিনি।

অনুবাদ কাব্য রচনার ক্ষেত্রেও বাংলা কবিতায় নতুন স্রোত এনেছিলেন তিনি৷ ইয়েটস, এজরা পাউন্ড, ভেরলেন প্রভৃতি সমকালীন ইউরোপীয় কবিদের কবিতা অনুবাদ করে বাংলা কবিতাকে অনন্য এক মাত্রা দিলেন তিনি৷ তাঁর কবিতায় ছন্দের কারুকাজ, শব্দ ও ভাষার যথোপযুক্ত ব্যবহারের কৃতিত্বের জন্য তাঁকে ‘ছন্দের জাদুকর’ নামে আখ্যায়িত করা হয়। কবির বন্ধু সমালোচক অজিত কুমার চক্রবর্তী লিখেছেন “ফরাসি কবি পল  ভেরলেন সম্বন্ধে যেমন বলা হয় ‘he paints with sound.’ সত্যেন্দ্র নাথ দত্ত সম্পর্কেও একই কথা বলা চলে।” সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের লেখা ‘হেমন্ত’ কবিতা আমরা উদাহরণ হিসেবে পড়তে পারি, “হাওয়ার মতন হালকা হিমের ওড়ন দিয়ে গায় / অন্ধকারে বসুন্ধরা শূণ্য চোখে চায়।/ তারার আলো দূর, কন্ঠ ভরা বাষ্প আঁখি অশ্রু পরিপূর।”  রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং তাঁর ‘পূরবী’ কাব্যের ‘সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত’ কবিতায় তাঁর গুণমুগ্ধতার কথা লিখেছেন-  “বঙ্গভূমে/যে তরুণ যাত্রিদল রুদ্ধদ্বার – রাত্রি- অবসানে/নিঃশঙ্কে বাহির হবে নবজীবনের অভিযানে/ নব নব সংকটের পথে পথে, তাহাদের লাগি/ অন্ধকার নিশীথিনী তুমি, কবি, কাটাইলে জাগি/ জয়মাল্য বিরচিয়া, রেখে গেলে গানের পাথেয়/ বহ্নিতেজে পূর্ণ করি।” মাত্র চল্লিশ বছর বয়সে ১৯২২ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি বাংলা সাহিত্যের উজ্জ্বল নক্ষত্র সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের মৃত্যু হয়।

তথ্যসূত্র


  1. বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস / দেবেশ কুমার আচার্য্য ; পৃঃ২১৩

Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

To Top
error: Content is protected !!

বাংলাভাষায় তথ্যের চর্চা ও তার প্রসারের জন্য আমাদের ফেসবুক পেজটি লাইক করুন