সববাংলায়

পেগাসাস স্পাইওয়্যার

বিভাগঃ ,

আধুনিক যুগের উন্নত প্রযুক্তির সাহায্যে আমরা বাজার-হাট করা থেকে ডাক্তার দেখানো প্রায় সব কাজই স্মার্টফোনে করে থাকি। ফেসবুক-হোয়াটস অ্যাপ সহ অন্যান্য সোশ্যাল মিডিয়া, ব্যাঙ্কের সমস্ত গোপন তথ্য, আমাদের ইমেল আইডি কিংবা বিভিন্ন সাইট এবং অ্যাপের পাসওয়ার্ড সবই ফোনে নিশ্চিন্তে সঞ্চিত রাখি আমরা। কিন্তু এই নিশ্চিন্তি দুশ্চিন্তায় বদলে যাবে যদি জানা যায় এমন এক সাইবার গুপ্তচর তৈরি করা হয়েছে যে কিনা যে কোনো মানুষের ফোনে একবার ঢুকলে নিমেষেই তাঁর সমস্ত গোপন তথ্য অপহরণ করে নিতে পারে যাকে আমরা এখন হ্যাকিং বলে জানি। আর এই আশঙ্কাজনক প্রসঙ্গেই সম্প্রতি উঠে এসেছে পেগাসাস স্পাইওয়্যারের নাম। তাহলে আসুন জেনে নেওয়া যাক আসলে এই পেগাসাস স্পাইওয়্যার (Pegasus Spyware) কী আর এটি কীভাবেই বা কাজ করে।

সাইবার দুনিয়ার গুপ্তচর হল এই পেগাসাস স্পাইওয়্যার। নামের মধ্যেই বোঝা যাচ্ছে স্পাই অর্থাৎ চরের মতো এই বিশেষ ক্ষতিকর সফটওয়্যার ফোন থেকে সমস্ত তথ্য পাচার করতে পারে তৃতীয় কোনো ব্যক্তি বা সংস্থার কাছে এবং কোনো ব্যক্তির উপর নজরদারি চালাতে পারে। ইজরায়েলি সাইবার-অস্ত্র নির্মাতা এবং নিরাপত্তা সংস্থা এনএসও গ্রুপের নির্মিত এই স্পাইওয়্যারটি যেকোনো অ্যাণ্ড্রয়েড কিংবা অ্যাপল সফটওয়্যারে কাজ করতে পারে। কোনো একটি লিঙ্ক বা হোয়াটসঅ্যাপ ভয়েস কলের মাধ্যমে এই স্পাইওয়্যারটি ফোনে প্রবেশ করতে পারে এবং তারপর ফোনে সঞ্চিত তথ্য, ছবি বা ভিডিও, সামাজিক মাধ্যমের কথাবার্তা, পাসওয়ার্ড, গুরুত্বপূর্ণ নথি সবই পাচার হয়ে যায় তৃতীয় ব্যক্তির কাছে। সাধারণত আমরা জানি সামাজিক মাধ্যমে কথাবার্তা বা যেকোনো আদানপ্রদান এনক্রিপ্টেড থাকে অর্থাৎ দুই পক্ষের মধ্যেই সুরক্ষিত থাকে। কিন্তু এই পেগাসাস স্পাইওয়্যার সেই বেড়াজাল ছিন্ন করে ঢুকে পড়তে সক্ষম ব্যক্তিগত পরিসরে। এমনকি সেই তৃতীয় ব্যক্তি এর মাধ্যমে ফোন হ্যাক করে ক্যামেরা কিংবা ফোনের লোকেশনটির উপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে সর্বদা কোনো মানুষের উপর নজরদারিও চালাতে পারেন। এমনকি ফোনের মাইক্রোফোন হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে কারো সঙ্গে কথা বললেও সেই কথা রেকর্ড করে নিতে পারে এই স্পাইওয়্যার। ফোন ট্যাপিংয়ের কথা আমরা আগে শুনে থাকলেও সাইবার-দুনিয়ার এমন মারাত্মক ব্রহ্মাস্ত্র আগে আলোচনায় আসেনি। বিশেষভাবে নির্মিত সাইবার-প্রকৌশলের সহায়তায় এই সফটওয়্যারটি সাধারণভাবে তৈরি হয়েছে সন্ত্রাসমূলক ষড়যন্ত্র কিংবা দেশীয় সন্ত্রাস হামলার নথি বা তথ্য জেনে দেশকে সুরক্ষিত করতে, এমনটাই জানিয়েছে এনএসও গ্রুপ।

এই এনএসও গ্রুপ আগে একটি বেসরকারী আমেরিকান ইকুইটি সংস্থা ফ্রান্সিসকো পার্টনার্সের অধীনে ছিল। পরে ২০১৯ সালে এটি পৃথক সংস্থা হিসেবে চালু হয়। গ্রিক পুরাণের দেবতা পসাইডনের সন্তান ডানাওয়ালা পেগাসাস ঘোড়ার নামানুসারে এই সফটওয়্যারটির নাম হয়েছে পেগাসাস স্পাইওয়্যার। ২০১৬ সালে প্রথম এটি নজরে আসে আরবের মানবাধিকার কর্মী আহমেদ মনসুরের। তাঁকে একটি লিঙ্ক পাঠানো হয় যার বিজ্ঞাপনে লেখা ছিল আরব আমীরশাহীর কারাগারে অত্যাচারিত কয়েদীদের কথা। সেই আপত্তিকর লিঙ্কটি তিনি সিটিজেন ল্যাব নামক একটি সংস্থায় পাঠিয়ে তাঁদের সহায়তায় জানতে পারেন যে যদি তিনি সেই লিঙ্ককে অনুসরণ করতেন তবে কারাগারের নিরাপত্তা ভাঙতে তিনি সহায়তা করতেন। এমন ঘটনার অনুসন্ধান করে জানা যায় যে ২০১৩ সাল থেকেই এইভাবে ব্যক্তিগত নিরাপত্তা খণ্ডন করে তথ্য পাচার করার চক্রান্ত শুরু হয়েছে আরব আমীরশাহী থেকে। এর অনেক পরে ২০১৮ সালে ইস্তাম্বুলের সৌদি আরব কনস্যুলেটে ‘ওয়াশিংটন পোস্ট’ সংবাদপত্রের বিখ্যাত সাংবাদিক জামাল খাসুগি সৌদি আরবের সরকার এই সফটওয়্যারের সাহায্যে তাঁর উপর অনৈতিক নজরদারি চালাচ্ছে এই মর্মে ইজরায়েলের এই এনএসও গ্রুপের বিরুদ্ধে একটি কেস দায়ের করেন। তখন থেকেই খবরে আসতে থাকে এই পেগাসাস সফটওয়্যারের নাম। ২০২১ সালে এসে জানা যায় ‘পেগাসাস প্রজেক্ট রিভিলেশন’-এর (Pegasus Project Revealation) কথা যার সাহায্যে জানা গেছে বিভিন্ন দেশের সরকার কর্তৃক দেশের রাজনীতিবিদ, সাংবাদিকদের উপর নজরদারি চালানোর চাঞ্চল্যকর সব তথ্য। তদন্তের পরে জানা গেছে যে ২০১৯ সাল থেকে এই প্রকল্প চালু হয়েছে মেক্সিকো, সৌদি আরব সহ পৃথিবীর প্রায় চল্লিশটি দেশে।

ভারতও এর হাত থেকে নিষ্কৃতি পায়নি। ২০১৯ সাল থেকে ১৬টি সংবাদমাধ্যম তদন্ত করে এই প্রকল্পের হাল-হকিকত নির্ণয় করেছে। ওই বছর ফেসবুক সংস্থা ভারতের রাজনীতিবিদ, মানবাধিকারকর্মী, সাংবাদিকদের ফোনের তথ্য অপহরণের প্রচেষ্টা এবং তাঁদের উপর নজরদারি চালানোর বিরুদ্ধে কেস রুজু করে। ২০২১ সালের ১৯ জুলাই ভারতের সংসদের বাদল অধিবেশনে উঠে আসে ভারতের প্রায় চল্লিশজনের ফোন এই পেগাসাস স্পাইওয়্যার দ্বারা আক্রান্ত হওয়ার কথা। সংবাদমাধ্যম সূত্রে জানা যায় যে, দুজন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী, একজন সাংবিধানিক পদাধিকারী, তিন জন বিরোধী নেতৃবৃন্দ সহ বহু ব্যবসায়ী, শিল্পপতি সমাজকর্মী, আমলা, নিরাপত্তা সংস্থার প্রধান প্রমুখ আক্রান্ত হয়েছেন এই স্পাইওয়্যারের দ্বারা। এই স্পাইওয়্যারের বিরুদ্ধে কংগ্রেসের প্রিয়াঙ্কা গান্ধী, পশ্চিমবঙ্গের অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় এই পেগাসাস স্পাইওয়্যারের মাধ্যমে নজরদারি চালানোর পিছনে কেন্দ্রীয় সরকারের মদত উপলক্ষ্য করে বিরোধিতায় সরব হয়েছেন।

এই ঘটনায় সব দেশের মানুষই ব্যক্তিগত সাইবার-নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্নের সম্মুখীন হচ্ছেন এবং সাইবার-দুনিয়ার এমন সব গোপন ফাঁদ থেকে নিষ্কৃতির উপায় খুঁজছে বিশ্ব।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading