ধর্ম

নিজের ছেলের হাতে অর্জুনের মৃত্যু

নিজের ছেলের হাতে অর্জুনের মৃত্যু হয়েছিল। আবার তিনি বেঁচেও গিয়েছিলেন নিজের স্ত্রীর সাহায্যে। মহাভারত তথা বিভিন্ন পৌরাণিক গল্পগুলোতে জন্ম মৃত্যু এগুলো অনেকক্ষেত্রেই অলৌকিক ভাবে সম্পন্ন হয়েছে। তাই অর্জুনের মৃত্যুর পর তাঁর বেঁচে ওঠা খুব একটা আশ্চর্যের কিছু নয়। অর্জুনের মৃত্যু আসলে কুরুক্ষেত্রে তাঁর করা পাপের ফল হিসেবেই তিনি পেয়েছিলেন।

কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ শেষে হস্তিনাপুরের রাজা জ্যেষ্ঠ পাণ্ডব যুধিষ্ঠির একদিন স্থির করলেন তিনি অশ্বমেধ যজ্ঞ করবেন। যজ্ঞের ঘোড়াকে ইচ্ছেমতো ঘুরতে ছেড়ে দেওয়া হল। তাকে অনুসরণ করলেন অর্জুন। নিয়মানুযায়ী ঘোড়া যেখানে যেখানে যাবে সেখানের রাজা হয় বশ্যতা স্বীকার করে নেবেন বা অর্জুনের সাথে যুদ্ধ করবেন। ইতিমধ্যেই কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে প্রাণ হারিয়েছিলেন বহু রাজা। তাই‚ যুধিষ্ঠিরের নির্দেশ ছিল‚ অর্জুন যেন বিভিন্ন প্রদেশের রাজাদের মৈত্রী প্রস্তাব দেন এবং যুদ্ধ যথাসম্ভব এড়িয়ে চলেন।

ঘোড়া হস্তিনাপুর ছেড়ে বেরল, সঙ্গে চললেন অর্জুন এবং তাঁর সেনা। উত্তরে গিয়ে ঘোড়া প্রথমে প্রবেশ করল ত্রিগর্তদেশে। সেখানকার রাজা সূর্যবর্মা ঘোড়াকে আটকালেন এবং মৈত্রী প্রস্তাব উড়িয়ে দিয়ে যুদ্ধ করলেন অর্জুনের বিরুদ্ধে। অর্জুন তাঁঁকে যুদ্ধে হারিয়ে এগিয়ে চললেন ঘোড়ার পিছনে।  এরপর ঘোড়া ঢুকল প্রাগজ্যোতিষপুরে। সেখানকার রাজা বজ্রদত্ত অর্জুনের সাথে যুদ্ধ করতে এলেন এবং অর্জুনের কাছে হেরে গিয়ে তাঁর মৈত্রীপ্রস্তাব স্বীকার করলেন। এরপর ঘোড়া ঢুকল সিন্ধু প্রদেশে। সেখানকার রাজারা জয়দ্রথের মৃত্যু স্মরণ করে অর্জুনকে আক্রমণ করলেন এবং হেরে গেলেন। এরপর অশ্ব প্রবেশ করল মনিপুরে।

মণিপুরের সিংহাসনে তখন বসে বভ্রুবাহন। এই বভ্রুবাহন হলেন অর্জুন এবং চিত্রাঙ্গদার পুত্র।  পিতা অর্জুন আসছেন জেনে রাজা বভ্রুবাহন নিজে তাঁকে স্বাগত জানাতে এলেন। কিন্তু অর্জুন সেই অভ্যর্থনা না গ্রহণ করে পুত্রকে বললেন যে শত্রুকে স্বাগত করা ক্ষত্রিয়ের ধর্ম নয়। তাই‚ পুত্র বভ্রুবাহন যেন তাঁর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন। কিন্তু পিতার বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরতে রাজি ছিলেন না বভ্রুবাহন। অর্জুন তাঁকে তিরস্কার করে চললেন। তখন তাঁকে বোঝাতে অর্জুনের আর এক স্ত্রী নাগরাজ কন্যা উলুপী সেখানে উপস্থিত হয়ে তাঁকে নিজের পরিচয় জানিয়ে বললেন তিনি (উলুপী) তাঁর (বভ্রুবাহন) সৎ মা। তিনি বললেন যে ক্ষত্রিয়ের ধর্ম পালন করে যেন বভ্রুবাহন অর্জুনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে। সৎ মা’র অনুমতি পেয়ে পিতার বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হলেন বভ্রুবাহন। পুত্রের যুদ্ধে মুগ্ধ হলেন অর্জুন। যুদ্ধ যত তুমুল হল, তত ভয়ঙ্কর হয়ে উঠলেন বভ্রুবাহন। যুদ্ধে অর্জুন মারা গেলেন। মারা যাবার আগে তিনিও পুত্রকে যথেষ্ট তীরবিদ্ধ করেছিলেন, যার ফলে সমর প্রাঙ্গণেই জ্ঞান হারিয়ে পড়ে থাকলেন বভ্রুবাহন |

