ইতিহাস

তারকনাথ পালিত

তারকনাথ পালিত (Taraknath Palit)  একজন প্রখ্যাত বাঙালি আইনজীবী যাঁর দানকৃত অর্থে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিভাগ স্থাপিত হয়। তিনি প্রায় নগদ পনেরো লক্ষ টাকা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়কে দান করে যান। এছাড়াও তিনি তাঁর পার্শিবাগানের বাড়ি ও তাঁর তৎকালীন বাসস্থান ৩৫ নং বালিগঞ্জ সার্কুলার রোডের বাড়িটি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়কে দান করেন। ১৯১৬ সালে পার্শিবাগানে তাঁর দানকৃত বাড়িটিতেই কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিভাগের কলেজ তৈরি করা হয় যেটি পরে রাজাবাজার সায়েন্স কলেজ (Rajabazar Science College) নামে খ্যাতি লাভ করে এবং তাঁর বালিগঞ্জ সার্কুলার রোডের বাড়িটি বালিগঞ্জ সায়েন্স কলেজ (Ballygunge Science College) নামে খ্যাতি লাভ করে। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় নির্মাণেও তিনি প্রভূত অবদান রেখে গেছেন।

১৮৩১ সালের অক্টোবর মাসে কলকাতার একটি ধনী পরিবারে তারকনাথ পালিতের জন্ম হয়। তাঁর বাবার নাম কালীশংকর পালিত। খুব অল্প বয়সে তাঁর বাবার মৃত্যু হয়। কিন্তু তাঁর ঠাকুরদা তাঁর ভরণপোষণের দায়িত্ব নেওয়ায় তাঁকে অর্থকষ্টে পড়তে হয়নি। হুগলির আমারপুরে তারকনাথের ছোটবেলা কাটে।

তারকনাথ কলকাতার হিন্দু স্কুল থেকে পড়াশোনা করেন। এই স্কুলে তাঁর সহপাঠী ছিলেন সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর। ১৮৬৭ সালে তিনি যে সময়ে ইংল্যান্ড গিয়ে আইন নিয়ে পড়াশোনা করেন সেই সময়ে ভারতীয়দের পক্ষে ইংল্যান্ডে আইন নিয়ে পড়াশোনা করা খুব সহজ ছিলনা। স্বল্পসংখ্যক বাঙালি যাঁরা ব্রিটেনে আইন নিয়ে পড়াশোনা করার সুযোগ পান তাঁদের মধ্যে তিনি  অন্যতম ছিলেন। তারকনাথ ছাত্র হিসেবে খুবই মেধাবী ছিলেন। ইংল্যান্ডে আইন পড়াকালীন তাঁর সাথে আনন্দরাম বড়ুয়ার সাথে বন্ধুত্ব হয়। আনন্দরাম বড়ুয়া ছিলেন প্রথম অসমীয়া স্নাতক। ব্যারিস্টারি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ১৮৭১ সালে ভারতে ফিরে আসেন তিনি। 

তারকনাথ ব্যারিস্টার হিসেবে বেশিরভাগ সময় ফৌজদারি মামলা সামলাতেন। তাঁর সময়ে কলকাতায় তাঁর মতন ফৌজদারি মামলায় সুদক্ষ আর কেউ ছিলনা। ফলে তাঁর নাম চারিদিকে ছড়িয়ে পড়তে থাকে। ব্যক্তি হিসেবে তারকনাথ খুবই স্বাধীনচেতা মানুষ ছিলেন। অন্যের মন জুগিয়ে চলার মতো মনোভাব তাঁর ছিল না। তাঁর এই স্বাধীনচেতা স্পষ্টবাদী মনোভাবের কারণে পেশাগতভাবে তাঁকে অনেক বাধার সম্মুখীন হতে হত এবং একারণেই তাঁকে অনেকেই অপছন্দ করতেন। মূলত সেই কারণেই তাঁর যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও তিনি ব্যারিস্টার হিসেবে খুব বেশি উন্নতি করতে পারেননি। রুক্ষ স্বভাবের মানুষ হলেও তারকনাথ খুবই বন্ধুবৎসল ছিলেন। বিপদে আপদে তিনি তাঁর বন্ধুদের পাশে সর্বদা দাঁড়াতেন। তবে কেউ কখনো তাঁর সাথে শত্রুতা করলে তিনি তাকে কখনো ক্ষমা করতেন না। সেই কারণে তাঁর বন্ধু থেকে শত্রুর সংখ্যাই বেশি ছিল।

তারকনাথ পালিত এক সময় স্বাধীনতা আন্দোলনের সাথে জড়িয়ে পড়েন। ভারতীয় কংগ্রেস পার্টিকে তিনি প্রয়োজনে অর্থ সাহায্যও করতেন। তিনি চাইতেন ভারতীয় সমাজ সবরকম কুসংস্কার থেকে মুক্ত হোক, ভারতে বিজ্ঞান শিক্ষার প্রসার ঘটুক, উপার্জনের নানান দিক উদঘাটিত হোক এবং কৃষি শিল্পের উন্নতি হোক। সে কারণে তিনি নানান সংস্কার মূলক কাজে প্রভূত অর্থ দান করতেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি হওয়ার সময়ে তিনি তাঁর জীবনের যাবতীয় সঞ্চয় এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তৈরীর কাজে দান করেন। প্রথমে ১৯০৫ সালে তিনি জাতীয়  শিক্ষা পরিষদ (National Council of Education, NCE) প্রতিষ্ঠার জন্য অর্থ সাহায্য করেন। কিন্তু সেই প্রতিষ্ঠানের স্থায়িত্বের প্রতি তিনি সন্দিহান হয়ে পড়লে সেখান থেকে তাঁর দানের অর্থ তুলে নিয়ে ১৯১২ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান শাখায় দান করেন। সেই অর্থ দিয়ে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়নবিদ্যা এবং পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ দুটিকে আরও উন্নত মানের করে তোলা হয়। তার পাশাপাশি সেই অর্থের দ্বারা সেই দুটি বিভাগের ছাত্র ছাত্রীদের নানাভাবে সাহায্য করা হতে থাকে। এই বিভাগ দুটিতে তাঁর পরামর্শে ভারতীয় শিক্ষক নিয়োগের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। তাঁর দান পত্রের শর্ত ছিল রসায়ন এবং পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে কেবলমাত্র ভারতীয় শিক্ষকই নিয়োগ করতে হবে। যদি তা না পাওয়া যায় তাহলে দেশের মেধাবী শিক্ষকদের শিক্ষা ও অভিজ্ঞতা লাভের জন্য  বিদেশে পাঠাতে হবে। এছাড়াও সেই অর্থ দিয়ে একটি ল্যাবরেটরি (laboratory) তৈরি করা হয়।

১৯০৬ সালে মহারাজা মণীন্দ্রচন্দ্র নন্দী, রাসবিহারী ঘোষ, ভূপেন্দ্রনাথ বসু এবং নীলরতন সরকারের সাথে তারকনাথ বেঙ্গল টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউট (Bengal Technical Institute) তৈরি করেন যার মূল উদ্দেশ্য ছিল স্বদেশী আন্দোলনকে সমর্থন করা এবং এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। তারকনাথ তাঁর পার্শিবাগানের বাড়িটি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়কে দান করেন। এছাড়াও তাঁর তৎকালীন বাসস্থান ৩৫ নং বালিগঞ্জ সার্কুলার রোডের বাড়িটিও তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়কে দান করে যান। এছাড়াও তিনি প্রায় নগদ পনেরো লক্ষ টাকা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়কে দান করে গেছেন। ১৯১৬ সালে পার্শিবাগানে তাঁর দান করা বাড়িটিতে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিভাগের কলেজ  তৈরি করা হয় যেটি পরে রাজাবাজার সায়েন্স কলেজ (Rajabazar Science College) নামে খ্যাতি লাভ করে। আর বালিগঞ্জ সার্কুলার রোডে তাঁর দান করা বাড়িটিতে বালিগঞ্জ সায়েন্স কলেজ (Ballygunge Science College) তৈরি করা হয়। তাঁর এই দানের জন্য তৎকালীন সমস্ত পত্র পত্রিকায় তাঁর প্রভূত প্রশংসা করা হয়েছিল। তিনি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তোলার কাজে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিলেন।

