ভারতের চা-রোপণ ও চা-উৎপাদনের ইতিহাসে অন্যতম পথিকৃৎ এবং একজন দেশপ্রেমী শহীদ মণিরাম দেওয়ান (Maniram Dewan)। ভারতের প্রথম চা রোপণকারী হিসেবে তাঁর নামই ইতিহাসে খোদিত হয়ে আছে। ব্রিটিশ সরকারের অধীনে দেওয়ান পদে প্রথমে আসামের চা বাগানগুলিতে কাজ করলেও, পরবর্তীকালে চা-বাগানের শ্রমিকদের উপরে ব্রিটিশদের অকথ্য অত্যাচার দেখে ব্রিটিশ বিরোধী ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হন মণিরাম। ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহের সময় ব্রিটিশ বিরোধিতার জন্য তাঁকে ফাঁসি দেওয়া হয়। আসামের উত্তর দিকের অঞ্চলের মানুষের কাছে তিনি ‘কালিতা রাজা’ নামে পরিচিত হন।
সাম্প্রতিক পোস্ট
১৮০৬ সালের ১৭ এপ্রিল আসামে মণিরাম দেওয়ানের জন্ম হয়। তাঁর পুরো নাম মণিরাম দত্ত বড়ুয়া। তাঁর পরিবার মূলত কনৌজ থেকে আসামে অভিবাসিত হয়েছিল মোটামুটিভাবে ষোড়শ শতাব্দীতে। তাঁর পিতৃপুরুষেরা বংশানুক্রমে অহোম আদালতের কেরানির কাজ করতেন। ১৭৬৯ সাল থেকে ১৮০৬ সালের মধ্যে সংঘটিত মামোরিয়া বিদ্রোহের সময় ধীরে ধীরে এই অহমিয়াদের আধিপত্য খর্ব হয়ে যায়। ১৮১৭ সাল নাগাদ আসাম আক্রমণ করে বর্মিরা। সেই সময় বাধ্য হয়ে তাঁরা বাংলায় চলে আসেন নিরাপদ আশ্রয়ের উদ্দেশ্যে। বাংলায় সেই সময় ব্রিটিশ ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির রাজত্ব। তারপরে ১৮২৪ সাল নাগাদ আবার প্রথম ইঙ্গ-বর্মা যুদ্ধ শুরু হলে তার আগে আগেই ব্রিটিশ সরকারের নিরাপত্তা ও সুরক্ষার মধ্যে পুনরায় আসামে ফিরে আসেন মণিরাম দেওয়ানের পরিবার। অবশেষে সেই যুদ্ধে বর্মিদের পরাজিত করে ব্রিটিশরা ইয়াণদাবোর সন্ধি অনুযায়ী আসামের অধিকার দখল করে।
পরবর্তীকালে উত্তর-পূর্ব ভারতের গভর্নর জেনারেলের এজেন্ট স্যার ডেভিড স্কটের অধীনে ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির একজন বিশ্বস্ত সহকারী হিসেবে কাজ করতে শুরু করেন মণিরাম দেওয়ান। ১৮২৮ সালে বাইশ বছর বয়সী মণিরাম ডেপুটি ক্যাপ্টেন জন ব্রায়ান নিউভিলের অধীনে রংপুর জেলার সেরেস্তাদার এবং তহ্শিলদারের পদে নিযুক্ত হন। পরে, ১৮৩৩ থেকে ১৮৩৮ সালের মধ্যে আসামের রাজা হন পুরন্দর সিংহ এবং তাঁর অনুমোদনে মণিরাম ‘বোরভাণ্ডার’ তথা মুখ্যমন্ত্রী পদে উন্নীত হন। পুরন্দর সিংহের পুত্র কমলেশ্বর সিংহ এবং পৌত্র কন্দর্পেশ্বর সিংহের সঙ্গেও একজন দক্ষ সহকারী হিসেবে কাজ করেন। তহশিলদার থাকাকালীন বিশাল অঞ্চল জুড়ে তাঁর প্রভাব ছিল এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে তাঁর প্রভাব ও খ্যাতি দুইই সমানভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল, ক্রমেই তা ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে কার্যকর হয়ে উঠছিল। পরে এই ব্রিটিশরাই অহোম রাজা পুরন্দর সিংহের রাজত্ব কেড়ে নিলে, বিশ্বস্ত মণিরাম নিজে থেকেই তহশিলদার এবং সেরেস্তাদার পদ থেকে ইস্তফা দেন।
