রায়গুণাকর ভারতচন্দ্র

রায়গুণাকর ভারতচন্দ্র

অষ্টাদশ শতকের যুগসন্ধির বিখ্যাত কবি রায়গুণাকর ভারতচন্দ্র (Raygunakar Bharatchandra)। নদীয়ার রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের সভাকবি ছিলেন তিনি। ‘অন্নদামঙ্গল’ কাব্যের জন্যই তিনি বাংলা সাহিত্যে চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন। এছাড়াও ‘সত্যপীরের কথা’, ‘রসমঞ্জরী’ ইত্যাদি বিখ্যাত সব গ্রন্থও তাঁরই রচনা। ভারতচন্দ্রের ব্যক্তিজীবন সম্পর্কে খুব বেশি তথ্য পাওয়া যায় না। ঈশ্বর গুপ্তই প্রথম তাঁর জীবনী রচনা করেন এবং তা ‘সংবাদ প্রভাকর’ পত্রিকায় প্রকাশ করেন। ভারতচন্দ্রের মৃত্যুর মধ্য দিয়েই মধ্যযুগের সমাপ্তি ঘটে। তাঁর পাণ্ডিত্য ও কবি প্রতিভার বিশ্লেষণ করে মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র ভারতচন্দ্রকে ‘রায়গুণাকর’ উপাধিতে ভূষিত করেন।  

১৭১২ সালে বর্ধমান জেলার ভুরশুটের পেঁড়ো গ্রামে ভারতচন্দ্রের জন্ম হয়। তাঁর পুরো নাম ভারতচন্দ্র রায়। তবে তাঁর জন্ম সাল ও জন্ম স্থান নিয়ে পণ্ডিতদের মধ্যে মতানৈক্য রয়েছে। ঈশ্বর গুপ্ত তাঁর লেখায় উল্লেখ করেছেন, ভারতচন্দ্রের জন্ম হয়েছে ১৭১২ সালে, আবার অন্য অনেক ঐতিহাসিকের মতে ১৭০৫ সাল থেকে ১৭১০ সালের মধ্যেই তাঁর জন্ম হয়। আবার অনেকের মতে হাওড়া জেলার পাণ্ডুয়া বা পেড্রো গ্রামে তাঁর জন্ম হয়। ভারতচন্দ্রের বাবা নরেন্দ্র নারায়ণ রায় ছিলেন জমিদার। ভারতচন্দ্রের মায়ের নাম ছিল ভবানী দেবী। নরেন্দ্র নারায়ণ এবং ভবানী দেবীর চার সন্তানের মধ্যে কনিষ্ঠ পুত্র ছিলেন ভারতচন্দ্র। তাঁদের কৌলিক পদবি ছিল মুখোপাধ্যায়, কিন্তু ধনাঢ্য হওয়ার জন্য ‘রায়’ উপাধি পেয়েছিলেন তাঁরা। ‘সত্যপীরের পাঁচালী’তে তিনি প্রথম আত্মপরিচয় উল্লেখ করেন। জনশ্রুতি অনুসারে বর্ধমানের রাজার সঙ্গে নরেন্দ্র নারায়ণের কিছু বিবাদের কারণে সমস্ত জমিজমা রাজা বাজেয়াপ্ত = করে নেন এবং তার জন্য নিঃস্ব হয়ে যান তিনি। এমনকি অনেকে বলে থাকেন পাণ্ডুয়ার রাজপ্রাসাদটিও নাকি নরেন্দ্র নারায়ণের থেকে কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। ফলে অত্যন্ত আর্থিক অনটনের মধ্যে পড়ে ভারতচন্দ্রের পরিবার। পরবর্তীকালে নরোত্তম আচার্যের কন্যাকে বিবাহ করেছিলেন রায়গুণাকর ভারতচন্দ্র। তাঁদের তিন পুত্রের নাম যথাক্রমে পরীক্ষিৎ, রামতনু ও ভগবান।

