সববাংলায়

নীহারিকা ।। নেবুলা

বিভাগঃ ,

আমাদের পৃথিবীর বাইরে ছড়িয়ে আছে এক অনন্ত মহাকাশ। আমাদের চেনা পৃথিবীর বাইরে এই মহাবিশ্বে, মহাকাশে বহু ঘটনা ঘটে চলেছে। আর সেই মহাকাশেরই অন্যতম সুন্দর বস্তু হল নীহারিকা । এই মহাবিশ্বে যেমন অসংখ্য ছায়াপথ রয়েছে, সেই ছায়াপথের মতই রয়েছে অসংখ্য নীহারিকা। নীহারিকা আসলে রঙিন সুদৃশ্য ধুলোর মেঘ। একে অনেকে নক্ষত্রের আঁতুরঘরও বলে থাকেন। অর্থাৎ নীহারিকা থেকেই বহু বহু নক্ষত্রের জন্ম হয়েছে বলে মনে করেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা। কুয়াশা, ধোঁয়া, গ্যাস আর বাষ্পের মিশেলে নির্মিত এই নীহারিকা কখনও শীতল, কখনও বা উষ্ণ হতে পারে। বহু বহু প্রাচীনকালে মানুষ রাতের আকাশের কালপুরুষের দিকে তাকিয়ে লক্ষ্য করেছিল এই রঙিন ধুলোর মেঘ। কিন্তু তখনও এর গঠন এবং বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে প্রকৃত ধারণা ছিল না মানুষের। বিজ্ঞান যত এগিয়েছে আমরা তত গভীরভাবে জানতে পেরেছি মহাবিশ্বের নানা বিষয়ে। নীহারিকা নিয়ে আরও নানা কথা জেনে নিই চলুন।

নীহারিকাকে ইংরেজিতে বলা হয় ‘নেবুলা’ (nebula)। গ্রিক শব্দ ‘nephele’ বা ‘nephos’ থেকে লাতিন nebula শব্দের উৎপত্তি হয়েছে বলে মনে করা হয়। এর অর্থ হল কুয়াশা, বাষ্প বা ধোঁয়া। এই নীহারিকা আসলে মহাজাগতিক মেঘ যার মধ্যে থাকে হাইড্রোহজেন, হিলিয়াম ও আরও অন্যান্য আয়নিত গ্যাস। এই গ্যাস আর ধুলিকণাকে বিজ্ঞানীরা বলছেন আন্তঃনাক্ষত্রিক উপাদান (interstellar medium)। এই আন্তঃনাক্ষত্রিক উপাদানগুলির মহাকর্ষীয় সংকোচনের (Gravitational Collapse) মাধ্যমেই নীহারিকার উৎপত্তি হয় বলে মনে করা হয়। পরিমাপের হিসেবে নীহারিকার ৯৯ শতাংশই গ্যাস যার মধ্যে ৭৫ শতাংশ থাকে হাইড্রোজেন এবং ২৫ শতাংশ থাকে হিলিয়াম। এই গ্যাস যেমন আয়নিত থাকে, আবার কখনও তড়িৎ-নিরপেক্ষ অবস্থাতেও থাকতে পারে। বিশালাকার একেকটি নীহারিকার ব্যাস হতে পারে একশো আলোকবর্ষের সমান। বিজ্ঞানীদের মতে মহাকাশে খালি চোখে দৃশ্যমান নীহারিকার ব্যাস প্রায় চাঁদের কৌণিক ব্যাসের দ্বিগুণ। নীহারিকার মধ্যে গ্যাসের ঘনত্ব থাকে খুবই কম, এমনকি পৃথিবীতে কোন শূন্যস্থানের থেকেও এই নীহারিকার ঘনত্ব কম হয় অনেক ক্ষেত্রে। এক ঘন সেন্টিমিটার  আয়তনের গ্যাসীয় নীহারিকায় একটি মাত্র গ্যাসীয় পরমাণুর উপস্থিতির কথা স্বীকার করেছেন বিজ্ঞানীরা। এই নীহারিকা থেকেই অতীতে বহু নক্ষত্রের জন্ম হয়েছে বলে মনে করা হয়। আবার ঈগল নীহারিকায় এখনও নক্ষত্র তৈরির প্রক্রিয়া চলছে বলে মনে করা হয়। গ্যাস, মহাজাগতিক ধুলো, আয়নিত নানা উপাদান মিলিত ও জমাটবদ্ধ হয়ে এক ঘনপিনদ্ধ পিণ্ডের সৃষ্টি হয়েছে এই ঈগল নীহারিকায় যাকে বিজ্ঞানীরা বলেছেন ‘Pillars of Creation’। বাস্তবিক এই নীহারিকা বলতে আকাশগঙ্গা ছায়াপথের বাইরে কোন বিস্তৃত মহাজাগতিক উপাদানের কথা বোঝানো হত। একসময় অ্যাণ্ড্রোমিডা ছায়াপথকেও অ্যাণ্ড্রোমিডা নীহারিকা বলে চিহ্নিত করা হত। বিজ্ঞানী এডউইন হাব্‌ল প্রথম আবিষ্কার করেন যে নীহারিকার সঙ্গে নক্ষত্র এবং নক্ষত্র থেকে বিচ্ছুরিত আলোর সম্পর্ক রয়েছে। এই রকম আলোর রশ্মির প্রকৃতি অনুযায়ী তিনি নীহারিকার প্রকারভেদ করার চেষ্টা করেন।

আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ১৫০ অব্দ নাগাদ জ্যোতির্বিজ্ঞানী ক্লডিয়াস টলেমি তাঁর ‘অ্যালমাজেস্ট’ বইয়ের অষ্টম ও নবম খণ্ডে পাঁচটি নীহারিকার উল্লেখ করেছিলেন বলে জানা যায়। তাঁর বইতেই প্রথম সপ্তর্ষিমণ্ডল আর সিংহ রাশির মাঝের অঞ্চলে একটি নীহারিকার অবস্থানের কল্পনা করা হয়েছিল। আরবীয় জ্যোতির্বিজ্ঞানী আব্দেল রহমান আল সুফির লেখাতেও নীহারিকা বা নেবুলা সম্পর্কে বিবিধ বর্ণনা পাওয়া যায়। পরবর্তীকালে বিভিন্ন বিজ্ঞানী নীহারিকা সম্পর্কে আলোচনা করেছেন, পর্যবেক্ষণ করেছেন। আরব ও চিনের জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা ১০৫৪ সাল নাগাদ ‘সুপারনোভা’ থেকে ক্র্যাব নীহারিকা উৎপন্ন হওয়ার প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করেছিলেন। এমনকি তাঁরা অনাবিষ্কৃত এবং আবিষ্কৃত মিলিয়ে মোট ২০টি নীহারিকা সম্পর্কে তথ্য দিয়েছিলেন। ১৭৮১ সালে চার্লস মেসিয়েরের লেখায় ১০৩টি নীহারিকার উল্লেখ পাওয়া যায়। পরবর্তীকালে উইলিয়াম হার্সেল এবং তাঁর বোন ক্যারোলিন হার্সেলও আরো অনেক নীহারিকার সন্ধান পেয়েছিলেন এবং তাঁদের পর্যবেক্ষণ লিপিবদ্ধ করেছিলেন। তারও প্রায় এক শতাব্দী পরে ১৮৬৪ সালের প্রারম্ভে উইলিয়াম হাগিন্স নীহারিকার বর্ণালী পরীক্ষা করে নিষ্প্রভ মেঘ হিসেবে নীহারিকার কিছু অংশকে পর্যবেক্ষণ করেন। অর্থাৎ তিনি কিছু নীহারিকাকে আলোক-শোষণকারী জমাটবদ্ধ উপাদান হিসেবে লক্ষ্য করেন এবং কিছু নীহারিকাকে উজ্জ্বল হিসেবে লক্ষ্য করেন। কিন্তু সবশেষে বিজ্ঞানী এডউইন হাব্‌ল প্রথম ঘোষণা করেন প্রতিটি নীহারিকার সঙ্গেই বহু নক্ষত্র যুক্ত রয়েছে।

পৃথিবীর সবথেকে কাছের নেবুলার নাম ‘হেলিক্স নেবুলা’। সূর্যের মত একটি বিশাল মৃত নক্ষত্রের অবশিষ্টাংশ এই হেলিক্স নেবুলা। পৃথিবী থেকে প্রায় ৭০০ আলোকবর্ষ দূরে আছে এই নেবুলা। এছাড়াও আরও কিছু নেবুলা হল – এম ৪২, এম ৪৩, এম ৭৮, অ্যান্ট নেবুলা, বুমেরাং নেবুলা, ক্যাটস আই নেবুলা, এস্কিমো নেবুলা, হর্সহেড নেবুলা, লেগুন নেবুলা, ওরিয়ন নেবুলা, পেলিকান নেবুলা, রেড আই নেবুলা, রিং নেবুলা, রোসেট এবং টারান্টুলা নেবুলা ইত্যাদি।

