সববাংলায়

ফুলন দেবী

বিভাগঃ , ,

ফুলন দেবী (Phoolan Devi) একজন ভারতীয় ডাকাত যিনি পরবর্তীকালে লোকসভার সদস্যা হয়েছিলেন। ফুলন দেবী ‘দস্যু রানী'(Bandit Queen) নামেই তিনি বেশি পরিচিত ছিলেন।

১৯৬৩ সালের ১০ আগস্ট উত্তর প্রদেশের জালৌন জেলার অন্তর্গত ঘোড়া কা পুরয়া গ্রামে মাল্লা সম্প্রদায়ে ফুলন দেবীর জন্ম হয়। উত্তর প্রদেশে মাল্লা সম্প্রদায়কে নিম্ন বর্ণ হিসেবে গণ্য করা হয়। নিম্নবর্ণের মাল্লা সম্প্রদায়ের প্রধান পেশা হল নৌকা চালানো।ফুলনের যখন মাত্র ১১ বছর বয়স তাঁর ঠাকুরদার মৃত্যু হয়। ঠাকুরদার মৃত্যুর পর তাঁর জ্যাঠা পৈতৃক সম্পত্তির একমাত্র উত্তরাধিকারী হিসেবে নিজেকে ঘোষণা করেন। ফুলনের বাবার নিমের বাগান ছিল। তাঁর বাবা ভেবে রেখেছিলেন এই বাগানের নিম কাঠ বিক্রি করে তিনি তাঁর দুই মেয়ের বিয়ে দেবেন। কিন্তু তাঁর জ্যাঠার ছেলে মায়াদিন বাগানের গাছগুলি কেটে বিক্রি করা আরম্ভ করলে ফুলন এর প্রবল বিরোধিতা করেন। ফুলন মায়াদিনকে চোর অপবাদ দিয়ে শারীরিক আক্রমণও করেন। এমনকি গ্রামের কিছু মেয়েকে জোগাড় করে তাঁদের সাথে হওয়া অন্যায়ের প্রতিবাদে ধর্নায়ও বসেন। ফুলন এতই জেদি ছিলেন যে তাঁকে তাঁর পরিবার কিছুতেই ধর্না থেকে ওঠাতে পারছিল না। শেষ পর্যন্ত তাঁর মাথায় ইঁট মেরে অজ্ঞান করে ধর্না থেকে তোলা হয়।

এই ঘটনার বেশ কয়েক মাস পর ফুলনের যখন এগারো বছর বয়স তাঁর গ্রাম থেকে কয়েকশো মাইল দূরে তাঁর থেকে তিনগুণ বয়সের পুট্টিলাল নামের এক ব্যক্তির সাথে তাঁর বিয়ে ঠিক করা হয়। ফুলন নিজের আত্মজীবনীতে পুট্টিলালকে একজন দুশ্চরিত্র হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

পুট্টিলালের ক্রমাগত অত্যাচার ও যৌন নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে ফুলন নিজের বাবার বাড়ি ফিরে যান। মায়াদিন ফুলনকে শিক্ষা দিতে সোনার আংটি চুরির মিথ্যে অপবাদ দিয়ে স্থানীয় থানায় ফুলনের নামে অভিযোগ করেন। ফুলনের তিনদিন কারাবাস হয়। জেলে থাকাকালীন পুলিশের হাতেই তিনি ধর্ষিতা হন। কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পর তাঁকে পরিবার ও গ্রাম থেকে বর্জন করা হয়।

১৯৭৯ সালে ফুলন ডাকাত দলে যোগ দেন। ফুলন যে ডাকাত দলে ছিলেন তার সর্দার ছিল উচ্চ বংশীয় ঠাকুর সম্প্রদায়ের বাবু গুজ্জর। বাবু গুজ্জর তাঁকে তিনদিন ধরে ক্রমাগত ধর্ষণ করে। এই সময়ে ফুলনকে উদ্ধার করে এই ডাকাত দলের সহ সর্দার বিক্রম মাল্লা। বিক্রম ছিল মাল্লা সম্প্রদায়ের ডাকাত। ফুলন এই ঘটনার পর বিক্রমের প্রেমে পড়েন। বিক্রম পরে তাঁকে বিয়ে করে স্ত্রীর মর্যাদা দেয়। এরপর বাবু গুজ্জরকে খুন করে বিক্রম হয়ে যায় ডাকাত দলের নেতা।

স্বামী বিক্রম মাল্লার কাছে প্রশিক্ষণ নিয়ে ফুলন বন্দুক চালানো, গ্রাম লুঠ করা, ভূস্বামীদের অপহরণ, রেল ডাকাতি প্রভৃতি কাজে বেশ পারদর্শী হয়ে ওঠেন। ফুলনের ডাকাতি চলত মূলত উত্তরপ্রদেশ ও মধ্য প্রদেশের সীমানা বরাবর বুন্দেলখণ্ড জুড়ে। প্রত্যেকবার ডাকাতি করে আসার পর দুর্গাদেবীর মন্দিরে গিয়ে তাঁর প্রাণ রক্ষার জন্য দেবীকে ধন্যবাদ জানিয়ে আসতেন ফুলন।

ডাকাতিতে হাত পাকানোর পর ফুলন তাঁর প্রথম স্বামী পুট্টিলালের গ্রামে তাঁর দলবল নিয়ে হানা দেন। ফুলন পুট্টিলালকে ঘর থেকে টেনে নিয়ে এসে প্রকাশ্যে ছুরি মারেন। এরপর খচ্চরের পিঠে উল্টো করে শুইয়ে নির্জন স্থানে নিয়ে গিয়ে বন্দুকের বাঁটের সাহায্যে প্রবল মার মারেন। প্রায় মৃত পুট্টিলালকে বাড়ির সামনে ফেলে যাওয়ার সময় শাসিয়ে যান এরপর গ্রামে কোন বয়স্ক পুরুষ নাবালিকাকে বিয়ে করলে তার এই অবস্থা হবে। এটাই ছিল ডাকাত হিসেবে ফুলনের প্রথম প্রতিশোধ গ্রহণ।

এই ঘটনার কয়েকমাস পর শ্রী রাম ও তার ভাই লালা রাম নামের দুই ডাকাত জেল থেকে ছাড়া পায়। শ্রী রাম ও লালা রাম জাতে ছিল উচ্চ বংশীয় রাজপুত। মুক্তি পাওয়ার পর বিক্রম শ্রী রামকে দলের নেতৃত্ব বহন করার জন্য আহ্বান জানালেও মাল্লা সম্প্রদায়ের ডাকাতরা তাদের আপত্তি জানায়। ফলে দল দুইভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। ঠাকুর সম্প্রদায়ের সদস্যরা শ্রী রাম ও মাল্লা সম্প্রদায়ের সদস্যরা বিক্রমের প্রতি অনুগামী ছিলেন। কিছুদিন পর শ্রী রাম বিক্রমকে হত্যা করে ও ফুলনকে অপহরণ করে নিয়ে যায় ঠাকুর সম্প্রদায়ের গ্রাম বেহমাইতে।

বেহমাইয়ে একটি ঘরে ফুলনকে আটকে রাখা হয়েছিল। সেখানে তাঁকে তিন সপ্তাহ ধরে গ্রামের ঠাকুর সম্প্রদায়ের বড় বড় নেতারা ধর্ষণ ও অকথ্য অত্যাচার করে। ফুলন মান সিং নামের মাল্লা সম্প্রদায়ের এক ব্যক্তির সাহায্যে গ্রাম থেকে কোন মতে পালিয়ে আসেন।

এরপর ফুলন বাবা মুস্তাকিন নামে এক ডাকাত সর্দারের সাহায্যে নতুন ডাকাত দল তৈরি করেন ফুলন। মান সিং ছিল তাঁর দলের দ্বিতীয় নেতা। প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য ফুলন রাম ভাইদের সন্ধান শুরু করেন এবং অবশেষে সন্ধান পান যে শ্রী রাম বেহমাই গ্রামে আশ্রয় নিয়েছে। নির্যাতিত হওয়ার ১৭মাস পর, ১৯৮১ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারী ফুলন পুলিশের ছদ্মবেশে রাম ভাইদের হত্যা করার জন্য বেহমাই গ্রামে প্রবেশ করে দেখেন সেখানে একটি বিয়ের আসর বসেছে। ফুলন ও দলের সদস্যরা সম্পূর্ন গ্রাম খুঁজেও রাম ভাইদের সন্ধান পাননি। ফুলন এরপর রাম ভাইদের তাঁর হাতে তুলে দেওয়ার জন্য গ্রামবাসীদের আদেশ করলে গ্রামবাসীরা রাম ভাইদের বিষয়ে অস্বীকার করে। ফুলন তখন রাগে গ্রামের ২২ জন যুবককে চম্বল নদীর পাড়ে গুলি করে হত্যা করেন। ইতিহাসে এই ঘটনা বেহমাই হত্যাকাণ্ড বা বেহমাই গণহত্যা নামে কুখ্যাত হয়ে আছে।

বেহমাই হত্যাকাণ্ডের কারণে সেই সময়ে উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী ভি.পি সিং পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিলেন। ফুলন ক্রমেই জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন দস্যুরাণী নামে। উত্তর প্রদেশের শহরগুলিতে দুর্গারূপী ফুলনের মূর্তি বিক্রি শুরু হয়ে যায়।

বেহমাই হত্যাকাণ্ডের প্রায় দু বছর পর ১৯৮৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে প্রায় ১০০০০ জন দর্শকের উপস্থিতিতে ফুলন আত্মসমর্পণ করেন। 

ফুলন দেবীর রাজনীতিতে প্রবেশ সমাজবাদী পার্টির নেতা মুলায়ম সিং যাদবের হাত ধরে। ১৯৯৬ সালে সমাজবাদী পার্টি ফুলনকে মির্জাপুর আসনটি লড়ার জন্য টিকিট দিলে ভারতীয় জনতা পার্টি ও বেহমাই হত্যাকাণ্ডে নিহত হওয়া ঠাকুরদের স্ত্রীদের প্রবল বিরোধিতা সত্ত্বেও তিনি নির্বাচনে জয়ী হন।

২০০১ সালের ২৬ জুলাই নতুন দিল্লীতে নিজের বাস ভবন থেকে বেরনোর সময়ে তাঁকে গুলি করে হত্যা করা হয়।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading