সববাংলায়

তেভাগা আন্দোলন

ভারতবর্ষে বিশেষত ব্রিটিশ শাসনামলে বহুবার কৃষকদের নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য সংগঠিত হতে দেখা গেছে। স্বাধীনতা লাভের ঠিক এক বছর আগে, তৎকালীন অবিভক্ত বাংলায় এমনই এক ঐতিহাসিক কৃষক আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল—যা ইতিহাসে তেভাগা আন্দোলন (Tebhaga Movement) নামে পরিচিত। তেভাগার আক্ষরিক অর্থ হল ফসলের তিন ভাগ। কৃষকদের দাবি ছিল, উৎপন্ন ফসলের তিনভাগের মধ্যে দুই ভাগ থাকবে চাষির জন্য এবং এক ভাগ যাবে জমির মালিকের কাছে। এই দাবি থেকেই তেভাগা আন্দোলনের সূত্রপাত।

তৎকালীন অখন্ড বাংলার মূলত দিনাজপুর এবং রংপুর জেলায় এই আন্দোলন তীব্র আকার ধারণ করেছিল। তেভাগা আন্দোলনের নেতৃত্ব এসেছিল বামপন্থী রাজনৈতিক শক্তির হাত ধরে, বিশেষ করে ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে যুক্ত অল ইন্ডিয়া কিষাণ সভার সক্রিয় সমর্থনে। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে কৃষকদের ব্যাপক অংশগ্রহণ এই আন্দোলনকে করে তুলেছিল এক যুগান্তকারী ঘটনা।

১৯৪৬ সাল থেকে ১৯৪৭ সাল — তেভাগা আন্দোলনের ব্যাপ্তি ছিল মোট একবছর। তবে কোন বড় আন্দোলন আকস্মিকভাবে শুরু হয় না, তার নেপথ্যে থাকে দীর্ঘদিন ধরে জমতে থাকা ক্ষোভ ও অসন্তোষ। তাই তেভাগা আন্দোলনের গুরুত্ব বুঝতে হলে ভারতবর্ষের কৃষিব্যবস্থার প্রশাসনিক মানচিত্রটা একটু বুঝে নেওয়া প্রয়োজন।

ব্রিটিশ শাসন কায়েম হওয়ার আগে পর্যন্ত জমির মালিক ছিল কৃষকেরাই। মোগল আমল পর্যন্ত তারা এক-তৃতীয়াংশ বা কখনও তারচেয়েও কম ফসল খাজনা হিসেবে জমিদারদের মাধ্যমে রাষ্ট্রকে দিত। কিন্তু ব্রিটিশরা যখন ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত’ প্রচলন করল তখন জমির মালিকানা সরাসরি চলে যায় জমিদারদের হাতে। জমিদাররা জমির পরিমাণ এবং অবস্থা অনুযায়ী ব্রিটিশ সরকারকে খাজনা প্রদান করত। এই জমিদার এবং কৃষকদের মাঝখানে আবির্ভূত হয় আরেক শ্রেণি যাদের বলা হত জোতদার। এই জোতদাররা জমি ইজারা নিয়ে কৃষকদের দিয়ে চাষাবাদ করাত এবং তাদের থেকে ফসলের ভাগ আদায় করত। পরিশ্রম করে ফসল উৎপাদন করলেও কৃষকেরা যেহেতু আর জমির মালিক ছিল না তাই জোতদারদের হাতে তাদের ফসলের অধিকাংশটাই তুলে দিতে হত। এই জোতদাররা আবার খাজনা হিসেবে অর্থ সংগ্রহ করত কৃষকদের থেকে এবং কখনও কখনও তার জন্যে অকথ্য অত্যাচারাও চালাত। মালিকানা হারানো ভাগ চাষিদের বলা হত আধিয়ার বা বর্গাদার। জোতদার এবং জমিদারদের এই অনৈতিক অধিকার দীর্ঘদিন ধরে কৃষকদের ভিতরে ক্ষোভের সঞ্চার করেছিল।

বাংলায় বর্গাদাররা তাদের ফলানো ফসলের পঞ্চাশ শতাংশ অর্থাৎ অর্ধেক ভাগই জমিদারদের দিয়ে দিতে বাধ্য থাকত। ফলত, অবশিষ্ট ফসলে কৃষকের দিন গুজরান হয়ে পড়েছিল দুঃসহ। এরই মধ্যে ১৯৪৩ সালে বাংলায় যখন ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়, দেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থার অবনতি ঘটে তখন ফসলের অর্ধভাগ দিতে বাধ্য থাকা বর্গাদার বা ভাগচাষিদের অবস্থা আরও শোচনীয় হয়ে পড়েছিল। তার আগে ১৯৪০ সালে ফজলুল হকের নেতৃত্বে গঠিত সরকারের আমলে ফ্লাউড কমিশন (Floud Commission) গঠিত হয়েছিল। জমিদারি প্রথা বাতিলসহ বাংলার ভূমি রাজস্ব সংক্রান্ত সংস্কারের বিষয়গুলো এই কমিশনের অধীনে ছিল। এই কমিশনেরই সুপারিশ ছিল চাষিদের উৎপাদিত ফসলের তিনভাগের দুইভাগ প্রদান করা। যদিও সরকারিভাবে সুপারিশটি কার্যকর হয়নি, এই সুপারিশ কৃষকদের মধ্যে নতুন আশার আলো জাগায় এবং তেভাগার দাবিকে গণআন্দোলনের রূপ দেয়।

