বিজ্ঞান

মহাবিশ্ব ।। বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ড ।। ইউনিভার্স

বহু বহু বছর আগে রাতের আকাশের দিকে তাকিয়ে মানুষ তারা চিনতে চেষ্টা করত। তার সঙ্গে এক গভীর রহস্য তাদের হাতছানি দিত। আকাশের তারাদের মাঝে লুকিয়ে থাকা এই মহাজগতের নানা রহস্যের নাগাল পেতে চেষ্টা করত তারা। মহাকাশ বিজ্ঞানের চর্চা তাই সেই সময় থেকেই শুরু। সূর্য, চাঁদ এদের দেখে দেখে মানুষের মনে অপার কৌতূহল হয়েছিল মহাকাশ সম্পর্কে। বিজ্ঞান যত এগিয়েছে, মানুষের এইসব কৌতূহল নিরসন করতে পেরেছে। মহাকাশের রহস্যের অনেকটাই আজ বিজ্ঞানীরা প্রকাশ্যে এনেছেন। তবু অনেকটা আজও রয়ে গেছে অজানা। বিপুলা এ পৃথিবীর কতটুকু জানি, আর পৃথিবীর বাইরের জগত সম্পর্কে ধারণা আমাদের আরও কম। আমরা লক্ষ করেছি এই পৃথিবী মহাশূন্যে ভাসমান, এর চারদিকে চাঁদ ঘোরে। আবার পৃথিবীও সূর্যের চারিদিকে ঘোরে। এই রকম আরও কত গ্রহ আছে মহাবিশ্বে, আছে কয়েক হাজার সৌরজগৎ।

মহাকাশের অন্তর্গত বস্তু ও শক্তির সমাবেশে গড়ে ওঠে মহাবিশ্ব। মহাকাশ বলতেই আমাদের মনে হয় এক বিশালাকায় শূন্য স্থান। কিন্তু মহাকাশ বিজ্ঞানীদের মতে, মহাবিশ্বের কোন স্থানই শূন্য নয়। খানিক বস্তু আর খানিক শক্তির সমাবেশেই গড়ে উঠেছে মহাবিশ্ব। এই বস্তু আর শক্তির অবস্থার নানা প্রকার রয়েছে যদিও। প্রাচীনকালে মানুষ আকাশের দিকে তাকিয়ে তারা, নক্ষত্র দেখত, দেখত ধূমকেতু, উল্কাপতনের মত অসংখ্যা মহাজাগতিক ঘটনা। ফলে মহাবিশ্বের মধ্যে রয়েছে গ্রহ, নক্ষত্র, গ্রহাণুপুঞ্জ মিলিয়ে অনেকগুলি ছায়াপথ, অনেকগুলি সৌরজগৎ এবং আরও কত কি। বহু প্রাচীনকালে গ্রিক দার্শনিকরা ভেবেছিলেন এই মহাবিশ্বের চারটি মৌলিক উপাদান রয়েছে  – আগুন, মাটি, জল ও হাওয়া। ভারতীয় দার্শনিকদের মতে এই মহাবিশ্ব তৈরি হয়েছে পঞ্চভূতের সমাহারে। এই পঞ্চভূত হল ক্ষিতি, অপ, তেজ, মরুৎ ও ব্যোম। অর্থাৎ মাটি, জল, আগুন, বায়ু ও আকাশ। তবে বিজ্ঞান যত এগিয়েছে তত এইসব ধারণার পরিবর্তে এসেছে অণু-পরমাণুর ধারণা। এই পরমাণুও আবার নিউট্রন, ইলেকট্রন ও প্রোটনে বিভাজিত হয় এবং পরে গবেষণায় জানা গেছে প্রোটন আর নিউট্রনকে ভাঙলে কোয়ার্ক (quark) কণা পাওয়া যায়। এই কোয়ার্ক আবার নানা প্রকার। বিজ্ঞানীদের মতে, আপ কোয়ার্ক, ডাউন কোয়ার্ক আর ইলেকট্রন দিয়েই মহাবিশ্বের যে কোনো জিনিস তৈরি হয়। তবু মহাবিশ্বের এক বিরাট অংশ আমাদের দৃষ্টির বাইরেই থেকে যায়। মহাকাশবিজ্ঞানীদের মতে, সমগ্র মহাবিশ্বের ৭১.৪ শতাংশ ডার্ক এনার্জি (dark energy), ২৪ শতাংশ ডার্ক ম্যাটার (dark matter) এবং ৪.৬ শতাংশ দৃশ্যমান পদার্থ দিয়ে নির্মিত। পৃথিবীর মতো আরও নানা গ্রহ, উপগ্রহ, মহাজাগতিক বস্তু, নক্ষত্র, ছায়াপথ এইসবই দৃশ্যমান পদার্থের মধ্যে রয়েছে। ফলে এই বিপুল মহাবিশ্বের মাত্র ৪.৬ শতাংশ বস্তুই কেবল আমাদের চোখে ধরা দেয়। ডার্ক এনার্জি বা গুপ্তশক্তি সম্পর্কে আজও আমরা বিশেষ কিছু জানতে পারিনি। তবে বিজ্ঞানীদের মতে এই ডার্ক এনার্জির জন্যেই একটু একটু করে এই মহাবিশ্ব প্রসারিত হচ্ছে।

মহাবিশ্বের ইংরেজি প্রতিশব্দ ‘ইউনিভার্স’ আসলে একটি প্রাচীন ফরাসী শব্দ ‘ইউনিভার্স’ (universe) বা লাতিন শব্দ ‘ইউনিভার্সাম’ (universam) থেকে এসেছে। সিসেরো (cicero) প্রথম এই লাতিন শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন, সেই থেকেই ইংরেজিতেও এই শব্দটি প্রচলিত হয়ে যায়। বহু কাল আগে গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্টটল ভাবতেন যে এই মহাবিশ্বে পৃথিবী স্থির এবং সূর্য, চাঁদ প্রভৃতি তার চারপাশে ঘুরছে। অন্যান্য নক্ষত্রগুলিও যে পৃথিবীর চারপাশে ঘুরছে সে কথা বিশ্বাস করতেন অ্যারিস্টটল। তাঁর ধারণার উপর ভিত্তি করে জ্যোতির্বিজ্ঞানী টলেমি এই মহাবিশ্বের যে ধারণা দেন তাতে একেবারে কেন্দ্রে ছিল পৃথিবী এবং এর চারপাশে ছিল আটটি গোলকের মতো সূর্য, চাঁদ, অন্যান্য নক্ষত্র এবং পাঁচটি গ্রহ। টলেমির এই মডেলের সঙ্গে ধর্মীয় বিশ্বাসের মিল থাকায় গির্জা এই ধারণাকে সম্মতি দিয়েছিল। ১৫১৪ সালে কোপারনিকাস আবার মহাবিশ্বের যে ধারণা দেন তাতে সূর্য ছিল বিশ্বের কেন্দ্রে। পৃথিবী ও অন্যান্য গ্রহ-নক্ষত্রগুলি এই সূর্যকে ঘিরে নির্দিষ্ট কক্ষপথে পরিভ্রমণ করতো। কোপারনিকাসের এই মহাবিশ্বের মডেল গির্জার ধর্মযাজকেরা মেনে নেননি। প্রচলিত ধর্মমতের বিরোধী হওয়ায় কোপারনিকাসকে নানা শাস্তি ভোগ করতে হয়েছিল ধর্মযাজকের কাছে। পরে কেপলার এবং গ্যালিলিও এই মতবাদকে সমর্থন করেন। গ্যালিলিওর দূরবীন আবিষ্কারের পরে মহাবিশ্বের ধারণা সম্পর্কে আরো স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়।


প্রাকৃতিক খাঁটি মধু ঘরে বসেই পেতে চান?