জ্যোতির্বিজ্ঞানী এডউইন হাব্‌লই প্রথম এই মহাবিশ্বের অসংখ্য নীহারিকার মধ্যে বিশেষ কিছু প্রকারভেদ নির্ণয় করেন। চলুন দেখে নেওয়া যায় এই মহাকাশে কত রকমের নীহারিকা রয়েছে। সবার প্রথমে হাব্‌ল উল্লেখ করেন পরিব্যাপ্ত নীহারিকার (Diffuse Nebulae) কথা। বহুল বিস্তৃত এই ধরনের নীহারিকাগুলির কোনো নির্দিষ্ট সীমারেখা থাকে না। যেহেতু নীহারিকাগুলি রঙিন হয়, তাই এ থেকে নির্গত আলোকরশ্মির বিচার করে বিজ্ঞানীরা পরিব্যাপ্ত নীহারিকাকে দুটি ভাগে ভাগ করেছেন – ১) বিকিরিত নীহারিকা (emission nebulae) এবং ২) প্রতিফলিত নীহারিকা (reflection nebulae)। বিকিরিত নীহারিকার ক্ষেত্রে হাইড্রোজেন ও হিলিয়াম গ্যাস নির্গত হতে থাকে। এই আয়নিত গ্যাস থেকে যে আলো বেরোয়, তা নীহারিকাকে আলোকিত ও উজ্জ্বল করে রাখে। এম ৪২, এম ৪৩ ইত্যাদি নীহারিকাকে এই পর্যায়ে ফেলেছেন বিজ্ঞানীরা। কিন্তু অন্যদিকে প্রতিফলিত নীহারিকার নিজস্ব কোন আলো থাকে না, এই নীহারিকার ভিতরে যে নক্ষত্র রয়েছে তার আলোই প্রতিফলিত হয়ে এই নীহারিকা উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। বিজ্ঞানীরা অনেকেই একে আণবিক মেঘপুঞ্জ নামে চিহ্নিত করেছেন কারণ এর মধ্যে প্রচুর পরিমাণে হাইড্রোজেন পরমাণু থাকে। আরেক প্রকারের নীহারিকার কথা বলেছেন হাব্‌ল যাকে অন্ধ নীহারিকা (Dark Nebulae) বলা হয়। এ জাতীয় নীহারিকার ভিতরকার নক্ষত্রের আলো বিকিরিত হলেও তা প্রতিফলিত হয়ে নীহারিকাকে উজ্জ্বল দেখায় না, বরং নীহারিকার চারপাশে আলোর আভা দেখা গেলেও এর মূল অংশটিকে অন্ধকার দেখায়। এই তালিকায় তৃতীয় স্থানে আছে গ্রহান্বিত নীহারিকা (planetary nebulae)। বিকিরিত নীহারিকার সঙ্গে এর বৈশিষ্ট্যগত কিছু সাদৃশ্য থাকলেও অনেকাংশেই পার্থক্য দেখা যায়। এর মধ্যেও আয়নিত হাইড্রোজেন গ্যাসের উপস্থিতি লক্ষ করেছেন বিজ্ঞানীরা। তাছাড়া একটি গ্যাসীয় আবরণের মধ্যে শ্বেত বামন নক্ষত্রকে (White Dwarf Star) কেন্দ্র করে এই নীহারিকা আবর্তিত হয়ে থাকে। এই শ্বেত বামন নক্ষত্রের আলোতেই মূলত এই নীহারিকা আলোকিত হয়ে থাকে। সবশেষে উল্লেখ করতে হয়, প্রাক্‌-গ্রহান্বিত নীহারিকার (Protoplanetory Nebulae) কথা। কোন প্রধান নক্ষত্র শ্বেত বামন নক্ষত্রে পরিণত হওয়ার সময়েই এই জাতীয় নীহারিকার উদ্ভব হয় মহাবিশ্বে। একেকটি নক্ষত্রের মৃত্যু ঘটলে তার থেকে প্রচুর ভর নষ্ট হয় যাতে তার বাইরের যে হাইড্রোজেনের আবরণ তা হাল্কা হয়ে যায়। ক্রমে তা পাতলা কুয়াশায় পরিণত হয় এবং সেই সময় দূর থেকে সেই কুয়াশার অন্তর্গত নক্ষত্রের রঙিন আলো দেখা যায়। এই দশাকেই বিজ্ঞানীরা প্রাক্‌-গ্রহান্বিত নীহারিকা বলে চিহ্নিত করেছেন।

ওরিয়ন নীহারিকার মত কিছু বিশালাকৃতি নীহারিকা খালি চোখে দেখা সম্ভব হলেও অনেকক্ষেত্রেই মহাজাগতিক ধুলো-ধোঁয়ার সঙ্গে তার পার্থক্য করা যায় না। স্পিৎজার টেলিস্কোপ এবং হাব্‌ল স্পেস টেলিস্কোপের সাহায্যে পরবর্তীকালে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা বহু নীহারিকা আবিষ্কার করেছেন এবং তার বহুবর্ণী আলোকছটার সৌন্দর্য উপভোগ করেছেন। মহাবিশ্বের অন্ধকার প্রেক্ষাপটে লাল, হলুদ, নীল, বেগুনি ইত্যাদি নানা বর্ণের সমাহারে নীহারিকাগুলিকে সত্যই মোহময় মনে হয়।                


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading