ইতিহাস

বিভূতিভূষণ দত্ত

ভারতীয় গণিতচর্চার এক অবিস্মরণীয় ঐতিহাসিক হিসেবে বিশ্বখ্যাত হয়েছেন বিভূতিভূষণ দত্ত (BibhutiBhusan Datta)। উনবিংশ শতাব্দীতে প্রবল দারিদ্র্য আর হতাশা কাটিয়ে গণিতের উপর গবেষণা করেছেন তিনি এবং মধ্যজীবনে চাকরি করলেও পরবর্তীকালে বেছে নিয়েছেন এক সন্ন্যাসীর জীবন। ভারতের গণিতচর্চার ইতিহাস রচনায় তাঁর লেখা ‘হিস্ট্রি অফ হিন্দু ম্যাথমেটিক্স’-এর দুটি খণ্ডের বই এক অবিস্মরণীয় কীর্তি। ভারতে শূন্য আবিষ্কারের ইতিহাস, বর্গমূলের ধারণার জন্ম, হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের কাছে পাই-এর গুরুত্ব, জৈনদের মহাকাশ চর্চা এমনকি আরবিদের গাণিতিক প্রতীকের ব্যাখ্যা সমস্ত বিষয়েই তাঁর গভীর জ্ঞানের প্রকাশ পাওয়া যায় তাঁর লেখা এই বইতে।

১৮৮৮ সালের ২৮ জুন অধুনা বাংলাদেশের চট্টগ্রাম জেলার কানুনগোপাড়া গ্রামে বিভূতিভূষণ দত্তের জন্ম হয়। তাঁর বাবা রসিকচন্দ্র দত্ত সাব-জজের দপ্তরে কর্মরত ছিলেন এবং চারিত্রিক দিক থেকে তাঁর মধ্যে আধ্যাত্মিকতা ও সততার উপস্থিতি ছিল। বিভূতিভূষণের মায়ের নাম মুক্তকেশী দত্ত যিনি ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষের সময় তাঁর প্রতিবেশীদের প্রাণ ঢেলে সাহায্য করেছিলেন। মুক্তকেশী এবং রসিকচন্দ্রের এগারোটি সন্তানের মধ্যে বিভূতিভূষণ দত্ত ছিলেন তৃতীয় সন্তান। তাঁর দুই দাদার নাম যথাক্রমে রেবতী রমণ দত্ত এবং ভূপতি মোহন দত্ত। বাকি আট ভাইয়ের নাম যথাক্রমে নীরদ লাল দত্ত, বিনোদ বিহারী দত্ত, হরিহর দত্ত, প্রমথ রঞ্জন দত্ত, সুবিমল দত্ত, সুকমল দত্ত, পরিমল দত্ত এবং রঞ্জিত দত্ত। ছোটোবেলা থেকেই বিভূতিভূষণের মধ্যে আধ্যাত্মিক চেতনার বিকাশ ঘটেছিল। কিশোর বয়সে পদার্পণ করেই তিনি তাঁর বাবা-মাকে সন্ন্যাসী হওয়ার ইচ্ছার কথা জানান। অদ্বৈতাচার্য শঙ্করের মতে দীক্ষিত হতে শুরু করেন বিভূতিভূষণ। স্কুলে পড়ার সময় থেকেই বস্তুজাগতিক সকল মোহ-বন্ধন কাটিয়ে উঠতে চাইছিলেন তিনি, সেই জন্য পোশাক পরাও ছেড়ে দিতে চান বিভূতিভূষণ আর তাই একটিমাত্র কৌপীন পরেই তিনি অভ্যস্ত হয়ে পড়েন। শ্রীরামকৃষ্ণের প্রচারিত ধর্মমতে জীবনের অরূপ-মাধুরী উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন তিনি। রামকৃষ্ণের সুযোগ্য শিষ্য স্বামী বিবেকানন্দের দেখানো পথেই জীবনের বাকি সময়টা অতিবাহিত করেছেন তিনি।

১৯০৭ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে একটি বৃত্তি অর্জন করেন বিভূতিভূষণ দত্ত। এরপরে তিনি ভর্তি হন হিন্দু কলেজে। সেখান থেকে ১৯১২ সালে বিজ্ঞানে স্নাতক উত্তীর্ণ হন তিনি এবং স্নাতকোত্তর পড়ার জন্য প্রস্তুতি নিতে থাকেন। ১৯১৪ সালের শুরুর দিকে বিশুদ্ধ ও প্রায়োগিক গণিতশাস্ত্রে স্নাতকোত্তরের পরীক্ষায় বসার কথা থাকলেও ১৯১৩ সালের নভেম্বর মাস থেকেই তিনি নিরুদ্দেশ হয়ে যান। পরে জানা যায় তিনি হরিদ্বারে গিয়েছিলেন ভ্রমণে। ফিরে এসে নির্ধারিত সময়েই তিনি স্নাতকোত্তরের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন এবং আশ্চর্যজনকভাবে পরীক্ষার দুটি পত্রের উত্তরপত্র পরবর্তীকালে ক্যালকাটা ম্যাথমেটিকাল সোসাইটি কর্তৃক জার্নালে প্রকাশের জন্য গৃহীত হয়। এই দুটি বিখ্যাত গবেষণাপত্রের শিরোনাম ছিল ‘অন এ ফিজিক্যাল ইন্টারপ্রিটেশন অফ সার্টেন ফর্মুলা ইন দ্য থিওরি অফ ইলাস্টিসিটি’ (১৯১০-১৯১১) এবং ‘অন দ্য ফিগারস্‌ অফ ইকুইলিব্রিয়াম অফ এ রোটেটিং মাস অফ লিকুইড ফর ল’স অফ অ্যাট্রাকশান আদার দ্যান দ্য ল অফ ইনভার্স স্কোয়ার’ (১৯১১-১২)। স্নাতকোত্তর উত্তীর্ণ হয়ে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা করার জন্য একটি বৃত্তি পান। অধুনা রাজাবাজার সায়েন্স কলেজে সেই সময় বিশুদ্ধ ও প্রায়োগিক গণিতের লেকচারার হিসেবেও নিযুক্ত হন বিভূতিভূষণ দত্ত। তাঁর গবেষণার ক্ষেত্র ছিল তরল-গতিবিদ্যা তথা হাইড্রোডাইনামিক্স বিষয়ে। গবেষণা চলাকালীনই তিনি বহু গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন যার মধ্যে ‘অন দ্য স্টেবিলিটি অফ টু কোঅ্যাক্সিয়াল রেক্টিলিনিয়ার ভর্টিসেস অফ কম্প্রেসেবল ফ্লুইড’ (On the stability of two coaxial rectilinear vortices of compressible fluid) এবং ‘নোটস অন ভর্টিসেস ইন এ কম্প্রেসিব্‌ল ফ্লুইড’ (Notes on Vortices in a Compressible Fliud) ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য যেগুলি যথাক্রমে ১৯১৮-১৯ এবং ১৯২০ সালে প্রকাশিত হয়। ১৯২০ সালে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট উপাধি দেওয়া হয়। এই বছরই তিনি শিক্ষাগত সাফল্যের দিকে ধাবিত না হয়ে স্বামী বিষ্ণু তীর্থজি মহারাজকে গুরু হিসেবে বরণ করে আধ্যাত্মিক জীবনের পথ শুরু করেন। বিখ্যাত বিজ্ঞানী গণেশ প্রসাদের অনুপ্রেরণায় তিনি তরল গতিবিদ্যার গবেষণা ছেড়ে গণিতের ইতিহাস নির্মাণের কাজে আকৃষ্ট হন। গণিতচর্চার ইতিহাস বিষয়ে গবেষণার কাজে বিভূতিভূষণ দত্ত প্রথমে ১৯২৬ সালে পাঁচটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন। ‘আল-বিরুণী অ্যাণ্ড দ্য অরিজিন অফ অ্যারাবিক নিউমেরালস্‌’, ‘এ নোট অন হিন্দু-অ্যারাবিক নিউমেরালস্‌’, ‘টু আর্যভট্টাস অফ আল-বিরুণী’, ‘হিন্দু (নন-জৈন) ভ্যালুস অফ পাই’ এবং ‘আর্লি লিটারারি এভিডেন্স অফ দ্য ইউজ অফ জিরো ইন ইণ্ডিয়া’ এই গবেষণাপত্রগুলি সেই সময়েই প্রকাশিত হয়। ফলে বোঝাই যায় ভারতীয় গণিতচর্চার ইতিহাসে পাই (π)-এর ব্যবহারের ইতিহাস, আরবি সংখ্যাতত্ত্ব কিংবা শূন্য আবিষ্কার ও ব্যবহারের বিবর্তন সবই গবেষণার বিষয় হিসেবে প্রাধান্য পেয়েছিল বিভূতিভূষণ দত্তের কাছে যা তাঁর আগে আর কোনো ভারতীয় গণিতবিদ করতে পারেননি। ১৯২৭ সালের ২০ ডিসেম্বর এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের ম্যাথমেটিক্যাল ইনস্টিটিউশনে একটি ভাষণ দেন বিভূতিভূষণ দত্ত যার বিষয় ছিল ‘কন্ট্রিবিউশন অফ দ্য অ্যানসিয়েন্ট হিন্দুজ টু ম্যাথমেটিক্স’ অর্থাৎ গণিতচর্চায় প্রাচীন ভারতীয় হিন্দুদের অবদান। এই বক্তৃতাটিই পরে ৬০ পাতায় বিন্যস্ত হয়ে এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের ম্যাথমেটিক্যাল ইনস্টিটিউশনের বুলেটিনে ছাপা হয়। ১৯২৯ সালে শিক্ষকতা ও গবেষণা দুইই ছেড়ে দেওয়ার ইচ্ছায় বিশ্ববিদ্যালয়ের পদ থেকে অবসর নেন তিনি। ১৯৩১ সালে গণেশ প্রসাদের আমন্ত্রণে বিভূতিভূষণ দত্ত কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের রিডারশিপ বক্তৃতা দাতা হিসেবে যুক্ত হন। প্রাচীন হিন্দুদের জ্যামিতিশাস্ত্র বিষয়ে তাঁর সেই বক্তৃতা পরে ২৪০ পাতার একটি বইতে সংকলিত আকারে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৩২ সালে প্রকাশিত হয়। যদিও এরপর স্থায়ীভাবে তিনি সমস্ত চাকরি থেকে অবসর নেন এবং এরপরে আর কোনোদিন চাকরি করেননি বিভূতিভূষণ। এক পরিব্রাজকের জীবন বেছে নেন তিনি। কিন্তু একইসঙ্গে চলতে থাকে তাঁর গণিতচর্চার ইতিহাস বিষয়ে গবেষণা। আর সেই গবেষণার ফল হিসেবে ক্রমান্বয়ে ১৯৩৫, ১৯৩৬ ও ১৯৩৭ সালে তিনি তিনটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন।

