ইতিহাস

পদ্মা বন্দ্যোপাধ্যায়

পদ্মা বন্দ্যোপাধ্যায় (Padmavathy Bandopadhyay) হলেন ভারতীয় বায়ুসেনার প্রথম মহিলা এয়ার মার্শাল এবং থ্রি-স্টার পদে উন্নীত দ্বিতীয় মহিলা। তিনি এরোস্পেস মেডিক্যাল স্যোসাইটির প্রথম মহিলা মেডিক্যাল অফিসার,উত্তর মেরুতে বৈজ্ঞানিক গবেষণাকারী প্রথম ভারতীয় মহিলা, ডিফেন্স সার্ভিস স্টাফ কলেজ কোর্স পাস করা প্রথম ভারতীয় মহিলা এবং বায়ু সেনার মেডিক্যাল সার্ভিস বিভাগের ডিরেক্টর জেনারেল ছিলেন। সামরিক কাজের পাশাপাশি সামাজিক কাজেও তিনি উল্লেখযোগ্য কৃতিত্বের পরিচয় রেখেছেন।

১৯৪৪ সালের ৪ নভেম্বর অন্ধ্রপ্রদেশের তিরুপতিতে পদ্মা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্ম হয়। তাঁর বিবাহ পূর্ববর্তী নাম ছিল পদ্মা স্বামীনাথন। পদ্মার ছোটবেলা কেটেছিল এক মধ্যবিত্ত পরিবারে। ছোটবেলা থেকেই তিনি তামিল ঐতিহ্য এবং মূল্যবোধের ছায়ায় বেড়ে উঠেছেন। দেবী লক্ষ্মীর নামে তাঁর নামকরণ করা হয়েছিল-পদ্মা। তাঁর ডাক নাম ছিল পদ্মু। বাবা ভি স্বামীনাথন কিছুটা কড়া ধাতের মানুষ হলেও মেয়ের পড়াশোনার ক্ষেত্রে সবসময় সহযোগিতা করে গেছেন এমনকি মেয়েকে উচ্চশিক্ষার জন্য দিল্লিও পাঠিয়েছিলেন। পদ্মার মা পদ্মার ছোটবেলা থেকেই গুরুতরভাবে অসুস্থ থাকতেন। ফলে স্বাভাবিকভাবেই তাঁর ছোটবেলা আর পাঁচটা শিশুর মতো করে কাটেনি। ১৩ বছর বয়স থেকেই গার্হস্থ্য কাজে তাঁকে অংশ নিতে হত। আর পাঁচটা শিশুর মতো খেলাধুলার সুযোগ তিনি পাননি। তাঁর মা যখন সফদরজং হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন তখন এক মহিলা ডাক্তারের সাথে তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। এই ডাক্তারের অনুপ্রেরণায় পদ্মার জীবনের শুরুতে লক্ষ্য ছিল ডাক্তার হয়ে ওঠা। তবে, পরবর্তীকালে বিশেষত চীন-ভারত যুদ্ধের সময়ে তাঁর সেনাবাহিনীতে যোগদানের ইচ্ছে প্রবল হয়ে ওঠে।