সংবাদ পেয়ে ছুটে এলেন চিত্রাঙ্গদা। এই অবস্থার জন্য তিনি উলুপীকে দায়ী করলেন এবং তাঁকে বললেন যে ভাবেই হোক অর্জুনের জ্ঞান ফিরিয়ে আনতে হবে। ইতিমধ্যে জ্ঞান ফিরে এল বভ্রুবাহনের এবং নিজের হাতে পিতাকে বধ করে বিশাল অনুতপ্ত ছিলেন তিনি। তাঁর হাতে কিভাবে এত বড় অনর্থ হয়ে গেল ভাবতে ভাবতেই তিনি শোকে ব্যাকুল হয়ে গেলেন। উলুপী মন্ত্রোচ্চারণ করে নাগলোক থেকে সঞ্জীবন মণি আনালেন। তারপর উলুপী বললেন যে অর্জুনের জন্ম ইন্দ্রের থেকে, সে কি অত সহজে মারা যেতে পারে! তাঁর হাতের সঞ্জীবন মণি বভ্রুবাহনকে দিয়ে বললেন এই মণি ছোঁয়ালেই  অর্জুন চিরনিদ্রা থেকে জেগে উঠবেন। উলুপীর নির্দেশে ওই মণি অর্জুনের দেহে ছোঁয়াতেই মুহূর্তের মধ্যে সুস্থ হয়ে উঠে বসেন অর্জুন।

তারপর উলুপী জানান যে এসবই অর্জুনের কৃতকর্মের ফল। যদি এভাবে অর্জুন মারা না যেতেন, তাহলে তাঁকে তাঁর পাপের জন্য নরকে যেতে হত। কি সেই পাপ? উলুপী বললেন‚ একদিন গঙ্গা তাঁর পুত্রদের নিয়ে উলুপীর সাথে দেখা করে বলেন‚ যে অর্জুন রথের সামনে শিখণ্ডীকে বসিয়ে কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে অন্যায়ভাবে ভীষ্মকে পরাস্ত করেছেন। ভীষ্ম আসলে অষ্টবসুর অষ্টম বসু। তাঁর প্রতি এই অন্যায় আচরণের বিধান চাওয়ায় গঙ্গা শাপ দিয়েছিলেন যে নিজের পুত্রের হাতেই মারা যাবেন অর্জুন। তবে নাগরাজের অনুরোধে নরম হয়ে বসুরা বলেন‚ নিজের পুত্রের হাতে অর্জুন মারা গেলেও আবার জ্ঞান ফিরে আসার মতই উঠে বসবেন এবং এতেই তাঁর সব পাপ ধুয়ে যাবে।

সব ঘটনা শুনে উলুপী চিত্রাঙ্গদার মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি শেষ হয়। অর্জুন তাঁকে বলেন যে তিনি (উলুপী) ঠিক কাজই করেছেন। তারপর বভ্রুবাহনকে আশীর্বাদ করে তাঁদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে মণিপুর ছেড়ে ঘোড়াকে অনুসরণ করে অন্যান্য রাজ্যে এগিয়ে যান অর্জুন।

স্বরচিত রচনা পাঠ প্রতিযোগিতা, আপনার রচনা পড়ুন আপনার মতো করে।

vdo contest

বিশদে জানতে ছবিতে ক্লিক করুন। আমাদের সাইটে বিজ্ঞাপন দেওয়ার জন্য যোগাযোগ করুন। ইমেল – contact@sobbanglay.com

 


তথ্যসূত্র


  1. "মহাভারত সারানুবাদ", দেবালয় লাইব্রেরী(প্রকাশক সৌরভ দে, তৃতীয় প্রকাশ) - রাজশেখর বসু, আশ্বমেধিক পর্ব (১০। অর্জুনের নানা দেশে যুদ্ধ  পৃষ্ঠাঃ ৫৮১ - ৫৮৩)
  2. https://en.wikipedia.org/wiki/Babruvahana

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।