১৯১৩ সালের ১ জানুয়ারি, ব্রিটিশ  গভর্নমেন্ট তাঁকে ‘নাইট’ (Knight) উপাধি প্রদান করে। তিনিই প্রথম বাঙালি যিনি এই উপাধি পান। তাঁর আগে হাইকোর্টের বিচারক ছাড়া নাইট উপাধি কোন বাঙালি কখনো পাননি। অতিরিক্ত অর্থ দান করার ফলে শেষ বয়সে তাঁকে প্রবল অর্থকষ্টের সম্মুখীন হতে হয়। ১৯১৪ সালের ৩ অক্টোবর ৮৩ বছর বয়সে তারকনাথ পালিতের মৃত্যু হয়।

তাঁকে বিশেষ সম্মান জানানোর জন্য কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিদ্যা বিভাগে তারকনাথ পালিতের নামাঙ্কিত একটি চেয়ার রয়েছে। চেয়ারটির নাম দেওয়া হয় ‘পালিত চেয়ার অফ ফিজিকস’ (Palit Chair of Physics)। এটি একটি বিশিষ্ট পদ যেটিতে পদার্থবিদ্যার  স্বনামধন্য বিভিন্ন অধ্যাপকেরা মনোনীত হন। ১৯১৭ সালে  নোবেলজয়ী পদার্থবিদ সি ভি রামন সেই পদে নিযুক্ত হন। এরপরে দেবেন্দ্রমোহন বসু, মেঘনাদ সাহা, বাসন্তী দুলাল নাগচৌধুরী, চঞ্চল কুমার মজুমদার এবং বর্তমানে অমিতাভ রায় চৌধুরী সেই পদটিতে নিযুক্ত হয়েছেন।

তথ্যসূত্র


  1. আত্মকথাঃ সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর,প্রকাশ সাল: ১৯১৫ খ্রিস্টাব্দ (১৩২২ বঙ্গাব্দ). পৃষ্ঠা- ৫৬-৫৮
  2. শিরোনামঃ জীবনী কোষ, তৃতীয় খণ্ড,লেখকঃ শশিভূষণ বিদ্যালঙ্কার,প্রকাশসালঃ ১৯৩৮ খ্রিস্টাব্দ (১৩৪৫ বঙ্গাব্দ),প্রকাশকঃ দেবব্রত চক্রবর্তী, পৃষ্ঠা- ৩২৮-৩৩০
  3. সংসদ বাঙালি চরিতাভিধান : প্রায় চার সহস্রাধিক জীবনী-সংবলিত আকর গ্রন্থ / প্রধান সম্পাদক, সুবোধচন্দ্র সেনগুপ্ত ; সম্পাদক, অঞ্জলি বসু. সংশোধিত ও সংযোজিত, পঞ্চম সংস্করণ, পৃষ্ঠা- ১৮৭
  4. https://en.wikipedia.org/
  5. https://blogs.eisamay.indiatimes.com/
  6. https://en.wikipedia.org/wiki/
  7. https://www.thegazette.co.uk/London/issue/28690/page/1147

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

ভারতীয় উপমহাদেশের সবচেয়ে শিক্ষিত ব্যক্তি


শ্রীকান্ত জিচকর
শ্রীকান্ত জিচকর

এনার সম্বন্ধে জানতে এখানে ক্লিক করুন