বিজ্ঞান

নক্ষত্র

নক্ষত্র

রবীন্দ্রনাথের গানে রয়েছে ‘আকাশ ভরা সূর্য তারা বিশ্ব ভরা প্রাণ’। এই মহাবিশ্বে কত লক্ষ লক্ষ নক্ষত্র রয়েছে তার হিসেব কে রাখে! রাতের আকাশের দিকে চোখ মেলে তাকালে মুগ্ধ হয়ে আমরা তারাগুলি দেখি। বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের মধ্যে ছড়িয়ে ছিটিয়ে অসংখ্য ছায়াপথ রয়েছে, রয়েছে অসংখ্য নীহারিকা আর তার পাশাপাশি রয়েছে অসংখ্য নক্ষত্র। রাতের কালো অন্ধকার আকাশের প্রেক্ষাপটে উজ্জ্বল আলোকিত বিন্দুগুলিকেই আমরা তারা বা নক্ষত্র বলে চিনি। জ্যোতিষচর্চার জগতেও এই নক্ষত্রগুলির ভূমিকা অনস্বীকার্য। চলুন জেনে নেওয়া যাক নক্ষত্রের সম্পর্কে আরো কিছু খুঁটিনাটি তথ্য।

খুব সংক্ষেপে বলতে গেলে হাইড্রোজেন ও হিলিয়াম সমন্বিত বিশালাকায় একপ্রকার মহাজাগতিক বস্তু হল এই নক্ষত্র যাদের অভ্যন্তরে নিউক্লীয় বিক্রিয়ার ফলে প্রচুর তাপ ও আলো উৎপন্ন হয়। আমাদের পৃথিবীর একেবারে নিকটতম নক্ষত্র একমাত্র সূর্য। বাকি যে সব আলোকবিন্দুকে আমরা রাতের আকাশে দেখতে পাই, তারা পৃথিবী থেকে বহু আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত। এখন সমগ্র মহাবিশ্বে ঠিক কতগুলি নক্ষত্র রয়েছে তা বলা একেবারেই অসম্ভব। তবে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা অনুমান করেছেন যে আমাদের আকাশগঙ্গা ছায়াপথে প্রায় ৩০ হাজার কোটি নক্ষত্রের উপস্থিতি রয়েছে।

প্রাক্‌ ইন্দো-আর্য ভাষা থেকেই সম্ভবত ‘স্টার’ (Star) বা নক্ষত্র শব্দের উৎপত্তি হয়েছে বলে মনে করা হয়। তবে অন্য অনেকেই মনে করেন এই শব্দটির উৎপত্তির পিছনে লাতিন শব্দ ‘স্টেলা’ (Stella), গ্রিক শব্দ ‘অ্যাস্টার’ (Aster) কিংবা জার্মান শব্দ ‘স্টার্ন’ (Stern)-এর প্রভাব রয়েছে। আবার আক্কাদীয় ‘ইস্থার’ (Ishtar) শব্দ থেকেও ‘স্টার’ শব্দের উৎপত্তি হয়েছে বলে মনে করা হয়। শব্দের উৎপত্তি তো জানা গেল, এবারে এই মহাবিশ্বে নক্ষত্রের জন্ম হল কীভাবে সে ব্যাপারে জেনে নেওয়া যাক। সাধারণ নিয়মে একটি নক্ষত্রের জীবনকাল চলে কোটি কোটি বছর ধরে। সেই জীবনকালের কতগুলি নির্দিষ্ট দশা রয়েছে। যেমন – প্রোটোস্টার (Protostar), টি টাউরি (T Tauri), প্রধান ক্রম (Main Sequence) ইত্যাদি।  

