ইতিহাস

ত্রিভুবনদাস কিশিভাই পটেল

সমগ্র বিশ্বে ভারত সর্ববৃহৎ দুগ্ধ-উৎপাদক দেশে পরিণত হতে পেরেছে আজ যে মহান মানুষটির চিন্তায়, পরিকল্পনায় এবং কর্মোদ্যোগে, তিনি হলেন ত্রিভুবনদাস কিশিভাই পটেল (Tribhubandas Kishibhai Patel)। ভারতের ‘শ্বেত বিপ্লব’-এর অন্যতম কাণ্ডারি ত্রিভুবনদাস পটেলকে বলা হয়ে থাকে ‘মিল্কম্যান অফ ইণ্ডিয়া’। দুগ্ধ-উৎপাদন ও সরবরাহের জন্য বিখ্যাত ‘আমূল’ সংস্থার প্রতিষ্ঠাতাও তিনি। একাধারে গান্ধীপন্থী স্বাধীনতা সংগ্রামী, নিষ্ঠাবান সমাজকর্মী ত্রিভুবনদাস কিশিভাই পটেল নিঃস্বার্থভাবে ভারতবাসীর উন্নতিসাধন ও সেবাকর্ম এবং সর্বোপরি ভারতে সমবায় আন্দোলনের জন্য আজও স্মরণীয়।

 ১৯০৩ সালের ২২ অক্টোবর গুজরাটের খেদা জেলার আনন্দে ত্রিভুবনদাস কিশিভাই পটেলের জন্ম হয়। তাঁর বাবার নাম শ্রী কিশিভাই পটেল এবং মায়ের নাম শ্রীমতি লখিবা। তাঁরা তিন ভাই ছিলেন – শ্রী ভগবানদাস পটেল, শ্রী চিম্মনভাই পটেল এবং তিনি। তাঁর বাবা ছিলেন একজন কৃষক।

ত্রিভুবনদাস পটেলের প্রাথমিক পড়াশোনা শুরু হয়েছিল নানাধ্‌নি ধর্মশালায়। তারপর তিনি ভর্তি হন আনন্দ প্রাইমারি স্কুল-এ। এছাড়া নিউ ইংলিশ স্কুল থেকে তিনি বাকি পড়াশোনা শেষ করেন। এই স্কুল‌টি বর্তমানে ডি এন হাই স্কুল অফ চারোটার এডুকেশন সোসাইটি (D N High School of Charotar Education Society) নামে পরিচিত। এরপরে ত্রিভুবনদাস ভর্তি হন আমেদাবাদের গুজরাট বিদ্যাপীঠ-এ স্নাতক স্তরের পড়াশোনার জন্য। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীনই তিনি মহাত্মা গান্ধীর অনুপ্রেরণায় স্বাধীনতা সংগ্রামে যুক্ত হয়ে পড়েন।

তিনি মহাত্মা গান্ধীর নেতৃত্বে আইন অমান্য আন্দোলন, গ্রামীণ উন্নতি এবং অস্পৃশ্যতা দূরীকরণ আন্দোলনে সম্পূর্ণভাবে নিয়োজিত ছিলেন। ১৯১৮ সালে তিনি মণিলক্ষ্মী মোতিভাই পটেলকে বিবাহ করেন। ১৯৪৮ থেকে ১৯৮৩ পর্যন্ত তিনি হরিজন সেবক সমিতি’র সভাপতি ছিলেন। নাসিক-এ ১৯৩০ সালে তিনি প্রথম কারারুদ্ধ হন লবণ সত্যাগ্রহে যোগ দেবার জন্য।

