সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত

সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত

বাংলা সাহিত্যের আকাশে সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত (Satyendranath Dutta) এক উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক৷ রবীন্দ্রানুরাগী হয়েও বাংলা কাব্যধারায় তিনি স্বতন্ত্র সুর আরোপ করেছিলেন৷ ‘ছন্দের জাদুকর’ নামে সুপরিচিত সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত বাংলা শ্বাসাঘাতপ্রধান ছন্দের বহুল প্রয়োগে এবং সংস্কৃত ও বিদেশি ছন্দের ঢঙে কবিতা রচনা করে এক নতুন দিক উন্মোচন করেছিলেন। ছন্দ-মাধুর্যের কারণে তাঁর লেখা ‘পাল্কীর গান’, ‘বর্ষা’, ‘ইলশে-গুঁড়ি’, ‘বজ্র-কামনা’, ‘তাতারসির গান’, ‘পিয়ানোর গান’, ‘সবুজ পরী’, ‘যুক্তবেণী’ ইত্যাদি পদ্যগুলি আজও বাঙালি মানসে জনপ্রিয়। লঘুচপল কল্পনা, অবাধ কৌতুহল আর রোমান্টিক কবিকৃতির কারণে সত্যেন্দ্রনাথের কবিতা বিখ্যাত হয়েছে। শুধু কবিতাই নয়, নাটক, উপন্যাস সহ অন্যান্য গদ্য রচনাতেও তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। রবীন্দ্রানুসারী কবিসমাজের প্রথম ও প্রধান কবি হয়েও রবীন্দ্রনাথের বিপুল বিস্তারি প্রতিভার পাশে আপন স্বকীয়তা বজায় রেখেছিলেন সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত।

১৮৮২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি (৩০ মাঘ, ১২৮৮ বঙ্গাব্দ) সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের জন্ম হয় ৷ তাঁর বাবা রজনীনাথ দত্ত ছিলেন পেশায় একজন নামী ব্যবসায়ী এবং তাঁর ঠাকুরদা অক্ষয়কুমার দত্ত ছিলেন ‘তত্ত্ববোধিনী’ পত্রিকার সম্পাদক এবং প্রখ্যাত বিজ্ঞানচিন্তক। তাঁর মায়ের নাম মহামায়া দেবী। সত্যেন্দ্রনাথের দাদুর নাম রামদাস মিত্র এবং দিদিমার নাম বিমলা দেবী। মামা কালীচরণ মিত্র সত্যেন্দ্রনাথকে কাব্যচর্চায় বা সাহিত্যসাধনায় প্রভূত প্রভাবিত করেছিলেন। উত্তরাধিকারসূত্রে ঠাকুরদা অক্ষয়কুমার দত্তের কাছ থেকে তিনি স্বজাত্যবোধের প্রেরণা পেয়েছিলেন। তাঁদের আদি নিবাস ছিল চব্বিশ পরগণার টাকীর গন্ধর্বপুর গ্রামে। সেখান থেকে তাঁরা নবদ্বীপের চুপী গ্রামে চলে এসেছিলেন। ঠাকুরদা অক্ষয়কুমার দত্ত পরবর্তীকালে কলকাতার মসজিদবাড়ি স্ট্রিটে থাকতে শুরু করলে দত্ত-পরিবারও সেই বাড়িতেই উঠে আসে। পরবর্তীকালে ১৯০৪ সালে কনকলতা দেবীর সঙ্গে তাঁর বিবাহ স্থির হয়। কিন্তু বিবাহের এক বছর আগেই সত্যেন্দ্রনাথের বাবা রজনীনাথের মৃত্যু হওয়ায় তাঁদের বিবাহ এক বছর পিছিয়ে গিয়েছিল। কনকলতা ও সত্যেন্দ্রনাথের দাম্পত্য ছিল মধুর, কিন্তু তাঁদের কোনও সন্তানাদি ছিল না।

