ইতিহাস

সি.ভি.রামন

চন্দ্রশেখর ভেন্কট রামন (Chandra Shekhar Venkata Raman) যিনি সি.ভি.রামন নামেই বেশি পরিচিত, একজন স্বনামধন্য ভারতীয় পদার্থবিদ যিনি আলোকবিজ্ঞান (Optics) এবং শ্রুতিবিদ্যা (Acoustic) পদার্থবিজ্ঞানের এই দুই শাখায় গবেষণার জন্য বিখ্যাত। ১৯৩০ সালে আলোকরশ্মির এক নতুন ধরনের বিক্ষেপ(Scattering) আবিষ্কার করে পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে (বিজ্ঞানের কোনো শাখায়, প্রথম এশীয় হিসেবে) নোবেল পুরস্কার পান তিনি। তাঁর আবিষ্কৃত আলোকরশ্মির এই বিশেষ বিক্ষেপণ ধর্মটি(Raman scattering) বা ‘রামন এফেক্ট'(Raman Effect)নামে খ্যাত। রামন এফেক্ট আবিষ্কারের দিনটি (২৮শে ফেব্রুয়ারী) ভারতবর্ষে ‘জাতীয় বিজ্ঞান দিবস’ (National Science Day ) রূপে পালন করা হয়। বাল্যকাল থেকেই বেহালা বাজাতেন তিনি। পরবর্তীকালে শব্দ তরঙ্গকে নিয়ে গবেষণাকালে তারনির্মিত যন্ত্রসঙ্গীত তাঁর চর্চার বিষয় হয়ে উঠেছিল। তাঁর আরো একটি বড় শখ ছিল দেশ-বিদেশে ভ্রমণের সময়ে আলোকরশ্মির বিচ্ছুরণ ও বিক্ষেপণের ধর্মসম্পন্ন পাথর,খনিজ দ্রব্যসহ ও নানা প্রাকৃতিক সম্পদ সংগ্রহ করা। 

১৮৮৮ সালের ৫ নভেম্বর ভারতের তৎকালীন মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সীর তিরুচিরাপল্লীতে (অধুনা তামিলনাড়ুর তিরুচি বা তিরুচিরাপল্লী) এক হিন্দু তামিল ব্রাহ্মণ পরিবারে সি.ভি.রামনের জন্ম হয়। তাঁর বাবা ছিলেন চন্দ্রশেখর রামানাথন আইয়ার এবং মা ছিলেন পার্ব্বতী আম্মাল। সি.ভি.রামন ছিলেন তাঁর আট ভাইবোনের মধ্যে দ্বিতীয়। তাঁর বাবা স্থানীয় উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন এবং আর্থিকভাবে স্বচ্ছল ছিলেন। এই প্রসঙ্গে স্মৃতিচারণে রামন বলতেন, “আমি তামার চামচ মুখে নিয়ে জন্মেছিলাম। আমার জন্মের সময়ই বাবা ১০টাকার মতো বড় অঙ্কের বেতন পেতেন!” ১৮৯২ সালে মিসেস এ.ভি.নরসিমা রাও কলেজে পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপকের চাকরি নিয়ে তাঁর বাবা সপরিবারে তৎকালীন বিশাখাপত্তনমে(বর্তমানে অন্ধ্রপ্রদেশের ভাইজ্যাগ) স্থানান্তরিত হন। পরে তিনি মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সী কলেজে গণিত ও পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপনায় আত্মনিয়োগ করেন। বাবার প্রভাবেই বিজ্ঞান বিষয়ে তাঁর আগ্রহ সঞ্চার হয়েছিল।তারনির্মিত যন্ত্রের (String Instruments) প্রতি আগ্রহ থেকেই সি.ভি.রামন নিজের জীবনসঙ্গীনীকে খুঁজে পেয়েছিলেন। তাঁর স্ত্রী লোকসুন্দরী আম্মালকে তিনি প্রথম দেখেছিলেন বীণা বাদ্যরত অবস্থায়। ১৯০৭ সালে বিয়ের পর তাঁরা কলকাতায় চলে আসেন। তাঁদের দুই সন্তান চন্দ্রশেখর রামন ও ভেন্কটরামন রাধাকৃষ্ণন । পরে ভেন্কটরামন রাধাকৃষ্ণন একজন রেডিও জ্যোতির্বিজ্ঞানীরূপে প্রতিষ্ঠিত হন। ১৯৮৩ সালে নোবেল পদক জয়ী সুব্রহ্মণ্যন চন্দ্রশেখর সম্পর্কে রামনের ভ্রাতুষ্পুত্র ছিলেন।