পাশাপাশি ছিল কমিউনিস্ট পার্টির সরাসরি সহযোগিতা। ১৯৩৬ সালে কংগ্রেসের বামপন্থী অংশ, কংগ্রেস সমাজতন্ত্রী দল ও কমিউনিস্টরা ‘সারা ভারত কিষান কংগ্রেস’ প্রতিষ্ঠা করেছিল। ১৯৩৭ সালে বিহারে এই কিষান কংগ্রেসের দ্বিতীয় অধিবেশনে এর নাম হয় ‘সারা ভারত কিষান সভা’। ১৯৪৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ‘বঙ্গীয় প্রাদেশিক কিষান সভা’ কৃষকদের সংগঠিত করে একটি বৃহৎ আন্দোলনের রূপদানে সহায়তা করেছিল। ফসলের তিনভাগের হিসেবে দাবি তোলা হয়েছিল বলে এই আন্দোলন তেভাগা আন্দোলন নামে পরিচিতি লাভ করে।

প্রাথমিকভাবে কাকদ্বীপ, সোনারপুর, ভাঙড় এবং ক্যানিং-এ কৃষক আন্দোলন শুরু হয়েছিল। কাকদ্বীপ এবং নামখানা ছিল আন্দোলনের প্রধান কেন্দ্রবিন্দু। মনে রাখতে হবে এই ১৯৪৬ সালেই কিন্তু হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে এক বীভৎস সাম্প্রতিক দাঙ্গা সংঘটিত হয়েছিল। তবুও তেভাগা আন্দোলনের চিত্রটি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। সেই সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাজনিত বিদ্বেষ ও বিভেদ ভুলে হিন্দু-মুসলমান কৃষক হাত ধরাধরি করে এই আন্দোলনে অংশ নিয়েছিল। কমিউনিস্টদের সহযোগিতায় গড়ে ওঠা এই আন্দোলন কৃষক ঐক্যের ডাক দেয় এবং তারই ভিত্তিতে এই আন্দোলন জেলা থেকে জেলায় ছড়িয়ে পড়তে থাকে। সুন্দরবনের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে শুরু করে উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন অংশের কৃষকেরা জোরালোভাবে তেভাগার দাবি উত্থাপন করেছিল।

পূর্ব এবং পশ্চিমবাংলার কৃষক আন্দোলন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, মহিলা শ্রমিক সংগঠন, সংগ্রামী তহবিল এবং রাজনৈতিক শিক্ষাপ্রদানের ক্লাস গড়ে তোলার মাধ্যমে ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল। তেভাগা আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের মধ্যে কাঁসারি হালদার, গণেশ দাস, অজিত বোস, বিষ্ণু চট্টোপাধ্যায়, ইলা মিত্র, হাজী মোহাম্মদ দানেশ, নূর জালাল, দেবপ্রসাদ ঘোষ, সুশীল সেন, কৃষ্ণবিনোদ রায়, ভূপাল পাণ্ডা, রূপনারায়ণ রায়, কালী সরকার প্রমুখ উল্লেখযোগ্য। এই আন্দোলনের প্রথম শহীদ ছিলেন দিনাজপুর জেলার তালপুকুর গ্রামের সমিরউদ্দিন ও শিবরাম মাঝি। সমিরউদ্দিন ছিলেন মুসলমান এবং শিবরাম মাঝি ছিলেন হাসদা সম্প্রদায়ের মানুষ। বালুরঘাট মহকুমাতেও এই আন্দোলন তীব্র আকার ধারণ করেছিল। খাঁপুর গ্রামে পুলিশ ও জোতদারদের আক্রমণ চরমে ওঠে। ১৯৪৭ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি ওই গ্রামের কৃষক নেতাদের গ্রেফতার করে পুলিশ। সেখানকার কৃষকরা, যাঁদের মধ্যে অনেকেই ছিলেন সাঁওতাল, তাঁরা তীর, ধনুক, টাঙ্গি প্রভৃতি নিয়ে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন। সেখানেই মুখোমুখি সংঘর্ষে ২২জন কৃষক শহীদ হয়েছিলেন।

