ইতিহাস

প্লিনি

প্লিনি

প্লিনি (Pliny the Elder) একজন রোমান লেখক ও প্রকৃতিবাদী দার্শনিক ছিলেন যিনি বিশ্বের প্রথম বিশ্বকোষ রচনা করার জন্য জগদ্বিখ্যাত। তাঁর লেখা সেই বিশ্বকোষের নাম ছিল ‘ন্যাচারালিস হিস্টোরিয়া’ তথা ‘ন্যাচারাল হিস্ট্রি’। তাঁর লেখা এই বইটিই পরবর্তীকালে আধুনিকতম বিশ্বকোষ রচনার নমুনা হিসেবে পরিগণিত হয়। প্লিনি তাঁর অবসর জীবনের বেশিরভাগ সময়ই লেখালিখি, পড়াশোনা ও প্রাকৃতিক এবং ভৌগোলিক নানাবিধ ঘটনা পর্যবেক্ষণ করেই কাটিয়েছিলেন। প্লিনির অন্যতম সর্বশ্রেষ্ঠ কাজের মধ্য উল্লেখযোগ্য হল ‘বেলা জার্মানিয়া’ তথা ‘দ্য হিস্ট্রি অফ দ্য জার্মান ওয়ার্স’। কিন্তু এই বইটি বর্তমানে লুপ্ত। অনেক বিখ্যাত ঐতিহাসিকদের মতে প্রাচীন গ্রিসের দার্শনিক ও ইতিহাসবিদ ট্যাসিটাস জার্মানির উপর একটি বই রচনার সময় প্লিনির লেখা ‘বেলা জার্মানিয়া’ বইটিকেই প্রধান উৎস হিসেবে বিবেচনা করেছিলেন।

আনুমানিক ২৩ খ্রিস্টাব্দের শেষে অথবা ২৪ খ্রিস্টাব্দের শুরুর দিকে প্রাচীন রোমের গল প্রদেশের অন্তর্গত নোভাম কোমাম শহরে এক ধনী অশ্বারোহী পরিবারে প্লিনির জন্ম হয়। তাঁর আসল নাম গাইয়াস প্লিনিয়াস সেকেন্দাস। তাঁর বাবার নাম গাইয়াস প্লিনিয়াস সেলার এবং তাঁর মায়ের নাম মার্সেলা। তাঁদের পরিবার মধ্যযুগীয় নাইটদের মত উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন ছিল এবং তাই তাঁদেরকে ‘ইকুয়েস্ট্রিয়ান’ বলা হত। সামরিক বাহিনীর পদগুলিতে এই মর্যাদার ব্যক্তিরাই যোগ দিতেন। তাঁদের পরিবারের সঙ্গে তৎকালীন রোমান সম্রাট টাইবেরিয়াসের ঘনিষ্ঠ সংযোগ ছিল।


এই ধরণের তথ্য লিখে আয় করতে চাইলে…

আপনার নিজের একটি তথ্যমূলক লেখা আপনার নাম ও যোগাযোগ নম্বরসহ আমাদের ইমেল করুন contact@sobbanglay.com


 

তাঁর বাবা প্লিনিকে রোমে নিয়ে যান আইন প্রণয়ন বিষয়ে শিক্ষিত করে তোলার জন্য। রোমান সিনেটর তথা ঐতিহাসিক মার্কাস সার্ভিলাস নোনিয়ানাসের কাছে প্লিনি শিক্ষাগ্রহণ করেছিলেন বলে জানা যায়।