এই সময়ই ভারতচন্দ্র বাড়ি থেকে পালিয়ে তাঁর মামার বাড়ি নওয়াপাড়া গ্রামে চলে যান এবং তাজপুর গ্রামে পড়াশোনা শিখতে শুরু করেন। চোদ্দো বছর বয়সে পাঠশালার পড়া শেষ করে নিজের গ্রামে ফিরে আসেন তিনি। ঐ সময়ই পাঠশালায় সংস্কৃত ভাষা অধ্যয়ন করেছিলেন তিনি। কিন্তু সেই সময় সংস্কৃত ভাষা শিখে খুব বেশি অর্থসংস্থান করা সম্ভব হত না। মুঘল শাসনে সর্বত্রই ফার্সি ভাষার প্রাধান্য ছিল এবং সরকারি চাকরি পেতে হলে ফার্সি ভাষা আবশ্যকভাবে শিখতে হত। এই লক্ষ্যেই ভারতচন্দ্র হুগলি জেলার দেবানন্দপুর গ্রামের রামচন্দ্র মুন্সীর কাছে ফার্সি ভাষা শিখতে শুরু করেন। রামচন্দ্রের বাড়িতে থেকে তাঁরই অন্নসংস্থানে বেশ কষ্ট করেই ফার্সি ভাষা শিখে ফেলেন তিনি। ঐ সময় থেকেই তাঁর মধ্যে কবিত্বশক্তির স্ফূরণ দেখা যায়।

রামচন্দ্র মুন্সির বাড়িতে থাকার সময়েই সত্যনারায়ণের পূজা উপলক্ষ্যে ভারতচন্দ্র রচনা করেন ‘সত্যপীরের পাঁচালী’। মাত্র পনেরো বছর বয়সে ১৭৩৭ সালে তাঁর এই লেখাটিই ছিল প্রথম লেখা কবিতা। প্রথমে সত্যনারায়ণ পূজা উপলক্ষ্যে একটি সংক্ষিপ্ত পাঁচালি লিখলেও পরে হীরারাম রায় নামে জনৈক অনুরাগীর অনুরোধে সত্যনারায়ণ দেবতা নিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ পাঁচালি রচনা করেন তিনি। ফার্সি ভাষা শেখার সুবাদে তাঁর রচিত এই পাঁচালি দুটিতেও প্রচুর ফার্সি শব্দের প্রয়োগ দেখা যায়। ক্রমে তিনি ফার্সি ভাষার একজন পণ্ডিত ব্যক্তি হয়ে ওঠেন। এরপরে তিনি আইন ব্যবসার কাজে নামেন এবং বর্ধমানে ফিরে অন্যান্য ভাইদের সঙ্গে মোক্তারি করা শুরু করেন। বর্ধমানের মহারাজার কাছ থেকে জমিদার নরেন্দ্র নারায়ণ কিছু জমি লিজ নিয়েছিলেন, ভারতচন্দ্রের কাঁধে এই জমি দেখাশোনার দায়িত্ব পড়ে। কিন্তু জমির খাজনা ঠিক সময় মত জমা দেন না তাঁর ভাইয়েরা। ফলে খাজনা পরিশোধ করতে না পারায় বর্ধমানের মহারাজ সেই সব লিজ নেওয়া জমি খাসভুক্ত করে নেন এবং ভারতচন্দ্রকে কারারুদ্ধ করেন। কিন্তু কৌশলে কারারক্ষীর সঙ্গে ছল করে কারাগার থেকে পালিয়ে গিয়েছিলেন ভারতচন্দ্র। পরে এক শুভাকাঙ্ক্ষী ভৃত্যের সঙ্গে উড়িষ্যায় চলে যান এবং সেখানে বৈষ্ণব সন্ন্যাসী মহলে তাঁর মেলামেশার ফলে তিনিও সন্ন্যাসীর বেশ ধারণ করেন। এই সন্ন্যাসীর বেশেই ভারতচন্দ্র খানাকুলে আসেন এবং সংসারধর্ম পালন করতে শুরু করেন। ফরাসি সরকারের দেওয়ান ফরাসডাঙার ইন্দ্রনারায়ণ চৌধুরীর সহায়তায় ভারতচন্দ্র নদীয়ার রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায়ের রাজসভায় কাজ পান। চল্লিশ টাকা মাসিক বেতনে কৃষ্ণচন্দ্রের রাজসভায় সভাসদ হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন ভারতচন্দ্র। কৃষ্ণচন্দ্রের অনুগ্রহে কৃষ্ণনগরেই থাকতে শুরু করেন তিনি। তাঁর পাণ্ডিত্য আর কবিত্বশক্তিতে মুগ্ধ হয়ে মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র ভারতচন্দ্রকে ‘রায়গুণাকর’ উপাধিতে ভূষিত করেন। এই সময়েই কৃষ্ণচন্দ্রের আনুকূল্যে তিনি মূলাজোড় পরগণা লাভ করে সেখানেই বাড়ি বানিয়ে থাকতে শুরু করেন। কৃষ্ণচন্দ্র এই জমির জন্য বার্ষিক ছয়শো টাকা সম্মানীও দিতেন রায়গুণাকর ভারতচন্দ্রকে। বর্ধমানের মহারাজ তিলকচন্দ্রের মা বিশেষ কারণে কৃষ্ণচন্দ্রের থেকে মূলাজোড় পরগণা ইজারা নিলে ভারতচন্দ্র আবার গৃহহারা হয়ে ‘গুম্ভে’ গ্রামে গিয়ে থাকতে শুরু করেন। বর্ধমানের রাজার পত্তনিদার রামদেব নাগের অত্যাচারের বিশদ বর্ণনা সম্বলিত ‘নাগাষ্টকম্‌’ নামের একটি কাব্য এই সময়েই রচনা করেন রায়গুণাকর ভারতচন্দ্র এবং কাব্যটি লিখে তিনি মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের কাছে পাঠিয়েছিলেন। এর কিছুদিন পরেই মূলাজোড় পরগণা পুনরায় ভারতচন্দ্রকে ফিরিয়ে দেন কৃষ্ণচন্দ্র। কৃষ্ণচন্দ্রই কবিকে সপ্তদশ শতাব্দীর বিখ্যাত কবি মুকুন্দরাম চক্রবর্তীর লেখা ‘চণ্ডীমঙ্গল’ কাব্যের অনুসরণে একটি নতুন কাব্য লিখতে উৎসাহ দিয়েছিলেন। তাঁর উৎসাহেই রায়গুণাকর ভারতচন্দ্র ‘অন্নদামঙ্গল’ কাব্য রচনা করেন। কৃষ্ণচন্দ্রের অনুরোধে বিদ্যাসুন্দরের কাহিনীও তিনি এই কাব্যের সঙ্গে সংযোজন করেন। এই ‘অন্নদামঙ্গল’ কাব্যের জন্যই বাংলা সাহিত্যে চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন রায়গুণাকর ভারতচন্দ্র। কৃষ্ণচন্দ্রের রাজসভায় নীলমণি দীনদেশাই নামের এক ব্যক্তি সমগ্র ‘অন্নদামঙ্গল’ কাব্যটি সঙ্গীতাকারে পরিবেশন করেছিলেন বলে জানা যায়।

১৭৭৬ থেকে ১৮৩৯ সালের মধ্যেই সম্ভবত রায়গুণাকর ভারতচন্দ্র তাঁর অন্নদামঙ্গল কাব্যটি লিখেছিলেন যা ১৮১৬ সালে প্রকাশিত হয়। লন্ডনের ব্রিটিশ মিউজিয়াম, কলকাতার এশিয়াটিক সোসাইটি এবং বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ-এ এই কাব্যের পুঁথি আজও সংরক্ষিত রয়েছে। ভারতচন্দ্র নিজে এই কাব্যকে আখ্যা দিয়েছেন ‘নূতন মঙ্গল’। কাশীখণ্ড উপপুরাণ, মার্কণ্ডেয় পুরাণ, ভাগবত পুরাণ, বিল্‌হনের লেখা ‘চৌরপঞ্চাশিকা’ ইত্যাদি গ্রন্থ থেকেই কবি এই কাব্যের আখ্যানবস্তু সংগ্রহ করেছিলেন। মূলত তিনটি খণ্ডে বিভক্ত এই কাব্যটি। প্রথম খণ্ডের নাম অন্নদামঙ্গল, দ্বিতীয় খণ্ড বিদ্যাসুন্দর এবং তৃতীয় খণ্ডের নাম মানসিংহ বা অন্নপূর্ণামঙ্গল। অন্নদামঙ্গল নামক খণ্ডে শিব ও সতীর কাহিনী, সতীর দেহত্যাগ, ব্যাসের কাশী নির্মাণ, দেবী অন্নপূর্ণার পূজা প্রচার, অন্নপূর্ণার মাহাত্ম্য, শিবের অন্নদাপূজা, ভবানন্দের জন্ম এবং দেবী অন্নদার ভবানন্দ গৃহে যাত্রা ইত্যাদি পৌরাণিক কাহিনীর পাশাপাশি গ্রন্থ পরিচয় অংশে নিজের জীবন ও তৎকালীন সমাজ-রাজনৈতিক নানা ঘটনার পরিচয় দিয়েছেন রায়গুণাকর ভারতচন্দ্র। এই অংশেই রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের সভার বর্ণনা দিয়েছিলেন ভারতচন্দ্র। ‘বিদ্যাসুন্দর’ শীর্ষক খণ্ডে বর্ধমানের রাজকন্যা বিদ্যার সঙ্গে কাঞ্চীর রাজকুমার সুন্দরের প্রেমকাহিনী বর্ণনা করেছেন রায়গুণাকর ভারতচন্দ্র। এই ‘বিদ্যাসুন্দর’ অংশে আদিরসের প্রাধান্য থাকায় এই কাব্যটি পরে নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়েছিল। এই খণ্ডে যেমন কবি মানসিংহের বাংলায় আগমনের বৃত্তান্ত রচনা করেছেন, তৃতীয় খণ্ডে বর্ধমান থেকে মানসিংহের প্রস্থান, মানসিংহের যশোরযাত্রা, মানসিংহের সঙ্গে প্রতাপাদিত্যের যুদ্ধ, ভবানন্দের বাড়িতে মানসিংহের আগমন, ভবানন্দের কাশী গমন ইত্যাদি ঘটনা বিবৃত করেছেন তিনি। এই কাব্যের ভবানন্দ চরিত্রটি বাস্তবে মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের পূর্বপুরুষ ছিলেন। তাঁর কীর্তি বর্ণনাই এই চরিত্রের উপস্থিতির মূল লক্ষ্য ছিল। অন্যান্য কাব্যের প্রভাব থাকলেও ব্যাসদেবের চরিত্র ও কাহিনীটি ভারতচন্দ্রের সম্পূর্ণ নিজের সৃষ্টি। ‘অন্নদামঙ্গল’ কাব্যের বহু পংক্তি বহুল জনপ্রিয়তার কারণে প্রবাদ বাক্যে পরিণত হয়েছে। কাব্যে ঈশ্বরী পাটনীর কামনা ‘আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে’ আজও আপামর বাঙালি মায়ের কামনা। এই কাব্য ছাড়া রায়গুণাকর ভারতচন্দ্র রচিত অন্যান্য রচনাগুলি হল – ‘রসমঞ্জরী’, ‘চণ্ডীনাটক’, ‘নাগাষ্টক’, ‘গঙ্গাষ্টক’ ইত্যাদি। এছাড়া আরো অনেক ছোট ছোট কবিতা লিখেছিলেন ভারতচন্দ্র যেমন – বসন্ত বর্ণনা, বর্ষা বর্ণনা, হাওয়া বর্ণন, কৃষ্ণের উক্তি, রাধিকার উক্তি, বলি রাজার উক্তি ইত্যাদি। হিন্দি ভাষাতেও একটি কবিতা লিখেছিলেন তিনি। তাঁর লেখা ‘রসমঞ্জরী’ আসলে মিথিলার ভানু দত্তের কাব্যের অনুবাদ এবং তাঁর ‘গঙ্গাষ্টক’ কাব্যটি সম্পূর্ণটাই সংস্কৃত ভাষায় লেখা।  

১৭৬০ সালে মাত্র ৪৮ বছর বয়সে বহুমূত্র রোগে রায়গুণাকর ভারতচন্দ্রের মৃত্যু হয়।      

তথ্যসূত্র


  1. 'কবি ভারতচন্দ্র',শঙ্করীপ্রসাদ বসু, দে'জ পাবলিশিং, তৃতীয় সং, নভেম্বর ২০১৪, কলকাতা, পৃষ্ঠা ১-৯
  2. 'রায়গুণাকর ভারতচন্দ্র', শ্রী মদনমোহন গোস্বামী, নালন্দা প্রেস, ১৯৫৫, কলকাতা, পৃষ্ঠা ১২-২৭, ৪৬-৭৬
  3. https://www.bajkulcollegeonlinestudy.in/
  4. https://ir.nbu.ac.in/
  5. https://roar.media/
  6. https://en.wikipedia.org/

আপনার মতামত জানান