১৯৩৮ সালে সন্ন্যাসধর্ম গ্রহণ করেন বিভূতিভূষণ দত্ত। সন্ন্যাসী জীবনে তাঁর নতুন নাম হয় স্বামী বিদ্যারণ্য। নিরামিষ আহার, দারিদ্র্যের মধ্যে তিনি কোনো বস্তুজাগতিক পদার্থ গ্রহণ করতেন না, এমনকি মানুষের সঙ্গে সমস্ত প্রকার আবেগ-সংযোগ পরিহার করেন তিনি। সন্ন্যাসী হয়েও গবেষণা থেকে তিনি বিরত হননি। ১৯৩৫ সালে প্রকাশ পায় তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘হিস্ট্রি অফ হিন্দু ম্যাথমেটিক্স’-এর প্রথম খণ্ড এবং এর দ্বিতীয় খণ্ড প্রকাশ পায় ১৯৩৮ সালে। এই বইয়ের তৃতীয় খণ্ডটি আর কখনোই প্রকাশিত হয়নি। এই বই প্রকাশের সময় বিভূতিভূষণ তাঁর গবেষণার মূল পাণ্ডুলিপিটি দিয়েছিলেন তাঁরই ছাত্র তথা অনুজ অবধীশ নারায়ণ সিংয়ের হাতে। অবধীশ সিংয়ের সাহায্যেই এই বইয়ের দুটি খণ্ড প্রকাশ পায়। তৃতীয় খণ্ডটি বিভূতিভূষণের জীবৎকালে প্রকাশ না পেলেও ১৯৮০ সালের প্রথম দিকে কৃপা শঙ্কর শুক্লা এই খণ্ডটির বিষয় নিয়ে নয়টি গবেষণাপত্রের সমাহারে ১৯৯৩ সালের মধ্যে ধারাক্রমে প্রকাশ করেন। জীবনের শেষ কয়েকটি বছর তিনি কাটান রাজস্থানের পুষ্করে।

ভারতে শূন্য আবিষ্কারের ইতিহাস, বর্গমূলের ধারণার জন্ম, হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের কাছে পাই-এর গুরুত্ব, জৈনদের মহাকাশ চর্চা এমনকি আরবিদের গাণিতিক প্রতীকের ব্যাখ্যা ইত্যাদি বহুধা বিস্তৃত বিষয়ে একজন বাঙালি সন্তান হয়ে এমন দুঃসাধ্য গবেষণা তাঁর পক্ষেই সম্ভব ছিল। বিভূতিভূষণের আগে কিংবা পরে কোনো বাঙালি গণিতবিদ এত বৃহৎ প্রকল্প নিয়ে গবেষণায় অগ্রণী হননি। প্রায় সত্তরটির বেশি গবেষণাপত্র লিখেছেন বিভূতিভূষণ দত্ত। এগুলির মধ্যে কয়েকটি হল – ‘আর্যভট্ট এবং তৎপ্রণীত পৃথিবীর গতিতত্ত্ব’ (১৯৩৫-৩৬), ‘আচার্য আর্যভট্ট এবং তাঁর শিষ্য ও অনুগামীরা’ (১৯৩৩-৩৪), ‘জৈন সাহিত্যে সংখ্যাতত্ত্ব’ (১৯৩০-৩১) ইত্যাদি সবই বাংলায় লেখেন তিনি। এছাড়াও ইংরাজি ভাষায় লেখা বিখ্যাত গবেষণাপত্রগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল – ‘On mula, the Hindu term for ‘root’ (১৯২৭), ‘The present mode of expressing numbers’ (১৯২৭), ‘The Hindu solution of the general Pellian equation’ (১৯২৮), ‘The Jaina School of mathematics’ (১৯২৯) ইত্যাদি।

১৯৫৮ সালের ৬ অক্টোবর রাজস্থানের পুষ্করে বিভূতিভূষণ দত্তের মৃত্যু হয়।

  • সববাংলায় সাইটে বিজ্ঞাপন দেওয়ার জন্য আজই যোগাযোগ করুন
    contact@sobbanglay.com

  • এই ধরণের তথ্য লিখে আয় করতে চাইলে…

    আপনার নিজের একটি তথ্যমূলক লেখা আপনার নাম ও যোগাযোগ নম্বরসহ আমাদের ইমেল করুন contact@sobbanglay.com

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

শুধুমাত্র খাঁটি মধুই উপকারী, তাই বাংলার খাঁটি মধু খান


ফুড হাউস মধু

হোয়াটস্যাপের অর্ডার করতে এখানে ক্লিক করুন