বিবিধ

নিরমা কন্যা

ভারতীয় টেলিভিশন জগতে একটি বিজ্ঞাপন খুবই জনপ্রিয়, “দুধ সি সফেদি নিরমা সে আয়ি/ রঙ্গীন কাপড়া ভি খিল খিলযায়ে… “। লাইনটি শুনলেই আমাদের চোখের সামনে নিমেষে ভেসে ওঠে ওয়াশিং পাউডারের প্যাকেটের উপর দুহাত ছড়িয়ে নৃত্যরত একটি ছোট্ট বাচ্চা মেয়ের ছবি। চল্লিশ বছরের বেশী সময় ধরে নিরমা ওয়াশিং পাউডারের প্যাকেটের উপর ছোট্ট মেয়েটির ছবি একই আছে। কোন বদল হয় নি। আমূল কন্যা বা লিরিল সাবানের ম্যাসকটের মতই ‘নিরমা গার্ল’ (Nirma Girl) বা ‘নিরমা কন্যা’ ম্যাসকটটি ভারতের বিজ্ঞাপন জগতে বিশেষ জায়গা তৈরী করে নিয়েছে।

সত্তরের দশক থেকে আজ অবধি সম্পূর্ণ ভারতীয় প্রক্রিয়ায় তৈরী ‘নিরমা’ ওয়াশিং পাউডার একটি জনপ্রিয় নাম। এই নিরমা কন্যা কে ও তাঁর উৎপত্তি হল কীভাবে সেটা জানতে আমাদের পিছিয়ে যেতে হবে বেশ কিছু বছর পেছনে। কারসান ভাই প্যাটেল গুজরাটের আমেদাবাদে এক সরকারি ল্যাবে ল্যাব টেকনিশিয়ান ছিলে। রসায়নে স্নাতক কারসান ভাইয়ের কলেজ জীবন থেকেই রসায়নের উপর প্রবল আগ্রহ। এই আগ্রহের কারণেই চাকরির পাশাপাশি তিনি অবসর সময়ে নিজস্ব ল্যাবরেটরি থেকে ডিটারজেন্ট বা কাপড় কাচার সাবান গুঁড়ো তৈরী করে সাইকেল করে বাড়ী বাড়ী বিক্রি করতেন।

ভারতে সে সময়ে হিন্দুস্তান ইউনিলিভার লিমিটেডের ‘সার্ফ’ ডিটারজেন্ট প্রবল জনপ্রিয় ছিল। কিন্তু এই ডিটারজেন্ট কেজি প্রতি তেরো থেকে চোদ্দ টাকা দরে বিক্রি হত যা তখনকার মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তদের সাধ্যের বাইরে ছিল। কারসান ভাই এই নিম্ন ও মধ্যবিত্তদের কথা মাথায় রেখেই খুব কম দামে ডিটারজেন্ট তৈরী করে মাত্র সাড়ে তিন টাকা কেজি দরে বিক্রি করতে শুরু করলেন।

১৯৬৮ সালে প্রথম ফসফেট মুক্ত পরিবেশ বান্ধব ডিটারজেন্ট তৈরী হয় কারসানের বাড়ীর পিছনে তাঁর নিজস্ব ল্যাবরেটরিতে। বাড়ী বাড়ী গিয়ে প্রতিদিন তিনি পনেরো থেকে কুড়ি প্যাকেট ডিটারজেন্ট বিক্রি করতেন। ধীরে ধীরে দামী ডিটারজেন্ট পাউডারের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় এই কম দামী ডিটারজেন্ট জনপ্রিয়তা লাভ করতে থাকে। তিন বছর পরে ব্যবসার প্রসার ঘটলে তিনি সরকারি চাকরি ছেড়ে দিয়ে সম্পূর্ণভাবে ব্যবসায় নিজেকে নিয়োজিত করেন।

কারসান ভাইয়ের এক মেয়ে নাম নিরুপমা। নাম ‘নিরুপমা’ হলেও তাঁকে বাড়ীতে ‘নিরমা’ বলে ডাকা হত। বাবা হিসেবে কারসান ভাই চেয়েছিলেন তাঁর মেয়ের সারা পৃথিবী জোড়া নাম হোক। কিন্তু ভাগ্যের নিদারুণ পরিহাসে এক পথ দুর্ঘটনায় নিরুপমার মৃত্যু হয়। মেয়ের অকাল মৃত্যুতে তিনি ভেঙ্গে পড়লেও ঠিক করেন যে তাঁর মেয়ের নামকেই তিনি সকলের কাছে পৌঁছে দেবেন। তিনি স্হির করেন তাঁর ডিটারজেন্ট কোম্পানির নাম তাঁর মৃত মেয়ের নামে ‘নিরমা’ রাখবেন। সেইমতো তিনি তাঁর ডিটারজেন্ট পাউডারের মোড়কের ওপরে তাঁর মেয়ের একটি সাদা ফ্রক পড়া ছবি প্রিন্ট করেন। তৎকালীন সময়ে কোন ব্যবসায়িক পণ্যের মোড়কের ওপর ছবি দেওয়ার বিশেষ চল বিশেষ ছিল না। সেই কারণে ‘নিরমা’ অন্যান্য দামী ডিটারজেন্ট পাউডারের থেকে একটু আলাদা হয়ে সকলের চোখে পড়ে।