অশ্বারোহী পদমর্যাদার যুবকদের রীতি অনুযায়ী প্লিনি একজন জুনিয়র অফিসার হিসেবে সেনাবাহিনীতে যোগদান করেন। প্লিনির গবেষক রোনাল্ড সাইম সেনাবাহিনীতে প্লিনির পদোন্নতির তিনটি পর্যায়কে চিহ্নিত করেছেন। ৪৭ খ্রিস্টাব্দে রোমের স্বাচ্ছন্দ্য ত্যাগ করে জার্মানিতে যুদ্ধের জন্য রাইনে একজন অফিসার ক্যাডেট হিসেবে কাজে যোগ দেন প্লিনি। পরে সহকারী পদাতিক বাহিনী এবং একটি অশ্বারোহী শাখার কমান্ডার হিসেবে উন্নীত হন প্লিনি। ব্রিটেন আক্রমণের সঙ্গে তাঁর জড়িত থাকার বিষয়টিও অনেক ঐতিহাসিক স্বীকার করেছেন। ফ্ল্যাভিয়ান রাজবংশের শাসনকালে পশ্চিম ভূমধ্যসাগরের দায়িত্বে অ্যাডমিরাল পদে থাকার সময় প্লিনি তাঁর কর্মজীবনকে পুনরুত্থিত করেন। জার্মানিতে থাকাকালীন ঘোড়ার পিঠের উপর থেকে নিপুণভাবে বর্শা নিক্ষেপের কঠিন শিল্পের উপর তিনি একটি বই লেখেন। পরবর্তীকালে রোমান সম্রাট ভেসপাসিয়ানের সঙ্গেও প্লিনির বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে এবং উভয়েই রাত জেগে বহু সময় কথোপকথন চালাতেন। জ্ঞান ও দক্ষতার জন্যেও সুবিদিত ছিল প্লিনির নাম। রোনাল্ড সাইমের মতে, জার্মানিয়া ইনফিরিয়রে জনৈক লেখক গ্লেনিয়াস ডোমিটিয়াস কর্বুলোর অধীনে একজন কোহর্ট-কমান্ডার হিসেবে কাজ করেছিলেন প্লিনি। ৪৭ খ্রিস্টপূর্বাব্দেই কাউসিতে রোমানদের বিজয় এবং মাস ও রাইন নদীর মাঝে খাল তৈরিতে অংশগ্রহণ করেন তিনি। পরে তাঁকে পাবলিয়াস পম্পেনিয়াস সেকেন্ডাসের অধীনে জার্মানিয়া সুপিরিয়র কমান্ডে উন্নীত করা হয় এবং একটি সামরিক ট্রিবিউনে স্থান দেওয়া হয়। অনেকের মতে, ২৭ বছর বয়সে আনুমানিক ৫০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে শ্যাট্টির বিরুদ্ধে প্রচারে অংশ নিয়েছিলেন তিনি। কমান্ডার অফ প্রেটোরিয়াম পদে থাকার সময় পণ্ডিত ব্যক্তি পম্পোনিয়াসের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব তৈরি হয়। পরবর্তীকালে আবার প্লিনিকে জার্মানিয়া ইনফিরিয়রে স্থানান্তরিত করা হয় এবং তার কিছুদিন পরেই কমান্ডার অফ এ উইং পদে উন্নীত করা হয় প্লিনিকে। তাঁর অধীনে সেই সময় ৪৮০ জন সামরিক সৈন্য ছিল। এই পদেই তিনি বাকি কর্মজীবন কাটিয়েছেন।

