অজয় কুমার মুখোপাধ্যায় (Ajay Kumar Mukhopadhyay) ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামী এবং পশ্চিমবঙ্গের একজন বিশিষ্ট রাজীতিবিদ। তিনি মেদিনীপুর জেলায় ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের অন্যতম প্রধান সংগঠক এবং স্বাধীনোত্তর পশ্চিমবঙ্গের চতুর্থ মুখ্যমন্ত্রী এবং তিন দফায় ওই পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। ১৯৪২ সালে ভারত ছাড়ো আন্দোলনের সময় মেদিনীপুরের তমলুকে যে ‘তাম্রলিপ্ত জাতীয় সরকার’ গঠিত হয়েছিল, তার গঠন এবং পরিচালনায় তাঁর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পরবর্তীকালে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের প্রথম সারির নেতা হিসেবে তিনি দীর্ঘকাল রাজ্যের সেচ ও জলপথ দপ্তরের মন্ত্রিত্ব সামলান। ১৯৬০-এর দশকে কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ নীতি ও নেতৃত্বের সঙ্গে মতবিরোধের জেরে তিনি দল ত্যাগ করে ‘বাংলা কংগ্রেস’ গঠন করেন এবং বামপন্থীদের সঙ্গে জোট বেঁধে রাজ্যে প্রথম অ-কংগ্রেসী যুক্তফ্রন্ট সরকার প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর রাজনৈতিক জীবন পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন রাজনৈতিক ও সামাজিক পটপরিবর্তনের ইতিহাসের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
১৯০১ সালের ১৫ এপ্রিল অধুনা পূর্ব মেদিনীপুর জেলার তমলুকে অজয় কুমার মুখোপাধ্যায়ের এর জন্ম হয়। তাঁর পিতা শরৎচন্দ্র মুখোপাধ্যায় পেশায় একজন বিশিষ্ট আইনজীবী। তাঁদের আদি বাসস্থান হুগলি জেলায় হলেও তাঁর পিতা আইন ব্যবসার সূত্রে তমলুকে এসে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। শরৎচন্দ্র মুখোপাধ্যায় অত্যন্ত সফল আইনজীবী ছিলেন এবং একসময় তমলুক বার অ্যাসোসিয়েশনের সম্পাদক হিসেবেও নির্বাচিত হয়েছিলেন। শরৎচন্দ্রের সন্তানেরা প্রত্যেকেই শিক্ষাদীক্ষায় এবং রাজনৈতিক ভাবধারায় প্রগতিশীল ছিলেন। অজয় কুমারের অনুজ বিশ্বনাথ মুখোপাধ্যায় ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির (CPI) একজন শীর্ষস্থানীয় নেতা এবং আজীবন বামপন্থী আন্দোলনের সাথে যুক্ত ছিলেন। বিশ্বনাথ মুখোপাধ্যায়ের স্ত্রী গীতা মুখোপাধ্যায়ও ছিলেন ভারতের অন্যতম প্রধান নারী কমিউনিস্ট নেত্রী এবং দীর্ঘদিনের সাংসদ। অজয় কুমারের আরেক ভাই সোমনাথ মুখোপাধ্যায় পেশায় একজন নামী চিকিৎসক। পারিবারিক এই রাজনৈতিক ও সামাজিক সচেতনতার পরিবেশ অজয় কুমারের ভবিষ্যৎ জীবনের ভিত্তি তৈরি করেছিল।
অজয় কুমার মুখোপাধ্যায় ছাত্রাবস্থায় স্বামী বিবেকানন্দের আদর্শের দ্বারা অত্যন্ত প্রভাবিত হয়েছিলেন। পরবর্তীকালে মহাত্মা গান্ধীর রাজনৈতিক দর্শনে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন। কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে উচ্চশিক্ষার জন্য ভর্তি হলেও ১৯২১ সালে গান্ধীজীর অসহযোগ আন্দোলনের ডাকে সাড়া দিয়ে তিনি পড়াশোনা মাঝপথেই ত্যাগ করেন এবং মেদিনীপুরে ফিরে এসে আন্দোলন সংগঠিত করতে শুরু করেন। এরপর ১৯৩০ সালের আইন অমান্য আন্দোলন এবং লবণ সত্যাগ্রহের সময় মেদিনীপুর জেলায় যে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে উঠেছিল, তাতে তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। এই আন্দোলনের কারণে ব্রিটিশ পুলিশ তাঁকে প্রথমবার গ্রেপ্তার করে।
