ইতিহাস

কোপারনিকাস

মিকলাই কপের্নিক্‌ বা নিকোলাস কোপারনিকাস একজন যুগান্তকারী জ্যোতির্বিজ্ঞানী যিনি প্রথম বলেছিলেন যে সূর্য স্থির পৃথিবী সূর্যের চারিদিকে প্রদক্ষিণ করছে। কোপারনিকাস কেবল একজন বিজ্ঞানী ছিলেন না তিনি ছিলেন সেই যুগের এক প্রতিবাদী কন্ঠস্বর। 

১৯ ফেব্রুয়ারী ১৪৭৩ সালে নিকোলাস কোপারনিকাস পোল্যান্ড সাম্রাজ্যের রয়্যাল প্রুসিয়া প্রদেশের থর্ন (আধুনিক তোরন) শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা কারাকোর ছিলেন একজন বণিক এবং তাঁর মা ছিলেন তোরনের একজন ধনী বণিকের কন্যা। চার ভাইবোনের মধ্যে কোপারনিকাস ছিলেন সব থেকে ছোট৷ কোপারনিকাস বিয়ে করেননি তবে ১৫৩১ থেকে ১৫৩৯ সাল পর্যন্ত তাঁর আনা সিলিং নামে এক গৃহকর্মীর সঙ্গে সম্পর্ক ছিল যদিও কোন সন্তানও ছিল না তাঁদের।

কোপারনিকাস ল্যাটিন ও জার্মান ভাষায় সমানভাবে দক্ষ ছিলেন। তিনি পোলিশ, গ্রীক এবং ইটালিয়ান ভাষাতেও কথা বলতে পারতেন। তবে তিনি কাজ করেছেন বেশিরভাগই ল্যাটিন ভাষায় কারণ তৎকালীন ইউরোপের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ল্যাটিন ভাষার চলই ছিল বেশী। কেবল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয় ল্যাটিন, রোমান ক্যাথলিক চার্চ ও পোল্যান্ডের রাষ্ট্রীয় আদালতেরও প্রধান ভাষা ছিল। কোপারনিকাসের লেখা কিছু তথ্য প্রমাণ জার্মান ভাষাতেও পাওয়া যায় যে বিষয়টি জার্মানির দর্শন বিভাগের অধ্যাপক মার্টিন ক্যারিয়ার উল্লেখ করেছেন তাঁর লেখায়। কোপারনিকাসের জার্মান ভাষায় দক্ষতার অন্যতম কারণ তাঁর জন্ম জার্মানির একটি গ্রামে। ফলে ছোট থেকেই জার্মান ভাষা শুনেই উনি বড় হয়েছেন।

কোপারনিকাসের জীবনযাত্রা ছিল বৈচিত্র্যে ভরপুর। ১৪৮৩ সালে কোপারনিকাসের বাবার মৃত্যু হলে তাঁর মামা লুকাস ওয়াটজেনোরোদের (ইয়ং) নিজে তাঁর সকল দায়িত্বভার নেন এবং তাঁর শিক্ষা ও কর্মজীবনের দায়িত্বও নিজের কাঁধে তুলে নেন। কোপারনিকাসের শৈশবের পড়ালেখার তেমন কোন প্রমাণ পাওয়া যায়নি। প্রথমে সেন্ট জন বিদ্যালয়ে তিনি পড়াশুনা শুরু করেন৷ তার পরে ক্যাথিড্রাল বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। পরবর্তিকালে উচ্চ শিক্ষার জন্য তিনি কারাকাও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। ১৪৯৩-৯৪ সালের শীতকালীন সেমিস্টারে তাঁর ভাই আ্যন্ড্রুর সাথে কারাকাও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া শুরু করেন। কোপারনিকাস কলা বিভাগে ভর্তি হলেও গানিতিক জ্যোতির্বিদ্যা সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করেছিলেন। এর মধ্যে ছিল গণিত, জ্যামিতি, জ্যামিতিক অপটিক্স, মহাজাগতিক, তাত্ত্বিক এবং গণনীয় জ্যোতির্বিদ্যা। এছাড়াও তিনি দর্শন এবং আ্যরিস্টটল ও আহমদ ইবনে রুশদের লিখিত প্রাকৃতিক বিজ্ঞান সম্পর্কে গভীর জ্ঞান লাভ করেন যা তাঁকে তাঁর ভবিষ্যতের তত্ত্ব তৈরীতে খুবই সাহায্য করেছিল।

