ইতিহাস

সুব্রহ্মণ্যন চন্দ্রশেখর

চন্দ্র নামে পরিচিত সুব্রহ্মণ্যন চন্দশেখর (Subrahmanyan Chandrasekhar) ছিলেন বিশ শতকের একজন প্রখ্যাত বিজ্ঞানী। ভারতে জন্মগ্রহণ করলেও তাঁর পেশাগত এবং পরবর্তী জীবন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেই কেটেছে। তিনি ছিলেন একজন জ্যোতিঃপদার্থবিজ্ঞানী (Astrophysicist)। মূলত নক্ষত্রদের তাত্ত্বিক গঠন এবং বিবর্তন ছিল তাঁর গবেষণার বিষয়। পরবর্তীতে আরও নির্দিষ্টভাবে বৃহদাকার নক্ষত্রদের বিবর্তনের পর্যায় এবং চন্দ্রশেখর সীমা (Chandrasekhar Limit) আবিষ্কারের জন্য তিনি বিশেষভাবে পরিচিতি পান। এর পাশাপাশি তিনি তাত্ত্বিক পদার্থবিদ্যা এবং জ্যোতিঃপদার্থবিজ্ঞানের বেশ কিছু দিক নিয়েও গবেষণা করেছেন। ভারত তথা গোটা বিশ্বের বিজ্ঞানমহলে তাঁর গবেষণা ব্যাপক আলোড়ন ফেলেছিল। সব মিলিয়ে আধুনিক বিজ্ঞানচর্চার ইতিহাসে সুব্রহ্মণ্যন চন্দ্রশেখরের অবদান অবিস্মরণীয়।

১৯১০ সালের ১৯ অক্টোবর পাঞ্জাবের লাহোরে (অধুনা পাকিস্তানে) একটি তামিল পরিবারে সুব্রহ্মণ্যন চন্দ্রশেখরের জন্ম হয়। তাঁর বাবার নাম ছিল চন্দ্রশেখর সুব্রহ্মণ্য আইয়্যর (Chandrasekhar Subrahmanya Ayyar) এবং মায়ের নাম ছিল সীতা বালাকৃষ্ণন (Sita Balakrishnan)। তাঁর বাবা ব্রি্টিশ ভারতে রেল দপ্তরের একজন হিসাবরক্ষক ছিলেন। পাশাপাশি তিনি কর্ণাটকী ঘরানার একজন সঙ্গীতজ্ঞও ছিলেন। সুব্রহ্মণ্যন চন্দশেখরের মা ছিলেন একজন বুদ্ধিজীবী। চন্দ্রশেখরের কাকা ছিলেন বিখ্যাত নোবেলজয়ী পদার্থবিজ্ঞানী চন্দ্রশেখর ভেঙ্কট রমন (Chandrasekhara Venkata Raman) যিনি সি ভি রমন নামে পরিচিত। ছোটোবেলা থেকেই এরকম পরিবেশে বড় হওয়ার ফলে বিজ্ঞান এবং গবেষণার প্রতি চন্দ্রশেখরের বিশেষ আগ্রহ জন্মেছিল।

১২ বছর বয়স পর্যন্ত তিনি বাড়িতেই পড়াশোনা করতেন। ১৯২২ সালে তিনি মাদ্রাসের (বর্তমানে চেন্নাই) ট্রিপ্লিকেনের হিন্দু উচ্চ বিদ্যালয়ে (Hindu High School, Triplicane, Madras) ভর্তি হন। এরপর ১৯২৫ সালে মাদ্রাসের প্রেসিডেন্সি মহাবিদ্যালয়ে (Presidency College) ভর্তি হন। পদার্থবিদ্যায় স্নাতক হয়ে তিনি ভারত সরকারের তরফ থেকে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করার জন্য একটি বৃত্তি পান। সেই বৃত্তির সুবাদে তিনি কেমব্রিজের ট্রিনিটি মহাবিদ্যালয়ে (Trinity College) ভর্তি হন। কেমব্রিজেই তিনি র‍্যালফ হাওয়ার্ড ফাওলারের (Ralph Howard Fowler) গবেষক ছাত্র হিসেবে কাজ করতে থাকেন। শ্রীনিবাস রামানুজনের (Srinivasa Ramanujan) পরে দ্বিতীয় ভারতীয় হিসেবে তিনি ট্রিনিটি ফেলোশিপ পান।