ফুড হাউস মধু

তাহলে যোগাযোগ করুন – +91-99030 06475


 


মহাকাশবিজ্ঞানীদের মতে আজ থেকে প্রায় ১৩০০ কোটি বছর আগে এই মহাবিশ্বের জন্ম হয়েছে। মহাবিশ্ব কীভাবে সৃষ্টি হল তা নিয়ে অনেক তত্ত্ব আছে। আমরা যে সকল গ্রহ, উপগ্রহ, নক্ষত্রের কথা জেনেছি সেই সব নিয়ে তৈরি হয় একেকটি ছায়াপথ। আমাদের পৃথিবী এবং সূর্য সহ অন্যান্য আরো নয়টি গ্রহ রয়েছে আকাশগঙ্গা ছায়াপথের (milkyway galaxy) মধ্যে। এরকম বহু বহু ছায়াপথে ভরে আছে এই মহাবিশ্ব। একেকটি ছায়াপথে রয়েছে অসংখ্য নক্ষত্র। প্রাচীনকালে মনে করা হতো মহাবিশ্ব সৃষ্টির আগে সেখানে মহাশূন্যে বিরাজ করতো শূন্যতা, না ছিল অন্ধকার, না ছিল আলো। বিজ্ঞানের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গেই এই সৃষ্টিতত্ত্ব সম্পর্কে ধারণাও বদলেছে। বিখ্যাত বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং মহাবিশ্ব সম্পর্কে বিগ ব্যাং (big bang) তত্ত্বের উপর আলোকপাত করেন। যদিও তাঁরও আগে জর্জ লেমাইটার প্রথম বিগ ব্যাং তত্ত্বের ধারণা দেন। এই তত্ত্ব অনুযায়ী সৃষ্টির আদিতে মহাবিশ্বের আদিতে সমস্ত ভর পুঞ্জীভূত ছিল। কোনো এক সময় মহাবিশ্বের সমস্ত বস্তুপিণ্ড একত্রিত ছিল এবং এক মহাবিস্ফোরণের ফলেই সমস্ত বস্তুপিণ্ড ছড়িয়ে পড়তে থাকে। বিগ ব্যাং-এর আগে কোনো কিছুর অস্তিত্ব ছিল না। এই বিগ ব্যাং-এর পর থেকেই তারাদের সৃষ্টি হয়। আজ থেকে প্রায় ৫৫ কোটি বছর আগে তারাদের দেখা যেতে থাকে মহাকাশে। বিজ্ঞানীদের মতে, এই বিস্ফোরণের পরেই মহাবিশ্বের একটি কণা অপর কণা থেকে সরে যেতে থাকে। এই মহাবিশ্বের এখনও অনেক কিছুই অজানা। জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা এই ক্ষেত্রে একটি রেড শিফটের (red shift) তত্ত্ব আরোপ করেন। সহজ ভাষায় রেড শিফট হল নির্দিষ্ট বিন্দু থেকে আলোকের উৎস ক্রমে দূরে সরে গেলে তার তরঙ্গ দৈর্ঘ্য বাড়ে এবং কম্পাঙ্ক কমে যায় ফলে তার রঙ লাল আলোর কাছাকাছি হতে থাকে। যেহেতু বেশির ভাগ আলোক উৎসের ক্ষেত্রে এই রেড শিফট দেখা যায় তাই বিজ্ঞানীরা ধরে নেন সমস্ত আলোক উৎসই দূরের দিকে সরে যাচ্ছে। অ্যালবার্ট আইনস্টাইন এই রেড শিফটকে কাজে লাগিয়ে ধারণা দিয়েছিলেন যে এই মহাবিশ্ব ক্রমশ বিস্তৃত হচ্ছে। বিজ্ঞানী এডউইন হাবল এই ধারণার বৈজ্ঞানিক প্রমাণও দিয়েছিলেন। এই মহাবিশ্বের বিগ ব্যাং-এর পরে তাপমাত্র ছিল অত্যধিক বেশি। এর ফলে সেই সময় পরমাণুর সৃষ্টি সম্ভব ছিল না। পরমাণু গঠনকারী বিভিন্ন কণা এবং ফোটন মহাবিশ্বে মুক্ত অবস্থায় ঘুরে বেড়াতো। এই সময় অন্য কণাগুলির সঙ্গে ফোটনের ক্রমান্বয়ী সংঘর্ষের ফলে ফোটন কণা বেরিয়ে যেতে পারে সহজেই। ক্রমে মহাবিশ্ব প্রসারিত হতে থাকে এবং এর উষ্ণতা ক্রমেই কমতে থাকে। শুধুমাত্র হাইড্রোজেন আর হিলিয়াম পরমাণুই কেবলমাত্র ছিল সেই সময়। তাছাড়া বাকি মহাবিশ্ব নিকষ আঁধারে ডুবে ছিল। একে বিজ্ঞানীরা বলেন কসমিক ডার্ক এজ (cosmic dark age)। ধীরে ধীরে মহাকর্ষীয় আকর্ষণে সমস্ত পরমাণু একত্রিত হয়ে মেঘের মতো নক্ষত্র তৈরি করে। একে কসমিক ডন (cosmic dawn) বা মহাবিশ্বের ভোর বলা হয়। পারমাণবিক বিভাজন প্রক্রিয়ার কারণে এই সব নক্ষত্রের উষ্ণতা ছিল অনেক বেশি। মহাবিশ্বের ছন্দিত মডেলে (oscillation model) মহাবিস্ফোরণ এবং মহাসংকোচন ক্রমান্বয়ে চলতে থাকে। মহাবিশ্বের অদৃশ্য শক্তির পরিমাণ খুব বেশি হলে তার প্রসারণের মাত্রা এত বেড়ে যাবে যে সমস্ত বস্তু ও শক্তি একে অপরের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে এবং এর মধ্যে দিয়ে মহাবিশ্বের সমাপ্তি ঘটবে। একে বিজ্ঞানীরা বলেছেন ‘বিগ রিপ’ (big rip)।

