ইতিহাস

গম্ভীরা

স্বরাজ যদি পাই হে ভোলা

খেতে দিব মানিককলা

না পেলে আঁইঠ্যাকলা

দেশজুড়ে তখন স্বদেশী আন্দোলনের জোয়ার। তার আঁচ পড়েছিল গম্ভীরা গানেও। কী করে গম্ভীরা গান ‘রাজনৈতিক’ হয়ে উঠলো বলবো সে কথা, তার আগে বরং জেনে নিই অবিভক্ত মালদহের একান্ত নিজস্ব লোকগান গম্ভীরার গোড়ার কথা। এ গানের নাম গম্ভীরা, এ গান যে উৎসবের অংশ তার নাম গম্ভীরা, আবার যেখানে এ উৎসব হয় তার পরিচিতিও গম্ভীরা নামে। 

দেবতাদের মানবায়ন বাঙালির চিরায়ত রীতি। উমা যেমন আমাদের ঘরের মেয়ে, তেমনি উমাপতি শিবও আমাদের ‘ঘরের বুড়ো’। আর এই বুড়ো শিবের বন্দনাগীতিই গম্ভীরা। শিবের আর এক নাম ‘গম্ভীর’, সেখান থেকেই ‘গম্ভীরা’ এসেছে বলে একাংশের মত। বিশিষ্ট গম্ভীরা গবেষক হরিদাস পালিত তাঁর “আদ্যের গম্ভীরা” গ্রন্থে বলেছেন, ‘বঙ্গদেশে চৈত্রমাসের শেষে যে শিবোৎসব ও চড়কপূজা হইয়া থাকে, তাহার চলিত নাম ‘শিবের গাজন’। যাঁহারা এই শিবের গাজন দেখিয়াছেন তাঁহারা বুঝিয়াছেন এই শিবের গাজনই নামান্তর প্রাপ্ত হইয়া মালদহে গম্ভীরা নাম খ্যাত হইয়াছে”। এই মত অনুসারে মালদার ‘গম্ভীরা’ ও দিনাজপুরের ‘গমীরা’ শিবের গাজনেরই নামান্তর। বিভিন্ন তথ্য ঘেঁটে জানা যায়, দেশভাগের আগে অখণ্ডিত মালদার ভোলাহাট শিবগঞ্জ ছিল গম্ভীরার পীঠস্থান। ভোলানাথের হাট থেকেই ভোলাহাট নামটা এসেছে বলে মনে করা হয়। যে শিব, সেই ভোলা। মালদা সদর থেকে কিলোমিটার চারেকের দূরত্বে হিন্দুপ্রধান এই ভোলাহাট গ্রামে একসময় প্রচুর শিবমন্দির ছিল, গম্ভীরার স্বাভাবিক বিকাশের পক্ষে যা ছিল অনুকূল। বর্তমানে মালদা ছাড়াও বাংলাদেশের চাঁপাইনবাবগঞ্জে গম্ভীরার চর্চা রয়েছে। 

গম্ভীরার পীঠস্থান মালদা কেন সে প্রসঙ্গে আরও কিছু কথা বলা জরুরী। মূলতঃ তন্ত্র উপাসক, বৌদ্ধ, শৈবদের ধর্মীয় সংস্কারের মিশেল এই গম্ভীরা উৎসব। নৃতাত্ত্বিক সূত্রমতে, গম্ভীরা উৎসব মূলতঃ পৌন্ড্রক্ষত্রিয় (পোদ), ধানুক, নাগর, চাঁই আর রাজবংশী – এই পাঁচ জনগোষ্ঠীরই উৎসব। জনগণনার ভিত্তিতে হার্বার্ট রিজলে (Herbert Hope Risley) দেখিয়েছেন যে রাজবংশী ছাড়া বাকি চার জনগোষ্ঠীর ঘনত্ব মালদাতেই সবচেয়ে বেশি। এই জনবিন্যাসই হয়তো মালদায় গম্ভীরা বিকাশের অন্যতম কারণ।

গম্ভীরা উৎসব পাঁচ দিনের। উৎসব শেষ হয় চৈত্রসংক্রান্তির চড়কপুজোয়। চৈত্র মাস যদি ৩০ দিনে শেষ হয়, অর্থাৎ সংক্রান্তি যদি তিরিশ তারিখ হয় তবে ২৬ তারিখে গম্ভীরার ‘ঘটভরা’, ২৭শে ‘ছোট তামাশা’, ২৮শে ‘বড় তামাশা’, ২৯শে ‘আহারা’ এবং শেষদিনে (৩০শে) চড়কপূজা। 