পূর্ণচন্দ্র ঘোষের তত্ত্বাবধানেই প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয়েছিল সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের। কলকাতার সেন্ট্রাল কলেজিয়েট স্কুল থেকে ১৮৯৯ সালে দ্বিতীয় বিভাগে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে জেনারেল এসেম্বলিজ ইনস্টিটিউশনে ভর্তি হন তিনি। এই স্কুল থেকে ১৯০১ সালে তৃতীয় বিভাগে এফ.এ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন তিনি। মাত্র তেরো বছর বয়সে বাবার সঙ্গে কলকাতা থেকে মধুপুরে আসেন সত্যেন্দ্রনাথ। এই মধুপুরে থাকাকালীনই তাঁর কবিতা লেখার সূত্রপাত বলে জানা যায়। সেই সময় ‘হিতৈষী’ নামের একটি পত্রিকার সঙ্গে সত্যেন্দ্রনাথের সান্নিধ্য ঘটেছিল। কলেজে পড়াকালীন পদার্থবিদ্যায় তাঁর আগ্রহ নজরে আসে সকলের যা সম্ভবত অক্ষয়কুমার দত্তের প্রভাব থেকেই ঘটেছিল। এই সময়েই সুরেশচন্দ্র সমাজপতির প্রেরণায় গল্প লিখতে শুরু করেন তিনি। শেষ পর্যন্ত বি.এ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারেননি সত্যেন্দ্রনাথ ।

বাবা রজনীনাথ দত্ত হোমিওপ্যাথি চিকিৎসায় অভিজ্ঞ ছিলেন বলে তিনি চেয়েছিলেন সত্যেন্দ্রনাথও যেন এই কাজেই যোগ দেয়। কিন্তু আদপে তা ঘটেনি। প্রথাগত পড়াশোনার পাট চুকিয়ে মামা কালীচরণ মিত্রের আমদানি-রপ্তানির ব্যবসায় যোগ দেন সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত । অবশ্য বেশিদিন এই ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারেননি তিনি এবং শেষ পর্যন্ত সাহিত্যচর্চাতেই মনোনিবেশ করেন সত্যেন্দ্রনাথ। ১৯০০ সালে তাঁর লেখা প্রথম কবিতার বই প্রকাশিত হয় ‘সবিতা’ নামে। সুরেশচন্দ্র সমাজপতির ‘সাহিত্য’ পত্রিকাতেও তাঁর কবিতা ছাপা হয়। ১৯০৫ সালে যখন সমগ্র দেশ বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনের জোয়ারে ভাসছে, সেই সময় তাঁর দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘সন্ধিক্ষণ’ প্রকাশ পায়। এই কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলি পরে ‘বেণু ও বীণা’ কাব্যগ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত হয়। তাঁর কবি প্রতিভার মূলে ছিল বস্তু প্রাধান্য, বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ, যুক্তি, নীতি পরায়ণতা, বাস্তবানুরাগ ও স্বজাত্যপ্রীতি। কলেজে পড়াকালীনই রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে তাঁর আলাপ হয়। ক্রমেই তিনি রবীন্দ্রনাথের স্নেহভাজন ও অন্তরঙ্গ আত্মীয় হয়ে ওঠেন। সেকালের অন্যতম রবীন্দ্র-ভক্ত বলে পরিচিত অজিতকুমার চক্রবর্তী, সৌরীন্দ্রমোহন মুখোপাধ্যায়, ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত প্রমুখ ছিলেন তাঁর অন্তরঙ্গ বন্ধু। রবীন্দ্রনাথের পঞ্চাশ বছর পূর্তি অনুষ্ঠান উপলক্ষ্যে টাউন হলে তাঁকে অভিনন্দন জ্ঞাপনে এবং পরে তাঁর নোবেল প্রাপ্তির সংবর্ধনা সভায় সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত অন্যতম উদ্যোগী ছিলেন। দ্বিজেন্দ্রলাল রায় রবীন্দ্রনাথকে ব্যঙ্গ করে যে ‘আনন্দ বিদায়’ প্রহসন লিখেছিলেন তার প্রথম রজনীর অভিনয় পণ্ড করে দিয়েছিলেন সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত এবং তাঁর অন্যান্য রবীন্দ্রানুসারী বন্ধুরা। ১৯১৫ সালে যখন রবীন্দ্রনাথ কাশ্মীর ভ্রমণে যান, তাঁর সঙ্গী হয়েছিলেন সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত । পরবর্তীকালে চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় এবং যতীন্দ্রমোহন বাগচীর সঙ্গেও তাঁর সখ্যতা গড়ে ওঠে। বাংলা সাহিত্যের বিখ্যাত গদ্যকার প্রমথ চৌধুরীর সঙ্গে তাঁর আত্মীয়তা গড়ে উঠেছিল এই সাহিত্যের সূত্রেই। প্রমথ চৌধুরী তাঁকে উৎসর্গ করে ‘পাদচারণ’ নামের একটি কবিতাও লিখেছিলেন বলে জানা যায়।

‘সবিতা’ কাব্যগ্রন্থের সূচনাংশেই দেখা যায় দেশের, জাতির ও অধিবাসীদের কল্যাণের কথা লেখা৷ তাঁর এই কাব্যে দ্বিধাগ্রস্ত বর্তমান ও স্বর্ণময় অতীত ঐতিহ্যের মধ্যে সেতু নির্মাণের চেষ্টা করেছেন তিনি। এই কাব্যগ্রন্থের কবিতায় ধ্বনিত হয় সেই আহ্বানের ছন্দ ”জ্বলিতেছ চিরদিন তুমি হে যেমন / জ্বলে সদা ধরনী তেমন’‘। তাঁর কাব্যে আধুনিকতা ছিল যথেষ্ট বাঙ্ময়৷ তাঁর কবিমানসের অধিষ্ঠাত্রী দেবী ছিলেন দেবী সরস্বতী। কাব্যের রূপকর্ম নির্মাণে, ছন্দ ও শব্দের ব্যবহারে, ধ্বনি স্পন্দন সৃষ্টিতে কবির জাদুস্পর্শে বাংলা কবিতা পেল এক বিচিত্র আনন্দের স্বাদ৷ তাঁর লেখা ‘ফুলের ফসল’ কাব্যের ‘চম্পা’ কবিতা নাটকীয় ভঙ্গিতে লেখা কবির সৌন্দর্যসত্তার নিদর্শন তুলে ধরে৷ সংস্কৃত মালিনী,মন্দাক্রান্তা, রুচিরা, তোটক ইত্যাদি ছন্দকেও বাংলা কবিতায় ব্যবহার করেছেন তিনি। তাঁর কবিতায় ছন্দের কারুকাজ, শব্দ ও ভাষার যথোপযুক্ত ব্যবহারের কৃতিত্বের জন্য তাঁকে ‘ছন্দের জাদুকর’ নামে আখ্যায়িত করা হয়। কবির বন্ধু সমালোচক অজিত কুমার চক্রবর্তী লিখেছেন “ফরাসি কবি পল  ভেরলেন সম্বন্ধে যেমন বলা হয় ‘he paints with sound.’ সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত সম্পর্কেও একই কথা বলা চলে।” রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং তাঁর ‘পূরবী’ কাব্যের ‘সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত’ কবিতায় তাঁর গুণমুগ্ধতার কথা লিখেছিলেন। ছন্দ-মাধুর্যের কারণে তাঁর লেখা ‘পাল্কীর গান’, ‘বর্ষা’, ‘ইলশে-গুঁড়ি’, ‘বজ্র-কামনা’, ‘তাতারসির গান’, ‘পিয়ানোর গান’, ‘সবুজ পরী’, ‘যুক্তবেণী’ ইত্যাদি পদ্যগুলি আজও বাঙালি মানসে জনপ্রিয়। সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের কবিতায় বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বাংলা শ্বাসাঘাতপ্রধান ছন্দের বহুল প্রয়োগে লক্ষ্য করা যায়। প্রচলিত পয়ার ত্রিপদী ছন্দও তাঁর হাতে অনন্য মাত্রা পেত। দীর্ঘ ও লঘু ত্রিপদীর নতুন যতিবিভাগ করে তিনি তাঁদের নতুনভাবে সাজিয়ে তুলেছিলেন। ১৩০০ বঙ্গাব্দে প্রকাশিত তাঁর ‘স্বর্গাদপি গরিয়সী’ কবিতায় স্বদেশপ্রেমের অনুষঙ্গ ফুটে ওঠে। তাছাড়া বিশ্ব-মানবতার জয়গান গেয়েছেন তিনি ‘জাতির পাঁতি’ কবিতায়। ‘গান্ধীজী’ কবিতায় তাঁর গান্ধী-প্রীতির পরিচিয় পাওয়া যায়। অনুবাদ কাব্য রচনার ক্ষেত্রেও বাংলা কবিতায় নতুন স্রোত এনেছিলেন তিনি৷ ইয়েটস, এজরা পাউন্ড, ভেরলেন প্রভৃতি সমকালীন ইউরোপীয় কবিদের কবিতা অনুবাদ করে বাংলা কবিতাকে অনন্য এক মাত্রা দিলেন তিনি৷

শুধু কবিতাই নয়, নাটক, উপন্যাস ও প্রবন্ধ রচনাতেও তাঁর অবদান ছিল অনস্বীকার্য। ১৯১১ সালে সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত নরওয়ের ঔপন্যাসিক জোনাস লাই-এর লেখা ‘লিভস্লাভেন’ উপন্যাসের অনুসরণে রচনা করেন ‘জন্মদুঃখী’ নামের উপন্যাসটি। ১৯১৩ সালে প্রকাশিত তাঁর ‘রঙ্গমল্লী’ নামের অনুবাদ-নাটকের সংকলনে স্টিফেন ফিলিপস, মেটারলিঙ্ক প্রমুখদের নাটকের অনুবাদ ছাপা হয়েছিল। চিনের ঋষি ও মনীষীদের নিয়ে তিনি লেখেন ‘চীনের ধূপ’ নামে একটি পুস্তিকা যা ১৯১২ সালে প্রকাশিত হয়। তাঁর লেখা গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রবন্ধ হল ‘ছন্দ-সরস্বতী’।

নবকুমার কবিরত্ন, কলম্‌গীর, বস্তুতান্ত্রিক চূড়ামণি, ত্রিবিক্রম বর্মণ, সলিলোল্লাস সাঁতরা ইত্যাদি নানাবিধ ছদ্মনাম ব্যবহার করতেন সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত।

১৯০৭ সাল থেকে ১৯১৭ সালের মধ্যে তাঁর লেখা অন্যান্য কাব্যগ্রন্থগুলি হল ‘বেণু ও বীণা’ (১৯০৬), ‘হোমশিখা’ (১৯০৭), ‘তীর্থসলিল’ (১৯০৮), ‘তীর্থরেণু’ (১৯১০), ‘ফুলের ফসল’ (১৯১১), ‘কুহু ও কেকা’ (১৯১২), ‘তুলির লিখন’ (১৯১৪), ‘মণিমঞ্জুষা’ (১৯১৫), ‘অভ্র আবীর’ (১৯১৬) ও ‘হসন্তিকা’ (১৯১৭)। এছাড়াও ‘বেলা শেষের গান'(১৯২৩), ‘বিদায় আরতি'(১৯২৪) প্রভৃতি সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের লেখা বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ। 

১৯২২ সালের ২৫ জুন মাত্র চল্লিশ বছর বয়সে সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের মৃত্যু হয়।

ওনাকে নিয়ে তথ্যমূলক ভিডিও দেখুন এখানে

  1. তথ্যসূত্র

  1. সনজীদা খাতুন, 'কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত', মুদ্রণিকা, মে ১৯৫৮, পৃষ্ঠা ৩-১৩, ১৩৩-১৭০ 
  2. ভবতোষ দত্ত, 'আধুনিকতার পূর্বসূরী সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত', অন্যদিন পত্রিকা, পৃষ্ঠা ১৩-৩১
  3. সৈয়দ আলী আহসান, 'কবি সত্যেন্দ্রনাথ', পরিচয় পত্রিকা, পৌষ ১৩৪৮, পৃষ্ঠা ৫১২-৫২০
  4. অরুণ কুমার মুখোপাধ্যায়, 'রবীন্দ্রানুসারী কবিসমাজ', দে'জ পাবলিশিং, আগস্ট ২০১৭, ৩য় সং, পৃষ্ঠা ২৬-৪০
  5. হরপ্রসাদ মিত্র, 'সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের কবিতা ও কাব্যরূপ', কথামালা প্রকাশনী, ১৩৬৬ বঙ্গাব্দ, ২য় সং, পৃষ্ঠা ১৭-২৮
  6. https://en.wikipedia.org/

2 comments

আপনার মতামত জানান