বাবার সঙ্গে বিশাখাপত্তনমে আসার পর রামন সেন্ট অ্যালোয়সিয়াস অ্যাংলো ইন্ডিয়ান স্কুলে ভর্তি হন। সেখান থেকে মাত্র এগারো বছর বয়সে ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করেন তিনি। এরপর ১৩ বছর বয়সে বৃত্তি সহ এফ.এ.(F.A.) [এখনকার ১০+২ সমতুল্য পরীক্ষা] পরীক্ষাতে উত্তীর্ণ হন। এরপর ১৯০২ সালে মাদ্রাজের প্রেসিডেন্সী কলেজে ভর্তি হন ও ১৯০৪ সালে মাদ্রাজ বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞানে প্রথম স্থানাধিকারী রূপে স্বর্ণপদকসহ বি.এ. ডিগ্রীলাভ করেন। ১৯০৬ সালে আলোকরশ্মির বিচ্ছুরণ (Diffraction of Light) বিষয়ে ব্রিটিশ জার্নাল ‘ফিলোজফিকাল ম্যাগাজিনে'(Philosophical Magazine) তাঁর প্রথম গবেষণাপত্র প্রকাশ পায়। ১৯০৭ সালে তিনি প্রেসিডেন্সী কলেজ থেকে পদার্থবিজ্ঞানে এম.এ পাশ করেন। এরপর তাঁর সমগ্র কর্ম জীবনই নিয়োজিত ছিল বিজ্ঞানচর্চা ও গবেষণার কাজে।

বাবার ইচ্ছাতে ১৯০৭ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে তৎকালীন ইন্ডিয়ান ফিন্যান্স সার্ভিস (অধুনা ইন্ডিয়ান অডিট অ্যান্ড অ্যাকাউন্টস্ সার্ভিস) -এর প্রবেশিকা পরীক্ষায় সি.ভি.রামন প্রথম স্থানাধিকারী হয়ে জুন মাসে কলকাতায় সহকারী অ্যাকাউন্টস্ জেনারেল পদে নিযুক্ত হন।এই সময়ে ভারতের প্রথম বিজ্ঞান গবেষণাকেন্দ্র ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট ফর দ্য কাল্টিভেশন অফ সায়েন্সের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ হয়। তাঁর সাথে আশুতোষ দে, অমৃতলাল সরকার ও আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের মতো ব্যক্তিদের সঙ্গে পরিচয় হয়। এই সূত্র ধরেই উন্মুক্ত হয় ব্যক্তিগতভাবে বিজ্ঞান গবেষণার দরজা। কিন্তু ১৯০৯ থেকে ১৯১০ অবধি চাকরি সূত্রে তিনি প্রথমে ব্রহ্মদেশের রেঙ্গুনে (বর্তমান মায়ানমার) ও পরে মহারাষ্ট্রের নাগপুরে বদলি হয়ে যান। তবে এরপর ১৯১১ সালে অ্যাকাউন্টস্ জেনারেল পদে উন্নীত হয়ে পুনরায় কলকাতা ফিরে আসেন। ১৯১৫ সাল থেকে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁর তত্ত্বাবধানে ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট ফর দ্য কাল্টিভেশন অফ সায়েন্সেসে গবেষক নিয়োগ শুরু করে। ১৯১৭ সালে রামন বিশ্ববিদ্যালয়ের পৃষ্ঠপোষক তারকনাথ পালিতের নামে রাজাবাজার সায়েন্স কলেজের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে নির্মিত পালিত চেয়ারের পদটি পান। দশ বছরের চাকরিতে ইস্তফা দিয়ে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম পালিত প্রফেসর হন সি.ভি.রামন। ১৯১৯ সালের মধ্যে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ডজনেরও বেশি ছাত্রের গবেষণায় তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন তিনি। এই সময়টিকে তিনি নিজের জীবনের স্বর্ণযুগ বলে মনে করতেন। ১৯১৯ সালে ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট ফর দ্য কাল্টিভেশন অফ সায়েন্স তাঁকে একই সঙ্গে সাম্মানিক অধ্যাপক ও সাম্মানিক সেক্রেটারি পদে নিযুক্ত করে। ১৯২২ সালে তিনি আলোকরশ্মির আণবিক বিচ্ছুরণ বিষয়ে গবেষণা শুরু করেন যা ১৯২৮ সালে ‘রামন এফেক্ট’ আবিষ্কারের প্রথম ধাপ ছিল। এরপরে তিনি বেহালা জাতীয় বাদ্যযন্ত্রের ধ্বনি,কার্যকারিতা ইত্যাদি বিষয়ে গবেষণা করেন ও নানা জার্নালে তা প্রকাশিত হয়। পরবর্তীকালে এক্স-রে এর ওপর Ultrasonic ও Hyposonic শব্দের প্রভাব , মানুষের দৃষ্টিশক্তির আড়ালে থাকা শারীরবিজ্ঞান ইত্যাদি নানা বিষয়ে গবেষণা করেছেন। ১৯২৬ সালে রামন ইন্ডিয়ান জার্নাল অফ ফিজিক্স(Indian Journal of Physics) প্রকাশ এবং সম্পাদনা শুরু করেন । ১৯৩৩ সালে তিনি ব্যাঙ্গালোরের ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্সের (Indian Institute of Science) প্রথম ভারতীয় ডিরেক্টর নিযুক্ত হন। এরপর ঐ বছরই ইন্ডিয়ান অ্যাকাডেমী অফ সায়েন্সেসের (Indian Academy of Sciences) প্রতিষ্ঠা করেন ও তার কার্যক্রম প্রকাশ করেন।১৯৪৮ সালে প্রতিষ্ঠা করেন রামন রিসার্চ ইনস্টিটিউট (Raman Research Institute)। তিনি জীবনের শেষদিন পর্যন্ত এই প্রতিষ্ঠানেই গবেষণার সঙ্গেই যুক্ত ছিলেন।

নানান দেশের নানান বিজ্ঞান সমিতি ও প্রতিষ্ঠান থেকে সাম্মানিক ডক্টরেট ও সদস্যপদ পেয়েছিলেন রামন। এছাড়া দেশী-বিদেশী ও আন্তর্জাতিক নানা পুরস্কারে ভরা ছিল এই বিশ্ববরেণ্য বিজ্ঞানীর ঝুলি। ১৯১২ তে কার্জন রিসার্চ পুরস্কার, ১৯১৩ সালে উডবার্ন রিসার্চ পদক প্রাপ্তি ঘটে। ১৯২৪ সালে রয়াল সোসাইটির ফেলো নির্বাচিত হয়েও অজানা কারণে সেই পদ ১৯৬৮ সালে পরিত্যাগ করেন তিনি। এরপর ১৯২৮ সালে রোমের Academia Nazionale delle Scienze কর্তৃক Matteucci পদক পান। ১৯২৯ সালে নাইটহুডে ভূষিত হন। ১৯৩০ সালে নোবেল পুরস্কার। ঐ একই বছর রয়াল সোসাইটি প্রদত্ত হিউ (Hughes Medal) পদক পেয়েছিলেন। ১৯৪১ সালে ফিলাডেলফিয়ার ফ্র্যান্কলিন ইনস্টিটিউট তাঁকে ফ্র্যান্কলিন পদকে এবং ১৯৫৪ সালে ভারত সরকার দেশের সর্বোচ্চ সম্মান ভারতরত্নে ভূষিত করেন। ১৯৫৭ সালে রামন লেনিন শান্তি পুরস্কার পান। পরে নেহরুর বিজ্ঞান গবেষণা সংক্রান্ত নীতির বিরোধিতা করে রামন ভারতরত্ন সম্মানও ত্যাগ করেন।

১৯৭০ সালের অক্টোবরের শেষের দিকে সি.ভি.রামন গবেষণাগারে থাকাকালীন হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। সুস্থ হয়ে কাজে ফিরে তিনি তাঁর প্রতিষ্ঠানের সকলের কাছে আর্জি জানান প্রতিষ্ঠানের সকল পত্র পত্রিকা জার্নাল যেন নিরবিচ্ছিন্নভাবে প্রকাশিত হয় এবং সংরক্ষিত হয়। কারণ ঐ জার্নালগুলিকে ভারতবর্ষে বিজ্ঞান গবেষণার ঐতিহ্যময় অতীতে ভবিষ্যতের বিজ্ঞানচর্চার মূল প্রবেশ করছে কিনা তা যাচাই করার অতি গুরুত্বপূর্ণ নথি রূপে তিনি বিশ্বাস করতেন।

অবশেষে ১৯৭০ সালের ২১ নভেম্বর ব্যাঙ্গালোর শহরে সি.ভি. রামনের মৃত্যু হয়।

সববাংলায় পড়ে ভালো লাগছে? এখানে ক্লিক করে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ভিডিও চ্যানেলটিওবাঙালি পাঠকের কাছে আপনার বিজ্ঞাপন পৌঁছে দিতে যোগাযোগ করুন – contact@sobbanglay.com এ।


Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

বাংলাভাষায় তথ্যের চর্চা ও তার প্রসারের জন্য আমাদের ফেসবুক পেজটি লাইক করুন