গম্ভীরা পার্বনের একদম প্রথম দিনটি শুরু হয় ‘ঘট ভরা ‘ দিয়ে। ‘ঘট ভরা’ অর্থাৎ ঘট প্রতিষ্ঠা করে গম্ভীরা মন্ডপে শিবের পুজো হয়। 

দ্বিতীয় দিন ছোট তামাশা। ছোট তামাশা শুরু হয় শিব বা  ‘হর-গৌরীর’ বন্দনা দিয়ে। এদিন ছোট ছোট ছেলেরা সন্যাসীর বেশ নেয়। এদের বলা হয় বাল ভক্ত । এই ‘বাল ভক্ত’রা শিবের সামনে একপায়ে দাঁড়িয়ে শিবের মন্ত্র উচ্চারণ করে ‘শিব-বন্দনা’ করে। আর এই পুরো অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন মণ্ডল বা প্রধান ভক্ত। 

তৃতীয় দিনে অর্থাৎ বড় তামাশার দিনে শুদ্ধচিত্তে ও শুদ্ধাচারে শিব ভক্তরা কাঁটাভাঙ্গা ও ফুলভাঙ্গা অনুষ্ঠান করে। এদিন শিবভক্তরা সংযমী উপোসী হয়ে মন্ডপে রাখা কাঁটা গাছ বুকে ধারণ করে এবং পরে কাঁটার বিছানায় শয়ন করে। ওই দিনই বিকেলে বাণ-ফোঁড়া পর্বে শিবভক্তরা লোহার তৈরী ত্রিশূলের সূক্ষভাগ কোমরে বিঁধিয়ে তাতে তেলে ভেজানো কাপড় জড়িয়ে আগুন লাগিয়ে দেয়। আগুন যত বেশি জ্বলতে থাকে বাদ্যযন্ত্র সহযোগে গম্ভীরার নাচও তত জোরালো হতে থাকে। এদিনই নানা অঞ্চলে এই উপলক্ষে সঙ বেরোয়। সঙের মধ্য দিয়েই সামাজিক দুর্নীতির কথা লোকসমাজে প্রচার করার প্রচলন ছিল। এ দিন সারা রাত ধরে মন্ডপে মুখোশ পরে শিব-দুর্গা, রাম-লক্ষণ প্রভৃতির নাচ চলে। ভোর হওয়ার সময় (সূৰ্য্য ওঠার আগে) ‘মশান নাচাহয়। মশান বিরাট আলুলায়িত কেশ, সিঁদুরলেপা কপাল, কাঁচুলি ও উন্নত কুচ, হাতে শঙ্খ, সালঙ্কারা বিকটবেশে সজ্জিত হয়ে বিবিধ অঙ্গভঙ্গী করে নাচ করতে থাকে, অন্যান্য ব্যক্তিরা ধুনুচিতে ধুনো দিয়ে সেই মশানের মুখের সামনে ধরে সান্ত্বনা দেয়। একে শাম্তিক্রিয়া বলে। ঢাকির বাজনার তালে তালে মুখার নাচ (মুখোশ পরে এই নাচ কে ‘মুখা নাচ’ বলা হয়) ক্রমশ ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে। অবেশেষে পূজক একটা মালা ও ধূপের ধোঁয়া সামনে নিয়ে এলে মুখা সেই ধোঁয়া গ্রহণ করে শান্ত হয়। এখানে মনে রাখতে হবে যে মশান কিন্তু ছেলেরাই সাজে।

বড় তামাশার পরের দিন হয় আহারা পুজো মশান নাচার পর হর-পার্বতীর পুজো শেষে হোম এবং তারপর ব্রাহ্মণ ও কুমারীভোজন হয়। এই দিন একটা কাঁচা বাঁশ গম্ভীরার (যেখানে গম্ভীরা উৎসব হয় তাকেও গম্ভীরা বলে) এক দিকে পুঁতে তার মধ্যে কলার মোচা, আম প্রভৃতি বেঁধে পুজো করে আহারা পুজো শেষ হয়। আহারা পুজোর পর গম্ভীরার মধ্যে দিয়ে কেউ জুতো পরে বা ছাতা মাথায় দিয়ে গেলে আগেকার দিনে নাকি দণ্ড বিধানের রীতি ছিল। এই দিন সন্ধ্যে-রাতে গানের সম্মেলন বসে। যেসব গান গাওয়া হয় তাকে বোলবাহি বা বোলবাই বা বোলাই বলে। যে বিষয় নিয়ে গান আরম্ভ বা রচিত তাকে গানের মুদ্দা বলে। প্রত্যেক গানের একটা মুদ্দা থাকা চাই। ধরা যাক, কোন  বছর বড় ভূমিকম্প হয়েছে, সেই নিয়ে গান লেখা হলে গানের মুদ্দা হলো ভূমিকম্প। এইসব গানে স্থানীয় ভাষা ও লোকসঙ্গীতের সুর স্পষ্ট। এই আহারা দিবসের আর একটা ইন্টারেস্টিং বিষয় হলো ‘শিবের চাষের অভিনয়। কেউ ধান ছিটিয়ে দেয়, কেউ হাল চালায়, কেউ ধান রোপণ করে, কেউ কেউ আবার গরু-মহিষ সেজে সেই ধান খায়। তারপরে ধান কাটা হয়, শেষে মণ্ডল বা প্রধান ভক্ত জিজ্ঞেস করেন ‘কত ধান?’। তার কেউ একটা উত্তর দিলে তা দিয়ে বছরের ধানের ফলন স্থির হয়।

গম্ভীরা উৎসবকে প্রধানতঃ দুই আঙ্গিকে ভাগ করা যায়। একদিকে যেমন আছে ঘটভরা, ফুলভাঙ্গা, আহারাপুজোর মতো আচার-অনুষ্ঠান, অন্যদিকে আছে ব্যঙ্গ-কৌতুক-অভিনয়ে ভরা গম্ভীরা গান। শিববন্দনা গম্ভীরা গানের একটা অঙ্গ হলেও, তার বাইরেও আছে অনেককিছু, যেমন – সালতামামি, টন্টিং, টপ্পা-ঠুংরি, চার-ইয়ারি ইত্যাদি। কেমন এই গম্ভীরার শিব? তিনি মোটেই স্বর্গের দেবতা নন এখানে, তিনি কখনো চালচুলোহীন সাংসারিক ভাবে উদাসীন এক মানুষ, কখনো আবার মোড়ল বা কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। মালদার বেশিরভাগ গম্ভীরার বন্দনাপর্ব শুরু হয় ‘শিব হে’ দিয়ে। আবার কোথাও কোথাও শিবকে সম্বোধন করা হচ্ছে ‘নানা’ বলে। কিছু জায়গায়, মূলত বাংলাদেশে, শিবের পরিবর্তে নানা-নাতির ভূমিকায় দু’জন অভিনয় করে। গম্ভীরা গানের আর এক উল্লেখযোগ্য দিক হোলো সালতামামি, যেখানে সারাবছর ধরে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক ভাবে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার বিবরণ দেওয়া হয় বিশ্লেনাত্মক ভঙ্গিতে। সাধারণভাবে সালতামামি কোনও এলাকার এক বাৎসরিক চালচিত্র, কাজেই এর সামাজিক গুরুত্ব অপরিসীম। এভাবেই গম্ভীরায় ধরা পড়েছে সমকালীন সমাজ-রাজনীতি। বেকার সমস্যা থেকে শুরু করে সেচের জলবণ্টন কিছুই বাদ থাকেনি তাতে। তাই গম্ভীরা শুধুই শিবকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এক ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, বরং এক পুরোদস্তুর রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান। আর এখানেই তথাকথিত লোকনাট্য থেকে গম্ভীরার স্বতন্ত্রতা, যেখানে আরাধ্য দেবতা শিব হয়ে উঠছে এক রাজনৈতিক চরিত্র যাঁকে সম্বোধন করে কোনো চরিত্র অনায়াসে বলে ওঠে – ‘শিব হে ! সেই যে ইলেকশানে জিত্যা একবার চোল্যা গেলে, ইলেকশানের আগে তো আর টিকিটি দেখলাম না’।

মুখা বা মুখোশের কথা না বললে গম্ভীরার আলোচনা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। প্রায় দেড় হাজার বছরের পুরোনো গম্ভীরা উৎসবের সঙ্গে যুক্ত মুখোশই সম্ভবত বাংলার প্রাচীনতম মুখোশ। গম্ভীরার যে অংশটি ধর্মীয় রীতি নিয়মের, সেখানেই মুখোশের ব্যবহার। শিব, কালী, নারসিংহী, বাসুলী, জহুরা মুখোশের পাশাপাশি আছে হনুমান, রাম-সীতা, বুড়া-বুড়ির নাচের মুখোশ ইত্যাদি। আগে সাধারণত কাঠের মুখোশই ব্যবহার করা হোত।  মূল মুখোশ যেগুলো গম্ভীরা মণ্ডপে থাকে তা প্রধানতঃ নিম ও বেল কাঠের তৈরি। নাচের জন্য ব্যবহৃত মুখোশ হালকা হওয়ার প্রয়োজনে ডুমুর, পিঠালি ইত্যাদি কাঠের তৈরি। এখন অবশ্য কাঠের মুখোশের চল কমে এসেছে। তার বদলে মুখোশ নির্মাণের উপাদান হয়েছে কাগজ, পিচবোর্ড, মাটি, টিন প্রভৃতি।

একটা বড় সময় জুড়ে গম্ভীরায় ধর্মীয় প্রাধান্যই বেশি ছিল। একসময় হর -গৌরীর মূর্ত্তি প্রতিষ্ঠা করে গম্ভীরা উৎসব পালন করা হোত। পরবর্তীতে গম্ভীরা হয়ে ওঠে অনেকবেশি সামাজিক ও রাজনৈতিক। জনশিক্ষার এই আকর্ষণীয় লোকসঙ্গীতের কদর ছিল খুব। গম্ভীরাগান একসময়ে স্বদেশী আন্দোলনেও  প্রেরণা জুগিয়েছে। অধ্যাপক বিনয়কুমার সরকার পরিচালিত ‘গম্ভীরা পরিষদ’ গম্ভীরা গানকে এক অন্যমাত্রা দিয়েছে। গম্ভীরায় উঠে এসেছে সাম্প্রদায়িক ঐক্যের কথা:

এ যে হিন্দু মুসলমান ছিল এক আসনে যান 

গলাগলি পীরিত করত গাইত গম্ভীরাগান”  (- সমীর খলিফা)

এমনকি ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করতে সুফি মাস্টার গম্ভীরা গানকে ব্যবহার করেন। সে সময়ে ব্রিটিশবিরোধী একটি গানের অংশ বিশেষ- 

দেশ ছাইড়া পালাবি ইঁদুর

খাইয়া পিটন হুড়কা

যখন মেয়েরা ঘরে ঘরে

ধরবে হাতে চরকা…।

গম্ভীরা গানের প্রবাদ পুরুষ হিসেবে খ্যাত যোগেন্দ্রনাথ চৌধুরী। তিনি মালদার গম্ভীরা গানের জগতে ‘মটরা’ নামে সুপরিচিত।  এ ছাড়াও বিশেষ ভাবে উল্লেখ্য তারাপদ লাহিড়ী, সুফী মাস্টার, দোকড়ি চৌধুরী, অমর মণ্ডল প্রমুখ। 

একসময়ে গম্ভীরার যে রমরমা ছিল, বিভিন্ন সামাজিক রাজনৈতিক কারণে সে জৌলুস এখন অনেকটাই ম্লান। তবু গম্ভীরা আজও এপার-ওপার বাংলার এক অন্যতম বলিষ্ঠ লোকনাট্য।

সববাংলায় পড়ে ভালো লাগছে? এখানে ক্লিক করে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ভিডিও চ্যানেলটিওবাঙালি পাঠকের কাছে আপনার বিজ্ঞাপন পৌঁছে দিতে যোগাযোগ করুন – contact@sobbanglay.com এ।


তথ্যসূত্র


  1. আদ্যের গম্ভীরা - হরিদাস পালিত
  2. গাজন - মনোজিৎ অধিকারী, প্রকাশক- দে’জ পাবলিশিং, ISBN: 978-81-295-2767-7
  3. মালদহ - সুস্মিতা সোম, প্রকাশক - সোপান, ISBN: 978-81-922470-2-1
  4. শিবের গীতে রাজনীতি - তথাগত চক্রবর্তী
  5. https://bartamanpatrika.com/
  6. http://print.thesangbad.net/
  7. https://www.kalerkantho.com/

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।