এক নজরে মণিরাম দেওয়ান-এর জীবনী:
- জন্ম: ১৭ এপ্রিল, ১৮০৬
- মৃত্যু: ২৬ ফেব্রুয়ারি, ১৮৫৮
- কেন বিখ্যাত: মণিরাম দেওয়ান বা মণিরাম দত্ত বড়ুয়া ভারতের চা-রোপণ ও চা-উৎপাদনের ইতিহাসে অন্যতম পথিকৃৎ। একসময় তিনি ব্রিটিশদের চা-বাগানের দেওয়ান ছিলেন কিন্তু চা শ্রমিকদের উপর ব্রিটিশ-অত্যাচার দেখে তিনি দেওয়ান পদ ছেড়ে দেন। পরবর্তীকালে ব্রিটিশ বিরোধী কার্যকলাপে জড়িয়ে পড়েন যে কারণে তাঁকে ফাঁসি দেওয়া হয়। মানুষের কাছে তিনি ‘কালিতা রাজা’ নামে পরিচিত ছিলেন।
তিনি ক্রমে বুঝতে পারেন যে উনিশ শতকের মধ্যভাগে আফিমের যুদ্ধ চলার সময়ে ব্রিটিশরা যখন চীন থেকে চা আমদানি করতে পারছে না, সেই সময় তিনিই প্রথম চায়ের ক্ষেত্রে চীনের একচেটিয়া আধিপত্যকে খর্ব করতে উদ্যত হন। আসামের উত্তরাঞ্চলের সিংপো উপজাতিদের কথা তিনি জানতে পারেন যারা ভারতে সে সময় চায়ের ব্যবহার করত, চা খেতো বন থেকে সেই চা পাতা সংগ্রহ করে। ১৮২৩ সালে আসামের জোড়হাট জেলার রবার্ট ব্রুসের পর্ণকুটিরে প্রথম সেই সিংপো উপজাতির সর্দার বেসাম গ্যাম নিজে হাতে কীভাবে সেই চা পাতা থেকে চা তৈরি করা হয় সেই পদ্ধতি প্রদর্শন করেন। অহোম রাজা পুরন্দর সিংহের একজন এজেন্ট ছিলেন এই রবার্ট ব্রুস। ১৮২০ সাল নাগাদ পুরন্দর সিংহও নিজের চেষ্টায় চীনা আমদানিকৃত চায়ের বিকল্প সন্ধানের চেষ্টা করতে থাকেন। প্রথমে বেসাম গ্যাম দেখালেন কীভাবে রোদে শুকোনো চা পাতাগুলিকে একটি ধাতব পাত্রে সামান্য আঁচে একটু পুড়িয়ে নেওয়া হয়, আর তারপর গরম জলে সেই পাতাগুলি দিয়ে একটু লালচে বাদামি রঙ ধরলেই তা নামিয়ে নিতে হবে, সেই চা-ই আমরা আজও খাই। রবার্ট ব্রুস এই চায়ের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য পাঠিয়ে দেন কলকাতায়। কলকাতা বোটানিক্যাল গার্ডেনের সুপারিনটেণ্ডেন্ট স্যার নাথানিয়েল ওয়ালিচ্ জানান যে সেই নমুনার চা পাতা চীন থেকে আমদানিকৃত চা পাতার থেকে আলাদা এবং উন্নতমানের। এই অনুমোদন পাওয়া গেলে পরে ১৮৩৪ সালের ১ ফেব্রুয়ারি একটি চায়ের বাণিজ্যিক রোপণ সংক্রান্ত বিষয়ে একটি চা কমিটি স্থাপন করেন লর্ড উইলিয়াম বেণ্টিঙ্ক। এই কমিটি সার্কুলার জারি করে চা চাষের উপযোগী স্থান খুঁজতে শুরু করে এবং এর উত্তরে স্যার এফ. জেনকিন্স জানান যে আসামেই চা চাষের সবথেকে উপযোগী স্থান রয়েছে।