তাঁর রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ অধ্যায় হল ১৯৪২ সালের ভারত ছাড়ো আন্দোলন। এই আন্দোলনের সময় মেদিনীপুরের তমলুক, মহিষাদল ও সুতাহাটা অঞ্চলে ব্রিটিশ প্রশাসনের কার্যকারিতা ব্যাহত হয়। ১৯৪২ সালের ১৭ ডিসেম্বর তমলুকে একটি স্বাধীন ও সমান্তরাল সরকার হিসেবে ‘তাম্রলিপ্ত জাতীয় সরকার’ আত্মপ্রকাশ করে। এই বিপ্লবী জাতীয় সরকার গঠনে সতীশচন্দ্র সামন্ত, সুশীলকুমার ধাড়া এবং অজয় কুমার মুখোপাধ্যায় মূল ভূমিকা নিয়েছিলেন। এই সরকারের নিজস্ব সশস্ত্র বাহিনী ‘বিদ্যুৎ বাহিনী’ এবং বিচার বিভাগীয় ব্যবস্থা ছিল। ব্রিটিশ পুলিশ যখন জাতীয় সরকারের প্রথম সর্বাধিনায়ক সতীশচন্দ্র সামন্তকে গ্রেপ্তার করে, তখন অজয় কুমার মুখোপাধ্যায় এই বিপ্লবী সরকারের সর্বাধিনায়কের দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং গোপনে আন্দোলন পরিচালনা করতে থাকেন। ১৯৪৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তাম্রলিপ্ত জাতীয় সরকারের বিলুপ্তি ঘটার পর ব্রিটিশ পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করে এবং ১৯৪৬ সাল পর্যন্ত তিনি কারারুদ্ধ থাকেন।
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৫২ সালে স্বাধীন ভারতের প্রথম সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এই নির্বাচনে অজয় কুমার মুখোপাধ্যায় তমলুক বিধানসভা কেন্দ্র থেকে জাতীয় কংগ্রেস প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে বিপুল ভোটে জয়ী হন। নির্বাচনে জয়লাভের পর ডক্টর বিধানচন্দ্র রায়ের মন্ত্রীসভায় তিনি সেচ ও জলপথ বিভাগের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। মন্ত্রী হিসেবে তিনি পশ্চিমবঙ্গের জলসম্পদ উন্নয়ন এবং কৃষিকাজের প্রসারে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা বাস্তবায়নে হাত দেন। ব্রিটিশ আমলের ১৯৪০-এর দশক থেকে চলে আসা কংসাবতী নদী উপত্যকা পরিকল্পনার পুরনো রূপরেখাটিকে তিনি নতুন করে খতিয়ে দেখেন এবং তাঁরই তৎপরতায় ১৯৫৬ সালে দ্বিতীয় পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার অধীনে মেদিনীপুরের কংসাবতী বাঁধ প্রকল্পের (Kangsabati Project) মূল নির্মাণ কাজ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়। এই বিশাল সেচ প্রকল্প বাস্তবায়নের ফলে সমগ্র পশ্চিমবঙ্গ, বিশেষ করে তাঁর জন্মভূমি মেদিনীপুর জেলার কৃষিক্ষেত্রে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসে। কেবল কৃষি বা সেচ নয়, জনকল্যাণমূলক কাজের অংশ হিসেবে তাঁরই আন্তরিক প্রচেষ্টায় ১৯৬২ সালে তমলুকে ১২ লক্ষ টাকা ব্যয়ে ১২৫ শয্যা বিশিষ্ট মহকুমা হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করা হয়। তৎকালীন গ্রামীণ স্বাস্থ্য পরিকাঠামোয় এটি একটি অত্যন্ত বড় পদক্ষেপ ছিল, যা আজও ওই অঞ্চলের অন্যতম প্রধান চিকিৎসা কেন্দ্র।