ইটালিতে পড়া শেষ হওয়ার পর তিরিশ বছরের কোপারনিকাস আবার ওয়ারমিয়াতে ফিরে আসেন যেখানে জীবনের বাকি চল্লিশ বছর কাটিয়েছিলেন। ১৫১২ সালে মামার মৃত্যুর আগে পর্যন্ত কোপারনিকাস মামার উপদেষ্টা হিসাবে কাজ করেছিলেন। মামার মৃত্যুর পর তিনি নিযুক্ত হন ফ্রুয়েনবার্গ গির্জার একনিষ্ঠ কর্তা হিসেবে। 

উচ্চতর শিক্ষা শেষ করে তিনি রোম বিশ্ববিদ্যালয়ে জ্যোতির্বিজ্ঞানের অধ্যাপক হিসেবে নিযুক্ত হন। সেই সময় তাঁর মনে মহাবিশ্ব সম্বন্ধে টলেমির সিদ্ধান্তগুলো নিয়ে সন্দেহ জাগে। পৃথিবী এই মহাবিশ্বের মাঝে অবস্থিত, পৃথিবীকে কেন্দ্র করে সূর্য, তারা আর চাঁদ ঘুরছে- এই নিয়মে তিনি কিছু ত্রুটি খুঁজে পান। জাগতিক নিয়মগুলি নিয়ে তাঁর মনে কৌতুহল জাগে। ক্লাসে যখন ছাত্রদের টলেমির সিদ্ধান্ত পড়াতেন, তখন তাঁর বার বার মনে হত তিনি ভুল শিক্ষা দিচ্ছেন।

প্রকৃত সত্যকে জানবার জন্য সঠিক ব্যখ্যা খোঁজার জন্য তিনি এ বিষয়ে আরো গভীর অধ্যয়ন শুরু করলেন। পরস্পর বিরোধী এসব ধারণার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তাঁর মন বারংবার বিভ্রান্ত হয়েছে। তিনি সর্বদা চেয়েছিলেন সত্যকে সামনে আনতে। মানসিক দোটানায় শিক্ষকতার চাকরি ছেড়ে দিয়ে শুরু হল তাঁর মনে উদ্রেক হওয়া জিজ্ঞাসার উত্তর খোঁজার পালা।

কোপারনিকাসের সময় টেলিস্কোপ ছিল না, তাই সাধারণ পর্যবেক্ষণ আর গাণিতিক পদ্ধতি উপর নির্ভর করা ছাড়া আর কোন উপায় ছিল না। ফ্রুয়েনবার্গ গির্জায় থাকাকালে একাকী তিনি চালিয়ে যান গবেষণা ও অনুসন্ধানের কাজ। এই ক্ষেত্রে কারো কাছ থেকে সহযোগিতা বা পরামর্শ তিনি পাননি। একটি উঁচু চূড়ায় দাঁড়িয়ে খালি চোখেই তিনি চন্দ্র, সূর্য ও গ্রহরাজির গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করতেন এবং নিজের পর্যবেক্ষণের ফলাফল লিপিবদ্ধ করে রাখতেন এবং সময়ে  সময়ে সেগুলো প্রকাশ করতেন। একনিষ্ঠ পর্যবেক্ষণ থেকে তিনি অনুধাবন করেন টলেমির ব্যাখ্যায় ত্রুটি আছে। তিনি অনুধাবন করেন পৃথিবী নয় সূর্যকে কেন্দ্র করেই পৃথিবী আবর্তিত হচ্ছে। কোপারনিকাস বলেন, “সূর্যের চারিদিকে পৃথিবী ঘোরে বলে ঋতু পরিবর্তন হয়। আর পৃথিবী তার নিজ অক্ষের উপর আবর্তিত হয় বলেই দিন-রাত্রি হয়।”

১৫১০ থেকে ১৫১৪ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত কোপারনিকাস তাঁর নতুন মতবাদের সংক্ষিপ্তসার হিসাবে একটি পান্ডুলিপি প্রস্তুত করেন। ১৫১৪ খ্রিষ্টাব্দে ব্যক্তিগত পর্যায়ে তিনি তাঁর বন্ধুদের মাঝে প্রচার করেন। তিনি ছিলেন গির্জার যাজক, তাঁর মতবাদ প্রচলিত ধর্মবিশ্বাসের সম্পূর্ণ বিরোধী। তাই স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে মতবাদের প্রচার করতে পারেননি। শেষপর্যন্ত ১৫৩৩ খ্রিষ্টাব্দে রোমের পোপ সপ্তম ক্লিমেন্টের সামনে এগুলো নিয়ে বক্তৃতাও করলেন এবং তাঁর সমর্থনও লাভ করলেন। তখন তাঁর মতবাদ প্রকাশের জন্য ১৫৩৬ খ্রিষ্টাব্দে আনুষ্ঠানিক অনুরোধ পেলেন কোপারনিকাস। তাঁর শিষ্য রেটিকাসের প্রচেষ্টায় রচনা প্রকাশ করার সিদ্ধান্ত নিলেন। রেটিকাস প্রকাশনার দায়িত্ব আন্দ্রিয়াস ওসিয়ান্ডারের হাতে তুলে দেন। কিন্তু  সমালোচনার ভয়ে ওসিয়ান্ডার নিজ দায়িত্বে গ্রন্থের সাথে একটা মুখবন্ধ জুড়ে দিলেন। তিনি ভাবলেন, বই প্রকাশিত হলে কোপারনিকাসের সঙ্গে তাকেও বিপদগ্রস্ত হতে হবে। তাই বইয়ের প্রথমে লিখলেন- “এ বইয়ের বিষয়বস্তু পুরোপুরি সত্য নয়। অনুমানের উপর ভিত্তি করে লেখা হয়েছে।” শুধু তাই নয়, তিনি ইচ্ছেমতো বই থেকে বিভিন্ন নাম তুলে নিলেন। তার মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ছিল আরিস্টার্কাসের নাম, যিনি প্রথম গভীর বিশ্বাসের সাথে বলেছিলেন, সূর্য স্থির পৃথিবী গতিশীল। 

শেষপর্যন্ত ১৫৪৩ খ্রিষ্টাব্দের ২৪ মে প্রকাশিত হল ‘De revolutionibus orbium coelestium’। কোপারনিকাসের এই বই পৃথিবীকে কেন্দ্র থেকে সরিয়ে মহাবিশ্বের ধারণার যে পরিবর্তন এনে দিয়েছিল তা অনেকেই মেনে নিতে পারলেন না৷ 

তাঁর বইটি যখন প্রকাশিত হয় তখন তিনি ছিলেন পক্ষাঘাত ও মানসিক রোগে আক্রান্ত। বইটি ছাপা অবস্থায় তাঁর কাছে এসে পৌঁছলে তখন তাঁর পড়ে দেখার মতো অবস্থা ছিল না। ১৫৪৩ সালের ২৪ মে সত্তর বছর কোপারনিকাসের মৃত্যু হয়। পোল্যান্ডের বাল্টিক কোস্টের ফ্রমব্রোক ক্যাথিড্রালের মেঝের নিচে নাম-পরিচয়হীনভাবে অবহেলার সাথে তাঁকে সমাধিস্থ করা হয়৷ 

তাঁর এই মতবাদ প্রচার করার জন্য পরবর্তীকালে জিওর্দানো ব্রুনোকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়। তবুও তাঁর বইয়ের মধ্যে দিয়ে তিনি যে সত্যের প্রতিষ্ঠা করে গেছেন, তার উপর ভিত্তি করে পরবর্তীকালে গ্যালিলিও, কেপলার, নিউটন, আইনস্টাইন জ্যোতির্বিজ্ঞানের নতুন নতুন দিগন্তকে উন্মোচন করেছেন। অথচ জীবনকালে কোপারনিকাস তাঁর মূল্য পেলেন না৷ 

Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

To Top
error: Content is protected !!

বাংলাভাষায় তথ্যের চর্চা ও তার প্রসারের জন্য আমাদের ফেসবুক পেজটি লাইক করুন