ইতিহাস

আরভিন শ্রোডিঙ্গার

আরভিন শ্রোডিঙ্গার নামে পরিচিত আরভিন রুডলফ যোশেফ আলেকজান্ডার শ্রোডিঙ্গার (Erwin Rudolf Joseph Alexander Schrödinger) ছিলেন আধুনিক বিজ্ঞানচর্চার ইতিহাসে একজন প্রাতঃস্মরণীয় ব্যক্তিত্ব। অস্ট্রীয়-আইরিশ এই তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানীই কোয়ান্টাম তত্ত্বের একাধিক যুগান্তকারী গবেষণা করেন, যা কোয়ান্টাম মেকানিক্সের চর্চাকে অনেকাংশে এগিয়ে দেয়। নোবেলজয়ী এই বিজ্ঞানী পদার্থবিদ্যার নানা দিক যেমন – স্ট্যাটিস্টিকাল মেকানিক্স, ইলেক্ট্রোডায়ানামিক্স, সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদ, সৃষ্টিতত্ত্ব ইত্যাদি নিয়ে গবেষণা করেছেন। তিনি বিজ্ঞানের দার্শনিক দিকের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিতেন। এছাড়াও, প্রাচীন এবং প্রাচ্য দর্শন, নীতিশাস্ত্র, ধর্মসম্পর্কেও তাঁর বিশেষ আগ্রহ ছিল। পদার্থবিজ্ঞানের পাশাপাশি দর্শন এবং তাত্ত্বিক জীববিদ্যার ওপর শ্রোডিঙ্গারের বেশ কিছু বই আছে। গবেষণা এবং বিজ্ঞানচর্চায় তাঁর অভূতপূর্ব অবদানের সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন বিষয়ে তাঁর লেখা আমাদের সমৃদ্ধি করে। পাশাপাশি আঁকার প্রতিও তাঁর বিশেষ আগ্রহ ছিল।

১৮৮৭ সালের ১২ আগস্ট অস্ট্রিয়ার ভিয়েনা শহরের (Vienna) আর্ডবার্গ (Erdberg) এলাকায় আরভিন শ্রোডিঙ্গারের জন্ম হয়। তিনি ছিলেন বাবা রুডলফ শ্রোডিঙ্গার (Rudolf Schrödinger) এবং মা এমিলিয়া ব্রেন্ডা শ্রোডিঙ্গারের (Emilia Brenda Schrödinger) একমাত্র সন্তান। তাঁর বাবা একজন উদ্ভিদবিজ্ঞানী ছিলেন এবং মা ছিলেন রসায়নবিদ্যার অধ্যাপিকা। মা এবং বাবা উভয়ের বিজ্ঞানচর্চা শ্রোডিঙ্গারকে ছোট থেকেই ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করেছে।

১৯০৬ থেকে ১৯১০ পর্যন্ত শ্রোডিঙ্গার ভিয়েনাতে ফ্রাঞ্জ এস. এক্সনার (Franz S. Exner) এবং ফ্রেড্রিক হাসেনর্লের (Friedrich Hasenöhrl) কাছে পড়াশোনা করতে থাকেন। পাশাপাশি তিনি কার্ল উইলহেল্ম ফ্রেড্রিক ফ্রিতজ কোলরশের (Karl Wilhelm Friedrich Fritz Kohlrausch) কাছেও পরীক্ষামূলক কাজ করতেন। ১৯১১ সালে তিনি এক্সনারের সহযোগী নিযুক্ত হন।

১৯১৪ থেকে ১৯১৮ সাল পর্যন্ত তিনি প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। ১৯২০ সালে জেনাতে (Jena) ম্যাক্স উইয়েনের (Max Wien) সহযোগী নিযুক্ত হন। সেই বছরেই সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে তাঁর উন্নতি হয়। ১৯২১ সালে তিনি ব্রেসলওতে (Breslau) অধ্যাপনার সুযোগ পান। ১৯২১ সালে তিনি জুরিখ বিশ্ববিদ্যালয়ে (University of Zurich) চলে যান। ১৯২৭ সালে বার্লিনে ফ্রেড্রিক উইলহেল্ম বিশ্ববিদ্যালয়ে (Friedrich Wilhelm University) ম্যাক্স প্লাঙ্ককে (Max Planck) অনুসরণ করার সুযোগ পান। তিনি প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ে (Princeton University) পড়াবার সুযোগ পান, কিন্তু তা প্রত্যাখ্যান করেন। এডিনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে (University of Edinburgh) তাঁর পড়ানোর সম্ভাবনা তৈরি হলেও ভিসা না আসায় তা হয়ে ওঠেনি। এমনকি তিনি ভারতের এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের (Allahabad University) পদার্থবিদ্যা বিভাগের চেয়ারপার্সনের দায়িত্বও স্বীকার করেছিলেন। তবে, শেষ পর্যন্ত তিনি ১৯৩৬ সালে অস্ট্রিয়ার গ্রাজ বিশ্ববিদ্যালয়ে (University of Graz) নিযুক্ত হন।

কর্মজীবনের শুরুর দিকে আরভিন শ্রোডিঙ্গার তাঁর প্রাক্তন শিক্ষক ফ্রাঞ্জ এক্সনারের সঙ্গে বিদ্যুৎ এবং তেজস্ক্রিয়তা নিয়ে গবেষণা করতেন। একইসঙ্গে তিনি ভাইব্রেশনাল তত্ত্ব (Vibrational Theory), ব্রাউনীয় গতি (Brownian Movement) নিয়ে পড়াশোনা করতে থাকেন। তাঁর কর্মজীবনের প্রথম পাঁচ বছরের মধ্যেই তিনি কোয়ান্টাম তত্ত্ব সম্পর্কে ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক, অ্যালবার্ট আইন্সটাইন (Albert Einstein), নীলস বোর (Niels Bohr), আর্নল্ড সমারফিল্ডের (Arnold Sommerfold) দেওয়া ধারণা সম্পর্কে অবগত হয়ে যান যা তাঁকে তাত্ত্বিক পদার্থবিদ্যার ওপরে কাজ করতে সাহায্য করেছিল। কিন্তু সেই মুহূর্তেই তিনি পদার্থবিদ্যার প্রচলিত পদ্ধতি থেকে সরে আসতে রাজি ছিলেন না। ১৯২৬ সালের জানুয়ারি মাসে তিনি ওয়েভ মেকানিক্সের (Wave Mechanics) ওপর একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন।

কোয়ান্টাম মেকানিক্স নিয়ে কাজ করার পাশাপাশি শ্রোডিঙ্গার একটি সমন্বিত ক্ষেত্র তত্ত্বের (Unified Field Theory) ওপর কাজ করার জন্য বিশেষ জোর দেন যা সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদের মৌলিক কাঠামো্র মধ্যে মাধ্যাকর্ষণ, তড়িৎচুম্বকত্ব এবং নিউক্লীয় শক্তিকে (Nuclear Forces) সমন্বিত করতে পারবে। শ্রোডিঙ্গার এই কাজটি দীর্ঘদিন ধরে আইনস্টাইনের সঙ্গে যৌথভাবে করেছিলেন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য আইনস্টাইনের সঙ্গে দীর্ঘদিন কাজ করার সময়েই তিনি যে পরীক্ষাটিকে আজকের পৃথিবী ‘শ্রোডিঙ্গারের বিড়াল’ (Schrödinger;s Cat) নামে জানে, সেই বিষয়টি প্রস্তাব করেছিলেন। বাস্তবে এরকম কোনো পরীক্ষা হয়নি। এটি শুধুমাত্র শ্রোডিঙ্গারের প্রস্তাবিত একটি পরীক্ষামূলক অবস্থা।

পদার্থবিদ্যার পাশাপাশি মনোবিদ্যার ওপরেও শ্রোডিঙ্গারের বিশেষ আগ্রহ ছিল। রঙের সংবেদনের (Colour Perception) মনঃস্তত্ত্ব নিয়ে শ্রোডিঙ্গারের কাজ নিউটন, ম্যাক্সওয়েল (Maxwell), ভন হেল্মহোল্টজের (von Helmholtz) গবেষণা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে করা। মনোবিদ্যার পাশাপাশি দর্শন, বিশেষত ভারতীয় দর্শনের প্রতি শ্রোডিঙ্গারের প্রবল আগ্রহ ছিল। উপনিষদে বর্ণিত চেতনার রহস্যময় দিক সম্পর্কে তিনি উৎসাহী ছিলেন। তিনি আর্থার শোপেনহাওয়ার (Arthur Schopenhauer), বারুচ স্পিনোজার (Baruch Spinoza) কাজে ভীষণভাবে প্রভাবিত হন। তাঁর লেখা বা আলোচনায় তিনি চেতনা, মুক্তি ইচ্ছা, ইন্দ্রিয় সংবেদন ইত্যাদি বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন।

১৯২০ সালের ৬ এপ্রিল আরভিন শ্রোডিঙ্গার আনেমারি বার্টেলকে (Annemarie Bertel) বিয়ে করেন। তিনি টিউবারকিউলোসিসে আক্রান্ত ছিলেন। ১৯২০-এর দশকে তাঁকে একাধিকবার আরোসার (Arosa) একটি সানাটোরিয়ামে (Sanatorium) থাকতেও হয়েছিল।

১৯৩৩ সালে তিনি শ্রোডিঙ্গার সমীকরণের (Schrödinger Equation) জন্য পদার্থবিদ্যায় নোবেল পুরস্কার পান। ১৯৩৭ সালে ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক মেডাল (Max Planck Medal) পান। ১৯৪৯ সালে রয়াল সোসাইটির বিদেশি সদস্য (Foreign Member of the Royal Society) নির্বাচিত হন। ১৯৫৬ সালে অস্ট্রিয়ান আকাদেমি অফ সায়েন্সেসের (Austrian Academy of Sciences) আরভিন শ্রোডিঙ্গার পুরস্কার (Erwin Schrödinger Prize) পান। ১৯৫৭ সালে অস্ট্রিয়ান ডেকোরেশন ফর সায়েন্স অ্যান্ড আর্ট (Austrian Decoration for Science and Art) পুরস্কার পান। তাঁর প্রতি সম্মান জানাতে তাঁর নামে আয়ারল্যান্ডের (Ireland) লিমেরিকে (Limerick) লিমেরিক বিশ্ববিদ্যালয়ের (University of Limerick) একটি ভবনের নামকরণ করা হয়েছে।

টিউবারকিউলোসিসের জন্যই এই কৃতী বিজ্ঞানীর ভিয়েনাতে ১৯৬১ সালের ৪ জানুয়ারি ৭৩ বছর বয়সে মৃত্যু হয়।

সববাংলায় পড়ে ভালো লাগছে? এখানে ক্লিক করে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ভিডিও চ্যানেলটিওবাঙালি পাঠকের কাছে আপনার বিজ্ঞাপন পৌঁছে দিতে যোগাযোগ করুন – contact@sobbanglay.com এ।


Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।