বিধানচন্দ্র রায়ের মৃত্যুর পর প্রফুল্লচন্দ্র সেনের নেতৃত্বে মন্ত্রীসভা গঠিত হয়। এই মন্ত্রীসভাতেও অজয় কুমার সেচ ও জলপথ বিভাগের দায়িত্বে ছিলেন। কিন্তু এই সময় সরকারের অন্দরমহলে দুর্নীতি চরম আকার ধারণ করে। দুর্নীতি সহ আরো অনেক কারণে কংগ্রেস সরকারের জনপ্রিয়তা ক্রমশ হ্রাস পেতে থাকে। দলের হারিয়ে যাওয়া জনপ্রিয়তা পুনরুদ্ধারের উদ্দেশ্যে মাদ্রাজের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী কামরাজ একটি পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। ‘কামরাজ প্ল্যান’ নামে পরিচিত এই পরিকল্পনায় স্থির হয় কংগ্রেস শাসিত রাজ্যগুলিতে মন্ত্রীসভার সদস্য কমানো হবে এবং প্রবীণ নেতাদের দলের সংগঠন তৈরির কাজ করতে হবে। অজয় কুমার স্বেচ্ছায় মন্ত্রিত্ব ত্যাগ করে মেদিনীপুর জেলা ও রাজ্যস্তরে দলীয় সংগঠনের কাজে নিয়োজিত হন। কিন্তু এই সময় প্রফুল্লচন্দ্র সেন এবং অতুল্য ঘোষের নেতৃত্বাধীন গোষ্ঠীর সাথে তাঁর তীব্র মতবিরোধ দেখা দেয়। দলীয় কোন্দলের জেরে তাঁকে মেদিনীপুর জেলা কংগ্রেস এবং প্রদেশ কংগ্রেসের সভাপতির পদ থেকে অপসারিত করা হয়।
এই ঘটনার প্রতিবাদে এবং কংগ্রেসের বিকল্প নীতি নির্ধারণের লক্ষ্যে ১৯৬৬ সালের ৫ ও ৬ ফেব্রুয়ারি কলকাতার শ্যামস্কোয়ারে একটি ঐতিহাসিক কর্মী সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এই সম্মেলনের মাধ্যমে অজয় কুমার মুখোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে ‘বাংলা কংগ্রেস’ নামক একটি নতুন আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল গঠিত হয়। তিনি জাতীয় কংগ্রেসের সদস্যপদ থেকে ইস্তফা দিয়ে এই নতুন দলের সভাপতি হন। ১৯৬৭ সালের চতুর্থ সাধারণ নির্বাচনে বাংলা কংগ্রেস বামপন্থী দলগুলির সাথে আসন সমঝোতা করে ‘পিপলস ইউনাইটেড লেফট ফ্রন্ট’ গঠন করে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। নির্বাচনে কংগ্রেস একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারালে, বাংলা কংগ্রেস এবং ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্ক্সবাদী) সহ অন্যান্য বিরোধী দলগুলি মিলে রাজ্যে প্রথম যুক্তফ্রন্ট সরকার গঠন করে। ১৯৬৭ সালের ১৫ মার্চ অজয় কুমার মুখোপাধ্যায় পশ্চিমবঙ্গের চতুর্থ মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন।
তবে প্রথম যুক্তফ্রন্ট সরকারের স্থায়িত্ব ছিল অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত। শরিকি বিবাদ এবং তৎকালীন খাদ্যমন্ত্রী প্রফুল্লচন্দ্র ঘোষের দলত্যাগের কারণে মাত্র আট মাসের মাথায়, ১৯৬৭ সালের নভেম্বর মাসে এই সরকারের পতন ঘটে এবং রাজ্যে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি হয়। এরপর ১৯৬৯ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট পুনরায় বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে এবং অজয় কুমার মুখোপাধ্যায় দ্বিতীয়বারের জন্য রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হন। কিন্তু এই সময় পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পরিস্থিতি অত্যন্ত উত্তাল হয়ে ওঠে। নকশালবাড়ি আন্দোলন এবং বিভিন্ন শরিক দলের মধ্যে অভ্যন্তরীণ হিংসাত্মক সংঘাতের কারণে আইনশৃঙ্খলার চরম অবনতি ঘটে। নিজ সরকারের শরিক দল সিপিআই(এম)-এর স্বরাষ্ট্র দপ্তরের ভূমিকা এবং রাজনৈতিক সহিংসতার প্রতিবাদে মুখ্যমন্ত্রী অজয় কুমার মুখোপাধ্যায় ১৯৬৯ সালের ১ ডিসেম্বর কলকাতার কার্জন পার্কে তিন দিনের অনশন সত্যাগ্রহে বসেন। তিনি জনসমক্ষে নিজের সরকারকে ‘অসভ্যের সরকার’ বলে তীব্র সমালোচনা করেন। শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়ায় ১৯৭০ সালের ১৬ মার্চ তিনি মুখ্যমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেন।
১৯৭১ সালের সাধারণ নির্বাচনে রাজ্যে একক কোন দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায়, অজয় কুমার মুখোপাধ্যায় কংগ্রেসের সমর্থনে তৃতীয়বারের জন্য পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হন। কিন্তু এই সরকারও মাত্র ৮৩ দিন স্থায়ী হয়ে ছিল। এরপর তিনি তাঁর দল বাংলা কংগ্রেসকে পুনরায় মূল জাতীয় কংগ্রেসের সাথে একীভূত করে দেন। ১৯৭২ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তিনি তমলুক থেকে কংগ্রেস প্রার্থী হিসেবে শেষবারের মতো জয়ী হন। এই সময় থেকেই তিনি বয়সজনিত কারণে সক্রিয় রাজনীতি থেকে ক্রমশ দূরে সরতে থাকেন। ১৯৭৭ সালের লোকসভা নির্বাচনে মেদিনীপুর অঞ্চলে তাঁর দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সহযোগী সতীশচন্দ্র সামন্ত জনতা পার্টির সুশীলকুমার ধাড়ার কাছে পরাজিত হওয়ার পর, অজয় কুমার মুখোপাধ্যায় রাজনীতি থেকে সম্পূর্ণ অবসর গ্রহণ করেন। তিনি তাঁর জন্মভূমি তমলুক ছেড়ে কলকাতায় এক আত্মীয়ের বাড়িতে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন।
সারাজীবন অত্যন্ত অনাড়ম্বর ভাবে কাটিয়েছেন অজয় কুমার মুখোপাধ্যায়। জনগণের মঙ্গলই ছিল তাঁর ধ্যানজ্ঞান। অকৃতদার এই মানুষটি আজীবন নিরামিষ খেতেন, খদ্দরের পোশাক পরতেন। ক্ষমতার সর্বোচ্চ স্তরে থেকেও তাঁর কোন ব্যক্তিগত সঞ্চয় বা সম্পত্তি ছিল না। জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে আদর্শের জন্য লড়াই করেছেন তিনি। সেজন্য কখনও কখনও চরম মূল্য দিতে হলেও তিনি একবারের জন্যও আদর্শভ্রষ্ট হননি।
১৯৭৭ সালে ভারত সরকার অজয় কুমার মুখোপাধ্যায়কে ‘পদ্ম বিভূষণ’ পুরস্কারে ভূষিত করে। ১৯৮৬ সালের ২৭মে ৮৫ বছর বয়সে কলকাতায় অজয় কুমার মুখোপাধ্যায়ের মৃত্যু হয়।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান