সববাংলায়

রাধাগোবিন্দ চন্দ্র

বিভাগঃ , ,

রাধাগোবিন্দ চন্দ্র ( Radha Gobinda Chandra) একজন ভারতীয় বাঙালী জ্যোতির্বিজ্ঞানী যিনি বাংলায় পর্যবেক্ষণমূলক জ্যোতির্বিজ্ঞান নিয়ে যুগান্তকারী কাজের জন্য বিখ্যাত হয়ে আছেন। পরিবর্তনশীল তারকাদের পর্যবেক্ষণের জন্য রাধাগোবিন্দ বিশেষভাবে বিখ্যাত। তিনি তাঁর জীবদ্দশায় মোট ৪৯৭০০ এর বেশি পরিবর্তনশীল তারকা পর্যবেক্ষণ করেছিলেন। আমেরিকান অ্যাসোসিয়েশন অফ ভেরিয়েবল স্টার অবসার্ভার সংস্থার সদস্য হওয়ার বিরল নজির ছিল তাঁর। পুঁথিগত বা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা এবং ডিগ্রি না থাকলে যে মানুষ অসম্পূর্ণ এ ধারণাকে সম্পূর্ণরূপে ভুল প্রমাণিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন তিনি।

১৮৭৮ সালের ১৬ জুলাই বাংলাদেশের যশোহর জেলার বকচর গ্রামে মামার বাড়িতে রাধাগোবিন্দ চন্দ্রের জন্ম হয়। তাঁর বাবা ছিলেন গোরাচাঁদ এবং মায়ের নাম পদ্মামুখ। পেশায় তাঁর বাবা ছিলেন ডাক্তারের সহকারী এবং তাঁর মা ছিলেন গৃহবধূ। ১৮৯৯ সালে মাত্র ২১ বছর বয়সে রাধাগোবিন্দের সাথে মুর্শিদাবাদের ৯ বছর বয়সী গোবিন্দমোহিনীর বিবাহ হয়। পরবর্তীকালে তিনি দুই সন্তানের পিতা হন।

বকচরে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে যশোর জিলা স্কুলে ভর্তি হলেও গতানুগতিক শিক্ষাজীবন একেবারেই পছন্দ করতেন না তিনি। রাতের আকাশের প্রতি তাঁর ছিল অমোঘ আকর্ষণ। দিদিমা সারদাসুন্দরী দেবীর দৌলতে আকাশের বুকে দৃশ্যমান নক্ষত্রদের বেশ খানিকটা চিনেছিলেন রাধাগোবিন্দ। স্কুলে ষষ্ঠ শ্রেণীতে পড়ার সময় পাঠ্যপুস্তক ‘চারুপাঠ তৃতীয় ভাগ’- এ অক্ষয়কুমার দত্তের প্রবন্ধ ‘ব্রহ্মাণ্ড কি প্রকান্ড’ পড়েই গ্রহ – নক্ষত্র এবং বিশ্বের সীমানা সংক্রান্ত প্রশ্ন জাগে রাধাগোবিন্দের মনে এবং তিনি জ্যোতির্বিজ্ঞানী হওয়ার স্বপ্ন দেখা শুরু করেন। কিন্তু পড়াশোনায় অমনোযোগীতার কারণে তিনবার প্রবেশিকা পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেও অকৃতকার্য হয়ে দ্রুত পড়াশোনার পাঠ চুকিয়ে শেষে কর্মজীবনে প্রবেশ করেন তিনি।

১৯০০ সালের প্রথমার্ধে মাত্র ২২ বছর বয়সে যশোর কালেক্টরেট অফিসে ১৫ টাকা মাইনের সামান্য কেরানীর পদে নিযুক্ত হন রাধাগোবিন্দ চন্দ্র যদিও পরে তিনি ট্রেজারি ক্লার্ক এবং কোষাধ্যক্ষের পদে উন্নীত হন এবং অবসর নেবার সময় তাঁর মাসিক বেতন হয়েছিল ১৭৫ টাকা। সামান্য কেরানীর চাকরি কিন্তু তাঁর আকাশ দেখা বন্ধ করতে পারেনি। পারিবারিক বন্ধু অ্যাডভোকেট কালীনাথ মুখোপাধ্যায়ের সহযোগিতায় মহাকাশ সম্পর্কিত বেশ কিছু বই হাতে আসে তাঁর। সাথে নিয়ে আসেন অল্প দামের একটি বাইনোকুলার। ১৯১০ সালে প্রথমে খালি চোখে এবং পরে সেই বাইনোকুলার দিয়েই তিনি দেখেন ‘হ্যালির ধূমকেতু’ যা তাঁর জীবনে ধূমকেতুর মতোই পরিবর্তন এনেছিল। অভ্যাসমত একটি খাতায় তিনি তাঁর পর্যবেক্ষণ লিখে রাখতেন এবং তাঁর এসমস্ত পর্যবেক্ষণ প্রবাসী পত্রিকায় ছাপাও হত। তাঁর প্রবন্ধ পড়ে শান্তিনিকেতনের বিজ্ঞান শিক্ষক জগদানন্দ রায় মুগ্ধ হয়ে রাধাগোবিন্দকে একটি টেলিস্কোপ কেনার পরামর্শ দেন। আর্থিক অবস্থা বিশেষ ভালো না থাকায় জ্যোতির্বিজ্ঞান চর্চা রাধাগোবিন্দে র পক্ষে সুচারুভাবে সম্ভব হচ্ছিলোনা। তাই ১৯১২ সালে নিজের সামান্য কিছু জমি বিক্রি করে ও চাকরিসূত্রে প্রাপ্ত টাকা দিয়ে একটি তিন ইঞ্চি ব্যাসের টেলিস্কোপ কিনে ছিলেন রাধাগোবিন্দ যা ইংল্যান্ড থেকে মেসার্স কক্স শিপিং এজেন্সি লিমিটেডের মাধ্যমে রাগাগোবিন্দের কাছে এসে পৌঁছায়।

সীমিত আয়ের কারণে রাধাগোবিন্দ চন্দ্রকে জ্যোতির্বিজ্ঞান চর্চায় যা ব্যয় হতো তা লিখে রাখতে হত। তাঁর এই হিসেব খাতা থেকে জানা যায় যন্ত্রটির দাম পড়েছিল ১৬০ টাকা ১০ আনা ৬ পাই। টেলিস্কোপ কেনার পর নতুন উদ্যমে চলতে থাকে রাধাগোবিন্দের মহাজাগতিক নক্ষত্রের পর্যবেক্ষণ। মহাকাশে কিছু এমন তারা রয়েছে যাদের ঔজ্জ্বল্য প্রত্যেকদিন পরিবর্তিত হয়। এদেরকে বলে ভেরিয়েবল স্টারস যার বাংলা নাম রাধাগোবিন্দ দিয়েছিলেন ‘বহুরূপী তারা’। ১৯১৮ সালের ৭ই জুন রাধাগোবিন্দ তাঁর তিন ইঞ্চি ব্যাসের টেলিস্কোপ দিয়ে আকাশের বুকে একটি নতুন নক্ষত্র ‘নোভা’ আবিষ্কার করেন যেটি ছিল জ্যোতির্বিজ্ঞানের ইতিহাসে তাঁর প্রথম এবং উল্লেখযোগ্য একটি আবিষ্কার। তাঁর আবিষ্কারের পরেই নক্ষত্রটির নামকরণ করা হয় ‘নোভা অ্যাকুইলা ত্রি ১৯১৮’। সহজার্থে ‘নোভা’ হলো কোন তারার মৃত্যুকালীন সময়ে বিষ্ফোরণ। সমগ্র এশিয়া মহাদেশে এই নোভা সর্বপ্রথম পর্যবেক্ষণ করার জন্য যশোরের কৃতি সন্তান রাধাগোবিন্দ চন্দ্র ইতিহাস বিখ্যাত। অতঃপর প্রবাসী পত্রিকাতে তিনি এটি নিয়ে লেখালেখিও করেন। সেই সময় আবার জগনানন্দ রায়ের উপদেশে রাধাগোবিন্দ তাঁর লেখার বিস্তারিত বিবরণ পাঠিয়ে দেন হার্ভার্ড মহাকাশ পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের চার্লস পিকারিংয়ের কাছে। তখনকার দিনে যাতায়াতের সুব্যবস্থা না থাকায় চিঠিটি পৌঁছোতে অনেক সময় লেগে যায়। কিন্তু হার্ভার্ড পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের কর্তৃপক্ষ তাঁকে অভিনন্দন জানিয়ে বেশ কিছু তারা মানচিত্র ও জ্যোতির্বিজ্ঞানের উপর বই পাঠিয়ে তাঁকে সম্মানিত করেন। খুব তাড়াতাড়ি আমেরিকান অ্যাসোসিয়েশন অব ভ্যারিয়েবল স্টার অবজার্ভারস (AAVSO) এর সদস্য পদ লাভ করেন রাধাগোবিন্দ। ১৯২৬ সালে চার্লস পিকারিং তাঁকে একটি ৬ ইঞ্চি ব্যাসের টেলিস্কোপ উপহার দেন যা আমেরিকার নিউইয়র্ক থেকে সুদূর যশোরের গ্রামে এসে পৌঁছোয়। সেই সময় এই টেলিস্কোপটি ছিল বাংলাদেশের সবথেকে বড় টেলিস্কোপ। এই টেলিস্কোপটি দক্ষিণ ভারতীয় জ্যোতির্বিদ ভেইনু বাপ্পুর কাছে কিছুদিন থাকার পর এখন পরম যত্নে রাখা আছে দক্ষিণ ভারতের কাভালুর মানমন্দিরে।ফরাসি সরকার ভ্যারিয়েবল স্টারের উপর রাধাগোবিন্দের পর্যবেক্ষণ ও গবেষণার স্বীকৃতি হিসেবে ১৯২৮ সালে তাঁকে OARF (Officers Academic republican francaise) উপাধি ও পদক প্রদান করেন। কলকাতায় ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূত পাঠিয়ে তাঁকে সম্মান জানানো হয়। কোনো বাঙ্গালির ফ্রান্স সরকারের থেকে এমন সম্মান অর্জনের ফলে তাঁকে সদস্য করে নেওয়া হয় Association francaise des Observateurs d’etoiles Variables (AFOEV) এবং ব্রিটিশ অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনে।

জ্যোতির্বিজ্ঞান নিয়ে শুধু চর্চাই নয় রাধাগোবিন্দ চন্দ্রের করা পর্যবেক্ষণ তৎকালীন পত্র -পত্রিকা ছাড়াও প্রকাশিত হয়েছিল পুস্তক আকারেও। জ্যোতির্বিজ্ঞানের ওপর চারটি বই লিখেছিলেন তিনি। বইগুলি হলো যথাক্রমে ‘ধূমকেতু’, ‘সৌরজগৎ’, ‘সবিতা ও ধরণী’ এবং ‘নক্ষত্রজগৎ’ যাদের মধ্যে শুধু ধূমকেতু বইটিই তাঁর জীবদ্দশায় প্রকাশিত হয়েছিল। অনেক কষ্টে তাঁর এক ভাইপোর চেষ্টায় এই বইটি প্রকাশিত হয়। এ বিষয়ে রাধাগোবিন্দ তাঁর ধূমকেতু বইতে নিজস্ব উক্তি করেছেন , “দীর্ঘ চারি বৎসরাধিক কাল মুদ্রাযন্ত্রের কুক্ষিগত থাকিয়া আমার প্রথম বৈজ্ঞানিক গ্রন্থ ধূমকেতু লোকলোচনের প্রত্যক্ষীগত হইল। জানি না আমার দেশবাসী কী চক্ষে ইহাকে দেখিবেন , ইহার পরিণতি মুদির দোকানে জিরা-মরিচ বাঁধায় পর্যবসিত হইবে অথবা বঙ্গবাণীর শ্রদ্ধালাভে ধন্য হইবে।” শুধুমাত্র একটি বইয়ের ক্ষেত্রেই নয় শেষ জীবনে রাধাগোবিন্দ তাঁর অপ্রকাশিত অন্য তিনটি গ্রন্থ সম্পর্কে উক্তি করেছিলেন, “নক্ষত্রবিজ্ঞানের অপর গ্রন্থনিচয় ‘সৌরজগৎ’ ; ‘সবিতা ও ধরণী’ এবং ‘নক্ষত্রজগৎ’ মুদ্রণের ব্যবস্থা হয় নাই। বয়স ৭৫ বৎসর অতীত হইতে চলিল , আর কত দিন ধরণীতে থাকিবো ; উহাদের মুদ্রণ দেখিয়া যাইতে পারিব কি না বিধাতাই জানেন । জীবিত কালের মধ্যে উহাদের মুদ্রণের ব্যবস্থা যদি না হয় তাহা হইলে পাণ্ডুলিপিগুলি কোনো প্রসিদ্ধ বাণী প্রতিষ্ঠানে দিয়া যাইব। প্রয়োজনবোধ হইলে তাঁহারাই উহাদের মুদ্রণের ব্যবস্থা করিবেন ; অনাবশ্যক মনে হইলে নষ্ট করিয়া ফেলিবেন।”

পশ্চিমবঙ্গের বারাসাতের দুর্গাপল্লীতে যথেষ্টই আর্থিক কষ্টের মধ্যে জীবন কাটাতে হত রাধাগোবিন্দ চন্দ্র কে। এমন কি অন্নসংস্থান করতেও তাঁকে সংগ্রাম করতে হত বলে জানা গেছে প্রত্যক্ষদর্শীদের থেকে। মৃত্যুর আগে পর্যন্ত বাকি জীবন প্রবল অর্থনৈতিক কষ্টের মধ্যে কাটিয়ে বারাসাতের দুর্গাপল্লীতে ১৯৭৫ সালের ৩ এপ্রিল ৯৭ বছর বয়সে প্রায় বিনা চিকিৎসায় তাঁর মৃত্যু হয়। মৃত্যুর সময় তাঁর প্রায় সমস্ত বইপত্র এবং তিন ইঞ্চি ব্যাসের টেলিস্কোপটি তিনি দান করে দিয়ে যান বারাসাতের সত্যভারতী বিদ্যাপীঠে।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।