সাথে সাথে বাজারে চাহিদাও বাড়তে থাকে নিরমার। কিন্তু দোকানদার ধারে নিরমা ডিটারজেন্ট কিনে নিয়ে টাকা দিতে দেরী করত। ফলে পুঁজিতে টান পড়তে শুরু করল। সেই সময়ে টেলিভিশন ও রেডিওতে প্রচার ভীষণই ব্যয়বহুল ছিল। কারসান ভাই স্হির করলেন তিনি টেলিভিশন রেডিওতে প্রচার করবেন নিরমার। তিনি বাজার থেকে সমস্ত ডিটারজেন্ট পাউডারের প্যাকেট তুলে নিলেন এবং নিরমার নামে একটি জিঙ্গল (কোন পণ্যের বিজ্ঞাপনী আবহ সঙ্গীত) তৈরী করান যা ভারতীয় বিজ্ঞাপনের জগতে ইতিহাসে পরিণত হয়েছে। তিনি পূর্ণিমা আ্যডভার্টাইসমেন্ট কোম্পানিকে দায়িত্ব দেন টিভি এবং রেডিওতে নিরমার বিজ্ঞাপন প্রচার করার। একটি ছোট্ট মেয়ের সাদা ফ্রক পড়া ছবি আর তার সাদা ফ্রকের মতই শুভ্রতা ডিটারজেন্ট পাউডার দেবে বলে দাবী করে একটি বিজ্ঞাপন তৈরী করেন তারা। শুরু হয় নিরমার টিভি এবং রেডিওতে প্রচার এবং অল্পদিনেই তা যথেষ্ট জনপ্রিয়তা লাভ করে। দোকান বাজারে নিরমার খোঁজ পড়তে শুরু করে। তখন কারসান ভাই নগদ টাকায় দোকানদারদের নিরমা ডিটারজেন্ট বিক্রি করতে শুরু করেন। এইভাবেই নিরমা একটি ব্র্যান্ড-এ পরিণত হয়।

১৯৭২ সালে গুজরাটে প্রথম দোকান হয় নিরমা ডিটারজেন্ট পাউডারের। ১৯৮৫ সালে নিরমা ভারতের অন্যতম জনপ্রিয় ব্র্যান্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। বর্তমানে ভারতীয় বাজারে নিরমার ৩৫% শেয়ার রয়েছে। ১৯৯০ সালে প্রায় বারো বছর পরে নিরমার দ্বিতীয় পণ্য বাজারে আসে একটি কাপড় কাচার সাবান। সেই ছোট্ট মেয়েটির সাদা ফ্রক পরা ছবিটি সাবানের প্যাকেটের উপরে প্রিন্ট করা। প্রতীকী হয়ে ওঠে ছবিটি ভারতের ঘরে ঘরে।

১৯৯৪ সালে নিরমা শেয়ার বাজারে নথিভুক্ত হয় কোম্পানি হিসেবে। ২০০৪ সালে আট হাজার টন ডিটারজেন্ট উৎপাদন করে নিরমা বিশ্বরেকর্ড তৈরী করে। ২০০৭ সালে আমেরিকার সিয়ার্লস ভ্যালি মিনারেল আই এন সি( Searles Valley Minerals Inc) কে কিনে নিয়ে পৃথিবীর সপ্তম বড় সোডা অ্যাশ্ কোম্পানিতে পরিণত হয় নিরমা। এখানেই থেমে যায়নি নিরমা। ‘নিরমা ইনষ্টিটিউট অফ টেকনোলজি’, ‘নিরমা ইনষ্টিটিউট অফ ম্যানেজমেন্ট, ‘নিরমা ইউনিভার্সিটি অফ সায়েন্স এ্যান্ড টেকনোলজি’ আজ পরিচিত নাম। একটি ঘরোয়া শিল্প থেকে আজ নিরমা প্রায় ২৫০০ কোটি টাকার কোম্পানিতে পরিণত হয়েছে।

ভারতের বিজ্ঞাপন জগতে ইতিহাসে যে কয়টি বিজ্ঞাপন বিখ্যাত হয়েছে তার মধ্যে নিরমা অন্যতম। দীর্ঘ চল্লিশ বছর ধরে একই ম্যাসকট নিয়ে নিরমা ভারত তথা পৃথিবীর বাজারে নিজের অস্তিত্বকে টিকিয়ে রেখেছে। গুণগত মান, কম দাম এবং ঐ ছোট্ট মেয়েটির ফ্রক পরা ছবিটি নিরমাকে অন্যান্য ডিটারজেন্ট পাউডার কোম্পানিগুলির তুলনায় এক অন্য পরিচিতি দিয়েছে। কারসান ভাই প্যাটেল তাঁর মৃত মেয়েকে এইভাবেই অমর করে রেখেছেন মানুষের মননে।

এই ধরণের তথ্য লিখে আয় করতে চাইলে…

আপনার নিজের একটি তথ্যমূলক লেখা আপনার নাম ও যোগাযোগ নম্বরসহ আমাদের ইমেল করুন contact@sobbanglay.com

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।