ভারত থেকে কেমব্রিজ যাওয়ার পথেই তিনি তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় কাজটি করেন। ফাওলারের ছাত্র হিসেবে যোগ দেবেন বলে জাহাজে ফাওলারের কাজ শ্বেত বামন নক্ষত্র (white dwarf star) নিয়ে পড়াশোনা করেন। সেই সময় সেই তত্ত্বে ভুল খুঁজে পান ও তিনি প্রমাণ করেন নক্ষত্রে অবস্থিত সব হাইড্রোজেন, হিলিয়াম জ্বালানি শেষ হলেই শ্বেত বামন নক্ষত্রে পরিণত হয় না।নক্ষত্রের ভর একটি বিশেষ সীমা পর্যন্ত হলে এটি শ্বেত বামন হয় এবং সেই সীমার বেশি হলে নক্ষত্রে অন্য রকম পরিণতি হয়। জাহাজে বসে করা এই কাজই এক বছর পর পরিমার্জন করে প্রকাশ করেন। তাঁর এই সীমা ‘চন্দ্রশেখর সীমা’ নামে পরিচিত। প্রাথমিক ভাবে এই সীমা ১.৭ নির্ণয় করলেও পরে তিনি ১.৪ নির্ণয় করেন। তাঁর এই তত্ত্ব অনুযায়ী, জ্বালানী ফুরিয়ে যাওয়ার পর যে নক্ষত্রের ভর প্রায় ১.৪ সৌর ভর এর বেশি হবে সেগুলি শ্বেত বামন না হয়ে বিস্ফোরণ হয়ে সুপারনোভা দেখা দেবে এবং তারপর তা নিউট্রণ স্টারে পরিণত হবে। আর এই ভর অনেক বেশি হলে তা কৃষ্ণগহ্বরে (black whole) পরিণত হবে। তাঁর এই গবেষণা আগের ধারণাকে আমূল পাল্টে দেয় কারণ তাঁর আগে বিজ্ঞানীরা মনে করতেন সব নক্ষত্রই শ্বেত বামনে পরিণত হবে কিন্তু এর পর জানা গেল যে সব নক্ষত্রের পরিণতি এক নয় – নিউট্রন স্টার এবং ব্ল্যাক হোলও হতে পারে।

১৯৩৫ সালে হার্ভার্ড মানমন্দিরের (Harvard Observatory) নির্দেশক হার্লো শ্যাপ্লি (Harlow Shapley) চন্দ্রশেখরকে তাত্ত্বিক পদার্থবিদ্যার অতিথি অধ্যাপক হওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানান। তিনি সেখানে গেলেও এই আমন্ত্রণ প্রত্যাখান করেন। এই সময়েই তাঁর আলাপ হয় শ্বেত বামন নক্ষত্রের উপর গবেষণায় অন্যতম ব্যক্তিত্ব জেরাল্ড কুইপারের (Gerald Kuiper) সঙ্গে। তিনি শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তর্গত ইয়ের্ক্স মানমন্দিরে (Yerkes Observatory) কর্মরত ছিলেন। এখানকার নির্দেশক ওট্টো স্ট্রুভ (Otto Struve) চন্দ্রশেখরের কথা শুনে তাঁকে ইয়ের্ক্সে যোগদান করার আবেদন জানান। ১৯৩৬ সালে তিনি তাত্ত্বিক জ্যোতিঃপদার্থবিজ্ঞানের সহকারী অধ্যাপক হিসেবে ইয়ের্ক্সে নিযুক্ত হন। এই একই বছরের সেপ্টেম্বর মাসে তিনি ললিতা দোরাইস্বামীকে (Lalitha Doraiswamy) বিয়ে করেন। অন্য অনেক নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করে তিনি তাঁর সমগ্র কর্মজীবন শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়েই কাটিয়েছেন।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন সুব্রহ্মণ্যন চন্দ্রশেখর মেরিল্যান্ডের অ্যাবেরডিন প্রুভিং গ্রাউন্ডের (Aberdeen Proving Ground) বালিস্টিক রিসার্চ ল্যাবরেটরিতে (Ballistic Research Laboratory) ক্ষেপণাস্ত্র বিজ্ঞান সংক্রান্ত গবেষণা করতেন। চন্দ্রশেখর পদার্থবিদ্যা এবং জ্যোতিঃপদার্থিবিদ্যার বিভিন্ন ক্ষেত্র নিয়ে গবেষণা করেছেন। তাঁর কাজের পদ্ধতিই ছিল কোনো একটি নির্দিষ্ট বিষয়ে নিয়ে গভীর পড়াশোনা করা, তা নিয়ে গবেষণা করে প্রবন্ধ লেখা এবং সমস্ত জ্ঞান একত্র করে বিষয়টি নিয়ে বই লিখে অন্য বিষয়ে এগোনো। এই পদ্ধতি মেনেই ১৯২৯ থেকে ১৯৩৯ সাল পর্যন্ত সময়ে তিনি একে একে নক্ষত্রমন্ডলের গঠন, এমনকি হোয়াইট ডোয়ার্ফের তত্ত্ব সংক্রান্ত পড়াশোনা করতে থাকেন। পরবর্তীকালে ১৯৩৯ থেকে ১৯৪৩ সাল পর্যন্ত সময়ে তিনি স্টেলার ডায়ানামিক্স (Steller Dynamics), ব্রাউনীয় গতি (Brownian Motion) সম্পর্কে পড়াশোনা শুরু করেন।