এই সময়ের মধ্যেই তিনি তাঁর প্রথম বইটি লিখেছিলেন বলে মনে করা হয়। ঘোড়ার পিঠ থেকে জ্যাভলিন ছোঁড়ার কৌশল অবলম্বন করে ক্ষেপণাস্ত্র ছোঁড়ার বিষয়ে একটি বই লিখেছিলেন প্লিনি যার নাম ‘অন দ্য ইউজ অফ ডার্ট বাই ক্যাভালরি’। এই বইটির অস্তিত্ব না পাওয়া গেলেও প্লিনি তাঁর বিখ্যাত বই ‘ন্যাচারাল হিস্ট্রি’-র একটি অধ্যায়ে এই বিষয়টি সামান্য সংযোজন করেছিলেন। এমনকি তিনি স্বপ্নও দেখেছিলেন যে ড্রুসাস নিরো তাঁকে তাঁর স্মৃতিকে উদ্ধার করতে নির্দেশ দিচ্ছেন এবং এই স্বপ্নের প্রভাবেই রোম ও জার্মানির সকল যুদ্ধের ইতিহাস রচনা করতে উৎসাহী হয়ে পড়েছিলেন প্লিনি। যদিও এই বর্ণনার সত্যতা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। ৬৮ খ্রিস্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত তিনি চাকরি ছেড়ে দেননি, রাষ্ট্রীয় কোনও পদের দায়িত্বেও সেই সময় তিনি ছিলেন না। কিন্তু ফ্লাভিয়ান বংশের শাসনকালে তাঁর প্রতিপত্তি ও যশ এতই বেড়ে যায় যে তাঁকে রাষ্ট্রীয় চাকরির দায়িত্ব সামলানোর জন্য আইন অভ্যাস ত্যাগ করতে হয়। পরবর্তীকালে তিনি দুই খণ্ডে সেনাপতি পম্পেনিয়াস সেকেণ্ডাসের জীবনী রচনা করেছেন। এই সময়পর্বে রোমের মসনদে বসেছিলেন সম্রাট নিরো যার বিরোধিতা করার জন্য প্লিনিকে গা ঢাকা দিয়েও থাকতে হয়েছিল কিছুকাল। পরে ভেসপাসিয়ান সম্রাট হলে তাঁর প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে নিযুক্ত হন প্লিনি। উপদেষ্টা পদ থেকে রাজ্যপালের পদেও উন্নীত হন তিনি। এই সময়পর্বেই প্লিনি রোম ও জার্মানির যুদ্ধের ইতিহাস বিষয়ে ২০ খণ্ডের একটি বিশালাকায় গ্রন্থ রচনা করেছিলেন। ৭৭ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত হয় প্লিনির সর্বশ্রেষ্ঠ কাজ ‘ন্যাচারালিস হিস্টোরিয়া’। এই বইটিকেই আধুনিক সময়ের প্রথম বিশ্বকোষ বলে চিহ্নিত করা হয়। ৩৭ খণ্ডে বিন্যস্ত এই বইতে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, অন্য পণ্ডিতদের কাজের নির্যাস এবং নিজের আগের কাজই ছিল এই বইয়ের মূল ভিত্তি। এই বই লেখার সময় তাঁর এক সহকারী উচ্চস্বরে গ্রিক পণ্ডিতদের লেখাগুলি পড়তেন এবং তা শুনে শুনে সেই নির্যাসটুকু লিখে রাখতেন প্লিনি। কোনও কোনও সময় তিনিও মুখে মুখে বলতেন আর একজন অনুলেখক তা লিপিবদ্ধ করতেন। তাঁর এই লিপিবদ্ধ নির্যাস প্রায় ১৬০টি খণ্ডে বিন্যস্ত হয়েছিল যা জনৈক লার্সিয়াস লিসিনিয়াস ৪ লক্ষ রোমান মুদ্রার বিনিময়ে কিনে নিতে চেয়েছিলেন, কিন্তু এই প্রস্তাবে অসম্মত হন প্লিনি। উদ্ভিদবিদ্যা, প্রাণীবিদ্যা, ভূতত্ত্ব এবং জ্যোতির্বিদ্যা এমনকি খনিজবিদ্যা সম্পর্কেও বহু তথ্য সন্নিবিষ্ট করেছেন প্লিনি তাঁর এই বইতে এবং তিনি নিজেও বিশ্বাস করতেন যে রোমান সাম্রাজ্যে তাঁর আগে কেউ এই ধরনের কাজ করেননি। ঐতিহাসিকরা এই বইটিকেই পৃথিবীর প্রথম বিশ্বকোষ হিসেবে দাবি করেন এবং এই বইটি এখনও টিকে আছে। প্রাচীন রোমের ঐতিহ্য, কল্পনা ও সংস্কার সম্পর্কে ধারণা করার জন্য অনেকেই প্লিনির এই বইটিকেই প্রামান্য হিসেবে বিবেচনা করেন। পরীক্ষিত বিষয়ের উপস্থিতি, মূল লেখকদের নামের উল্লেখের প্রয়োজনীয়তা, সংহত সূচিপত্রের উপস্থিতির কারণে প্লিনির লেখা ‘ন্যাচারালিস হিস্টোরিয়া’ পরবর্তীকালের বিশ্বকোষ রচনার নমুনা হয়ে উঠেছে। এই বইয়ে বেশিরভাগ তথ্যই ছিল গ্রিক পণ্ডিতদের উক্তি থেকে ঋণকৃত। তবে এর মধ্যে থাকা তথ্য অনেক সময়ই ভুল ছিল। বৈজ্ঞানিক ঘটনার মনগড়া ব্যাখ্যাও ছিল এই বইতে। এই বইতেই দেখা যায় গ্যালিলিওর ১৭০০ বছর আগে প্লিনিই প্রথম পৃথিবীর জোয়ার ভাটার উপর চাঁদ ও সূর্যের প্রভাব সম্পর্কে ধারণা দিয়েছিলেন। আবার প্রত্যেক প্রাণীরই যে মৃত্যুর পর ওজন বেড়ে যায় তাও স্বীকার করেছিলেন প্লিনি এই বইতে।    