বিজ্ঞানীদের মতে, নক্ষত্রের আকার যত বড়ো হবে, তার আয়ু তত কম হবে। সংক্ষেপে বললে নীহারিকা থেকেই এই নক্ষত্রের জন্ম হয়। নীহারিকাগুলি আসলে হাইড্রোজেন সমন্বিত ধুলো-মেঘ (Dust Cloud)। হাজার হাজার বছর ধরে মাধ্যাকর্ষণের কারণে এই নীহারিকাগুলির অভ্যন্তরেই ঘন পদার্থের (Dense Matter) এক একটা পকেট তৈরি হয় যারা নিজেদের ভর সংকুচিত করতে শুরু করে। এই গ্যাসের ভর সংকোচনের ঘটনাটি একটি নক্ষত্রের জীবনকালের প্রাথমিক দশা বলে চিহ্নিত হয় যাকে প্রোটোস্টার (Protostar) বলা হয়। যেহেতু নীহারিকার মধ্যেকার ধুলো এই প্রোটোস্টারকে আচ্ছাদিত করে রাখে, তাই কারো পক্ষে একে সনাক্ত করা খুবই সমস্যাজনক। যেই মাত্র প্রোটোস্টারগুলি আকারে ক্ষুদ্র হতে থাকে, ভরবেগ সংরক্ষণের সূত্র অনুসারে তাদের ঘূর্ণন গতিও বেড়ে যায়। এরপরে ক্রমে ক্রমে যত প্রোটোস্টারের অভ্যন্তরস্থ চাপ বাড়তে থাকে, তত তার তাপমাত্রাও বাড়তে শুরু করে। এই সময়কালই নক্ষত্রের ‘টি টাউরি দশা’ (T Tauri Phase) নামে পরিচিত। লক্ষ লক্ষ বছর পরে যখন নক্ষত্রের আভ্যন্তরীণ তাপমাত্রা বেড়ে ২৭০ লক্ষ ডিগ্রি ফারেনহাইটে পৌঁছায়, নিউক্লীয় সংযোজন প্রক্রিয়া শুরু হয়ে যায়। এর মধ্য দিয়েই নক্ষত্রের জীবনকালের সবথেকে দীর্ঘতম পর্যায় শুরু হয় যার নাম প্রধান ক্রম (Main Sequence)। আমাদের ছায়াপথে থাকা অসংখ্য নক্ষত্র এমনকি সূর্যকেও প্রধান ক্রমের নক্ষত্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই প্রকারের নক্ষত্রের মধ্যে একটি স্থিতিশীল নিউক্লীয় সংযোজন প্রক্রিয়া সর্বদা চলতে থাকে যার ফলে নক্ষত্রের অভ্যন্তরস্থ হাইড্রোজেন হিলিয়ামে রূপান্তরিত হয় এবং নক্ষত্রগুলি এক্স-রশ্মি বিকিরিত করে। এই নিউক্লীয় সংযোজনের ফলে হিলিয়াম উৎপাদনই নক্ষত্রের আলো ও তাপের ভাণ্ডার তৈরিতে সহায়তা করে। এর কারণেই বহু বহু আলোকবর্ষ দূরে থাকলেও নক্ষত্রের আলো আমরা পৃথিবী থেকেই দেখতে পাই। বিজ্ঞানীরা বলছেন যে ধুলো-মেঘ সংকুচিত হয়ে নক্ষত্রের জন্ম হয়, সেই ধুলো-মেঘের অবশিষ্ট থেকেই কোনো কোনো সময় গ্রহ, গ্রহাণুপুঞ্জ কিংবা ধূমকেতু তৈরি হতে পারে।

বিজ্ঞানীরা বলছেন আমাদের সূর্যের সমান আকারের কোন নক্ষত্রের জন্ম থেকে পরিণত অবস্থায় পৌঁছাতেই প্রায় ৫ কোটি বছর সময় লেগে যায়। শুনলে আশ্চর্য হতে হয় আমাদের সূর্য নাকি প্রায় ১ কোটি বছর ধরে তার এই পরিণত অবস্থায় রয়েছে। রাতের আকাশের দিকে তাকালে সব নক্ষত্রকে সমান উজ্জ্বল দেখায় না। নক্ষত্রের এই ঔজ্জ্বল্য নির্ভর করে পৃথিবী থেকে তাদের দূরত্ব এবং তাদের আভ্যন্তরীণ শক্তির পরিমাণের উপর। আবার একেক নক্ষত্রের একেক রকম বর্ণ বা রঙ লক্ষ করা যায়। যেহেতু নক্ষত্রগুলির তাপমাত্রা একেক রকম হয়, তাই তাদের বিকিরিত বর্ণালীর প্রকারও এক রকম হয় না। যে নক্ষত্রের তাপমাত্রা অত্যন্ত  বেশি, সাধারণভাবে তা সাদা বা নীল বর্ণের দেখায়। আবার অন্যদিকে তুলনায় শীতল নক্ষত্রগুলির বর্ণ কমলা বা লাল হয়ে থাকে। হার্ৎজস্প্রাং-রাসেল ডায়াগ্রামের (Hertzsprung-Russell Diagram) মধ্যে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা নক্ষত্রের সমস্ত বৈশিষ্ট্যগুলিকে বিচার-বিশ্লেষণ করে তাদের নির্দিষ্ট কতগুলি শ্রেণিতে বিন্যস্ত করেছেন। শ্রেণিগুলি হল যথাক্রমে –