এর পরে ১৯৪৩ থেকে ১৯৫০ সাল পর্যন্ত তিনি বেতার স্থানান্তরের (Radio Transfer) তত্ত্ব এবং হাইড্রোজেনের ঋণাত্মক আয়নের (Negative Ion of Hydrogen) তত্ত্বের ওপর মনোনিবেশ করেন। এর পরে ১৯৫০ থেকে ১৯৬১ সাল পর্যন্ত আলোড়ন (Turbulence), হাইড্রোডায়ানামিক (Hydrodynamic) ও হাইড্রোম্যাগ্নেটিক স্থিতি (Hydromagnetic Stability) নিয়ে ধারাবাহিকভাবে কাজ করেন। ১৯৬০ এর দশকে তিনি সমতা (Equilibrium) এবং সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদ (General Relativity) সংক্রান্ত উচ্চতর গবেষণা শুরু করেন। ১৯৭১ থেকে ১৯৮৩ সাল পর্যন্ত চন্দ্রশেখর কৃষ্ণ গহ্বরের (Black Hole) গাণিতিক তত্ত্ব নিয়ে কাজ করেন। ১৯৮০ এর দশকের শেষের দিকে তিনি মহাকর্ষীয় তরঙ্গের (Gravitational Waves) সংঘর্ষের তত্ত্ব নিয়ে কাজ করতে থাকেন। এছাড়াও ১৯৫২ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত সুব্রহ্মণ্যন চন্দ্রশেখর ‘দ্য অ্যাস্ট্রোফিজিকাল জার্নাল’-এর (The Astrophysical Journal) সম্পাদক ছিলেন।

নক্ষত্রের বিবর্তন এবং গঠনের প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া সম্পর্কে তাঁর গবেষণার জন্য তিনি ১৯৮৩ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পান। এছাড়াও তিনি ১৯৪৪ সালে রয়্যাল সোসাইটির একজন ফেলো (Fellow of the Royal Society, FRS) নির্বাচিত হন। ১৯৫২ সালে ব্রুস পদক (Bruce Medal), ১৯৫৩ সালে রয়্যাল অ্যাস্ট্রোনমিকাল সোসাইটির (Royal Astronomical Society) স্বর্ণ পদক, ১৯৫৭ সালে আমেরিকান আকাদেমি অফ আর্টস অ্যান্ড সাইন্সেস-এর (American Academy of Arts and Sciences) রামফোর্ড পুরস্কার (Rumford Prize), ১৯৬৬ সালে আমেরিকার জাতীয় বিজ্ঞান পদক (National Medal of Science, US), ১৯৭১ সালে ন্যাশনাল আকাদেমি অফ সাইন্সেসের (National Academy of Sciences) হেনরি ড্র্যাপার পদক (Henry Draper Medal), ১৯৮৪ সালে রয়্যাল সোসাইটির কোপলে পদক (Copley Medal), ১৯৮৯ সালে গর্ডন জে. লাইং অ্যাওয়ার্ড (Gordon J. Laing Award), হামবোল্ট পুরস্কার (Humboldt Prize) তাঁর পাওয়া কিছু বিশেষ সম্মান। এছাড়াও তিনি ১৯৬৮ সালে ভারত সরকারের তরফ থেকে পদ্ম বিভূষণ সম্মান পান।

১৯৯৫ সালের ২১ আগস্ট হঠাৎ করে হার্ট অ্যাটাক হয় তার ফলে শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের হাসপাতালে সুব্রহ্মণ্যন চন্দ্রশেখরের মৃত্যু হয়।

স্বরচিত রচনা পাঠ প্রতিযোগিতা, আপনার রচনা পড়ুন আপনার মতো করে।

vdo contest

বিশদে জানতে ছবিতে ক্লিক করুন। আমাদের সাইটে বিজ্ঞাপন দেওয়ার জন্য যোগাযোগ করুন। ইমেল – contact@sobbanglay.com

 


Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।