এই মহাবিশ্বের মধ্যে কোটি কোটি সূর্য রয়েছে বলে মনে করেন বিজ্ঞানীরা আর এই সব সূর্যকে ঘিরে গড়ে উঠেছে বহু বহু সৌরমণ্ডল যার মাত্র একটিতেই আমাদের বসবাস। এই সৌরমণ্ডলের কেবলমাত্র একটি গ্রহ পৃথিবীতেই আজ পর্যন্ত বিপুল প্রাণের স্ফূরণ দেখা গেছে। বিজ্ঞানীরা যদিও গবেষণা করে চলেছেন প্রতিনিয়ত পৃথিবীর বাইরে অন্যান্য গ্রহে প্রাণের অস্তিত্বের বিষয়ে। মহাবিশ্বের কতটুকুই বা জানা গেছে। কে জানে হয়তো আমাদের অজ্ঞাতেই এখনও পৃথিবী থেকে লক্ষ লক্ষ আলোকবর্ষ দূরের কোনো গ্রহে মানুষের মতই প্রাণী আছে, জীব আছে, আমরা হয়তো এখনও তার নাগালই পাইনি। সৌরমণ্ডলের বাইরে থাকা এই সব গ্রহকে বিজ্ঞানীরা বলছেন এক্সোপ্ল্যানেট (Exoplanet) যেখানে সমুদ্রের অতলে প্রাণের অস্তিত্ব থাকতে পারে বলে মনে করেন বিজ্ঞানীরা। আকাশগঙ্গা ছায়াপথের এই সৌরমণ্ডলে সূর্যকে কেন্দ্র করে পৃথিবী সহ অন্যান্য আরো আটটি গ্রহ আবর্তিত হচ্ছে। এই একটি সৌরমণ্ডলের সকল গ্রহ সম্পর্কেই আমরা এখনও ধারণা করে উঠতে পারিনি – মহাবিশ্ব এতই বিপুল, এতই রহস্যময়।

অন্যদিকে এই মহাবিশ্বের সূচনা যেমন হয়েছে, তেমনি মহাবিশ্বের সমাপ্তিও সম্ভব। এই মহাবিশ্বের মধ্যেই লক্ষ লক্ষ তারা প্রতিদিন জন্মাচ্ছে আর কয়েক লক্ষ তারা প্রতিদিন ধ্বংস হচ্ছে। কত সহস্র ছায়াপথ একে অপরের সঙ্গে বিস্ফোরণে ধ্বংস হচ্ছে, আবার কয়েক হাজার ছায়াপথ নতুন জন্ম নিচ্ছে। এই ছন্দ-তাল-লয়, সৃষ্টি আর ধ্বংস সব নিয়েই আমাদের এই মহাবিশ্ব।  

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

-
এই পোস্টটি ভাল লেগে থাকলে আমাদের
ফেসবুক পেজ লাইক করে সঙ্গে থাকুন

নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুকে নিয়ে জানা-অজানা তথ্য


নেতাজী

ছবিতে ক্লিক করে দেখুন এই তথ্য