  • প্রধান ক্রম নক্ষত্র (Main Sequence Star)
  • শ্বেত বামন নক্ষত্র (White Dwarf Star)
  • লাল বামন নক্ষত্র (Red Dwarf Star)
  • দৈত্যাকার নক্ষত্র (Giant Star)
  • অতি দৈত্যাকার নক্ষত্র (Super Giant Star)

বিজ্ঞানীরা বলছেন অতি দৈত্যাকার নক্ষত্রগুলির ব্যাসার্ধ আমাদের সূর্যের থেকেও কয়েক হাজার গুণ বড় হতে পারে। এই সব তারাদের জীবনকালের প্রায় ৯০ শতাংশ সময়ই প্রধান ক্রম পর্যায়ের অন্তর্ভুক্ত। সূর্যকে বিজ্ঞানীরা একটি প্রামাণ্য হলুদ বামন নক্ষত্র হিসেবে বিবেচনা করেন এবং তাঁদের ধারণা আরো কয়েক কোটি বছর সূর্যের এই প্রধান ক্রম দশা বজায় থাকবে। উপরের তালিকার মধ্যে আকারের দিক থেকে লাল বামন নক্ষত্রগুলিই সবথেকে ক্ষুদ্র যার ভর সূর্যের ভরের ১০ শতাংশ এবং সূর্য থেকে নির্গত শক্তির মাত্র ০.০১ শতাংশ লাল বামন নক্ষত্র থেকে নির্গত হয়। এই ধরনের নক্ষত্রের তাপমাত্রা হয় মোটামুটিভাবে ২৮০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস থেকে ৩৮০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত। এই লাল বামন নক্ষত্রের সংখ্যাই মহাবিশ্বে সবথেকে বেশি, এমনটাই বলছেন বিজ্ঞানীরা এবং এদের আয়ুষ্কাল প্রায় ১০ হাজার কোটি বছর। অন্যদিকে আকারে সবথেকে বড় অতি দৈত্যাকার নক্ষত্রগুলি সূর্যের থেকে ১০০ গুণ পর্যন্ত বড় হতে পারে এবং তাদের পৃষ্ঠতলের তাপমাত্রা প্রায় ৩০ হাজার ডিগ্রি সেলসিয়াস। কিন্তু অন্যদিকে এই নক্ষত্রগুলির জীবনকাল তুলনায় সবথেকে কম, মাত্র কয়েক লক্ষ বছর। বিজ্ঞানীদের মতে মহাবিশ্ব সৃষ্টির একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ে এই ধরনের নক্ষত্রগুলি ছিল, তবে এখন এদের সংখ্যা খুবই কম। আমাদের আকাশগঙ্গা ছায়াপথে মাত্র কয়েকটি অতি দৈত্যাকার নক্ষত্র রয়েছে বলে জানা যায়।