চার বছর পরে সুবসাগরের নাজিরা টি এস্টেটে দেওয়ান রূপে নিযুক্ত হন মণিরাম। তাঁর সে সময় বেতন ছিল মাসিক ২০০ টাকা। সেই থেকেই তিনি মণিরাম দেওয়ান নামেই পরিচিত। মণিরামই প্রথম ভারতের চা-রোপণকারী ছিলেন এবং চা চাষের সমস্ত খুঁটিনাটি সম্পর্কে তিনি ধীরে ধীরে অবগত হন। কিন্তু ক্রমেই তিনি লক্ষ করতে থাকেন চা বাগানের শ্রমিকদের উপরে ব্রিটিশদের অকথ্য অত্যাচার বেড়ে যাচ্ছিল, বেশি পরিমাণ চা উৎপাদন ও প্রভূত লাভের জন্য সেই অত্যাচার সহ্য করা একজন ভারতীয় হয়ে মণিরামের পক্ষে সম্ভব ছিল না। আসামের চা-বাগানের শ্রমিকদের উপর এই অত্যাচারের প্রতিবাদে মণিরাম দেওয়ান পদ থেকে ইস্তফা দেন এবং নিজের উদ্যোগে সেংলুং ও চীনামারা প্রদেশে ১৮৪৩ ও ১৮৪৪ সালে দুটি পৃথক চা-বাগান গড়ে তোলেন।
চা উৎপাদনের পাশাপাশি লোহা গলানো, নুন নিষ্কাশনের কাজেও যুক্ত ছিলেন তিনি। হাত বন্দুকের ম্যাচলক, কোদাল এবং কাপ-প্লেট নির্মাণের কাজেও যুক্ত ছিলেন মণিরাম। অন্যান্য ব্যবসার মধ্যে তিনি একইসঙ্গে হ্যাণ্ডলুম, নৌকা নির্মাণ, ইঁট নির্মাণ, অভ্রের নানা রকম কাজ, চিনামাটির কাজ, কয়লা সরবরাহ, মিলিটারিদের বাসস্থান নির্মাণ ইত্যাদি নানাবিধ কাজ করতেন। কামরূপের গারোহাট, নাগাহাট এবং শিবসাগর হাট তাঁরই তৈরি। এছাড়াও তিনি তৈরি করেন ডিব্রুগড়ের বোরহাট, ধেমাজির সিসিহাট এবং ডারাং-এর ডাবারিয়া হাট। নিজের ব্যবসায়িক বিস্তৃতির কাজে এই হাটগুলি তাঁর নিজ উদ্যোগেই নির্মিত হয়।
১৮৫০ সাল নাগাদ, ইউরোপীয় চা রোপণকারীদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারছিলেন না তিনি এবং অন্যান্য নানা ক্ষেত্রে ব্রিটিশরা সমস্যা সৃষ্টি করছিল। ১৮৫১ সালে শিবসাগরের মুখ্য অফিসার চার্লস হোরলয়েড মণিরামের চা বাগানের মিথ্যে ত্রুটি দেখিয়ে চা বাগান সংক্রান্ত সমস্ত অনুমোদন বাতিল করে দেন। চা-বাগানের ১৮৫ জন শ্রমিক এবং তাঁদের পরিবারসহ নিজের পরিবারও আর্থিক সমস্যার সম্মুখীন হয়। ১৮৫২ সালে কলকাতা সদর আদালতে বিচারপতি এ.জি মোফাত মিলস্-এর কাছে একটি প্রতিবাদপত্র পাঠান। সেই চিঠিতে ব্রিটিশদের অকথ্য অত্যাচারের কথা তুলে ধরার পাশাপাশি মিথ্যে মামলায় অতিরিক্ত অর্থের অপচয় এবং অসম কর ব্যবস্থার বিরুদ্ধেও প্রতিবাদ করেন। অহোম রাজবংশের অসম্মান এবং ক্রমান্বয়ে সেই রাজবংশের সঞ্চিত সম্পদ লুন্ঠন করে যাওয়ার বিরুদ্ধেও সরব হন মণিরাম। কামাখ্যা মন্দিরে হিন্দুদের পুজো বন্ধ করে দেওয়ার প্রতিবাদ করেন। সব মিলিয়ে ব্রিটিশদের চোখের বালি হয়ে ওঠেন মণিরাম। এর