ত্রিভুবনদাসের কর্মজীবন একটু ভিন্ন খাতে শুরু হয়েছিল। মহাত্মা গান্ধী এবং সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলের অনুপ্রেরণায় ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশ নিয়েছিলেন তিনি। তারপর ১৯৪০ সালের শেষদিকে, সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলের নির্দেশে তিনি খেদা জেলায় কৃষকদের সঙ্গে কাজ শুরু করেন। পলসন এণ্ড পলসন ডেয়ারির ব্যবসায়ীদের একচেটিয়া ও অনৈতিক ব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে ত্রিভুবনদাস সমস্ত কৃষকদের সঙ্ঘবদ্ধ করেন। কিন্তু বম্বে সরকার এই সমবায়কে কোনো সাহায্য না করে সেই কৃষকদের পলসন ডেয়ারিতেই দুধ সরবরাহ করতে বলেন। বম্বে দুগ্ধ প্রকল্পে কায়রা জেলা থেকে ৩৬০ কি.মি দূরে বম্বেতে দুগ্ধ সরবরাহের দায়িত্ব সরকার দিতে চায় পলসন ডেয়ারির পেস্টনজি এডালজিকে (Pestonjee Edulji)। অনিচ্ছুক কৃষকরা সঙ্ঘবদ্ধ হয়ে ত্রিভুবনদাসের নেতৃত্বে তখন বন্‌ধ ডাকে। টানা পনেরো দিন পলসন ডেয়ারিতে দুধ সরবরাহ করেননি তাঁরা। সেই সূত্রেই ১৯৪৬ সালের ১৪ ডিসেম্বর ত্রিভুবনদাসের উদ্যোগে তৈরি হয় কায়রা জেলার সমবায় দুগ্ধ উৎপাদক ইউনিয়ন লিমিটেড (KCMPUL)। ১৯৫৫ সালে এই সংস্থার নাম হয় ‘আমূল’। সংস্কৃত ‘অমূল্য’ শব্দ থেকেই এই নামের উৎপত্তি।

ভারতের বিখ্যাত সমবায় ডেয়ারি হল এই ‘আমূল’। বর্তমানে প্রায় ৩৬ লক্ষ দুগ্ধ-উৎপাদক কৃষক এই সমবায়ের অন্তর্ভুক্ত। ১৯৭০ সালে ভারতে ‘শ্বেত বিপ্লব’ ঘটিয়ে ভারতকে বিশ্বে সর্ববৃহৎ দুগ্ধ ও দুগ্ধজাত দ্রব্য উৎপাদক দেশে পরিণত করেছে ‘আমূল’। ডঃ ভার্গিস কুরিয়েন (Varghese Kurien) নামে একজন উদ্যোগপতিকে ত্রিভুবনদাস তাঁর সংস্থায় প্রযুক্তি ও বিপণন পরিকল্পনার পদে বহাল করেন। ত্রিভুবনদাস ছিলেন ‘আমূল’-এর প্রথম চেয়ারম্যান, পরবর্তীতে কুরিয়েন ২০০৫ সাল পর্যন্ত চেয়ারম্যান ছিলেন। ডঃ ভার্গিস কুরিয়েন -এর সহায়তায় ত্রিভুবনদাসের এই সমবায় দুগ্ধ প্রকল্প বিশ্বখ্যাত হয়ে পড়ে এবং এই কারণে ডঃ ভার্গিস কুরিয়েনকে ভারতের ‘শ্বেত বিপ্লবের জনক’ বলা হয়ে থাকে। কুরিয়েন এবং ত্রিভুবনদাসের পাশাপাশি মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ে ডেয়ারি প্রযুক্তি নিয়ে পড়াশোনা করা দলায়া (Dalaya) ‘আমূল’-এর প্রযুক্তিগত সহায়তা দিয়েছিলেন। শীতকালে উৎপন্ন অতিরিক্ত মোষের দুধকে প্রযুক্তির সাহায্যে গুঁড়ো দুধে রূপান্তরিত করার প্রক্রিয়া সফল করেছিলেন দলায়া এবং কুরিয়েন, যার ফলে সারা বছর জুড়েই দুধের সমান যোগান বজায় থাকে। সেসময় দলায়া ডেনমার্কে গিয়ে শিখে এসেছিলেন এই প্রযুক্তি।

১৯৫৫ সালের অক্টোবর মাসে খেদা ডেয়ারিতে চালু হয় ‘নিরো অ্যাটোমাইসার’ (Niro Atomiser), মোষের দুধকে শুকনো করার জন্য নির্মিত বিশ্বের প্রথম ‘স্প্রেয়ার-ড্রায়ার’ (Sprayer-Dryer)। ত্রিভুবনদাস, কুরিয়েন এবং দলায়া-র ত্রয়ী জুটির সমবায় ডেয়ারি প্রকল্পের সাফল্যের কথা গুজরাটের আনন্দের পার্শ্ববর্তী অন্যান্য গ্রামেও ছড়িয়ে পড়ে। ধীরে ধীরে মেহসানা, বানসকণ্ঠ, বরোদা, সবরকণ্ঠ এবং সুরাট-এও পরপর পাঁচটি ডেয়ারি ইউনিয়ন গড়ে ওঠে। ত্রিভুবনদাস পটেলের নেতৃত্ব ও নির্দেশনায় এবং ড. ভার্ঘিস কুরিয়েনের সহায়তায় গুজরাটের আনন্দ-এ পরপর শুরু হয় গুজরাট সমবায় দুগ্ধ বিপণন সংগঠন (Gujarat Co-operative Milk Marketing Federation), জাতীয় ডেয়ারি উন্নয়ন বোর্ড (National Dairy Development Board) এবং ইনস্টিটিউট অফ রুরাল ম্যানেজমেন্ট (Institute of Rural Management)। ত্রিভুবনদাস পটেল সমস্ত গ্রামের সমবায়গুলিকে অনুরোধ করেছিলেন যে সেগুলি যেন জাতি ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সব দুগ্ধ-উৎপাদনকারীদের জন্য উন্মুক্ত থাকে। ১৯৭৩ সালে ত্রিভুবনদাস পটেলের নেতৃত্বে ‘আমূল’ তার ২৫ বছর সম্পূর্ণ করেছে। সেই উদযাপনে পাশে ছিলেন মোরারজি দেশাই, মণিবেন পটেল এবং ডঃ ভার্গিস কুরিয়েন।  

ত্রিভুবনদাস কিশিভাই ভারতের প্রদেশ কংগ্রেস কমিটি, ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস-এর সভাপতি ছিলেন। ১৯৬৭-১৯৬৮ এবং পরে ১৯৬৮ থেকে ১৯৭৪ পরপর দুবার তিনি রাজ্যসভার সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। জীবনের শেষদিন পর্যন্ত তিনি সমাজের জন্য কাজ করে গেছেন। শেষ বয়সে গ্রামে গ্রামে তেল এবং তৈলজাত দ্রব্যের সমবায় সংগঠন গড়ার চেষ্টা করেছিলেন তিনি। তাঁর এইসমস্ত জনকল্যাণমূলক কাজের পাশাপাশি সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলের জীবনের উপর নির্মীয়মান তথ্যচিত্র ‘সর্দার’-এর জন্যও তিনি সাহায্য করেছিলেন। তথ্যচিত্রটি সম্পূর্ণ হয়ে গেলেও কিছু টাকার অভাবে মুক্তি পাচ্ছিল না। ত্রিভুবনদাস পটেল অর্থসাহায্য করে ছবিটির মুক্তি পাবার ব্যবস্থা করেন। তাঁর জীবনে ও কাজে বল্লভভাই পটেলের গভীর প্রভাবকে স্মরণে রেখে একপ্রকার গুরুদক্ষিণা দিয়েছিলেন তিনি এভাবে।

১৯৭৬ সালে বিখ্যাত পরিচালক শ্যাম বেনেগালের পরিচালনায় একটি হিন্দি চলচ্চিত্র মুক্তি পায়। ১৯৭০ সালে ‘অপারেশন ফ্লাড’ নামে যে প্রজেক্টটি ন্যাশনাল ডেয়ারি ডেভেলপমেন্ট বোর্ড চালু করে তার ফলে প্রচুর দুগ্ধ উৎপাদক কৃষক গো-পালনকারি দরিদ্র ভারতীয় আর্থিকভাবে স্বনির্ভর হন। এই সাফল্যের নাম দেওয়া হয় ‘শ্বেত বিপ্লব’। মূলত এই প্রেক্ষাপটেই ছায়াছবিটি তৈরি। এই ছবিতে নাসিরুদ্দিন শাহ ত্রিভুবনদাসের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। বলাই বাহুল্য, এই ছবিটি পরের বছর ১৯৭৭ সালে জাতীয় পুরস্কারের মনোনয়নে, হিন্দি ভাষায় সেরা চলচ্চিত্র, সেরা চিত্রনাট্য ও সেরা নেপথ্য গায়িকা বিভাগে প্রথম হিসেবে ঘোষিত হয়। ছবিতে ব্যবহৃত ‘মেরো নাম কাথাপারে’ গানটি পরবর্তীকালে ‘আমূল’-এর বিজ্ঞাপনে ব্যবহৃত হয়।    

১৯৬৩ সালে ‘কমিউনিটি লিডারশিপ’-এর (Community Leadership) জন্য দারা নাসেরওয়ানজি, খুরোদি এবং ভার্গিস কুরিয়েনের পাশাপাশি ত্রিভুবনদাস পটেলও পেয়েছিলেন ‘রামন ম্যাগসেসাই পুরষ্কার’। এছাড়াও ১৯৬৪ সালে ভারত সরকারের পক্ষ থেকে তিনি ‘পদ্মভূষণ’ পুরস্কার লাভ করেন। ১৯৭০ সালের শেষে ত্রিভুবনদাস পটেল যখন অবসর নেন, গ্রামীণ সমবায়ের কৃষকরা প্রত্যেকে এক টাকা করে দান করে মোট ৬ লক্ষ টাকা সঞ্চয় করে ত্রিভুবনদাস পটেলকে দেন। সেই টাকা ব্যবহার করে তিনি ‘ত্রিভুবনদাস ফাউণ্ডেশন’ নামে একটি চ্যারিটি ট্রাস্ট গড়ে তোলেন। এশিয়ার বৃহত্তম এন. জি. ও- তে (NGO) পরিণত হয় এই ট্রাস্ট। গুজরাটের খেদা জেলায় মহিলা ও শিশু স্বাস্থ্য নিয়ে সেবামূলক কাজ করে এই ট্রাস্ট। ত্রিভুবনদাস ছিলেন সেই ট্রাস্টের প্রথম চেয়ারম্যান। ন্যাশনাল ডেয়ারি ডেভেলপমেন্ট বোর্ডের প্রাক্তন চেয়ারপার্সন শ্রীমতি ড. অমৃতা প্যাটেল ‘ত্রিভুবনদাস ফাউণ্ডেশন’কে এশিয়ার বৃহত্তম এন.জি.ও (NGO) হিসেবে মূল্যায়ন করেছেন। এই ফাউণ্ডেশনের অধীনে ভারতের প্রায় ৬০০টি গ্রামে মহিলা ও শিশুস্বাস্থ্য নিয়ে কাজ হয়ে চলেছে। তাঁর মতে, এটি আসলে একটি গ্রামীণ দুগ্ধ সমবায় যেখানে একজন গ্রামীণ স্বাস্থ্য কর্মীকে তাঁর কাজের জন্য সাম্মানিক দেওয়া হয়। ফলে স্বাস্থ্য-সেবামূলক কাজের ক্ষেত্রে ফান্ড তৈরি হয় দুগ্ধ উৎপাদন থেকে। এটি সত্যিই বিস্ময়ের।  

১৯৯৪ সালের ৩ জুন ত্রিভুবনদাস কিশিভাই পটেলের মৃত্যু হয়।

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর - জন্ম সার্ধ শতবর্ষ



তাঁর সম্বন্ধে জানতে এখানে ক্লিক করুন

বাংলাভাষায় তথ্যের চর্চা ও তার প্রসারের জন্য আমাদের ফেসবুক পেজটি লাইক করুন