যত নক্ষত্রের জীবনকাল এগোয়, তত তাদের আভ্যন্তরীণ হাইড্রোজেন হিলিয়ামে পরিণত হয় এবং সেই হাইড্রোজেনের ভাণ্ডারও নিঃশেষিত হতে থাকে। নক্ষত্রের কেন্দ্রে হিলিয়াম গ্যাস নিবেশিত হয় এবং তাপমাত্রা বাড়িয়ে তোলে। এর সঙ্গে সঙ্গেই এই নক্ষত্রগুলির বাইরে উষ্ণ গ্যাসের একটা পরিমণ্ডল ক্রমেই বিস্তৃত হতে থাকে। নক্ষত্র যখন তার কেন্দ্রে সমস্ত হাইড্রোজেনকে একত্রিত করে, তার আভ্যন্তরীণ নিউক্লীয় সংযোজন বিক্রিয়া সমস্ত বন্ধ হয়ে যায় এবং নক্ষত্রের বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় শক্তি উৎপাদন প্রক্রিয়াও বন্ধ হয়ে যায়। এর ফলে নক্ষত্রের কেন্দ্র সংকুচিত হতে শুরু করে এবং এর তাপমাত্রা আরো বাড়তে থাকে। কেন্দ্রের মধ্যে হাইড্রোজেন অবশিষ্ট না থাকলেও, কেন্দ্রের বাইরে একটি বিশেষ স্তরে হাইড্রোজেন থেকে নিউক্লীয় বিক্রিয়ায় হিলিয়াম উৎপাদন চলতে থাকে। এই স্তরটি নক্ষত্রের বহিঃস্পৃষ্টকে আরো বাইরের দিকে ঠেলে দেয় এবং এর ফলেই সেটি ক্রমে প্রসারিত হয়ে শীতল লাল দানব নক্ষত্রে পরিণত হয়। এই ধরনের বিশালাকায় স্ফীত নক্ষত্রকে বলা হয় লাল দৈত্য নক্ষত্র (Red Giant Stars)। এভাবেও একটি নক্ষত্রের জীবন শেষ হতে পারে, কিংবা অন্যভাবেও হতে পারে। কীভাবে নক্ষত্রের মৃত্যু হবে তা নির্ভর করছে সেই নক্ষত্রের আকারে উপর। এই সমস্ত লাল দৈত্য নক্ষত্রগুলি ক্রমে মৃত হয়ে শ্বেত বামন নক্ষত্রে পরিণত হয়। লাল দৈত্য নক্ষত্রের কেন্দ্র অঞ্চল সংকুচিত হয়ে তার তাপমাত্রা অত্যন্ত বেড়ে যায় এবং ঘনত্বও বেড়ে যায়। এর ফলে শ্বেত বামন নক্ষত্রের ভর হয় সূর্যের থেকে মাত্র ০.১৭ থেকে ০.৩৩ গুণ বেশি, কিন্তু তার তাপমাত্রা হয় প্রায় ৭৫০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস থেকে ৪০ হাজার ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত। যদি কোনও শ্বেত বামন নক্ষত্র অন্য সহোদর নক্ষত্রের কাছাকাছি থাকে, তাহলে সেই নক্ষত্রের মধ্যেকার হাইড্রোজেন মাধ্যাকর্ষণের টানে শ্বেত বামন নক্ষত্রের পৃষ্ঠতলে সঞ্চিত হয়। পর্যাপ্ত হাইড্রোজেন সঞ্চিত হলে একটা নিউক্লীয় বিস্ফোরণ ঘটে। এর ফলেই শ্বেত বামন নক্ষত্রটি খানিক উজ্জ্বল হয়ে ওঠে এবং তার অভ্যন্তরের অবশিষ্ট পদার্থগুলি বাইরে বেরিয়ে আসে। এই পর্যায়ের নক্ষত্রকে ‘নোভা’ (Novae) বলা হয়। যে সমস্ত প্রধান ক্রম নক্ষত্রের ভর সূর্যের ভরের প্রায় আট গুণ হয়ে যায় তাদের মধ্যে এক বিশাল বিস্ফোরণ ঘটে যাকে বিজ্ঞানীরা বলেন সুপারনোভা (Supernovae)। এই সুপারনোভা থেকে জন্ম হয় নিউট্রন নক্ষত্রের (Neutron Star)। এভাবেই ক্রমান্বয়ে আবার একটি নতুন নক্ষত্রের সৃষ্টি হয়ে থাকে। সূর্যের মত কোনও নক্ষত্র অবশেষে শ্বেত বামন নক্ষত্রে পরিণত হয়। এক্ষেত্রে বিজ্ঞানীরা দেখেছেন যদি কোনও নক্ষত্রের ভর সূর্যের ভরের ১.৪ গুণ হয়, তাহলে তা শ্বেত বামন নক্ষত্র হিসেবেই পরিণতি পাবে আর যদি কোনও নক্ষত্রের ভর এর থেকে বেশি হয়,সেক্ষেত্রে তা নিউট্রন নক্ষত্রে পরিণত হয়। এই বিশেষ ভরের সীমাকে জ্যোতির্বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ‘চন্দ্রশেখর লিমিট’।

কোনও নক্ষত্রের আলো যা আমরা আজকের আকাশে দেখছি, আশ্চর্য এই যে সেই নক্ষত্র হতেই পারে বহু শত বছর আগে মৃত বা ধ্বংস হয়ে গেছে বিস্ফোরণে। পৃথিবী থেকে কোটি কোটি আলোকবর্ষ দূরে থাকায় সেই আলো এসে পৌঁছাচ্ছে বর্তমানে আমাদের চোখে। ফলে রাতের আকাশের দিকে তাকিয়ে কোনটা অতীত আর কোনটা বর্তমান ভ্রম হতেই পারে।

  • অফিস ও হোম রিলোকেশন

     

    বিস্তারিত জানতে ছবিতে ক্লিক করুন

  • প্যাকার্স ও মুভার্স এর বিশ্বস্ত প্রতিষ্ঠান 

    বিস্তারিত জানতে ছবিতে ক্লিক করুন

1 Comment

1 Comment

  1. Pingback: নক্ষত্রপুঞ্জ ।। কনস্টেলেশন | সববাংলায়

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

ঈশ্বরচন্দ্র ও তাঁর পুত্রের সম্পর্ক



বিস্তারিত জানতে ছবিতে ক্লিক করুন