পদ্মা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয় দিল্লীর তামিল এডুকেশনাল অ্যাসোসিয়েশনের সিনিয়র সেকেন্ডারি স্কুলে। দিল্লীতে তাঁর জীবনযাত্রা ছিল অনেকটাই স্বচ্ছল। তাঁকে এ সময়ে গৃহস্থালীর কোন কাজ করতে না হওয়ার ফলে কেবলমাত্র পড়াশোনা নিয়েই ব্যস্ত থাকতে পেরেছিলেন তিনি। কিন্তু তা সত্ত্বেও, শুরুতে তাঁকে পড়াশোনা করতে গিয়ে বেশ কিছু প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়েছিল। দিল্লীতে আসার আগে তিনি তামিল এবং সংস্কৃত ভাষায় পড়াশোনা করেছিলেন। কিন্তু দিল্লীতে তাঁর পড়ার মাধ্যম ছিল-হিন্দী এবং ইংরেজি। কিন্তু তিনি কিছুদিনের মধ্যেই এই প্রতিকূলতাকে জয় করে পড়াশোনা চালিয়ে যান। তিনি দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের কিরোরি মল কলেজ থেকে পাশ করেন। কলেজ জীবনে তিনি প্রথম স্থান অর্জন করেছিলেন। স্কুল স্তরে কলা বিভাগে পড়াশোনা করলেও কলেজ স্তরে পড়াশোনার জন্য তিনি বিজ্ঞান বিষয়কে বেছে নেন। কলেজ পাশ করার পর তিনি পুনের আর্মড ফোর্স মেডিক্যাল কলেজের(এ.এফ.এম.সি.)এর এন্ট্রান্সে বসেন। তাঁর সহপাঠীরা স্বাভাবিকভাবেই অধিকাংশই  ছিলেন ছাত্র। এফ. এম. সির. প্রথম ব্যাচেলর ছাত্রী ছিলেন পদ্মা। হোস্টেলে থেকে তাঁর পড়াশোনা শুরু হয়। মাঝে মায়ের অসুস্থতার জন্য পরীক্ষা দিতে পারেননি তিনি। তবে ভেঙে না পড়ে তিনি দ্বিতীয় ব্যাচে আবার নতুন করে পড়াশোনা শুরু করেন।
পদ্মা বন্দোপাধ্যায় তাঁর পাঁচ বছরের কোর্স সমাপ্ত করার পর ১৯৬৮ সালে বায়ুসেনা বাহিনীতে যোগ দেন।

তিনি এরপর ইন্টার্ন  হিসাবে যোগ দেন বেঙ্গালুরুর এয়ার ফোর্স হাসপাতালে। এখানেই তাঁর সাথে ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট সতীনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সম্পর্ক তৈরী হয়। পরবর্তীতকালে তাঁরা দুজন বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। ১৯৭১ সালের যুদ্ধে পঞ্জাবের হালওয়ালা বায়ুসেনা ঘাঁটিতে পদ্মার স্বামীর পোস্টিং হয়। তাঁর প্রথম পদোন্নতি হয়েছিল স্কোয়াড্রন লিডার হিসেবে যেখান থেকে পরবর্তীতে তিনি  উইং কমান্ডার হন। এই সময়ে তাঁর পোস্টিং হয় ডিফেন্স ইনস্টিটিউট অফ ফিজিওলজি অ্যান্ড অ্যালায়েড সায়েন্সেস (DIPAS Defence Institute of Physiology and Allid Science) বিভাগে।সেনাবাহিনীতে তাঁর নির্দিষ্ট দায়িত্ব পালন করার পাশাপাশি তিনি বিমানের উচ্চতা সম্পর্কে পরিশ্রমসাধ্য গবেষণাধর্মী কাজ করেন। একইসাথে অনেকগুলি গুরুত্বপূর্ণ কৃতিত্বের অধিকারিণী হওয়ার সুবাদে ভারতবর্ষের ইতিহাসে একমাত্র সামরিক অফিসার হিসেবে তিনি ইন্দিরা প্রিয়দর্শিনী পুরস্কারে ভূষিত হন। ১৯৭১ সালে পাক-ভারত যুদ্ধের সময়ে তিনি মেডিসিন অফিসার ছিলেন। সেই সময়ে তিনি বর্ডারে একজন সিনিয়র অফিসার হিসেবে যুদ্ধকেত্রে নেমে কাজ করেছিলেন।তাঁর দায়িত্ব ছিল, ওষুধ ও কর্মী যোগান দেওয়া।’