১৯৪৬ সালে রাণীশংকৈল উপজেলায় আবার মহিলা কৃষকরা লাঠি, ঝাঁটা, দা, বটি ইত্যাদি ঘরোয়া জিনিসগুলিকেই অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে পুলিশের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন। সেখানে একজন সশস্ত্র পুলিশ এক নারী কৃষকের প্রতি অভদ্র ভাষা প্রয়োগ করলে কৃষক নেতা ও রাজবংশী নারী ভাণ্ডনীর নেতৃত্বে পুলিশটিকে সারারাত আটক করে রাখা হয়েছিল এবং ভাণ্ডনী নিজে বন্দুক কাঁধে সারারাত সেই বন্দী পুলিশটিকে পাহারা দিয়েছিলেন। এছাড়াও কাকদ্বীপে মহিলারা ভীষণ সক্রিয়ভাবে আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছিলেন। মহিলারা সভা, মিছিল এবং জোরপূর্বক ফসল কাটার কাজে যোগ দিতেন। এমনকি তাঁরা ফসল পাহারাও দিতেন। পুলিশ বা জোতদারদের আসতে দেখলেই মহিলারা শঙ্খ বাজিয়ে কৃষকদের সতর্ক করে দিতেন। কিছু মহিলা যাঁরা আদালতে সাফাইয়ের কাজ করতেন, তাঁরাও আদালতের ভিতরকার গোপন ও প্রয়োজনীয় তথ্য আন্দোলনকারীদের কাছে পৌঁছে দিতেন। এইভাবে নারীদেরও এগিয়ে আসায় আন্দোলনের ভীত আরও দৃঢ় হয়েছিল।

শুধু বর্তমান পশ্চিমবাংলায় নয়, পূর্ববাংলাতেও অর্থাৎ বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্ত রংপুর, খুলনা, ময়মনসিংহ, যশোর প্রভৃতি জায়গায় তেভাগার আগুন ছড়িয়ে গিয়েছিল। ‘আধি নয়, তেভাগা চাই’ — কৃষকদের এই স্লেগান আকাশে-বাতাসে তখন ভেসে বেড়াচ্ছিল। কিছু জায়গায় তেভাগা এতই তীব্র রূপ ধারণ করেছিল যে, জমিদাররা তেভাগা কর্মীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা তুলে নিয়ে তাদের সঙ্গে সমঝোতা করতে পর্যন্ত প্রস্তুত হয়ে গিয়েছিল। কোন অঞ্চলকে তো চাষিরা তেভাগা এলাকা হিসেবেও ঘোষণা করে দিয়েছিলেন। বিশেষত মেদিনীপুর এবং চব্বিশ পরগণায় তেভাগার অধিকার সুদৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।

প্রায় একবছরব্যাপী তেভাগা আন্দোলনের ফল অনেকাংশে ইতিবাচক হয়েছিল বলা যায়। জানা যায় প্রায় চল্লিশ শতাংশ বর্গাদার চাষিকে স্বেচ্ছায় জমিদারেরা তেভাগার অধিকার দিয়েছিল। পরবর্তীকালে ১৯৫০ সালে জমিদারি প্রথা উচ্ছেদ এবং বর্গাদারী আইন প্রণয়নের মাধ্যমে কৃষকেরা তাঁদের জমির ফসলের অধিকাংশ ভাগের অধিকার পেলেও তা যথাযথভাবে তখনও বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে ১৯৬৭ সালে পশ্চিমবঙ্গে ভূমি সংস্কার আইন বাস্তবায়ন না হওয়ার কারণে আরেকটি কৃষক সংগ্রাম দেখা গিয়েছিল। আরও পরে কৃষকদের অধিকার নিশ্চিত করার জন্য ‘অপারেশন বর্গা’ চালু করেছিল বামফ্রন্ট সরকার। তবে একথা নিশ্চিতভাবেই বলা যায় যে, তেভাগা আন্দোলন ভারতের কৃষি-আন্দোলনের ইতিহাসের এক সন্ধিক্ষণ। এই তেভাগা আন্দোলনেই কৃষকদের এক রাজনৈতিক চেতনার উত্থান লক্ষ করা যায় যাকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের অধিকার বুঝে নিতে তাঁরা লড়াই করেছিলেন। তেভাগা আন্দোলন যে ভারতবর্ষের ইতিহাসের বৃহত্তম কৃষক আন্দোলন সেই বিষয়ে আজ আর কোন সন্দেহ থাকবার কথা নয়।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

তথ্যসূত্র


  1. ‘স্বদেশ, সভ্যতা ও বিশ্ব’, জীবন মুখোপাধ্যায়, শ্রীধর পাবলিশার্স, কলকাতা, পুনর্মুদ্রণ, জানুয়ারি, ২০২১।
  2. https://en.m.wikipedia.org/
  3. https://vajiramandravi.com/
  4. https://www.insightsonindia.com/
  5. https://amritmahotsav.nic.in/
  6. https://www.clearias.com/

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading