বিবিধ

পার্লে-জি কন্যা

চায়ের সাথে বিস্কুট হল একে অন্যের পরিপূরক। বাড়ীতে হঠাৎ অতিথির আগমনে চা বিস্কুটই গৃহস্হের মান রাখে। দামী বিস্কুট না হোক সামান্য থিন অ্যারারুট বিস্কুট বা দুধের সাথে কয়েকটা বিস্কুট শিশুদের পেট আর মন ভরাতে খুবই কার্যকরী। সস্তায় পুষ্টিকর হিসেবে বিখ্যাত ‘পার্লে-জি’ বিস্কুটের জগতে একটি বহুল পরিচিত নাম। আর এই পার্লে-জি বিস্কুট বলতেই আমাদের চোখে ভেসে ওঠে বিস্কুটের মোড়কে একটি ছোট্ট মিষ্টি শিশু কন্যার ছবি, পার্লে-জি কন্যা (Parle- G girl)। কিন্তু কে এই শিশু কন্যা? কি তার পরিচয়? সে সবই জানবো আজ এখানে।

১৯২৯ সাল, স্বাধীনতা আসতে তখনও বেশ কয়েক বছর দেরী। মোহনলাল দয়াল পেশায় রেশম ব্যবসায়ী স্হির করেন চকলেট, লজেন্সের ব্যবসা করবেন। যেমন ভাবা তেমন কাজ। চলে গেলেন জার্মানি, সেখান থেকে কনফেকশনারি ট্রেনিং নিয়ে ভারতে ফিরে খুলে ফেললেন চকলেট তৈরির একটি ছোট্ট কারখানা।

জার্মানি থেকে ফেরার সময় তিনি তৎকালীন প্রায় ষাট হাজার টাকা খরচ করে একটি চকলেট কুকি তৈরীর যন্ত্র ও কিনে এনেছিলেন। সম্পূর্ণ স্বদেশী প্রক্রিয়ায় তৈরি কমলা লজেন্স তিনিই প্রথম তৈরী করেন তাঁর কারখানায়। খুব তাড়াতাড়ি সেই লজেন্স জনপ্রিয় হয়ে উঠল। অন্যান্য কোম্পানিরাও সেই লজেন্সের অণুকরণে লজেন্স প্রস্তুত করতে শুরু করল।

পার্লে-জি কন্যা
পার্লে-জি কমলা লজেন্স

মোহনলাল তাঁর এই লজেন্স কোম্পানিটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বোম্বে(অধুনা মুম্বই)র ইরলা ও পারলা নামক দুটি গ্রামের মাঝে। জায়গার নামানুসারে কোম্পানির নাম রাখলেন ‘পার্লে’। বারোজন কর্মী নিয়ে প্রথমে তিনি কোম্পানির কাজ শুরু করলেও শেষ পর্যন্ত পরিবারের সদস্যদেরও তিনি তাঁর এই ব্যবসায় যুক্ত করে নেন। পরাধীন ভারতে বিস্কুট ছিল সাধারণ মানুষের আয়ত্তের বাইরে। কারণ সমস্ত বিস্কুটই বিদেশ থেকে আমদানি হত এবং দাম ছিল অত্যন্ত বেশী। ইউনাইটেড, ব্রিটানিয়া, গ্লাকসো ইত্যাদি বিদেশী ব্র্যান্ডগুলি বিস্কুটের বাজারে পরিচিত নাম ছিল সেসময়। পার্লে কোম্পানি প্রতিষ্ঠা হওয়ার দশ বছর পরে অর্থাৎ ১৯৩৯ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় পার্লে প্রথমবার তাদের তৈরি বিস্কুট বাজারে নিয়ে আসে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় স্বদেশী আন্দোলনের নীতি ছিল ‘বিদেশী দ্রব্য বর্জন ও স্বদেশী দ্রব্য গ্রহণ’। স্বদেশী ভাবনায় অণুপ্রাণিত হয়ে সম্পূর্ণরূপে দেশীয় উপায়ে তৈরী মিষ্টি গ্লুকোজ বিস্কুট বাজারে আনল পার্লে, নাম দিল ‘পার্লে গ্লুকো’।

পার্লে-জি গ্লুকো
পার্লে-জি গ্লুকো

দেশের জনসাধারণের চাহিদা মেটানোর জন্যই বিস্কুট নিয়ে আসে পার্লে । শুধু দেশের মানুষই নন বিদেশীরাও এই বিস্কুটকে পছন্দ করতে শুরু করল। দেশীয় উপাদানে তৈরী সস্তার এই গ্লুকোজ বিস্কুট জনপ্রিয়তা লাভ করল দ্রুত। ১৯৬০ সালে ব্রিটানিয়া কোম্পানি তাদের গ্লুকোজ বিস্কুট ‘গ্লুকোজ ডি’ বাজারে আনল। বিদেশী দামী বিস্কুটের সাথে প্রতিযোগিতায় নিজেদের অস্তিত্ব আলাদা করে রাখার জন্য পার্লে হলুদ রঙের মোম কাগজের মোড়কের ওপর একটি শিশু কন্যার ছবিসহ কোম্পানির নাম ও লোগো লাল রঙে ছেপে বাজারে আনল।

পার্লে কোম্পানির লক্ষ্য ছিল বাড়ীর বাচ্চা ও মহিলাদের দৃষ্টি আর্কষণ করা এবং ‘পার্লে গ্লুকো’ বিস্কুটের বাজারে আগমনের সাথে সাথে তারা সেই লক্ষ্যে সফল হল। প্যাকেটের মোড়কে ট্যাগ লাইনে চমক ব্রিটানিয়ার সাথে দ্বন্দ্বে পার্লেকে এগিয়ে দিল। ‘পার্লে গ্লুকো’ নামেই এই বিস্কুটটি চলল ১৯৮০ সাল অবধি। তারপর পার্লে তাদের বিস্কুটের ব্র্যান্ড নাম পাল্টে রাখল- পার্লে-জি (জি অর্থে গ্লুকোজ)। বাকিটা ইতিহাস।

পার্লে -জি’র এই ঐতিহাসিক বিবর্তনে একজন কিন্তু অপরিবর্তিতই থেকে গেল- সেটি পার্লে -জি’র বিজ্ঞাপনী ম্যাসকট পার্লে- জি কন্যা। পার্লে- জি বিস্কুটের প্যাকেটে ঐ ছোট্ট মেয়েটির সারল্যভরা অবাক চাহনি আপামর দেশবাসীর দৃষ্টি আর্কষণ করল। বিস্কুটের আর্কষণ আরও জনপ্রিয় হয়ে ওঠে এই ছবিটির জন্য। আমূল কন্যা বা নিরমা কন্যার মত এটিও ভারতীয় বিজ্ঞাপনের জগতে একটি জনপ্রিয় ম্যাসকট।

‘পার্লে-জি কন্যা’র আসল পরিচয় জানতে অনেকেই আগ্রহী। কিন্তু বর্তমানকালে পার্লে জি কন্যার পরিচয় নিয়ে একটি বির্তকের উত্থান হয়েছে। শিশু কন্যার আসল পরিচয় হিসেবে তিনজনের নাম উঠে আসে- ১. নীরু দেশপান্ডে, যিনি বর্তমানে নাগপুরের বাসিন্দা। শোনা যায় মাত্র চার বছর তিন মাস বয়েসে নীরুর বাবা তাঁর একটি ছবি তোলেন। যদিও তাঁর বাবা পেশাদার চিত্রগ্রাহক ছিলেন না। কিন্তু তিনি ছবিটিতে নীরুকে দারুণ মেজাজে ধরতে পেরেছিলেন যার ফলে ছবিটি ভীষণ সুন্দর ওঠে। নীরুর বাবার কোন পরিচিত ব্যক্তির দ্বারা ছবিটি পার্লে কোম্পানির কাছে পৌঁছায় এবং সেই ছবিটির অণুকরণেই ‘পার্লে গ্লুকো’ বিস্কুটের মোড়কের উপরে মেয়েটির ছবি আঁকা হয় বলে অনুমান করা হয়। ২. সুধা মুর্তি, যিনি আই টি ইন্ড্রাস্ট্রিয়ালিষ্ট নারায়ণ মুর্তির স্ত্রী এবং ৩. গুঞ্জন গুন্ডানিয়া। এঁদের মধ্যে নীরু দেশপান্ডের জনপ্রিয়তাই বেশি পার্লে- জি কন্যা হিসেবে।

ক্রমাগত চলে আসা এই বির্তকের অবসান ঘটাতে পার্লের প্রোডাক্ট ম্যানেজার মায়াঙ্ক শাহ এক সাক্ষাতকারে বলেন – বিস্কুটের প্যাকেটের উপর ব্যবহৃত শিশুকন্যার ছবিটি একটি কল্পনা মাত্র যার সঙ্গে বাস্তবের কোন নারী চরিত্রের কোনরূপ মিল নেই। এই ছবিটি কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা মগনলাল দয়ালের কল্পনাপ্রসূত। বাস্তবে কারোর সাথে যদি একান্তই মিল পাওয়া যায় তাহলে তা নিছকই কাকতালীয়।

বির্তক যাই থাকুক না কেন পার্লে-জি কন্যার ম্যাসকটটি কিন্তু বাচ্চা থেকে বুড়ো সকলেরই খুব পছন্দের। ১৯৮০ সালে পার্লে একটি ক্যাম্পেন করে যেখানে গ্লুকোজ বিস্কুটের ‘জি’ অর্থে গ্লুকোজ বোঝানো হয়। ১৯৮২ সালে তৈরী হয় স্লোগান ‘স্বাদে ভরা শক্তিতে ভরা’ এর সাথে নতুন আকর্ষণীয় মোড়কে আসে ‘পার্লে জি’। ২০১১ সালে আবার নতুন বিজ্ঞাপনী স্লোগান আনে- ‘পার্লে জি’, ‘জি’ অর্থে ‘জিনিয়াস’। মোড়ক বা ক্যাম্পেন অথবা স্লোগানের বদল হলেও ‘পার্লে-জি কন্যার’ ছবিটি একই রয়ে গেছে বছরের পর বছর ধরে। এই ছবিটিই প্রতীকী হয়ে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে ‘পার্লে জি’ কে। নামী দামী বিস্কুট কোম্পানীর সাথে প্রতিযোগীতায় দাঁড়িয়ে এই বিস্কুট কোম্পানিটি গ্লুকোজ বিস্কুটের ব্র্যান্ডকে শাসন করছে। ২০০৩ সালে বিশ্বের সর্বাধিক বিক্রিত ব্র্যান্ড হিসেবে তকমা পেয়েছে ‘পার্লে জি’। প্রতিদিন প্রায় চল্লিশ কোটি বিস্কুট তৈরী করতে পার্লে কোম্পানির চিনিই লাগে ১৬১০০ টন। এই বিপুল উৎপাদন কেবল কোম্পানির জনপ্রিয়তার কারণেই সম্ভব হয়েছে। বিস্কুটের সাথে সাথে ‘পার্লে জি কন্যা’ও কোথাও গিয়ে আপন হয়ে গেছে দেশবাসীর কাছে।

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।