প্লিনির ভাগ্নে প্লিনি দ্য ইয়ঙ্গার এবং কয়েকজন বিখ্যাত ঐতিহাসিক প্লিনিকে কাজপাগল বলেই ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি সময় নষ্ট করা একদমই পছন্দ করতেন না, গভীর রাত পর্যন্ত লেখালিখি করতেন এবং লেখালিখির ক্ষতি হবে বা সময় নষ্ট হবে বলে তিনি কখনও বিবাহও করেননি, সন্তান উৎপাদনও করেননি। হেঁটে বেড়ানো বা ভ্রমণকে তিনি সময়ের অপচয় বলে মনে করতেন আর তাই তিনি সমগ্র রোম একটি সেডান চেয়ারে বসে ঘুরে বেড়াতেন, সঙ্গে থাকতেন তাঁর এক সেক্রেটারি যিনি প্লিনির সঙ্গে সঙ্গে অনবরত নোটস নিতেন। যদিও তাঁর গলার একটি প্রদাহজনিত কারণে তাঁর শ্বাসকষ্টের সমস্যা দেখা দেয় এবং সেই কারণেই হাঁটাহাঁটি একপ্রকার বন্ধ করে দেন তিনি। শীতকালে যাতে তিনি ঘোড়ায় চড়ার সময়েও বা বাইরে ভ্রমণের সময়েও লিখতে পারেন, তাই লম্বা হাতাযুক্ত পোশাক পরতেন। প্লিনি নিজেই বলেছেন যে বিশ্বকোষ লেখার জন্য প্রায় ১০০ জন পণ্ডিত ব্যক্তির প্রায় হাজার দুয়েক বই তাঁকে পড়তে হয়েছে এবং তার ফলেই প্রায় ২০ হাজারেরও বেশি তথ্য বিন্যস্ত করতে পেরেছিলেন তিনি। মৃত্যুর আগে তিনি তাঁর সমস্ত সম্পত্তি রেখে যান তাঁর ভাগ্নে প্লিনি দ্য ইয়ঙ্গারের জন্য।

আনুমানিক ৭৯ খ্রিস্টপূর্বাব্দে ৫৫ বছর বয়সে প্লিনির মৃত্যু হয়।

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

-
এই পোস্টটি ভাল লেগে থাকলে আমাদের
ফেসবুক পেজ লাইক করে সঙ্গে থাকুন

বিধান রায় ছিলেন আদ্যোপান্ত এক রসিক মানুষ। তাঁর রসিকতার অদ্ভুত কাহিনী



বিস্তারিত জানতে ছবিতে ক্লিক করুন