১৯৭৫ সালে এভিয়েশন মেডিসিনে বিশেষ কোর্স করার পর পদ্মা ডিফেন্স স্টাফ কলেজের এন্ট্রান্সে ফের সাফল্য অর্জন করেন। এরপর পদ্মা এরোস্পেস মেডিক্যাল স্যোসাইটির প্রথম মহিলা মেডিকেল অফিসার হিসাবে নির্বাচিত হন। ২০০০সালের ২৬ জুন ভারতীয় বায়ুসেনা বাহিনীর প্রথম এয়ার মার্শাল হিসাবে পদ্মা বন্দ্যোপাধ্যায় নিযুক্ত হন। এরপর তিনি এয়ার ফোর্স মেডিক্যাল ইউনিটের কমান্ডিং অফিসার হিসাবেও নির্বাচিত হন। পদ্মা ব্যক্তিগত ভাবে নারী-পুরুষ বিভাজনের কথা বিশ্বাস করেন না। সন্তান ধারণ করে এবং সেই শিশুকে মানুষ করে তোলার পাশাপাশি নিজের জীবনের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন যে করা যায় তা তিনি নিজেই প্রমাণ করেছেন। নিজের জীবনে খুব প্রকটভাবে না হলেও তিনি নারী হওয়ার কারণে বৈষম্যমূলক আচরণ টের পেয়েছেন।পুরুষ সেনারা নিজেদের শারীরিক সমস্যা তাঁকে জানাতে স্বচ্ছন্দ বোধ করতেন না। তাঁর প্রতি আচার-আচরণের ক্ষেত্রেও কোন কোন পুরুষ সহকর্মী রূঢ়তার পরিচয় দিয়েছেন।

পদ্মা বন্দ্যোপাধ্যায় ডিফেন্স ইনস্টিটিউট অফ ফিজিওলজি অ্যান্ড অ্যালায়েড সায়েন্সেসে উইং কমান্ডার হিসেবে পোস্টিং এর পর সেখানে তিনি দীর্ঘদিন গবেষণা করেছেন। তাঁর গবেষণামূলক নিবন্ধের সংখ্যা ২৩টি। পাশাপাশি তাঁর নামে ২৭টি গবেষণা পত্র প্রকাশিত হয়েছে। বর্তমানে, তাঁর নেতৃত্বে রিটায়ার্ড মেডিকেল অফিসাররা পূর্ব উত্তর প্রদেশের প্রান্তিক শিশুদের বিনিমূল্যে চিকিৎসা এবং শিক্ষা প্রদান করছেন।

পদ্মা বন্দ্যোপাধ্যায়কে এয়ার ফোর্স ওয়াইভস ওয়েলফেয়ার  অ্যাসোসিয়েশন ট্রফিতে ভূষিত করা হয়েছে। সামাজিক কাজে বিরল কৃতিত্বের জন্য ২০২০ সালে তাঁকে পদ্মশ্রী সম্মানে পুরস্কৃত করা হয়। তিনিই একমাত্র সামরিক অফিসার যিনি এই সর্বোচ্চ স্তরের নাগরিক পুরস্কার পেয়েছেন। পুরস্কার পাওয়ার পর আপ্লুত পদ্মার মন্তব্য ছিল-‘আমি এই পুরস্কার পেয়ে বাধিত হয়েছি। কারণ সামরিক আধিকারিকদের এই পুরস্কার পাওয়া খুবই বিরল  ঘটনা। কিন্তু এই কাজ( দরিদ্র শিশুদের পাশে দাঁড়ানো) দু একদিনের কাজ নয়। এটা সারাজীবনের কাজ।” পদ্মা বন্দ্যোপাধ্যায় ও সতীনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় যৌথভাবে’ বিশিষ্ট সেনা মেডেল পেয়েছেন। সেনাবাহিনীর ইতিহাসে তাঁরাই একমাত্র দম্পতি যাঁরা এই পুরস্কার পেয়েছেন। এছাড়াও তিনি সেনাবাহিনীর কাছ থেকে -পরম বিশিষ্ট সেবা মেডেল ,অতি বিশিষ্ট সেবা মেডেল এবং বিশিষ্ট সেবা মেডেলের মতো উল্লেখযোগ্য পুরস্কার পেয়েছেন।

সববাংলায় পড়ে ভালো লাগছে? এখানে ক্লিক করে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ভিডিও চ্যানেলটিওবাঙালি পাঠকের কাছে আপনার বিজ্ঞাপন পৌঁছে দিতে যোগাযোগ করুন – contact@sobbanglay.com এ।


Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

বাংলাভাষায় তথ্যের চর্চা ও তার প্রসারের জন্য আমাদের ফেসবুক পেজটি লাইক করুন