প্রতিবিধানস্বরূপ অহোম রাজাদের পুরাতন শাসনব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার প্রস্তাব দেন তিনি। যদিও এই প্রস্তাব একেবারেই নাকচ করে দেন বিচারপতি মিলস। অহোম শাসন পুনরায় ফিরিয়ে আনার জন্য মণিরাম জনমত সংগ্রহ করার চেষ্টা করেন। ১৮৫৭ সালে ৬ মে, অহোম রাজা কন্দর্পেশ্বর সিংহের পক্ষ থেকে ব্রিটিশ সরকারের কাছে পুনরায় তিনি একটি প্রতিবাদপত্র পাঠান। ইতিমধ্যে সিপাহি বিদ্রোহ শুরু হলে অহোম রাজা কন্দর্পেশ্বরের গুপ্তচর ও প্রধান পরামর্শদাতা পিয়ালী বড়ুয়ার মাধ্যমে একটি সংকেতপত্র পাঠান এবং এই সময়ে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে একটি আন্দোলন গড়ে তুলতে অনুরোধ করেন। ডিব্রুগড় এবং গোলাহাটের সিপাহিদের নিয়ে ব্রিটিশ-বিরোধী ষড়যন্ত্র গড়ে তোলেন রাজা কন্দর্পেশ্বর এবং মণিরাম। স্থানীয় নেতা উর্বিধর বড়ুয়া, মায়ারাম বারবোরা, উগ্রসেন মোরঙ্গিখোয়া গোহেইন, দেওরাম ধিঙ্গিয়া বড়ুয়া, দ্যুতিরাম বড়ুয়া, বাহাদুর গাঁওবুড়াহ্ প্রমুখরা এই বিদ্রোহে অংশ নেন। এই ষড়যন্ত্রে অংশ নেন সুবেদার শেখ ভিকুন এবং নূর মহম্মদ। কন্দর্পেশ্বর প্রতিশ্রুতি দেন তিনি সিপাহিদের বেতন দ্বিগুণ করে দেবেন যদি তারা ব্রিটিশদের পরাজিত করতে পারে। পরিকল্পনা অনুযায়ী ঠিক হয় প্রথমে জোড়হাটে একটি বিরাট মিছিল করে বিক্ষোভকারীরা হেঁটে যাবে রাজবাড়ির দিকে এবং জোড়হাট দখল করবে আর তারপর ডিব্রুগড় ও শিবসাগর দখল করবেন তারা। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে এই পরিকল্পনা আগে থেকেই জানতে পেরে যায় ব্রিটিশরা। ফলে রাজা কন্দর্পেশ্বর, মণিরাম এবং অন্যান্য নেতারা গ্রেপ্তার হন। কিছুদিন আলিপুর জেলে বন্দি রেখে মণিরামকে পরে জোড়হাটে নিয়ে আসা হয়। তাঁর বিরুদ্ধে মামলা চললে স্যার চার্লস হোরলয়েড বিচার করেন মণিরামের এবং সেই মামলায় শিবসাগরের দারোগা হরনাথ পার্বতীয়া বড়ুয়া তাঁকে সমস্ত ষড়যন্ত্রের মুখপাত্র ছিলেন বলে জানান। পিয়ালী বড়ুয়া এবং মণিরাম দেওয়ানকে ফাঁসি দেওয়া হয়।
১৮৫৮ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি মণিরাম দেওয়ানের ফাঁসিতে মৃত্যু হয়। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁকে নিয়ে অনেক গান লেখা হয় যা “মণিরাম দেওয়ানের গীত” নামে পরিচিত। এছাড়াও গোয়াহাটির মণিরাম দেওয়ান ট্রেড সেন্টার ও ডিব্রুগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের মণিরাম দেওয়ান হোস্টেল তাঁর সম্মানার্থে নির্মিত।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান